ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ৭ ফাল্গুন ১৪২৬ অাপডেট : ১৯ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২০:৪৫

প্রিন্ট

লক্ষ্মীপুরে ঐতিহ্যবাহী ‘বুড়া কর্তার মেলা' শুরু

লক্ষ্মীপুরে ঐতিহ্যবাহী ‘বুড়া কর্তার মেলা' শুরু
লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি

লক্ষ্মীপুরে ঐতিহ্যবাহী ‘বুড়া কর্তার’মেলা শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার জেলার করুনানগরের চরডাক্তার এলাকায় ১৫ দিনব্যাপাী এ মেলা শুরু হয়েছে।

স্থানীয় বুড়া কর্তার সমাধি আশ্রমের উদ্যোগে ৯০ বছর ধরে ব্যাপক পরিসরে আয়োজিত এ মেলা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণির মানুষের কাছে সমাদৃত। প্রতিবছর একই স্থানে একই তারিখে আয়োজিত এ মেলা প্রাঙ্গণ জেলা ও জেলার বাইরে থেকে আগত কয়েক লাখ দর্শনার্থীর আগমনে মুখরিত থাকে।

স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক গুরু শ্রী শ্রী রাধাকান্ত সোহং স্বামীজি প্রকাশ বুড়া কর্তার লোকায়ত সমাধিস্থলকে ঘিরে প্রতিষ্ঠিত আশ্রমে তার প্রতি সম্মান নিবেদন করে বছরের এই সময়ে তিরোধান উৎসব পালন করা হয়। আর এ তিরোধান উৎসবকে কেন্দ্র করেই ক্রমান্বয়ে এ মেলার প্রচলন হয়েছে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ৯০ বছর আগে ১৩৩৫ বাংলা সনে লক্ষ্মীপুরে তৎকালে মেঘনা নদীর ভাঙন কবলিত চরমটুয়া এলাকায় এসে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ব্রাহ্মণ পরিবারের আধ্যাত্মিক সাধক শ্রী শ্রী রাধাকান্ত সোহং স্বামীজি আরাধনায় ব্রতী হন। ওইখানে দীর্ঘ সময় তপস্যারত থাকা অবস্থায় স্থানীয় হিন্দুদের ভক্তি শ্রদ্ধায় সমাদৃত হন। অতিবয়োবৃদ্ধ হয়ে তিনি লোকায়িত হন। বয়োবৃদ্ধ হওয়ায় তিনি লোকমুখে বুড়া কর্তা খ্যাতি পান।

লোকায়িত হওয়ার পর সেখানে মেঘনাপাড়েই তাকে সমাধিস্থ করা হয়। কিন্তু মেঘনা নদীর ভাঙনের কবলে ওই এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হলেও নদীর পাড়ে ওই আধ্যাত্মিক মহা পুরুষের কঙ্কালসার মরদেহ ভেসে ওঠে। তখন তার অতি ভক্ত ক্ষেত্র মোহন চক্রবর্তী নামের একজন স্বপ্নাদৃষ্ট হয়ে এটিকে পরম মমতায় তুলে এনে করুনানগরের চরডাক্তার এলাকায় ফের সমাধিস্থ করেন। পরে ওই সেবায়েত ভক্ত ও তার ছেলে মালতী মোহন চক্রবর্তী তার নামে এখানে বুড়া কর্তার সমাধি আশ্রম গড়ে তোলে প্রতি বছর তিরোধান উৎসব পালন শুরু করেন।

বুড়া কর্তার তিরোধান উৎসব প্রথম শুরু হয় ১৩৩৬ বাংলা সনে। ওই উৎসবে কয়েকজন ভক্ত আশ্রমে লীলা র্কীতন ও প্রসাদ বিতরণ করে। ধীরে ধীরে এ ধারাটি হিন্দু সম্প্রদায়ের সর্বস্তরে গ্রহনযোগ্যতা লাভ করে। কালক্রমে এখন ওই স্থানে নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর, গোপালগঞ্জ, ভোলাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পালা দল এসে কীর্তন পরিবেশন করে। এই কীর্তন শুনতে ও প্রসাদ নিতে জেলা ও জেলার বাইরের হাজার হাজার হিন্দু নারী-পুরুষ এখানে আগমন করেন। বহু লোকের আগমন হওয়ায় প্রথমে এখানে কয়েকজন ফেরিওয়ালা বিভিন্ন খাবার ও খেলনা পণ্য নিয়ে বাণিজ্য শুরু করে। সময়ের বিবর্তনে এ ধারাটি ব্যাপক পরিসরের মেলায় পরিনত হয়।

আশ্রম কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি উৎপল কুমার দাস জানান, ৩-৪ হাজার হিন্দু নারী-পুরুষ ভক্ত প্রতিদিনি দুই বেলা করে ৪দিন আশ্রমে পাঁচমিশালী সবজি ও ভাত সমৃদ্ধ প্রসাদ গ্রহণ করেন। এতে কয়েক লাখ টাকা ব্যয় হয়।

মেলা উৎসব আয়োজন কমিটির সভাপতি অরবিন্দ দাস জানান, কীর্তন উপলক্ষে তখন আশ্রম প্রাঙ্গণে ফেরিওয়ালারা ভিড় করতো বিভিন্ন পণ্য নিয়ে। সময়ের পরিবর্তনে ধীরে ধীরে এসে এখন বড় ধরনের মেলা বসে। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাঝামাঝি থেকে শুরু করে ১৫ দিন চলে এ মেলা। এতে আশ্রম প্রাঙ্গণ হাজার হাজার হিন্দু মুসলিমের মিলন মেলায় পরিণত হয় বলে জানান তিনি।

আর মেলাকে ঘিরে বগুড়া, রাজশাহী, কুমিল্লা, ভোলা, বরিশাল, কিশোরগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পণ্য নিয়ে এখানে আসেন বিক্রেতারা। ইতোমধ্যে শতাধিক স্টল বসেছে মেলায়। এতে শিশুদের খেলনা, মাটির তৈরী হাড়ি পাতিল, প্লাস্টিক সামগ্রী, গৃহস্থালী জিনিসপত্র, আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন পণ্য সামগ্রী এবং বিভিন্ন রকমারি খাবার পাওয়া যায়। ভালো বিক্রি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা অত্যন্ত আশাবাদী এবারো। সর্বোপরি লাখো দর্শনার্থীর ভিড়ে শুরু থেকে শেষ দিন পর্যন্ত বুড়া কর্তার মেলা প্রাণবন্ত থাকে।

বাংলাদেশ জার্নাল/আরকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত