ঢাকা, সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০১৯, ৯ বৈশাখ ১৪২৬ অাপডেট : ১১ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১৫ এপ্রিল ২০১৯, ১২:৫৬

প্রিন্ট

সিরাজ উদ্দৌলার বিরুদ্ধে আরো একাধিক ছাত্রীর অভিযোগ

সিরাজ উদ্দৌলার বিরুদ্ধে আরো একাধিক ছাত্রীর অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক

ফেনীর সোনাগাজীর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার বিরুদ্ধে একাধিক শিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে বেশ কয়েকজন ছাত্রীর অভিযোগ, অধ্যক্ষ যে শুধু নুসরাত জাহান রাফির সঙ্গে এমন করেছেন তা না। আমাদের অনেকের সাথে এমন করেছে। ওনার একটা অভ্যাস ছিল এটা।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ৫দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে গত বুধবার রাতে না ফেরার দেশে চলে যান সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি। এই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা নুসরাতকে তার কক্ষে নিয়ে যৌন নিপীড়ন করেন- এমন অভিযোগে গত ২৭ মার্চ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করেন নুসরাতের মা শিরিন আক্তার।

এরপর গত ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষায় অংশ নিতে ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে গেলে দুর্বৃত্তরা ওই ছাত্রীকে ছাদে ডেকে নিয়ে যায়। এরপর ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে তার দেওয়া শ্লীলতাহানির অভিযোগ তুলে নিতে বলে। সে রাজি না হলে দুর্বৃত্তরা তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।

অভিযোগ উঠেছে, ২০১০ সালে শিক্ষাঙ্গানে যৌন নিপীড়ন-সহিংসতা রোধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা প্রণীত হলেও মানছে না ফেনীসহ দেশের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এতে দিন দিন বাড়ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির ঘটনা।

ছাত্রীদের অভিযোগ, নুসরাতসহ একাধিক শিক্ষার্থী যৌন নিপীড়নের শিকার হলেও মাদ্রাসা কমিটির কাছে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার না পাওয়ায় বেপরোয়া ছিলেন অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা। আবার কোন প্রতিকার হতো না বলে ভয়ে অনেকে অভিযোগ করতেও আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

এদিকে, ব্যর্থতার দায়ে মাদ্রাসার পরিচালনা পরিষদ বাতিলের দাবি উঠেছে। ফেনী জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট শাহিনুজ্জামান বলেন, যদি প্রশাসনের নজরদারীতে এসব কমিটি থাকতো তাহলে এমন যৌন হয়রানি প্রতিরোধ করতে সহায়ক হতো।

বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির ফেনী জেলা শাখার এই নেতা মনে করেন, অভিযোগ পেয়েও অভিযুক্ত সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে ব্যবস্হা না নেয়ায় মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটি বাতিল করা উচিৎ।

বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির ফেনী জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোসাদ্দেক আলী বলেন, অবিলম্বে এই কমিটি বাতিল করে নতুন কমিটির করে জরুরি ব্যবস্থা নেয়া দরকার।

এ বিষয়ে ফেনীর জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহেদুজজামান বলেছেন, গভর্নিং বডি নিয়ে যে কথা উঠছে, যদি তাদের কোনো গাফিলতি থাকে তাহলে সেটা আমরা দেখবো। রিপোর্ট পাওয়ার পরে জানা যাবে যে কার কোথায় গাফিলতি ছিল। তদন্তে দায়ী হলে মাদ্রাসা কমিটির বিরুদ্ধে নেয়া হবে ব্যবস্থা।

উচ্চ আদালতের এই নির্দেশনার বলা হয়েছে, সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ কর্মক্ষেত্রে যৌন নিপীড়ন বিরোধী কমিটি গঠন করতে হবে। পাঁচ সদস্যের এই কমিটির প্রধান হবেন একজন নারী। এছাড়া কমিটিতে আরো একজন নারী সদস্য থাকবেন। এর মেয়াদ হবে দু'বছর।

সোনাগাজীর কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একাধিক শিক্ষক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) অভিযোগ করেন, বিএনপি জোট সরকারের আমলে সিরাজ-উদ-দৌলাকে যারা শেল্টার দিয়েছেন, তার মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় পৌর বিএনপি নেতা আলাউদ্দিন গঠন, জামায়াত নেতা গোলাম কিবরিয়া, ছালেহ আহমেদ, মোহাম্মদ মোহসীন। বিভিন্ন অনৈতিক কাজে বিপদে পড়ে এদের ছত্রছায়ার আশ্রয় নিতো অধ্যক্ষ সিরাজ।

তবে বিএনপি নেতা আলাউদ্দিন গঠন অধ্যক্ষ সিরাজকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে মাদ্রাসার উন্নয়ন কাজে কোনও সময় আমি হয়তো তাকে সহায়তা করেছিলাম। কিন্তু তার কোনও অপকর্মে আমার সমর্থন নেই, ছিলও না।’

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ম্যানেজিং কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয় পৌর কাউন্সিলর ও উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ আবদুল হালিম মামুনকে। শেখ মামুনের সঙ্গে ‘ভাগবাটোয়ারায়’ দ্বন্দ্ব তৈরি হলে তিনি তাকে বাদ দিয়ে ম্যানেজিং কমিটির সহসভাপতি করেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনকে। আর এভাবেই কৌশলে প্রভাবশালীদের কব্জা করে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা শিক্ষার্থীদের বছরের পর বছর যৌন হয়রানিসহ নানা অপকর্ম করে পার পেয়ে গেছেন। এই অধ্যক্ষ নিজে টিকে থাকতে এবং লুটপাট করতে সব সময় ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের ‘ম্যানেজ’ করে অপকর্ম চালিয়ে যেতেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে তিনি ম্যানেজিং কমিটিতে সোনাগাজী পৌর বিএনপির সভাপতি আলাউদ্দিন এবং তার সহযোগী জামায়াত নেতা ও পৌর জামায়াতের সাবেক সভাপতি আবদুল মান্নানকে সদস্য করেন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সে বিপাকে পড়ে যায়।

পরে ২০১২ সালে আলাউদ্দিন ও আবদুল মান্নানকে বাদ দিয়ে ম্যানেজিং কমিটিতে সদস্য করেন আওয়ামী লীগের উপজেলা সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ আবদুল হালিম মামুনকে। জামায়াত নেতা আবদুল মান্নানকে ম্যানেজিং কমিটি থেকে সরিয়ে দেয়ার কারণে ব্যাপক ক্ষুব্ধ হন জামায়াতপন্থী শিক্ষকরা।

তখন শেখ মামুনকে হাতে রেখে অন্যদের ঘায়েল করতে ব্যাপক তৎপর হয়ে ওঠেন অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা। ২০১৫ সালে মাদ্রাসার অর্থনৈতিক লেনদেনকে কেন্দ্র করে অধ্যক্ষের সঙ্গে মনোমালিন্য শুরু হয় মামুনের। পরে অধ্যক্ষ তার দলে টেনে নেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনকে।

২০১৮ সালে রুহুল আমিনকে মাদ্রাসা ম্যানেজিং কমিটির সহ-সভাপতি ও তার সহযোগী পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলমকে ম্যানেজিং কমিটির সদস্যপদ থেকে সরিয়ে দিয়ে রুহুল আমিনকে সদস্য করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাদ্রাসার এক শিক্ষক জানান, ‘গত বছর ৩ অক্টোবর অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা আলিম শ্রেণির আরেক ছাত্রীকে যৌন হয়রানি করে। প্রতিকার চেয়ে মেয়েটির বাবা মাদ্রাসা পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (রাজস্ব) কাছে অভিযোগ দিয়েছিলেন। চিঠির অনুলিপি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছেও দেওয়া হয়। কিন্তু ওই ঘটনায় কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং যে তিন শিক্ষক অধ্যক্ষের যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে মুখ খুলেছিলেন, তাদের কারণ দর্শানোর চিঠি দেয় অধ্যক্ষ। ওই তিন শিক্ষক হলেন— আরবি বিভাগের প্রভাষক আবুল কাশেম এবং জ্যেষ্ঠ শিক্ষক বেলায়েত হোসেন ও হাসান।’

প্রভাষক আবুল কাশেম এ বিষয়ে বলেন, ‘মাদ্রাসার ভাবমূর্তি রক্ষার স্বার্থে এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকতে অধ্যক্ষের কাছে তার ঘনিষ্ঠ লোকদের মাধ্যমে বার্তা পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু এতে সে ক্ষুব্ধ হয়ে তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর চিঠি দেয়, যার মধ্যে আমিও আছি। ফলে আমরা তার অপকর্মের কথা বলতে সাহস পাই না। ফলে আগের ওই শ্লীলতাহানির ঘটনাটিও চাপা পড়ে যায়। এর ধারাবাহিকতায় সে নুসরাতের সঙ্গে এমন আচরণ করতে পেরেছে।’

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত
close
close