ঢাকা, শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ আপডেট : ২২ মিনিট আগে
শিরোনাম

পলাতক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসা‌মি গ্রেপ্তার

  নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪:৩৫  
আপডেট :
 ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫:৪১

পলাতক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসা‌মি গ্রেপ্তার
আসামি মো. আলকেস। ছবি: নিজস্ব
নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর শাহ আলী এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে বাসু হত্যা মামলার দীর্ঘ ১২ বছর ধরে পলাতক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, হত্যা, ডাকাতিসহ একাধিক মামলার আসামি মো. আলকেসকে (৫২) গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-৪।

র‌্যাব জানায়, গ্রেপ্তার আলকেস ১২ বছর ধরে ঠিকানা পরিবর্তন করে ছদ্মবেশ ধারণ করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপনে ছিলেন। আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় নিজের পরিচয় গোপন করার জন্য ক্রমাগত পেশা পরিবর্তন করছিলেন। বরিশাল গিয়ে ট্রাকের হেল্পার ও পরে ড্রাইভার হিসেবে কাজ শুরু করে। বেপরোয়াভাবে বাস চালানের সময় সিলেটে তার বাসের নিচে পরে একজন নির্মমভাবে নিহত হয়। এ ঘটনায় সিলেটের ওসমানীনগর থানায় পরিবহন আইনে তার বিরুদ্ধে পুনরায় হত্যা মামলা হলে সে পালিয়ে কুয়াকাটা মাছ ধরার ট্রলারে কাজ শুরু করে। মাছ ধরার পাশাপাশি সাগরে বিভিন্ন ট্রলারে ডাকাতি করতো। গ্রেপ্তারের আগ পর্যন্ত গত দেড় বছর ধরে একটি দূরপাল্লার পরিবহনের চালক হিসেবে কাজ করে আসছিলেন আলকেস।

২০১২ সালে ভবন নির্মাণকে কেন্দ্র করে ভুক্তভোগী বাসুর ওপর আগ্নেয়াস্ত্র, দেশিয় ধারালো অস্ত্র ও লোহার রড নিয়ে আক্রমণ করে। আক্রমণের এক পর্যায়ে আলকেস তার কাছে থাকা অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে কয়েক রাউন্ড গুলি করলে বাসুর মাথার বাম পাশে লেগে ডান পাশ দিয়ে বের হয়ে গেলে বাসু ঘটনাস্থলেই মারা যান। এ ঘটনায় নিহতের ভাই চিনু মিয়া আলকেসহ ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরো ৬/৭ জন আসামির বিরুদ্ধে শাহ আলী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

শনিবার দুপুরে রাজধানীর কাওরানবাজা‌রে র‌্যাব মি‌ডিয়া সেন্টা‌রে আ‌য়ো‌জিত সংবাদ স‌ম্মেল‌নে র‍্যাব-৪ এর অধিনায়ক ডিআইজি মোজাম্মেল হক বলেন, গ্রেপ্তার মো. আলকেস, মামলার বাদী চিনু মিয়া ও নিহত বাসু মিয়া (৪৮) একই এলাকার বাসিন্দা। মামলার বাদী চিনু মিয়া নিহত বাসু মিয়ার আপন ছোট ভাই। গ্রেপ্তার আলকেস শাহ আলীর চটবাড়ী নবাবেরবাগ এলাকার ২০০ সদস্য বিশিষ্ট একটি মৎস্যজীবী সমিতির সদস্য। নিহত বাসু মিয়া ও বাদী চিনু মিয়ার চটবাড়ী এলাকায় ১০ শতাংশের একটি পৈত্রিক দখলীয় সম্পত্তি ছিল। জমিটি আজগর আলীর কাছে বাৎসরিক ভিত্তিতে লিজ দেয়া ছিল। কিন্তু এক সময় আসামি আজগর আলী প্রতারণামূলক জাল দলিল করে নিজের নামে নিয়ে নেন এবং পরে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে ২০১০ সালে সমীতির নামে হস্তান্তর করে।

এতে করে ওই জমি মালিকানা নিয়ে মামলার বাদী চিনু মিয়া এবং ভিকটিম বাসু মিয়ার সঙ্গে মৎসজীবি সমিতীর বিরোধ সৃষ্টি হয়। জমিটি প্রকৃতপক্ষে মূল মালিক চিনু মিয়া ও বাসু মিয়া। সমিতির লোকজনের সংখ্যা বেশি হওয়ায় তারা অর্থাৎ এই মামলার আসামি আলকেসসহ অন্যান্য আসামি আজগর, গিয়াস উদ্দিন, সুানু মিয়া, জিন্নাত, রুমা, কদর আলীদের নেতৃত্বে ওই সমিতির নামে রাখা জমি জোরপূর্বক দখল করে জায়গাটিতে সীমানা প্রাচীর তৈরি করে। তখন মামলার বাদী চিনু মিয়া ও নিহত বাসু মিয়া আসামিদের সঙ্গে বিরোধে না জড়িয়ে সিভিল আদালতে মামলা দায়ের করার পর প্রায় দুই বছর পর আদালত বাদী চিনু মিয়া ও বাসু মিয়ার পক্ষে রায় প্রদান করেন।

পরে মামলার বাদী এবং ভিকটিম আদালতের রায় পেয়ে ওই জমিতে ২০১২ সালের শুরুতে ভবন নির্মাণ করা শুরু করে প্রথম তলার ছাদ পর্যন্ত নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ হয়। ঘটনার দিন ২০১২ সালের ১৪ মে চিনু মিয়ার ভাই বাসু নবনির্মিত ভিবিনের ছাদে পানি দেয়ার জন্য একজন কর্মচারী নিয়ে যায়। তখন সমিতির সদস্যরা মামলার এজাহারনামীয় আসামি আলকেস, আজগর, রাজু, খলিল, সেলিম, কদর আলী, লেদুসহ অজ্ঞাতনামা আরো ৬/৭ জন আগ্নেয়াস্ত্র, দেশিয় ধারালো অস্ত্র ও লোহার রড নিয়ে আক্রমণ করে।

আক্রমণের এক পর্যায়ে আলকেস তার কাছে থাকা অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ‌দি‌য়ে কয়েক রাউন্ড গুলি করলে বাসুর মাথার বাম পাশে লেগে ডান পাশ দিয়ে বের হয়ে গেলে বাসু ঘটনাস্থলেই মারা যান। ওই ঘটনায় নিহতের ভাই চিনু মিয়া গ্রেপ্তার আলকেসসহ ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরো ৬/৭ জন আসামির বিরুদ্ধে শাহ আলী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা নং-২৪।

ঘটনার পর তিন মাসের মধ্যে আলকেসসহ অধিকাংশ আসামিদের পুলিশ গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন আলকেস নিজেকে সম্পৃক্ত করে অন্যান্য আসামির নাম উল্লেখ ক‌রে আদালতে ১৬৪ ধারা মোতাবেক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। কিন্তু আসামিরা চার মাস কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেলে অন্যান্য আসামিরা আদালতে হাজিরা দিলেও আলকেস জামিন নিয়ে আত্মগোপনে চলে যায় এবং এই মামলায় আর কখনো হাজিরা দেয়নি।

ডিআইজি মোজাম্মেল হক আরো বলেন, মামলাটি তদন্ত করে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে এজাহারনামীয় ১৩ জন এবং তদন্তে প্রাপ্ত একজনসহ মোট ১৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করলে আদালত পর্যাপ্ত স্বাক্ষ্য প্রমাণের উপর ভিত্তি করে বিচারকার্য পরিচালনা করে ২০২১ সালের ১৫ নভেম্বর আলকেস, আজগর আলী, খলিল, সেলিম ও রাজুসহ মোট ৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড, কদর আলী ও লেদুকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন। জামিনে থাকা অবস্থায় আলকেস গংয়ের সঙ্গে আজাহার ও সানুর মতবিরোধ সৃষ্টি হওয়ায় আলকেস গং আজাহার ও সানু নির্মমভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। এই ডবল মার্ডারের মূল আসামি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আলকেস।

এ ঘটনায় আলকেসের বিরুদ্ধে আরো একটি হত্যা মামলা আদালতে বিচারাধীন এবং তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট পেন্ডিং আছে। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত কদর আলী হাজতে থাকা অবস্থায় স্ট্রোক করে মারা যান। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত নসু, জিন্নাত, গিয়াস, সালেম উদ্দিন এবং রুমাসহ পাঁচজনকে খালাস ‌দেন।

র‌্যাব জানায়, আলকেসের বিরুদ্ধে বাসু হত্যা মামলা হওয়ায় চার মাস হাজত খেটে জামিন নিয়ে এলাকায় অবৈধ বালুর ব্যবসা শুরু করেন। বাসু হত্যা মামলার আসামি আজাহার ও সানুর সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হওয়ায় আলকেসের নেতৃত্বে সাভার থানা এলাকায় আজাহার ও সানুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এবং একটি হত্যা মামলা হয়। এই মামলায় তি‌নি সাভার থানার ওয়ারেন্টভুক্ত পলাতক আসামি। অবৈধভাবে বালু উত্তোলন এবং সংরক্ষণ করার অপরাধে পরিবেশ অধিদপ্তর তার বিরুদ্ধে শাহ আলী থানায় মামলা রুজু করে এবং এই মামলায় তি‌নি পলাতক ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি। এছাড়াও তি‌নি শাহ আলী থানায় ডাকাতির প্রস্তুতি মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত পলাতক আসামি। এসব মামলায় গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে চলে যান তিনি।

বাংলাদেশ জার্নাল/সুজন/এমএস

  • সর্বশেষ
  • পঠিত