ঢাকা, শনিবার, ১৩ জুলাই ২০২৪, ২৯ আষাঢ় ১৪৩১ আপডেট : ৭ মিনিট আগে
শিরোনাম

মিরসরাই ট্র্যাজেডির ১৩ বছর

দুর্ঘটনাস্থলে এখনো থমকে দাঁড়ায় পথিক

  প্রতিনিধি

প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০২৪, ১৩:২৫  
আপডেট :
 ১১ জুলাই ২০২৪, ১৩:২৯

দুর্ঘটনাস্থলে এখনো থমকে দাঁড়ায় পথিক
মিরসরাই ট্র্যাজেডির ১৩ বছর। ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রামের মিরসরাই ট্র্যাজেডির ১৩ বছর পূর্ণ হলো আজ। এখনো হৃদয়ে নাড়া দেয় সেই দিনটি। ২০১১ সালের ১১ জুলাই আজকের এই দিনে উপজেলার আবু তোরাবসহ আশপাশের আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিলো স্বজনদের আহাজারিতে। একে একে প্রাণ হারিয়েছিলেন ৪৫ কোমলমতি শিক্ষার্থী।

ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের স্মরণে আবু তোরাব স্কুল গেট অভিমুখে নির্মিত হয়েছিল আবেগ ও ঘটনাস্থলে অন্তিম স্মৃতিস্তম্ভ। সেখানে ফুল দিয়ে নিহতদের স্মরণ করেন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, নিহতদের স্বজন ও স্থানীয়রা।

ওই সময় নিহতদের স্বজনদের সমবেদনা জানাতে ছুটে আসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়া, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, বিকল্পধারা বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ দেশের বিশিষ্টজনরা। থেমে ছিল না দেশের সমাজসেবকদের সাহায্যের হাত। মিরসরাই ট্র্যাজেডি নিয়ে ওই সময় ধারাবাহিক সংবাদ পরিবেশন করেছিল দেশের গণমাধ্যমের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলোও।

১১ জুলাই এলে শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েন স্বজনরা। স্মৃতি বলতে শুধু ছবির ফ্রেমই রয়েছে। পুত্রহারা মা-বাবারা সেই ছবি নিয়ে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে আহাজারি করেন। আবার কখনো কখনো নীরব-নিস্তব্ধ হয়ে একেবারেই নির্বাক হয়ে যান। দেখতে দেখতে ঘটনার ১২ বছর পার হয়ে গেলেও এখনো কান্না থামেনি সন্তানহারা মায়েদের। এখনো ছেলের ছবি নিয়ে নীরবে-নিভৃতে কাঁদেন গর্ভধারিণী মায়েরা। গভীর রাতে ঘুম থেকে জেগে আদরের সন্তানের খোঁজে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করতে থাকেন অভাগিনী মা।

সেদিনের ঘটনা থেকে একমাত্র সন্তানের চিন্তায় এখন রোগাগ্রস্ত মায়ানী ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কুদ্দুস মাস্টার বাড়ির প্রবাস ফেরত আবু রিদোয়ান। সেদিনের ঘটনার বর্ণনা করতে গিয়ে বার বার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন বাবা তিনি।

আবু রিদোয়ান বলেন, সেদিন দুপুর বেলা নামাজ শেষ করে মসজিদ থেকে বের হতেই মোবাইলে কল বেজে উঠে। অপরপ্রান্ত থেকে কেউ একজন বলে উঠে সুজন স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে গিয়েছিলো, ফেরার পথে একটি ট্রাক ডোবায় পড়েছে। তখনই ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। মসজিদ থেকে বের হয়ে ছুটছি সামনের দিকে। ঘটনাস্থল, হাসপাতাল, থানা কোথাও না পেয়ে হতাশ হয়ে ছুটছি দিকবিদিক। পরে খবর পেলাম আমার ছেলে বাড়ি ফিরেছে। তবে জীবিত নয় মৃত।

মিররসরাই ট্র্যাজেডিতে নিহতরা- সাইদুল ইসলাম, সাখাওয়াত হোসেন, তাকিব উল্লাহ মাহমুদ সাকিব, আনন্দ চন্দ্র দাশ, নুর মোহাম্মদ রাহাত, আল মোবারক জুয়েল, তোফাজ্জল ইসলাম, লিটন চন্দ্র দাশ, মো. সামছুদ্দিন, মেজবাহ উদ্দিন, ইমরান হোসেন ইমন, কাজল চন্দ্র নাথ, সূর্য চন্দ্র নাথ, ধ্রুব নাথ, আবু সুফিয়ান সুজন, রূপন চন্দ্র নাথ, সামছুদ্দিন, ইফতেখার উদ্দিন মাহমুদ, আমিন শরীফ, উজ্জ্বল চন্দ্র নাথ, শরীফ উদ্দিন, সাখাওয়াত হোসেন, কামরুল ইসলাম, তারেক হোসেন, নয়ন শীল, সাজু কুমার দাশ, জুয়েল বড়ুয়া, রায়হান উদ্দিন, জাহেদুল ইসলাম, এস এম রিয়াজ উদ্দিন, টিটু দাশ, রাজিব হোসেন, আশরাফ উদ্দিন, জিল্লুর রহমান, জাহেদুল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম, আশরাফ উদ্দিন পনির, রায়হান উদ্দিন শুভ, মঞ্জুর মোর্শেদ, তারেক হোসেন, সাখাওয়াত হোসেন নয়ন, আনোয়ার হোসেন, হরনাথ দাশ, আরিফুল ইসলাম, রাকিবুল ইসলাম চৌধুরী।

সেদিন যা ঘটেছিল:

১১ জুলাই সোমবার। মিরসরাই স্টেডিয়ামে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ ফুটবলের ফাইনাল জিতে মিনি ট্রাকে ফিরছিল সবাই। বড়তাকিয়া-আবুতোরাব সড়কের সৈদালী এলাকায় ট্রাকটি উল্টে ছিটকে পড়ে ডোবায়। ঘটনার পরপর ডোবার জল থেকে উদ্ধার হয় মরদেহ আর মরদেহ। মরদেহের মিছিলে সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৫। অন্যদিকে ছেলের মৃত্যুর খবরে হৃদ্‌ক্রিয়া বন্ধে মারা যান হরনাথ। সব মিলিয়ে ৪৫ জনের প্রাণের বিনিময়ে রচিত হয় মিরসরাই ট্র্যাজেডি।

আবু তোরাব বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ৩৪ শিক্ষার্থী প্রাণ হারায় ওই দুর্ঘটনায়। এছাড়া আবু তোরাব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তিনজন, প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরী কলেজের দুইজন, আবু তোরাব ফাজিল মাদরাসার দুইজন, এবং আবু তোরাব এস এম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুইজন শিক্ষার্থী মারা যায়।

আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মর্জিনা আক্তার বলেন, বিজয় মিছিল নিয়ে মিনি ট্রাকে চড়ে বাড়ি ফেরার পথে মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনার ক্ষত আমরা আজও বয়ে বেড়াচ্ছি।

বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় মিরসরাই ট্র্যাজেডিতে নিহত শিক্ষার্থীদের স্মরণে স্কুল প্রাঙ্গণে স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, নিহত পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আবুতোরাব স্কুল প্রাঙ্গণে ‘আবেগ’ ও দুর্ঘটনাস্থলে নির্মিত ‘অন্তিম’-এ পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে এবং নিহত স্কুলশিক্ষার্থীদের স্মরণে স্থানীয় মসজিদ, মন্দির, গির্জায় বিশেষ প্রার্থনা করা হবে।

বাংলাদেশ জার্নাল/ওএফ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত