ঢাকা, বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ আপডেট : ২৫ মিনিট আগে
শিরোনাম

ফরিদপুরের চরাঞ্চলে আলো ছড়াচ্ছে হাজী লতিফুন্নেসা ফাউন্ডেশন

  হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ : ২৫ নভেম্বর ২০২২, ১৩:০২

ফরিদপুরের চরাঞ্চলে আলো ছড়াচ্ছে হাজী লতিফুন্নেসা ফাউন্ডেশন
গোলাপবাগ লতিফুন্নেসা প্রাথমিক বিদ্যালয়। ছবি: প্রতিনিধি
হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর প্রতিনিধি

পদ্মা, আড়িয়াল খাঁ, কুমার ও মধুমতিসহ কয়েকটি নদীবেষ্টিত জেলার নাম ফরিদপুর। বিশেষ করে পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদীর বিভিন্ন চরাঞ্চলের অধিকাংশ গ্রাম ছিলো উন্নয়ন বঞ্চিত। ছিলো না শিক্ষার আলো, এমনকি চিকিৎসা পাওয়াটাও যেন সোনার হরিণ মনে করতো এসব চরাঞ্চলে বসবাসকারী হাজারো খেটে খাওয়া মানুষ।

পদ্মার চরের এমনি একটি সুবিধা বঞ্চিত এলাকার নাম গোলাপবাগ। ফরিদপুরের চরাঞ্চলের একটি একসময়ের অবহেলিত গ্রামাঞ্চল চরমাধবদিয়া ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত গোলাপবাগ। বছরের দীর্ঘ সময় ধরে পানিবদ্ধ থাকা গোলাপবাগের একটা সময়ে রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিছুই ছিলো না। শতকরা ৯৫ ভাগ পরিবারই ছিলো হতদরিদ্র। গত তিন দশকের ব্যবধানে এসব চিত্র এখন ঠাঁই নিয়েছে স্মৃতির খাতায়। যার নেপথ্যে রয়েছে হাজী লতিফুন্নেসা ফাউন্ডেশন নামে একটি মানবসেবী সংগঠন।

স্থানীরা জানান, পদ্মার চরবেষ্টিত গোলাপবাগ কোন একক গ্রাম নয়। চরমাধবদিয়া ইউনিয়নের একাধিক গ্রাম নিয়ে সেখানে এই গোলাপবাগের যাত্রা শুরু আশির দশকে। এই এলাকার মরহুম আব্দুল লতিফ খানের পুত্র মো. আব্দুর রশীদ খান হারুন ও আক্তারুজ্জামান খান। দরিদ্রপীড়িত এলাকায় এই পরিবারটি অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট অগ্রসর এবং পূর্বপুরুষেরা গ্রামের মাতব্বর শ্রেণির সুবাদে পড়াশোনার জন্য ছোটবেলাতেই এলাকা ছেড়ে ঢাকা যান আক্তারুজ্জামান খান। মেট্রিক পাশ করার আগেই তার ব্যবসার হাতেখড়ি। আর প্রথম জীবনের উপার্জিত টাকা দিয়ে ১৯৮২ সাল থেকেই শুরু করেন সমাজ সংস্কারের কাজ। চরমাধবদিয়ার পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের আটটি গ্রাম নিয়ে গড়ে তুলেন এই গোলাপবাগ।

এরপর গ্রামে গোলাপবাগ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন ও গ্রামের জরাজীর্ণ মসজিদটিকে সংস্কার করে সেখানে লিল্লাহ বোর্ডিং স্থাপনের মাধ্যমে শুরু করেন পথচলা। সেই থেকে শুরু। এরপর যেমন নিজে পিছিয়ে থাকেননি। তেমনি গোলাপবাগের উন্নয়নের গতিকেও বাড়িয়ে নিয়ে এসেছেন উন্নয়নের মূল ধারায়। নিজের মায়ের নামে গড়ে তোলা গোলাপবাগ হাজী লতিফুন্নেসা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এরপর দাঁড় করিয়েছেন হাফেজিয়া মাদ্রাসা মসজিদ ও এতিমখানা, গোলাপবাগ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বেসরকারি চিকিৎসা কেন্দ্র, বয়স্ক নারী ও পুরুষদের শিক্ষা কেন্দ্র। শহরের টেপাখোলায় একটি কলেজ স্থাপন করা হয়েছে এই হাজী লতিফুন্নেসা ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে। এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় ব্যয় ভার বহনের জন্য নিজেদের সম্পদ থেকে প্রতিমাসে কয়েক লাখ টাকা সরবরাহ করেন তারা। এছাড়া তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে তারা এলাকার অনেক কর্মহীন বেকারদের কাজের সংস্থান করে সেসব পরিবারের দরিদ্রতা মোচন করেছেন।

নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে এই দুই ভাই আমেরিকায় চলে যান। সেখান থেকেও দেশের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে এসব জনহিতকর কাজ পরিচালনা করছেন। মাঝেমধ্যেই দেশে এসে তারা মানুষের সাহাযার্থে এগিয়ে আসেন। তাদের এই মহতি উদ্যোগের ফলেই মূলত একসময়ের এই দারিদ্রপীড়িত এলাকার মানুষ শিক্ষাবিস্তার ও কর্মের সংস্থানসহ নানাভাবে উপকৃত হচ্ছেন।

গোলাপবাগ জামে মসজিদ সংস্কার করে বহুতলবিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করে দিয়েছে হাজী লতিফুন্নেসা ফাউন্ডেশন। সেখানে এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মসজিদটির সংস্কারে সিংহভাগ অর্থ ব্যয় করেছেন হারুন খান। রয়েছে সামর্থ্য অনুযায়ী গ্রামের সবমানুষের সহায়তাও।

মসজিদে এখন নয়নাভিরাম সুদৃশ্য মিনার তৈরির কাজ চলছে। যা মসজিদটিকে আলাদা সৌন্দর্য দিয়েছে। এই মসজিদের পাশের একটি কক্ষে দেখা গেলো, শিশুরা হেফজ পাঠ নিচ্ছে। পাঠদানরত ক্বারি রেজাউল করিম জানান, সেখানে ৪০ জনের মতো আবাসিক ছাত্র রয়েছে যারা হেফজ সম্পন্ন করছেন। আবাসিক ছাত্রদের থাকা ও খাওয়া সম্পূর্ণ ফ্রি সেই শুরু থেকেই। এলাকায় দ্বীনি শিক্ষা বিস্তারে প্রতিষ্ঠানটি ভূমিকা রাখছে। চরাঞ্চলের দরিদ্রপীড়িত পরিবারের সন্তানদের জন্য প্রতিষ্ঠানটি একটি আশীর্বাদ স্বরূপ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এছাড়া সাধারণ শিক্ষাবিস্তারের জন্য রয়েছে লতিফুন্নেসা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও গোলাপবাগ লতিফুন্নেসা প্রাথমিক বিদ্যালয়। বেসরকারি এই প্রাথমিক স্কুলটি সরকারিকরণ করা হয়েছে। সেখানে সরকারি খরচে দ্বিতল একটি ভবনও নির্মাণ করা হয়েছে।

গোলাপবাগ হাফেজিয়া মাদ্রাসায় পাঠরত ছাত্ররা

গোলাপবাগ হাফেজিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল হাফেজ মাওলানা মো. রফিকুল ইসলাম জানান, গোলাপবাগ হাজী লতিফুন্নেসা ফাউন্ডেশনের সভাপতি মো. আব্দুর রশীদ খান হারুন। তারই ছোট ভাই হচ্ছেন আক্তারুজ্জামান খান। তারা দুই ভাই-ই আমেরিকা প্রবাসী। তারা প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনার জন্য তাদের বেশকিছু সম্পদ থেকে উপার্জিত আয় নিয়মিতভাবে প্রদান করেন। ঢাকার বসুন্ধরায় সাত তলা একটি ভবন থেকে পাওয়া প্রতিমাসের আয় এবং গ্রামের ৩০ বিঘা জমির ফসলের যাবতীয় আয় ছাড়াও তারা আরও বিভিন্নভাবে অর্থ সহায়তা করে যাচ্ছেন এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য। গ্রামের দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্রটিতে আমেরিকা থেকে আনা ওষুধ তারা বিনামূল্যে রোগীদের জন্য বিতরণ করেন। এসব কাজের সম্পূর্ণ দায়িত্ব বহন করেন আব্দুর রশীদ খান হারুন সাহেব ও আক্তারুজ্জামান খান সাহেব।

এব্যাপারে চরমাধবদিয়া ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ড মেম্বার আব্দুল হক বলেন, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কারণে তাদের এলাকার মানুষ অনেক উপকৃত হয়েছে। কারণ এখানকার বেশিরভাগ মানুষই হতদরিদ্র। রাস্তাঘাট, স্কুল, কলেজ কিছুই ছিলো না। এখন সেই অবস্থা নেই। নিজেদের অর্থায়নে এসব মাদ্রাসা, স্কুল, এতিমখানা, মসজিদ, বালিকা বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালনা করেন তারা। গ্রামের মানুষ বিনামূল্যে এসব সেবা পায়। এছাড়া তারা সবসময়েই সাধারণ মানুষের সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন। এই কোভিড-১৯ এর সময়ে তারা বিপন্ন মানুষকে নানাভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন।

বাংলাদেশ জার্নাল/এমপি

  • সর্বশেষ
  • পঠিত