ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৯ মাঘ ১৪২৯ আপডেট : ৪ মিনিট আগে
শিরোনাম

প্রধানমন্ত্রীর জনসভা ঘিরে পোস্টার–ব্যানারে ছেয়ে গেছে বন্দরনগরী

  মনির ফয়সাল, চট্টগ্রাম থেকে

প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১০:৩৩  
আপডেট :
 ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১০:৪১

প্রধানমন্ত্রীর জনসভা ঘিরে পোস্টার–ব্যানারে ছেয়ে গেছে বন্দরনগরী
পোস্টার–ব্যানারে ছেয়ে গেছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। ছবি: বাংলাদেশ জার্নাল
মনির ফয়সাল, চট্টগ্রাম থেকে

দীর্ঘ ১০ বছর পর আগামী ৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম সফরে আসছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। টাইগারপাস মোড়ে পলোগ্রাউন্ড মাঠে চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে ভাষণ দেবেন তিনি। এখনো ৭ দিন সময় বাকি। আর তাতেই প্রচারণায় সরগরম সবখানে। জনসভার প্রস্তুতি হিসেবে তিন সপ্তাহ আগেই চিটাগাং উইম্যান চেম্বারের মেলা স্থগিত করা হয়। এরই মধ্যে প্রশাসন বলে দিয়েছে আগামী ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রামে কোনো ধরনের নাগরিক কর্মসূচি পালন করা যাবে না।

অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুকন্যার আগমন ঘিরে নেতাকর্মীর মধ্যে দেখা দিয়েছে প্রাণচাঞ্চল্য। উৎসাহ-উদ্দীপনায় চলছে প্রধানমন্ত্রীকে বরণের প্রস্তুতি। সমাবেশস্থলের আশপাশ থেকে শুরু করে নগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় এখন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাদের ব্যানার-পোস্টার-ফেস্টুন-তোরণে ছেয়ে গেছে বন্দরনগরী। সেখানে সংগঠন নয়, ব্যক্তির পরিচয় ও প্রচারণা শোভা পাচ্ছে।

সচেতন মহল বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই নেতারা বড় বড় ব্যানার-পোস্টার তুলেছেন। প্রধানমন্ত্রী যেসব সড়ক দিয়ে আসা-যাওয়া করবেন মূলত সেসব সড়কেই ব্যানার-পোস্টারের ছড়াছড়ি। কে কার থেকে বড় ব্যানার তুলবে, সেই প্রতিযোগিতা চলছে।

সরেজমিন দেখা যায়, নগরের আগ্রাবাদ, বারিক বিল্ডিং, চৌমুহনী, দেওয়ানহাট, টাইগার পাস, সিআরবি, লালখানবাজার, আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার, আন্দরকিল্লা, জামালখান, নিউমার্কেট, স্টেশন রোড, পলোগ্রাউন্ড মাঠের আশপাশ ছেয়ে গেছে নেতাদের ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুনে।

গত ৩০ মে নগরের একটি কমিউনিটি সেন্টারে নগর ইউনিট যুবলীগের কাউন্সিল হয়। সম্মেলনের ৫ মাস পেরিয়ে গেছে এখনও গঠন হয়নি কমিটি। তাই যুবলীগের পদপ্রত্যাশীদের অনেকেই এবার ব্যানার-পোস্টারে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে মরিয়া। এজন্য প্রধানমন্ত্রীর চট্টগ্রামে আসা-যাওয়ার পথকেই বেছে নিয়েছেন তারা।

পোস্টার-ব্যানারে কেউ প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা এবং কেউ কেউ সমাবেশে সফল করার আহ্বান জানিয়েছেন। আবার অনেকেই ভালো জায়গা দখল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় আগে থেকেই ব্যানার ও তোরণ লাগানোর জন্য গাছ-বাঁশের কাঠামো তৈরি করে রেখেছেন বিভিন্ন স্থানে।

বিশেষ করে পলোগ্রাউন্ড মাঠে যাওয়ার পথে চোখে পড়বে বাঁশ ও কাঠের তৈরি অসংখ্য কাঠামো। তবে টাইগারপাস মোড়ে বাঘের ভাস্কর্যের গা ঘেঁষে ব্যানার টাঙানোর জন্য বিশালভাবে তৈরি করা বাঁশের কাঠামোর কারণে বাঘগুলো ঢাকা পড়ে। অবশ্য সমালোচনার মুখে সেসব ব্যানার সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

নগরীর আগ্রাবাদ থেকে কাজির দেউড়ি পর্যন্ত মো. মহিউদ্দিন বাচ্চু, শাহেদ হোসেন টিটু, সৈয়দ মাহমুদুল হক, সৈয়দ রিয়াজুল করিম বিলাস, খলিলুর রহমান নাহিদ, মো. হেলাল উদ্দিন, মো. আলমগীর কবির, মো. ওসমান, মশিউর রহমান চৌধুরী, মামুন চৌধুরী, আজিজুর রহমান আজিজের ব্যানার-পোস্টার ছিল চোখে পড়ার মতো। লালখানবাজার মোড়ে উত্তর জেলা কৃষক লীগের নামে রাস্তার দুপাশে তৈরি করা হয়েছে তোরণ। এছাড়া টাইগারপাস মোড়ে হাসিনা মহিউদ্দিনের নামেরও একটি তোরণ দেখা গেছে।

নগর যুবলীগের এক নেতা বলেন, আমরা নব্বইয়ের দশকের রাজনৈতিক কর্মী। কখনো ব্যানার-পোস্টারের রাজনীতি করিনি। কিন্তু এখন আমরা ডিজিটাল ব্যানার টাঙাতে বাধ্য হচ্ছি। রাজনীতি আর কর্মী সংগ্রহের মধ্যে নেই। সেটি হয়ে ওঠেছে নেতার প্রচারের অংশ।

দলের এই জনসভাকে কেন্দ্র করে ব্যক্তির প্রচার নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ ঝেড়েছেন চট্টগ্রামের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম শহরকে আমরা নান্দনিকভাবে সাজিয়েছি। কিন্তু ব্যক্তির রুচিহীন প্রচারের কারণে এই শহরের সৌন্দর্য ঢাকা পড়ে গেছে। আমরা কিছু ছোট ছোট ব্যানারের মাধ্যমে চট্টগ্রামকে শৈল্পিকভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছি।

তিনি বলেন, পলোগ্রাউন্ডের জনসভাকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলার যৌথ প্রস্তুতি সভায় আমি এ ব্যাপারে আপত্তি তুলেছি। নেত্রী চট্টগ্রাম আসছেন, অথচ আমাদের উন্নয়ন নিয়ে কোনো ধরনের প্রদর্শনী নেই। ব্যক্তির প্রচারের মাধ্যমে শহরকে আর দেখা যাচ্ছে না। আমি খুব খুশি হব নেত্রী আসার আগেই যদি তারা নিজেদের ব্যানার-পোস্টার খুলে ফেলেন।

চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেন, নেতাকর্মী সবাই প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ শোনার অপেক্ষায়। কারণ প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে আসতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাও।

এদিকে ১৫ নভেম্বর থেকে পলোগ্রাউন্ড মাঠে মঞ্চ তৈরির কাজ শুরু হয়। চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভার জন্য নৌকার আদলে মঞ্চ তৈরি করা হচ্ছে। মঞ্চের মাঝখানের ৪০-৮০ ফুটের মধ্যে ২০০ অতিথি বসবেন। মঞ্চের উচ্চতা হবে সাত ফুট। এছাড়াও মঞ্চের সামনে মুক্তিযোদ্ধা, ভিআইপি ও মহিলাদের বসার জন্য পৃথক প্যান্ডেল তৈরি করা হচ্ছে। প্রায় ১০ লাখ মানুষ এ সমাবেশে জড়ো হবেন বলে ধারণা করছেন আওয়ামী লীগ নেতারা।

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভাকে ঘিরে বর্ণিল সাজে সাজছে চট্টগ্রাম। রংতুলির আঁচড়ে বিবর্ণতা দূর করে নবরূপ পেতে চলেছে বন্দরনগরী। স্থাপত্যে জমে থাকা ময়লা ও দাগ পরিষ্কার করতে কাজ করছেন চট্টগ্রামের বিভিন্ন সেবা সংস্থা। ভাঙাচোরা সড়ক সংস্কার করা হচ্ছে। ফুটপাত, সড়কদ্বীপ, ফ্লাইওভারে পড়ছে রংয়ের ছোঁয়া।

প্রধানমন্ত্রীর আগমন আনন্দঘন করতে নগরের রাস্তাঘাট ও স্থাপত্যগুলোকে প্রাণ দিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। দম ফেলার ফুরসত নেই তাদের। নগরের ফ্লাইওভারগুলোও বাহারি রঙে সাজছে। এছাড়া নগরীর আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ফ্লাইওভার থেকে এমএ মান্নান ফ্লাইওভারের মাঝের অংশটির ল্যাম্পপোস্টে ৭০-এর নির্বাচনে বিজয় ও স্বাধীনতার প্রতীক নৌকার আকৃতিতে এলইডি বাতি লাগিয়ে আলোকসজ্জা করেছে চসিক-এর বিদ্যুৎ বিভাগ।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন জানান, চট্টগ্রামের জনসভা থেকে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচনে বিজয়ের জন্য নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেবেন। আমরা স্মরণকালের সর্ববৃহৎ জনসমাগম ঘটিয়ে দেখিয়ে দিতে চাই চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ, আওয়ামী লীগ মানুষের পাশে ছিল, আছে এবং থাকবে। আর চট্টগ্রামের মানুষ আওয়ামী লীগের সঙ্গে রয়েছে ও থাকবে।

দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান জানান, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জনসভার মঞ্চ তৈরির কাজ চলছে দিনে-রাতে। মঞ্চের কাজ অনেকটা এগিয়ে গেছে। মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণের নেতাদের তত্ত্বাবধানে সকল প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। মোশাররফ ভাইয়ের নেতৃত্বে আমাদের সকল সিনিয়র নেতা প্রায় প্রতিদিনই মাঠ পরির্দশন করছেন। খুঁটিনাটি দিকগুলো দেখছেন, প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। কেন্দ্রীয় নেতারাও মনিটারিং করছেন।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দলীয় ব্যানারে চট্টগ্রামে এটিই প্রথম জনসভা। এই জনসভার পর আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী ব্যস্ততার কারণে চট্টগ্রামে আর নাও আসতে পারেন। তাই এই জনসভার মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামবাসীকে দেয়া হবে ভোটের বার্তা। একইসঙ্গে মিলবে নতুন দিক-নির্দেশনা। আওয়ামী লীগের বৃহত্তম এই জনসমাবেশে চট্টগ্রাম মহানগর, দক্ষিণ ও উত্তর জেলা থেকে কয়েক লাখ নেতাকর্মী যোগদান করবেন।

উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম এ সালাম বলেন, প্রত্যেক ইউনিয়ন থেকে কর্মী-সমর্থকরা সমাবেশে যোগদান করবে। উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতারা এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যরা তাদের সমন্বয় করছেন। উত্তর চট্টগ্রামের ৭ উপজেলা থেকে জনসভায় যোগ দিতে বাস-ট্রাক ভাড়া করা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, ২০১২ সালের ২৮ মার্চ নগরীর পলোগ্রাউন্ড মাঠে সর্বশেষ আওয়ামী লীগের জনসভায় ভাষণ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দীর্ঘ ১০ বছর পর একই মাঠে আবার ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। স্বাভাবিকভাবেই এ জনসভা সফল করতে প্রাণপণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে উত্তর, দক্ষিণ ও মহানগর আওয়ামী লীগ। এক্ষেত্রে মহানগর আওয়ামী লীগের নেতারা জনসভা ঘিরে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছেন।

আগামী ৪ ডিসেম্বর সকালে চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। সেটি শেষ করে ওইদিন পলোগ্রাউন্ডে আওয়ামী লীগের সমাবেশে যোগ দেবেন তিনি। পলোগ্রাউন্ডে জনসভায় যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী বিমানবন্দর থেকে টাইগারপাস হয়ে জনসভায় আসতে পারেন। এটা বিবেচনা করে বিমানবন্দর থেকে টাইগারপাস পর্যন্ত সড়ক সংস্কার দ্রুত এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। আবার বিকল্প হিসেবে টাইগারপাস থেকে লালখান বাজার হয়ে সেনানিবাস পর্যন্ত সড়কও দ্রুত সংস্কার করা হচ্ছে। টাইগারপাস থেকে লালখানবাজার পর্যন্ত অংশে পাইলিংয়ের কাজ বন্ধ রেখে সড়কে কার্পেটিং করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ জার্নাল/ওএফ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত