ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬ আপডেট : কিছুক্ষণ আগে English

প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৮:৪৭

প্রিন্ট

কাকের ডাকে ঘুম ভাঙ্গে যে গ্রামে

কাকের ডাকে ঘুম ভাঙ্গে যে গ্রামে
রূপগঞ্জ প্রতিনিধি

কাকের কন্ঠ বেশ কর্কশ এবং কঠোর। কাকের কন্ঠ যতই শ্রুতিকটূ হোক, কাক বেশি পরিচিত প্রকৃতিবান্ধব হিসেবে। শুধু কন্ঠের কারণে কাককে অবহেলা করার কোন কারণ নেই। কাকের জন্ম মধ্য এশিয়ায়। তুরস্ক এবং তার আশপাশের এলাকা কাকের জন্মস্থান বলে জনশ্রুতি আছে। ৪০টি বিভিন্ন প্রজাতির কাক থাকলেও আমাদের দেশে প্রধানত দু’ধরনের কাক বেশি চোখে পড়ে। এদের মধ্যে একটি ঘোর কালো রঙের, আকারে বড় দাঁড় কাক। আর অন্যটি অপেক্ষাকৃত ছোট ধূসর বর্ণের, পাতি কাক। কাককে সবাই কুৎসিত পাখি হিসেবে চিনে।

হাজারো কাক একত্র হয়ে আপন করে নিয়েছে রূপগঞ্জের কায়েতপাড়া ইউনিয়নের কামশাইর গ্রাম। যুগ যুগ ধরে গ্রামটিতে কাক এসে বসবাসের কারনে পরিচিত পেয়েছে ‘কাকের গ্রাম’হিসেবে। গ্রামটির চারপাশ জুড়ে বাঁশঝাড় আর বড় বড় গাছ। ঝাঁকে ঝাঁকে কাক এসে আশ্রয় নিয়েছে বাঁশঝাড়গুলোতে। পুরো গ্রাম সকাল-সন্ধ্যা ওদের ডাকে থাকে মুখর। সকালে ঝাঁক বেঁধে আহারের উদ্দেশ্যে নেমে পড়ে গোধুলিবেলায় আবার আপন নীড়ে ফেরার দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয় এলাকাবাসী। একটা সময় বিরক্ত মনে হলেও এখন কাকের ডাকই ভাল লাগে স্থানীয়দের। গ্রামটিতে এমন দৃশ্য দেখতে সকাল বিকাল ভিড় জমান আশ-পাশের এলাকা থেকে ছুটে আসা বিভিন্ন বয়সের পাখিপ্রেমিরা। সন্ধ্যায় পুরো এলাকা আন্দোলিত হয় কাকের কা-কা-কা শব্দে। আবার সকালের ঘুম ভাঙে কাকের কোলাহলে।

কাকের খাবার, গতিবিধি স্বভাব সর্বোপরি কন্ঠ ইত্যাদির বিচারে কাকের জনপ্রিয়তা খুব বেশি নয়। কিন্তু অনেকেই জানে না যে পাখির মধ্যে কাক সবচে চালাক প্রাণি বলে মনে করা হয়। অবশ্য নির্বুদ্ধিতার জন্যও কাকের বিশেষ খ্যাতি আছে। কলসির মধ্যে নুড়ি ফেলে তৃষ্ণার্ত কাকের তৃষ্ণা নিবারণের গল্পটি কাকের সেরা বুদ্ধিমত্তার উদাহরণ। কিন্তু তারই পাশাপাশি চোখ বন্ধ করে কোন কিছু লুকিয়ে রাখা এবং পরে আর খুঁজে না পাওয়া কিংবা কাকের বাসায় কোকিলের ডিম পাড়ার সুযোগ করে দেয়া-এসব নিঃসন্দেহে কাকের নির্বুদ্ধিতার লক্ষণ। কাক খুবই উপকারি পাখি। এরা খুবই পরিবেশ বান্ধব। এরা মরা, পচা আর বাসী জিনিসপত্র খেয়ে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখে। গ্রাম তো বটেই শহর পরিচ্ছন্ন রাখার ক্ষেত্রেও কাকের কোন বিকল্প নেই। কাক না থাকলে সুসভ্য নাগরিক জীবন যাপন কোনদিন সম্ভব হত না। তাই কাক বিহীন শহর কল্পনাও করা যায় না।

এ গ্রামে বসবাসরত পাখি প্রেমিক আক্তার হোসেন বলেন, কাকগুলোকে আমরা কেউ আঘাত করি না। কাউকে তাড়াতে দেই না। পাখি শিকারী মুক্ত গ্রামটিতে কেউ পাখি ধরতে আসে না। এখানে পাখি ধরা ও মারা সম্পুর্ন নিষেধ।

ওই গ্রামের ৭০ বছর বয়সী প্রবীন বৃদ্ধ জামান মিয়া বলেন, ছোট বেলা থেকে দেখে এসেছি এ কাকগুলো প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে টিকে আছে। অনেক সময় প্রকৃতির ঝড়ে পাখির বাসাগুলো ভেঙে যায় কাকছানা মাটিতে পড়ে যায়। খড়-কুটো দিয়ে আবার নতুন ভাবে বাঁশঝাড়ে উঠিয়ে দেয়া হয়। ওদের প্রতি এলাকার সবারই মায়া আছে। গ্রামের গৃহিণী জোহরা বেগম জানান, শুধু বাঁশঝাড়ে নয়, অনেক সময় ঘরেও চলে আসে পাখিরা। এমনকি ঝড়-তুফান হলে পাখিগুলো গৃহস্থ্যের ঘরে ঢুকে পড়ে। মানুষ আর পাখি মিলেমিশে একসঙ্গে থাকতে হয়। চৌকির ওপর–নিচ পাখিরা দখল করে নেয়।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা এবিএম জাহাঙ্গীর আলম রতন বলেন, কাক খুবই শুচিবাইগ্রস্ত পাখি। যতই নোংরা আবর্জনার সাথে বসবাস করুক না কেন এরা সারাক্ষণ পরিচ্ছন্ন থাকতে ভালবাসে। দিনে তিন/চার বার স্নান এদের পরিচ্ছন্নতার পরিচায়ক। যেখানেই যাক, যা-ই খাক না কেন ঘরে ফেরার আগে নদী, নালা কিংবা ডোবার পানিতে এরা নিয়মিত ঠোঁট ও মাথা পরিষ্কার করে, ঠোঁট দিয়ে জল তুলে পাখা ধোয়। নোংরা জিনিস খেলেও এরা শরীর নোংরা রাখে না।

কাকের কোন স্থায়ী বাসস্থান নেই। এরা সাধারণত নির্জন বনাঞ্চলে কোন পাতা ভরা গাছকে রাত কাটানোর জন্য নির্বাচন করে। আর সন্ধ্যা হতে না হতেই তার ডালে গিয়ে বসে। এরা প্রচণ্ড শীতের রাতে কিংবা ঝড়ের সময়েও বাসা ছেড়ে কোথাও যায় না। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। ডিম পাড়ার সময় হলেই কাক কেবল স্থায়ী বাসা তৈরি করে। এদের বাসা মানেই খড়, কাগজের টুকরো, সরু ডালপালা দিয়ে বানানো এক টুকরা আশ্রয়। এক সঙ্গে এরা ৪/৫ টা হালকা নীল রঙের ডিম পাড়ে। মাত্র ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে এরা সবগুলো ডিম পাড়ে।

পাশের এলাকা থেকে দেখতে আসা কয়েকজন দর্শনার্থী বলেন, এত কাক আমরা কখনো একসঙ্গে দেখিনি।

অবসরপ্রাপ্ত প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, এ কাকগুলো সাধারণত বাঁশ ঝাড় কিংবা বড় গাছের ডালে বাস করতে পছন্দ করে। মানুষের আক্রমণ না হলে কমপক্ষে একটানা শতবছর পর্যন্ত একই স্থানে বসতি গড়ে তোলে।

এমএ/

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত