ঢাকা, সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১১ আশ্বিন ১৪২৯ আপডেট : ৮ মিনিট আগে

হাসপাতালে সিট ফাঁকা, মেঝেতে চিকিৎসা হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধার

  পাবনা প্রতিনিধি

প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২২, ০০:৩৫

হাসপাতালে সিট ফাঁকা, মেঝেতে চিকিৎসা হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধার
ছবি: প্রতিনিধি
পাবনা প্রতিনিধি

সিট ফাঁকা থাকা সত্ত্বেও বীর মুক্তিযোদ্ধা হরি শংকরকে পাবনা জেনারেল হাসপাতালের মেঝেতে শুইয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা হরি শংকর(৭১) পাবনা সদর উপজেলার পৌর সদরের বলরামপুর এলাকার বাসিন্দা।

শুক্রবার পাবনা জেনারেল হাসপাতালে এ ঘটনা ঘটে বলে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সচিত্র জানিয়েছেন সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম-মুক্তিযুদ্ধ’৭১ পাবনা জেলা শাখার সভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা আ স ম আব্দুর রহিম পাকন। এর পরে অনেকেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আ স ম আব্দুর রহিম পাকন জানান, শুক্রবার সকালে বীর মুক্তিযোদ্ধা হরি শংকর অসুস্থ হয়ে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন। খবর পেয়ে তিনি তাকে হাসপাতালে দেখতে গিয়ে দেখেন তাকে শুধুমাত্র একটি স্যালাইন দিয়ে বারান্দায় মাটিতে শুইয়ে রাখা হয়েছে।

তিনি সামাজিক গণমাধ্যমে দেয়া স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘বাঙালি জাতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী আমরা সবাই এহেন ব্যবস্থার জন্য লজ্জিত এবং দুঃখিত।’

বীর মুক্তিযোদ্ধা আ.স.ম. আব্দুর রহিম পাকন জানান, তিনি সকালে হাসপাতালে গিয়ে দেখতে পান নন পেইং ওয়ার্ডে তখনও তিনটি সিট ফাঁকা ছিল। অথচ তাকে একটি সিট দেয়া হয়নি। তখন তিনি নিজে অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধা হরি শংকরকে একটি বেডে তুলে দেন। এ সময় কোন চিকিৎসককেও তিনি পাননি বলে জানান।

এ দিকে বিষয়টি জানাজানির পর সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে নিন্দার ঝড় উঠেছে। কবি, গীতিকার আলমগীর কবির হৃদয় লিখেছেন ‘এগুলো দেখবার বা বলবার জন্য কেউ নেই। যারা দায়িত্বে আছেন তারাও যেন অনেকাংশে কিছুই জানি না ভাব নিয়ে চলেন।’

একটি একটি প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ জেবুন্নেছা ববিন লিখেছেন, ‘খুবই দুঃখজনক।’

মাহমুদ আলম নামের একজন ব্যবসায়ি লিখেছেন ‘উনি বারান্দায় কেন? মুক্তিযোদ্ধাদের সংরক্ষিত সিট তাহলে আছে কাদের জন্য?’

জেলা ক্রীড়া সংস্থার ক্রিকেট সাব কমিটির সদস্য খাইরুল ইসলাম পিয়াল লিখেছেন ‘আসলেই খুব খারাপ অবস্থা হাসপাতালের। খুবই দুঃখ জনক।’

সামিউল আহমেদ হিমেল নামের একজন লিখেছেন, ‘পাবনা সদর হাসপাতাল দূর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। একজন মুক্তিযোদ্ধার সাথে এমন আচরণ করা মোটেই উচিত নয়। অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রশাসনের পদক্ষেপ নেয়া উচিত। সাধারণ মানুষের সাথেও এমন আচরণ করা হয়। মানুষই মনে করে না।’

পাবনা সদরের বলরামপুর কমিউিনিটি হাসপাতালের ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান লিখেছেন, ‘একজন মুক্তিযোদ্ধার জন্য ডিসি, এসপি, এমপির সুপারিশ লাগবে কেন? যারা নিজেদের জীবনকে বাজী রেখে দেশকে স্বাধীন করলেন তাদের অধিকার সবার আগে।’

শুভ খাঁন নামের একজন লিখেছেন, ‘পাবনা সদর হাসপাতালের চিকিৎসা এতটাই খারাপ, কর্মকর্তা- কর্মচারিরা রোগীদের খুবই অবহেলা করেন... যা কল্পনার বাইরে। দুপুর ২ টার পর থেকে সারা রাত আর কোন ডাক্তার থাকে না, পবানায় এসব দেখার কেউ নাই।’

