ঢাকা, শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ আপডেট : ২৭ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ০৮ নভেম্বর ২০১৯, ২০:১৩

প্রিন্ট

ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’: জেলায় জেলায় প্রস্তুতি

ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’: জেলায় জেলায় প্রস্তুতি
জার্নাল ডেস্ক

ঘূর্ণিঝড়র ‘বুলবুল’র প্রভাবে দেশের বিভিন্নস্থানে শুক্রবার মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, সেইসাথে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ঝড়টি বঙ্গোপসাগর থেকে উত্তর-পশ্চিম উপকূলের দিকে এগিয়ে আসছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদেরা। তাদের মতে, ঘূর্ণিঝড়টি শনিবার মধ্যরাতের দিকে বাংলাদেশের খুলনা-বরিশাল অঞ্চলের ওপর আঘাত হানতে পারে।

ইতোমধ্যে চট্টগ্রামে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত এছাড়া মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। শুক্রবার বিকেলে আবহাওয়া অফিস এই তথ্য জানায়।

এদিকে ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’কে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রশাসন ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। খুলে দেয়া হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো এ সংক্রান্ত খবর-

কলাপাড়া (পটুয়াখালী): ঝড়ের প্রভাবে বঙ্গোপসাগর উত্তাল হয়ে উঠেছে। বিশাল-বিশাল ঢেউ সৈকতে আছড়ে পড়ছে। বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে পটুয়াখালীর কলাপাড়াসহ উপকূলীয় এলাকায় হালকা-মাঝারি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। সমুদ্র উত্তাল থাকায় গভীর সমুদ্রে অবস্থানরত অধিকাংশ মাছ ধরা ট্রলার মৎস্য বন্দর আলীপুর-মহিপুরের পোতাশ্রয় শিববাড়িয়া নদীসহ বিভিন্ন স্থানে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য অবস্থান নিয়েছে। গোটা উপকূল জুড়ে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল’র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

এদিকে পায়রা সমুদ্রবন্দর এলাকায় চার নম্বর হুশিয়ারি সংকেত জারি করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। গভীর সমুদ্র থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে ফেরার পথে কুয়াকাটা ঝাউ বাগান এলাকার কাছাকাছি উত্তাল ঢেউয়ের ঝাপটায় এফবি মা কুলসুম নামের ট্রলার থেকে বেলাল (৪০) নামের এক জেলে সাগরে পরে নিখোঁজ রয়েছেন। বেলাল পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ থানার লক্ষ্মীরহাট গ্রামের কুরবান আলীর ছেলে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঘূর্ণিঝড় বুলবুল’র প্রভাবে পায়রা বন্দরে পণ্য খালাস বন্ধ রয়েছে। টানা বৃষ্টির কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়ে পড়েছে। কলাপাড়া পটুয়াখালী-ঢাকা নৌ-রুটসহ অভ্যন্তরীণ রুটের লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতির শংকায় রয়েছে কৃষকরা। একইভাবে শীতকালীন সবজি চাষিরা রয়েছে সর্বোচ্চ ক্ষতির আশংকায়।

এছাড়া সমুদ্রে সাতার কাটাসহ পর্যটকদের চলাচলে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে কুয়াকাটা ট্যুরিস্ট পুলিশ ও নৌ-পুলিশ।

সাতক্ষীরা: সাতক্ষীরায় আকাশ দিনভর ছিলো মেঘাচ্ছন্ন। শুক্রবার সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। বেলা বাড়ার সাথে সাথে শুরু হয় গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। সন্ধ্যায় এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বৃষ্টি হচ্ছিল।

এদিকে, ‘বুলবুলে’র সম্ভাব্য আঘাত মোকাবেলায় সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসন ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত দুর্যোগ মোকাবেলা কমিটির সভায় জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল জানান, উপকূলীয় উপজেলাগুলিতে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে স্ব স্ব এলাকায় মাইকিং করে জনগণকে নিরাপদে থাকতে বলা হয়েছে। এছাড়া সুন্দরবন সংলগ্ন নদীখালে থাকা নৌযানগুলিকে উপকূলে নিরাপদ স্থানে থাকার আহবান জানানো হয়েছে। তিনি আরো জানান, এরই মধ্যে ২৭০টি আশ্রয় শিবির প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

১ হাজার ২৫২ টি স্কুল-কলেজ মাদ্রাসা ফাঁকা করে রাখা হয়েছে। শ্যামনগর ,আশাশুনি ও কালিগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত এলকার জনগণকে শনিবার বেলা ১১ টার মধ্যে এসব আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে আনার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দুর্যোগ কবলিতদের সহায়তায় ১১০ মেট্রিক টন চাল, নগদ ১ লাখ টাকা, ৮’শ প্যাকেট শুকনো খাবার, ২৭ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, পানীয় জল, ওষুধপত্র মজুদ রাখা হয়েছে।

২২ হাজার স্বেচ্ছাসেবক ও রেডক্রিসেন্ট বাহিনী, ৮৫ টি মেডিকেল টিম, নৌ ও স্থলযান প্রস্তুত রাখা হয়েছে। একইভাবে পুলিশ, বনবিভাগ,কোস্টগার্ড, র‌্যাব ও বিজিবির পক্ষ থেকেও উপকূলীয় এলাকায় বুলবুল মোকাবেলায় আগাম ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক আরো জানান, সরকারি কর্মকর্তাদের ছুটি বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত তাদের কর্মস্থল ত্যাগ করতে নিষেধ করা হয়েছে।

অপরদিকে, সুন্দরবনের দুবলার চরে রাসমেলায় অংশগ্রহণেচ্ছু পুণ্যার্থীরা সম্ভাব্য দুর্যোগের কারণে যাত্রা বন্ধ করেছেন। এর আগে জেলা প্রশাসন থেকে তাদের সতর্ক করে দেয়া হয়। এর আগে দুপুরে উপকূলীয় সব উপজেলায় নির্বাহী অফিসাররা প্রস্তুতিমূলক সভা করেছেন।

গোপালগঞ্জ: বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’র প্রভাবে গোপালগঞ্জ জেলায় বৃষ্টিপাত হচ্ছে। সকাল থেকেই শুরু হয় বৃষ্টিপাত। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে দিনমজুরের।

জানাগেছে, ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’র প্রভাবে সকাল থেকে জেলায় বৃষ্টিপাত হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ। সবেচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হয়েছে দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষেরা। বৃষ্টি থাকায় কাজের অভাবে অলস সময় কাটাতে হচ্ছে তাদের।

এদিকে, বৃষ্টিপাতের ফলে রাস্তা ঘাট ফাঁকা রয়েছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাইরে বের হচ্ছে না। বৃষ্টিপাতের ফলে শীতকালীন সবজির চারা মারা যাওয়ায় অশংকায় রয়েছে কৃষকেরা। এছাড়া জেলার বিভিন্ন উপজেলাও বৃষ্টিপাতের খবর পাওয়া গেছে।

পিরোজপুর: ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ এর প্রভাবে পিরোজপুরে শুক্রবার সকাল থেকে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। ওই দিন খুব ভোরেই এ বৃষ্টি শুরু হয়। জেলার বিভিন্ন উপজেলাসহ পাশ্বাবর্তী জেলাগুলোতে এ বৃষ্টির খবর পাওয়া গেছে।

শহরে সাধারণের চলাচল খুবই কম। আবহাওয়া খারাপ হওয়ায় মানুষের ভেতর আতংক দেখা যাচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, ২০০৭ সালের ১৪ নভেম্বরের সিডরের দিনে এমন আবহাওয়া দেখা গেছে।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার বিকালে দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক আবু আলী মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, জেলার সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে এব্যাপারে নিজ নিজ উপজেলায় মাকিং ও আশ্রয়কেন্দ্র খুলে দিতে বলা হয়েছে। স্থানীয়দের আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়ার জন্য সকল ব্যবস্থা গ্রহণসহ শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে জেলার ইন্দুরকানী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হোসাইন মুহম্মাদ আল-মুজাহিদ জানান, উপজেলার সকল ইউপি চেয়ারম্যানকে দুপুরেই মাকিং করতে বলা হয়েছে। স্ব-স্ব ইউনিয়নের প্রতিটি মসজিদের মাইক থেকে স্থানীয়দের আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়ার জন্য অনুরোধ করে মাইকিং করা হচ্ছে। আশ্রয় নেয়াদের জন্য শুকনো খাবারের সরবরাহ থাকবে।

জেলার নাজিরপুর উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ইস্রাফিল জানান, উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে ৪১টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় সাড়ে ৩৬ হাজার মানুষের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলা করতে শুক্রবার দুপুরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে এক প্রস্তুতি মিটিং করা হয়েছে। উপজেলা জুড়ে বিভিন্ন মসজিদসহ সরকারি উদ্যোগে সচেতনতামূলক ও স্থানীয় ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নেয়ার অনুরোধ করে মাইকিং করা হয়েছে।

লক্ষ্মীপুর: ধেয়ে আসা ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুলে’র প্রভাবে মেঘনা উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরে শুক্রবার ভোর থেকে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি চলছে। এতে স্বাভাবিক জনজীবনে কিছুটা বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। দিনভর বৃষ্টির কারণে জেলা শহরসহ হাট-বাজারগুলোতে মানুষের সমাগম অন্যসময়ের তুলনায় অনেক কম দেখা গেছে। তবে নিত্য প্রয়োজনে রাস্তায় বের হওয়া মানুষজনের চলাচলে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে।

এদিকে ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ আঘাত হানার আশংকায় উপকূলীয় এ জেলায় দুর্যোগ মোকবেলায় প্রস্তুতিমূলক সভা করেছে স্থানীয় জেলা প্রশাসন। শুক্রবার রাত ৮টার দিকে জেলা প্রশাসকের হলরুমে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা বিষয়ক উক্ত প্রস্তুতি সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক অঞ্জন চন্দ্র পাল।

এসময় পুলিশ সুপার ড. এ এইচ এম কামরুজ্জামান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সফিউজ্জামান ভূঁইয়া, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শফিকুর রেদোয়ান আরমান শাকিল সহ স্থানীয় সরকার বিভাগের বিভিন্ন দপ্তরের জেলা কার্যালয়ের প্রতিনিধিগণ এবং জেলা সিভিল সার্জন, রেডক্রিসেন্ট সোসাইটিসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়া লক্ষ্মীপুর প্রেসক্লাবের সভপতি কামাল উদ্দিন হাওলাদার ও সাধারণ সম্পাদক সাইদুল ইসলাম পাবেলসহ জেলায় কর্মরত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এখন পর্যন্ত ৪ নম্বর সতর্ক সংকেত বিরাজ করছে এ জেলায়। আশংকাজনক দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে ১০০টি সাইক্লোন শেল্টার ও গঠন করা হয়েছে ৬৬টি মেডিকেল টিম। এছাড়া মেঘনা নদীর তীরবর্তী জেলার ৪টি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাদের জরুরি সভা করে প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে খোলা হয়েছে বিশেষ কন্ট্রোল রুম। জেলার সব সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। রেড ক্রিসেন্টের পক্ষ থেকে ২৫০০ কর্মী প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ জার্নাল/আরকে

বাংলাদেশ জার্নাল/আরকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত