নকল মোবাইল তৈরির কারখানার সন্ধান

গুলিস্তানে তৈরি ফোন ‘মেড ইন চায়না-ফিনল্যান্ড’

প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২২, ২১:৩২ | অনলাইন সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর গুলিস্তানে নকল মোবাইল তৈরি ও আইএমইআই পরিবর্তনের কারখানার সন্ধান পেয়ে অভিযান চালিয়েছে র‌্যাব। ওই কারখানা থেকে বিপুল পরিমাণ নকল মোবাইল ফোনসেট ও যন্ত্রপাতি উদ্ধার করেছে র‌্যাব-৩। 

সোমবার বিটিআরসি’র সহযোগীতায় চালানো অভিযানে কারখানার মালিক ও নকল মোবাইল তৈরির মূল কারিগর মো. স্বপনকে (২৬) গ্রেপ্তার করা হয়।

ওই কারখানা থেকে ভুয়া আইএমইআই মোবাইল ১ হাজার ৪৯৫টি, মোবাইলের নকল ব্যাটারী ৩ হাজার ৩৭০টি, হেডফোন ১২০টি, চার্জার ক্যাবল ৩৮৫টি, নকল মোবাইলের চার্জার ১ হাজার ১৫ টি, সেলার মেশিন ১টি, হিট গান মেশিন ১টি, এলসিডি মনিটর ৪৩টি, ইলেক্ট্রিক সেন্সর ১০টি, আইএমইআই কাটার মেশিন ১৩টি এবং বিপুল পরিমান ভুয়া আইএমইআই স্টিকার ও বারকোড উদ্ধার করা হয়েছে।

র‌্যাব বলছে, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার কোনো ধরনের অনুমোদন না থাকলেও দিনে ৫০টি মোবাইল ফোনসেট তৈরি হতো কারখানাটিতে। দিনে ২০০টিরও বেশি মোবাইল বিক্রি করতেন স্বপন। বিভিন্নভাবে মোবাইলের যন্ত্রাংশ এনে স্বপনের কারখানায় নকল আইএমআই দিয়ে মোবাইল ফোনসেট তৈরি করা হতো, যা দেশের বিভিন্ন এলাকায় খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে সাধারণ গ্রাহক ও অপরাধীদের হাতে চলে যেতো।

সোমবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে সংস্থাটির মিডিয়া সেন্টারে র‌্যাব-৩ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, পঞ্চম শ্রেণি পাশ করা স্বপনের ছোট বেলা থেকেই প্রযুক্তিগত দিকে আগ্রহ ছিলো। একজনের মোবাইল ফোনসেট মেরামতের সূত্রে গুলিস্তান এলাকার এক মেকানিকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এরপর সেই মেকানিকের মাধ্যমে স্বপন জানতে পারেন, মোবাইলফোন মেরামতের ব্যবসাটি লাভজনক। তখন তিনি বিনা বেতনে একটি সার্ভিসিং দোকানের মেকানিকের সঙ্গে কাজ শিখতে শুরু করেন এবং একপর্যায়ে মোবাইল সার্ভিসিংয়ের ওপর বেশ দক্ষতা অর্জন করেন। পাশাপাশি এ বিষয়ে জানার জন্য অনলাইনে বিভিন্ন ভিডিও দেখেন। পরে স্বপন নিজেই ভিন্ন দেশ থেকে যন্ত্রাংশ এনে মোবাইল ফোন তৈরি ও আইএমআইহ নম্বর পরিবর্তনের কাজ শুরু করেন।

ওই কারখানায় আরও কারিগর ছিলো। তারাও তাকে সহযোগিতা করতেন। স্বপনের কারখানায় তৈরি এসব মোবাইল দেশের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা কিনে নিতেন। এসব মোবাইল তৈরি করতে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা খরচ হতো। কিন্তু এসব মোবাইল তারা ১৫০০ থেকে ২০০০টাকায় বিক্রি করতেন। স্বপনের কারখানায় তৈরি করা এ মোবাইল দেশের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীরা কিনে নিতেন। তার কারখানায় তৈরি করা মোবাইল সিলার ও হিটার মেশিনের সহায়তায় মোবাইলের গায়ে মেড ইন চায়না, মেড ইন ভিয়েতনাম, মেড ইন ফিনল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের নাম লিখে আসল মোবাইলের মতো প্যাকেটিং করে বিক্রি করা হতো। 

র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, স্বপন প্রতিদিন ৫০টি মোবাইল ফোনসেট তৈরি করতে পারেন। তার কারখানায় থাকা সহযোগীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। এক বছর ধরে কারখানাটি চালাচ্ছিলেন স্বপন। 

র‌্যাব-৩ এর সিও বলেন, বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ এই ধরনের মোবাইলগুলোর ক্রেতা। মোবাইলগুলোতে সীম ইনসার্ট করলে‘বিটিআরসির ডাটাবেজে হ্যান্ড সেটটি নিবন্ধিত নয়’এই মেসেজ আসে। বিটিআরসির ডাটাবেজে নিবন্ধিত না থাকায় মোবাইলগুলো বিক্রির পর অধিকাংশ মোবাইলফোনেই কোনো না কোনো সমস্যার কারণে গ্রাহক অভিযোগ করতেন। বারবার মোবাইল নষ্ট হওয়ায় গ্রাহকরা হয়রানির শিকার হতেন। তখন মোবাইল মেরামতের আশা ছেড়ে দিয়ে নষ্ট মোবাইলটি আর ফেরত নিতে আসতেন না গ্রাহকরা। তখন ওইগুলো মোবাইল পুনরায় মেরামত করে নতুন গ্রাহকের কাছে বিক্রি করতেন তিনি।

স্বপনের কারখানায় তৈরি ১০হাজার মোবাইল দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্রি হয়েছে। এই মোবাইল বিক্রির ৩০লাখ টাকারও বেশি দিয়ে নিজ গ্রামে জমি কিনেছেন স্বপন। এসব নকল মোবাইল দিয়ে কথা বলা ছাড়াও বিভিন্ন কাজ করা যেত। মোবাইল কোনো অপরাধ চক্র অথবা রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে কি না তা জানতে তদন্ত চলছে।

বাংলাদেশ জার্নাল/এমএম