মো: অলিফ নামের একজন লিখেছে, ‘যারা হাসপাতাল পরিচালনা করেন তাদের শাস্তি দাবি করছি। এদের জন্য আওয়ামী লীগের দুর্নাম হয়। গরিব মানুষ যন্ত্রণায় ছটফট করে আর ঐ হাসপাতালের কর্তব্যরত ডাক্তারা বসে বসে টাকা লুটে।’

বীর মুক্তিযোদ্ধা আ স ম আব্দুর রহিম পাকন জানান, তিনি হাসপাতালে যাওয়ার পরে শোনেন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দকৃত একমাত্র পেইং বেডটি অন্য একজন অসুসস্থ বীর মুক্তিযোদ্ধাকে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, অন্য ৩টি সাধারণ বেডতো খালি ছিল। তিনি নিজে খালি সিটগুলোর ছবিও তোলেন। সিট খালি থাকা সত্ত্বেও ওই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে মেঝেতে শুইয়ে স্যালাইন দেয়া হচ্ছিল। হাসপাতালে সিটও কেনা-বেচা হয়।

অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের বরাত দিয়ে আ স ম আব্দুর রহিম পাকন জানান, বীর মুক্তিযোদ্ধা হরি শংকর এখন তার নিজ বাড়িতে রয়েছেন। তাকে তিনটি স্যালাইন দিয়ে ‘রিলিজ’ করে দেয়া হয়েছে। চিকিৎসক তাকে একটি টেস্ট দিয়েছিলেন। সে টেস্টও হাসপাতাল থেকে না করে বলা হয়েছিল, বাইরে থেকে করে আনতে হবে।

পাবনা জেনারেল হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার জাহাঙ্গীর আলম জানান, তিনি এ সময় হাসপাতালে ছিলেন না। তবে সিট থাকা সত্ত্বেও এমনটি হওয়ার কথা নয়। পুরা বিষয়টি তিনি জানেন না। এ সময় যারা দায়িত্বে ছিলেন তারা ভাল বলতে পারবেন বলে জানান।

পাবনা জেনারেল হাসপাতালের সহকারি পরিচালক (এ.ডি) ডা. ওমর ফারুক মীর জানান, বীর মুক্তিযোদ্ধা হরি শংকর ডায়রিয়া রোগের জন্য হাসপাতালে ভর্তি হন বলে তিনি জেনেছেন। তাকে মেঝেতে চিকিৎসা দেয়ার কথা তিনি অস্বীকার করেন।

তিনি জানান, একজন রোগীকে অন্যত্র সরিয়ে ওই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সিট দেয়া হয়েছিল।

উল্লেখ্য, পাবনা জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। গত ৩ জুলাই পাবনা জেনারেল হাসপাতালে আসেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) সাইদুর রহমান। তিনি ওই দিন দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত টানা দুই ঘণ্টা তিনি হাসপাতালে অবস্থান করেন। হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা দেখে চরম ক্ষুব্ধ হন। দ্রুত এসব অব্যবস্থাপনা দূর করে চিকিৎসাসেবার মান বাড়াতে হাসপাতালের সহকারি পরিচালককে নির্দেশ দেন।

এ সময় অতিরিক্ত সচিব বলেন, আপনি কাজ করতে না পারলে সরে যান। এরপর গত কুরবানী ঈদের দ্বিতীয় দিন ১১ জুলাই দুপুরে হাসপাতালে রোগীদের খোঁজ নিতে হাসপাতাল ঝটিকা পরিদর্শনে যান পাবনা-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক প্রিন্স। এ সময় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অনুপস্থিতি, অব্যবস্থাপনা, অপরিচ্ছন্নতা ও খাবারের নিন্মমান নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন সংসদ সদস্য।

সর্বশেষ পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ডায়রিয়ার চিকিৎসা করাতে গিয়ে ১ বছরের শিশুর ৩টি আঙুল কেটে ফেলতে হয়েছে। জুন মাসের ১০ থেকে ১৮ তারিখ পর্যন্ত শিশুটি পাবনা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। সঠিকভাবে ইনজেকশন পুশ না করায় এবং চিকিৎসায় অবহেলার কারণে এমন ক্ষতি হয়েছে বলে শিশুটির বাবা জাহিদুল ইসলাম জাহিদ জানিয়েছেন। এ ঘটনার প্রতিবাদে সিভিল সার্জনসহ বিভিন্ন মহলে অভিযোগপত্র দিয়েছেন তিনি।

বাংলাদেশ জার্নাল/জিকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত