ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৯ মাঘ ১৪২৯ আপডেট : ৮ মিনিট আগে
শিরোনাম

টিউশনি করে গোল্ডেন এ প্লাস পেলেন জমজ দুই বোন

  কুষ্টিয়া প্রতিনিধি

প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৯:৪৯

টিউশনি করে গোল্ডেন এ প্লাস পেলেন জমজ দুই বোন
জমজ দুই বোন। ছবি: প্রতিনিধি
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি

সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবা দীর্ঘদিন ধরে মানসিক রোগী। টিউশনি করে কোন রকমে সংসার চালাচ্ছেন মা। তবুও লেখাপড়া থেকে একচুল পিছু হটেনি কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার ধুবইল হাজিপাড়া গ্রামের সামিয়া খাতুন ও সাদিয়া খাতুন নামের জমজ দুইবোন। চরম প্রতিকূলতার মধ্যে বেড়ে ওঠা এই দুইবোন এবারের এসএসসি পরীক্ষায় পেয়েছেন গোল্ডেন এ প্লাস। শুধু তাই নয়, অর্থের অভাবে সামিয়া-সাদিয়া নিজেরা কখনও প্রাইভেট পড়তে না পারলেও তারা কিন্তু তাদের লেখাপড়ার সমস্ত খরচ জুগিয়েছেন নিজেরাই টিউশনি করে।

দুইবোনের এমন সাফল্যে দারুন খুশি পরিবার, এলাকাবাসীসহ স্কুলের শিক্ষকরা। সামিয়া-সাদিয়াকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে সরকারসহ সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার দাবি তাদের।

কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার ধুবইল ইউনিয়নের হাজিপাড়া গ্রামের মো. আশরাফুল ইসলামের জমজ দুই মেয়ে সামিয়া খাতুন ও সাদিয়া খাতুন। বাবা আশরাফুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে বাড়িতেই থাকেন। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম আশরাফুল অসুস্থ থাকায় তিন মেয়েকে নিয়ে চরম বিপাকে পড়েন মা মোছা. আসমা খাতুন। স্বামী আশরাফুলের চিকিৎসার খরচসহ মেয়েদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে নিজেই সংসারের হাল ধরেন তিনি। এইচএসসি পাশ থাকায় বাড়ির আশপাশের ছেলে-মেয়েদের প্রাইভেট পড়িয়ে এবং পৈত্রিকসূত্রে পাওয়া আশরাফুলের যৎসামান্য মাঠের জমি লিজ দিয়ে কোন রকম সংসারটা চালিয়ে নিচ্ছেন তিনি।

বুদ্ধির পর বাবা আশরাফুল ইসলামের স্বাভাবিক আচরণ দেখেনি সামিয়া ও সাদিয়া। অভাবের টানাপোড়েনের সংসারে তাই বাবার কাছে আবদারের বিষয়টি অবান্তরই বটে। কিন্তু মা আসমা খাতুন তাদের সেই অভাব বুঝতে দেননি কখনও। যতটুকু পেরেছেন টিউশনি করে মেয়েদের পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার গুরু দায়িত্ব কাঁধে নেন।

কিন্তু মেয়েরা বড় হওয়ার সাথে সাথে সংসারে শুরু হয় আরও টানাপোড়েন। তাই সংসারের পড়ালেখার পাশাপাশি সামিয়া ও সাদিয়া শুরু করেন টিউশনি। নিজেরা প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়ার সুযোগ না পেলেও প্রতিবেশি স্কুল পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের পড়িয়ে নিজেদের লেখাপড়ার খরচ জোগানের পাশাপাশি মায়ের সংসারে কিছুটা হলেও অবদান রাখেন তারা।

নানা প্রতিকূলতার ভেতরেও সামিয়া ও সাদিয়া এবার অংশ নেন এসএসসিতে। প্রত্যাশা ছিল ভালো ফলাফলের। হয়েছেও তাই। কুষ্টিয়ার মিরপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দু’জনই পেয়েছেন গোল্ডেন এ প্লাস। সন্তানদের এমন ফলাফলে দারুন খুঁশি মা আসমা খাতুন। মেয়েদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে সরকারসহ সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতাও চেয়েছেন তিনি।

সামিয়া-সাদিয়ারা তিন বোন। বড় বোন নির্জনা আক্তার শননও ছিল মেধাবী ছাত্রী। এসএসসিতে শনন এ প্লাস পেয়ে বর্তমানে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। বড় বোনের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছেন সামিয়া-সাদিয়া। শত প্রতিকূলতার ভেতরেও কাঙ্খিত ফলাফলে উচ্ছাসিত তারা। তাদের উচ্চ শিক্ষার জন্য সরকারসহ সমাজের বিত্তবানদের সহযোগীতা কামনা করেছেন সামিয়া ও সাদিয়া। পিএসসি ও জেএসসিতেও বৃত্তিসহ ভালো ফলাফল অর্জন করেছিল এই জমজ শিক্ষার্থী। জমজ দুইবোনের এমন সাফল্যে উদ্ভাসিত এলাকাবাসীরা মিষ্টি নিয়ে সামিয়া-সাদিয়াকে খাওয়াতে তাদের বাড়িতে ভিড় করছেন।

সামিয়া-সাদিয়ার এমন কৃতিত্বে দারুন খুশি তাদের কাছে প্রাইভেট পড়তে আসা ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা। বড় হয়ে লেখাপড়ায় সামিয়া-সাদিয়ার মতোই হতে চান তারা।

সামিয়া-সাদিয়ার এমন সাফল্যে অভিভূত তাদের স্কুলের শিক্ষকরাও। মিরপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোছা. রাশিদা বানু বলেন, অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা জমজ এই দুই বোন লেখাপড়ায় খুবই ভালো। পড়ালেখার প্রতি তাদের আগ্রহও অনেক। আমরা আমাদের স্কুলের পক্ষ থেকে সামিয়া-সাদিয়াকে অনেক সহযোগিতা করেছি। তাদের উত্তরোত্তর সফলতা কামনা করেন প্রধান শিক্ষক।

মিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল কাদের জানান, সামিয়া-সাদিয়াকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে সবধরনের সহযোগিতা করা হবে।

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, সু-শিক্ষিতরাই পারে একটি সন্দুর সমাজ গড়তে। তাই চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলা সামিয়া-সাদিয়ার মেধা বিকাশে সরকারসহ সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে আসবে এমনটায় প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

বাংলাদেশ জার্নাল/এমপি

  • সর্বশেষ
  • পঠিত