ঢাকা, শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯ আপডেট : ১৩ মিনিট আগে
শিরোনাম

ফরিদপুরের পদ্মায় নাব্যসংকট, নৌ চলাচল ব্যাহত

৭ হাজার কুলি-শ্রমিক বেকার

  হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১৯:৫৪

ফরিদপুরের পদ্মায় নাব্যসংকট, নৌ চলাচল ব্যাহত
নাব্যসংকটে নৌযান চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ছবি: প্রতিনিধি
হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর প্রতিনিধি

চলতি শুস্ক মৌসুমে ফরিদপুরে পদ্মা নদীতে নাব্যসংকট দেখা দিয়েছে। এতে পণ্যবাহী জাহাজ, কার্গো, বলগেট ও বড় ট্রলার চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থায় ঘাটের প্রায় ৭ হাজার কুলি-শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। অন্যদিকে, দূরদূরান্ত থেকে আসা এসব পণ্যবাহী জাহাজ নৌ-বন্দরে ভিড়তে পারছে না। ফলে নৌ-বন্দরের শুল্ক আদায়ও কমে গেছে। আবার, এসব নৌযান থেকে পণ্য খালাস করতে অতিরিক্ত মাশুল গুনতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, গত সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে পদ্মা নদীর পানি কমতে শুরু করে। তখন থেকেই এসব নৌযান নাব্যসংকটের কবলে পড়ে সিএন্ডবি ঘাটের বন্দরে আসতে বাধাপ্রাপ্ত হয়। বর্তমানে এই দূরাবস্থা চরমে পৌঁছেছে। নাব্যসংকট রক্ষায় কমপক্ষে ১০/১৫ স্থানে বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিং মেশিন বসিয়ে খনন কাজ করা খুবই জরুরি হয়ে পড়ছে। তবে খননের কাজ পরিকল্পিতভাবে করা না হলে, অল্পদিনের মধ্যেই নৌ চ্যানেলগুলো নতুন বালু এসে ভারাট হয়ে যাবে বলে ঘাটের ছোট ও মাঝারি নৌযান মালিকরা মনে করেন।

দক্ষিণবঙ্গসহ বৃহত্তর ফরিদপুরের ব্যবসায়ীক পণ্য আনা-নেয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ নৌ-বন্দরটি শত বছরের প্রাচীন। ২০১৭ সালে সরকার এটিকে তৃতীয় শ্রেণির নৌ-বন্দর হিসেবে গেজেট প্রকাশ করে। চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর এবং সিলেট, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লাসহ বিভিন্নস্থান থেকে নৌ-পথে এই বন্দরে পণ্য আনা-নেয়া করা হয়। ফরিদপুরের সোনালি আঁশ খ্যাত পাট এই বন্দর হয়েই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বহির্বিশ্বে রপ্তানি হয়।

এছাড়া সিলেট থেকে কয়লা, চট্টগ্রাম থেকে সিমেন্ট, রাজশাহী থেকে বালু, ভারতের গরু ও চালসহ চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, মুন্সিগঞ্জ, কমলঘাট, মিরকাদিম থেকে ওই নৌ-পথেই চাল আমদানি হয়। নারায়ণগঞ্জ বন্দর থেকে প্রচুর সিমেন্টবাহী জাহাজ ও কার্গো এই বন্দর থেকে খালাস করা হয়। কিন্তু বর্তমানে নদীতে নাব্য না থাকায় এবং অসংখ্য ডুবোচর সৃষ্টি হওয়ায় এসব পণ্যবাহী নৌযান বন্দরে আসতে পারছে না। যেগুলো মাল খালাশ করেছে সেগুলো ঘাটে আটকা পড়ছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নৌ-বন্দরে ভিড়তে না পেরে অনেক দূরে ডিক্রীচর, ভূঁইয়াবাড়ি ঘাট, খুশির বাজার, পিঁয়াজখালী ঘাট, হাজিগঞ্জের চরহাজীগঞ্জের এলাকা, চরভদ্রাসনের এমপিডাঙী ও গোপালপুরসহ বিভিন্নস্থানে নদীর তীরে পণ্যবাহী জাহাজ, কার্গো, বলগেট ও বড় ট্রলার নদীর তীরে ভিড়ানো রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ মেঘনা ঘাট থেকে আগত সিমেন্টবাহী জাহাজের মাস্টার মো. সাকিল সেখ বলেন, চরে এসে ঠেকে গেছি। আমার জাহাজে ১২ হাজার বস্তা সিমেন্ট এনেছি। কিন্তু, পর্যাপ্ত গভীরতা নেই বলে ৮ হাজার বস্তা সিমেন্ট আনতে হয়েছে। ৪ হাজার বস্তা সিমেন্ট কম আনতে হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ থেকে ফরিদপুর ঘাটে আসতে প্রায় দুই কিলোমিটার চরের অস্তিত্ব মিলছে। ৩ দিনের পথ আসতে ৫ দিন লেগে গেছে।

তিনি আরও বলেন, এতে আমাদের পণ্যের আগ্রহ কমে গেছে। নৌবন্দরে ভিড়তে পারলে প্রতিবস্তা থেকে ১৪ টাকা করে বাড়তি পেতাম। কিন্তু এখন এই টাকার অর্ধেক দিয়ে আরেকটি ট্রলার ভাড়া করে মাল খালাস করতে হচ্ছে। এসব কারণে তাদের স্টাফ খরচ এবং অন্যান্য ভাড়াও বেড়ে গেছে। এছাড়া জানমালের নিরাপত্তা নিয়েও তারা উদ্বিগ্ন। পথে পথে চাঁদাবাজদের হানা।

নোঙর করা অবস্থায় কয়েকটি পণ্যবাহী জাহাজ

এম.বি. শতনীড় নামে আরেকটি জাহাজের মাস্টার মো. কামাল বলেন, নাব্য না থাকায়, জাহাজের ইঞ্জিনের পাখা ডুবোচরে ঠেকে যায়। চুকান আটকে যায়। এতে চালু অবস্থায় জাহাজের অনেক ক্ষতি হয়। তিনি বলেন, অন্তত গড়ে ১০ হাত গভীর পানি থাকা প্রয়োজন ছিল, কিন্তু সেখানে কোথাও কোথাও দুই-তিন হাত পানি রয়েছে। এখন জরুরি দরকার ড্রেজিং করা। পরিকল্পিতভাবে ড্রেজিং না করলে পুনরায় পলি পড়ে আবার ভরে যায়।

পদ্মায় নাব্য আসছে না কেন? এর কারণ জানতে চাইলে সেখানে ড্রেজিংয়ের কাজে নিযুক্ত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বলেন, ড্রেজিংয়ের পরপরই আবার নতুন পলি ও বালু এসে ভরে যায়। পানিতে প্রচুর পলি থাকায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

ফরিদপুর নৌবন্দরের পণ্য খালাসে নিযুক্ত প্রতিষ্ঠান টাইগার ট্রান্সপোর্টের ম্যানেজার মো. আ. হাকিম বলেন, প্রায় ৮ হাজার কুলি-শ্রমিক এই নৌ-বন্দরে কাজ করতো। এর মধ্যে অনেক ট্রান্সপোর্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীও রয়েছেন। জাহাজ কার্গো না আসায় তারা বেকার হয়ে পড়ছেন। কাজ পাচ্ছেন না।

পদ্মা ট্রান্সপোর্টের মালিক রহমান জানান, বছরের ৫ মাস এখানে পানি কম থাকে বলে পণ্য খালাসে সমস্যা হয়।

ফরিদপুরের সিএন্ডবি ঘাট থেকে শুল্ক আদায়কারী বিআইডব্লিউটিএর কর্মচারী মো. রবিউল ইসলাম বলেন, বন্দরে জাহাজ, কার্গো বলগেট, বড় ট্রলার ভিড়তে না পারায় তাদের শুল্ক আদায়ও কমে গেছে। তিনি জানান, আগে ঘাটটি ইজারা দেয়া হতো।

এ্যাপারে বিআইডব্লিউটিএর সংশ্লিষ্ট একজন পোর্ট অফিসার নাম প্রকাশের অনিচ্ছা সত্ত্বে বলেন, নৌবন্দরটিকে সচল করতে নৌ-চ্যানেলে ড্রেজিং কাজ চলছে। তবে এই ঘাটটি এখনও বড় নৌযান চলাচলের উপযুক্ত হয়নি। আশা করছি চলতি মৌসুমেই ঘাট পয়েন্টে ড্রেজিংয়ের কাজ শুরু করলে এই সংকট কেটে যাবে।

কথা হয় ঘাটের কুলি শ্রমিকদের প্রবীণ নেতা মো. তারা মিয়ার (৬০) সাথে। তিনি জানান, এই ঘাটের ১১টি সেক্টরে প্রায় ৮ হাজার কুলি-শ্রমিক ছিল। পদ্মার যৌবন থাকা অবস্থায় এই বন্দরে প্রতিদিন ৩/৪ শত নৌযান ভিড়তো। এখন নাব্যসংকটের কারণে সপ্তাহে ১০/১৫ বলগেট ও ৩/৪ টি জাহাজ আসে। কাজ নেই। তাই কমপক্ষে ৭ হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশ জার্নাল/এমপি

  • সর্বশেষ
  • পঠিত