ঢাকা, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ২৯ কার্তিক ১৪২৬ আপডেট : ৮ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০১৯, ০৯:৫৩

প্রিন্ট

প্রধানমন্ত্রীর প্রকল্প

২০ টুকরি বালির সাথে এক বস্তা সিমেন্ট

২০ টুকরি বালির সাথে এক বস্তা সিমেন্ট
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

কুলাউড়ায় চলমান প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি আশ্রয়ন প্রকল্প-২ এর কাজে এক বস্তা সিমেন্টের সাথে ২০ টুকরি বালু মিশিয়ে কাজ করেছে মিস্ত্রি। অথচ বালু মিশ্রণের কথা রয়েছে এক বস্তা সিমেন্টের সাথে ৬ টুকরি।

প্রতিবাদ করতে গেলে উল্টো অপদস্থ হতে হয়েছে উপকারভোগীকে। ফেটে গেছে খুঁটি, ঘর ও বারান্দার ফ্লোর। ল্যাট্রিন নির্মাণে ৮টি করে রিং স্লাব ব্যবহারের কথা থাকলেও দেয়া হয়েছে ৫-৬টি করে রিং-স্লাব।ফলে ঘরের কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সাধারণ মানুষের মনে।

কুলাউড়ার চলমান প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ন-২ প্রকল্পের ‘যার জমি আছে ঘর নেই, তার নিজ জমিতে ঘর নির্মাণ’ কাজে চলছে এমন অনিয়ম। যার নেতৃত্বে আছেন কুলাউড়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল লাইছ। প্রকল্প থেকে লুটপাটের জন্য ঘর নির্মাণে প্ল্যান, ডিজাইন প্রাক্কলন মোতাবেক গুণগত মান বজায় রাখা হয়নি বলে অভিযোগ উপকারভোগীদের।

প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নে উপজেলা প্রশাসন থেকে নিয়োগ দেয়া হয় ইউএনওর পছন্দের ঠিকাদার। নিয়োগকৃত রাজমিস্ত্রি ও কাঠমিস্ত্রিরা ইচ্ছে মতো কাজ করছেন। উপকারভোগীদের সাথে খারাপ আচরণ করেছেন।

প্রকল্প নীতিমালায় পিআইসির মাধ্যমে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) কাজটি করার কথা থাকলে সভাপতি তা করেননি। তিনি একক ক্ষমতাবলে তার পছন্দের ঠিকাদারের মাধ্যমে ঘরের পিলার ও কাঠের দরজা-জানালা তৈরির কাজ করছেন।

দরজা-জানালা তৈরিতে শাল, গর্জন, জামরুল, কড়াই, শিশু, আকাশমণি গাছের কাঠ ব্যবহারের কথা থাকলেও অল্প বয়সী ও অসার ইউক্যালিপটাস কাঠ দিয়ে তড়িঘড়ি কাজ করছেন।

সরজমিন গেলে দেখা যায়, ঘর ও বারান্দার মেঝে সিসি ঢালাই ৩ ইঞ্চি ধরা থাকলেও ১-২ ইঞ্চি দিয়ে ঘরের কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে। পিএল এর ইটের গাথুনি ১ফুট ৯ ইঞ্চি করার নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে করা হচ্ছে ১ ফুট এবং ব্যবহার করা হচ্ছে নিম্নমানের ইট ও খোয়া।

সিডিউলে ১৭৫ বর্গফুট আয়তনের একটি ঘরে ৪ বর্গ ইঞ্চি ১২টি পিলারের উচ্চতা ১২ ফুট। মূল ঘর ও বারান্দা এবং ল্যাট্টিনে ৯টি খুঁটি ১০ ফুট ৬ মিলি ৪টি করে রড দেয়ার নিয়ম থাকলেও ১২টি পিলার ১০ ফুট করে এবং ৯টি পিলার ৮ ফুট করে ৬ মিলি. রডের স্থলে ৪ মিলি. ৩টি করে রড এবং রিং ৪ মিলি. রডের পরিবর্তে মোটা তার ও নিম্নমানের ইটের খোয়া ব্যবহার করা হয়েছে।

পিলারে থাকবে ছয় এমএম গ্রেড রড (চারটি)। কিন্তু নন-গ্রেড রড ব্যবহার করা হচ্ছে। পিলালের রড বাঁধাইয়ে রিং (চুড়ি) হিসেবে রডের বদলে ব্যবহার করা হয়েছে ৮ নম্বর জিআই তার। তৃতীয় শ্রেণির ইটের খোয়া (ডাস্টসহ) দিয়ে পিলার বানানো হচ্ছে।

পিলার ঢালাই শেষে চটের মাধ্যমে ১৪ থেকে ২১ দিন পানি দেয়ার (কিউরিং) কথা। কিন্তু সেখানে চটের বস্তা ব্যবহার করা হয়নি, দেওয়া হয়নি ঠিকমত পানিও। প্রতি ফুটে একটি করে রিং দেয়ার কথা থাকলেও ১৬ ইঞ্চি পর পর লাগানো হয়েছে রিং।

আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প এর ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত নকসাঁ ও প্রাক্কলন থেকে জানা গেছে, প্রতিটি ঘরের মেঝে ১৫০ মিলিমিটার বালি দেয়ার পর ডাবল লেয়ার পলিথিনের উপর ঢালাই দিতে হবে। সরজমিনে গিয়ে তার কোন মিল পাওয়া যায় নি।

কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের কানাইটিকর গ্রামের রব উল্লাহ (৬৫) প্রধানমন্ত্রীর আশ্রায়ন প্রকল্পের ঘর পেয়েছেন। প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এই ঘর কয়দিন টিকবো আল্লায় জানইন।

একই ইউনিয়নের সুজাপুর গ্রামের রুমেনা বেগম (৩০) জানান, ঘরটা বানাইতে অত খারাপ কাম করছইন, একজরা বাতাস দিলেই লড়ে (নড়ে)। খুটা গাড়ার (পুতা) কথা ৩ ফুট। কিন্তু এক দেড়ফুট গাড়া অইছে কিনা সন্দেহ আছে। গনিপুর গ্রামের আব্বাস আলী ও আব্দুল আহাদ জানান, মাত্র এক মাসের মধ্যে ঘরের নিচ (ফ্লোর) ফেটে গেছে। যারা কাজ করছে তারা ২০ টুকরি বালির সাথে এক বস্তা সিমেন্ট দিছে। এর লাগি এই অবস্থা।

উপজেলার জয়চন্ডী ইউনিয়নের রঙ্গিরকুল গ্রামের কয়েছ মিয়া জানান, ঘরের কাজে লাকড়ি (কাট) বাজে ব্যবহার করা অইছে। দুর্বল খুঁটি দিছে। বাতাসে সিমেন্টের খুঁটিগুলো ফাটি (ফেটে) যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

পৃথিমাপাশা ইউনিয়নের গনিপুর গ্রামের পাকাঘর নির্মাণ শ্রমিক আজহারুল ইসলাম জানান, আমি নিজে এসব কাজ করি। কিন্তু আমারে যে ঘরটা দেয়া অইছে তা এক্কেবারে নিম্নমানের। এক লাখ টাকাতো দূরের কথা এসব ঘর নির্মাণে ৫০ হাজার টাকা খরচ হলেও বেশি হবে।

উপজেলায় মোট ৩০০ ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের অধীনে সরকার প্রতিটি কাঁচা ঘর নির্মাণের জন্য ১ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। ঘর নির্মাণ শেষে বাড়তি টাকা সুবিধাভোগীদের ফেরত দেয়ার নিয়ম থাকলেও এখন পর্যন্ত কেউ পায়নি এ টাকা।

উপকারভোগীরা আরও জানান, প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে বিনামূল্যে পাওয়া ঘরের মেঝেতে আমাদেরকে মাটি ভরাট করতে বাধ্য করেছে প্রকল্প বাস্তবায়নের সাথে জড়িত কর্মকর্তারা। এজন্য ধার-দেনা করে গুনতে হয়েছে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা।

মাথাগোজার একমাত্র গৃহটি যাতে সুন্দর হয় সে জন্য কর্তব্যরত কর্তাদের কথামত ঘর নির্মাণকারী শ্রমিকদের নিয়মিত ২ বেলা এমনকি কখনও কখনও ৩ বেলা খাবারের ব্যবস্থা করতে হয়েছে উপার্জনে অক্ষম পরিবারদের।

নীতিমালা অনুযায়ি আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ পিআইসির মাধ্যমে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে কাজ করার কথা থাকলেও পিআইসির সভাপতি (ইউএনও) একক ক্ষমতাবলে তার পছন্দের লোকজনকে দিয়ে কাজ করান।

পিআইসির অন্য সদস্যরা হলেন- উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও), সদস্য সচবি (উপজেলা প্রকৌশলী), উপজলো সহকারী কমশিনার (ভূমি) ও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ইউপি চেয়ারম্যান জানান, নীতিমালা অনুযায়ী চেয়ারম্যানরা পদাধিকার বলে কমিটির সদস্য হলেও, কাজে কিংবা তালিকা করার সময় তাদেরকে সম্পৃক্ত করা হয়নি।

তবে বরমচাল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আহবাব চৌধুরী জানান, তালিকা করার সময় কিংবা কাজ করার কিছুই আমরা জানি না। যখন জানলাম তখন দেখি এক ওয়ার্ডে ৩টা আরেক ওয়ার্ডে ৭টা। ঘর নিয়া এখন আমি পড়ছি বিপাকে।

পিআইসি’র সদস্য সচিব (উপজলো প্রকৌশলী) ইসতিয়াক হাসান বলেন, আমি শুধু নামেই সদস্য, এটুকুই জানি। আর কিছু জানা নাই।

ইউএনওর মনোনীত ঠিকাদার রাজিব মন্ডল জানান, সবকিছু জানেন ইউএনও। তিনি সব বলতে পারবেন। আমি শুধু টিন কিনে দিয়েছি। এই রাজিব মন্ডল একেক সময় নিজের বাড়ি খুলনা আবার একেক সময় ঢাকা মিরপুর বলেন।

এসব অনিয়মের বিষয়ে কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল লাইছের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও মুঠোফোনে পাওয়া যায়নি।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রায়ন প্রকল্প-০২ প্রকল্পের উপ-পরিচালক (যুগ্ম সচিব) এসএম হামিদুল হক জানান, এ প্রকল্পটি উপজেলা নির্বাহী অফিসাররা বাস্তবায়ন করেন। কাজে কোন অনিয়ম হলে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেবো।

বাংলাদেশ জার্নাল/টিপিবি

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত