ঢাকা, রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ১ পৌষ ১৪২৬ আপডেট : ৬ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১:২৩

প্রিন্ট

প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৬৭ কোটি টাকা ফেরত নিয়ে ধোঁয়াসা

প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৬৭ কোটি টাকা ফেরত নিয়ে ধোঁয়াসা
নাজমুল হোসেন

প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ট্রাষ্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান এমএ খালেক ৯০ কোটি টাকা আত্মসাতের বিষয়টি স্বীকার করলেও ফেরত দিতে গড়িমসি করছে। যা বর্তমানে সুদসহ ১৬৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। একটি জাতীয় দৈনিকে টাকা আত্মসাতের বিষয়টি প্রকাশ পেলে তিনি তা স্বীকার করেন এবং সঙ্গে সঙ্গে ৬ কোটি টাকা বোর্ডকে ফেরত দেন। তবে এর পরে টাকা ফেরত দেওয়া নিয়ে আর উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে জানিয়েছে প্রাইমএশিয়া ফাউন্ডেশন।

সূত্র জানায়, তার কাছে পাওনা টাকা আদায়ের জন্য বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করা হলেও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তার বাসায় যোগাযোগ করা হলেও সেখান থেকে বলা হচ্ছে তিনি বাসায় নেই। তিনি দেশে আছেন না দেশের বাহিরে আছেন সে ব্যাপারেও নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থায় টাকা ফেরত না পেলে বিশ্ববিদ্যালয়টির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। শিক্ষার্থীদের জীবনে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।

প্রাইমএশিয়া ফাউন্ডেশনের ব্যাংক হিসাব বেসরকারি খাতের প্রাইম ব্যাংকে। ব্যাংকটির মতিঝিল শাখায় এর হিসাব নং-১০৪১১০৬০০০০৬৫৬। ফাউন্ডেশনের হিসাব বিবরণীতে দেখা যায়, এমএ খালেক বিভিন্ন সময় ব্যাংক হিসাব থেকে ৬৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা সরিয়ে নিয়েছে। পে-অর্ডারের মাধ্যমে এক গ্রাহককে দিয়েছেন ২১ কোটি টাকা। এছাড়াও স্ত্রী ভাগ্নেসহ পরিবারের বিভিন্ন ব্যক্তির নামে টাকা সরিয়েছেন। সব মিলিয়ে তিনি ৯০ কোটি ৪৩ লাখ টাকা সরিয়ে নিয়েছেন। যা সুদসহ বর্তমানে ১৬৩ কোটি টাকাতে দাঁড়িয়েছে। এই টাকা তিনি অবৈধভাবে সাংগঠনিক ক্ষমতার বাহিরে গিয়ে উত্তোলন করেছেন।

চাটার্ড অ্যাকাউন্ট প্রতিষ্ঠান হুদাভাসীর অডিট রিপোর্টেও বেরিয়ে এসেছে এমএ খালেকের অর্থ কেলেঙ্কারীর নথি। হুদাভাসীর রিপোটে বলা হয়েছে, ২০১০ এর জানুয়ারী থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে প্রায় ৬৬ কোটি টাকা এম এ খালেক প্রাইমএশিয়া ফাউন্ডেশন থেকে নিজ একাউন্টে সরিয়েছেন। ৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা সাবিহা খালেক, ভাগ্নে মিজানুর রহমান মোস্তফা এবং ব্যক্তিগত স্টাফ মো. তাজুল ইসলাম এবং ব্যক্তিগত কোম্পানি মেক্সনস বাংলাদেশ লিঃ এর নামে স্থানান্তর করেছেন। যার ব্যাংক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া প্রাইম এশিয়া ফাউন্ডেশন থেকে ২১ কোটি টাকা এম এ খালেক বিভিন্ন নামে পে-অর্ডারের মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়েছে। যা ফাউন্ডেশনের সর্বশেষ ৩০ অক্টোবর ২০১৯ এর হিসাবে বেরিয়ে এসেছে।

এই তথ্যগুলো গণমাধ্যমে ফাঁস হয়ে গেলে এমএ খালেক দ্রুত সময়ের মধ্যে ৬.২৭ কেটি টাকা ফাউন্ডেশনকে ফেরত দেন। এই টাকা ফেরত দিলেও বাকি টাকা ফেরতের কোন উদ্যোগ নেননি। সূত্র জানায়, এই টাকা ফেরত দিয়ে তিনি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এটা অনেকটা ‌‘আই ওয়াস’। বাস্তবে বাকি টাকা ফেরত না দিতে তিনি টালবাহানা করছেন। বাকি ১৬০ কোটি টাকা ফেরত না নিতে পারলে বিশ্ববিদ্যালয়টির অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয় ফাউন্ডেশনের অধীনে। ১৮৮২ সালের ট্রাস্ট আইন দ্বারা গঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ড। এ আইনের ৫১ ধারার বিধান অনুযায়ী, ট্রাস্টি নিজের লাভের জন্য কিংবা অন্য যেকোনো প্রয়োজনে ট্রাস্টের সম্পত্তি ব্যবহার করতে পারেন না। কিন্তু প্রাইমএশিয়া ট্রাস্টি বোর্ডের তত্কালীন চেয়ারম্যান এমএ খালেক প্রাইমএশিয়ার ফাউন্ডেশনের অর্থ ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবের পাশাপাশি স্ত্রী, ভাগ্নে, প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী, নিজের কোম্পানিসহ স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে স্থানান্তর করেছেন।

প্রাইম ব্যাংক ছাড়াও এমএ খালেক প্রাইম ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, প্রাইম ফিন্যান্স ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড, প্রাইম ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড, প্রাইম ইসলামী সিকিউরিটিজ লিমিটেড, প্রাইম প্রুডেনশিয়াল ফান্ড লিমিটেড, প্রাইম ফিন্যান্সিয়াল সিকিউরিটিজ লিমিটেড, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, ফারইস্ট ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, ফারইস্ট স্টক অ্যান্ড বন্ডস লিমিটেড ও পিএফআই সিকিউরিটিজ লিমিটেডের মূল উদ্যোক্তাদের অন্যতম। এছাড়া গ্যাটকো লিমিটেড, গ্যাটকো অ্যাগ্রো ভিশন লিমিটেড, গ্যাটকো টেলিকমিউনিকেশনস লিমিটেড, এইচআরসি টেকনোলজিস লিমিটেড, প্রাইম প্রপার্টি হোল্ডিংস লিমিটেড, পিএফআই প্রপার্টিজ লিমিটেডেও ছিলেন তিনি। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে এমএ খালেকের পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের নাম ম্যাকসনস গ্রুপ।

অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ মাথায় নিয়ে ২০১৮ সালের ১৪ নভেম্বর প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগপত্র জমা দেন এমএ খালেক। একই বছরের ১০ ডিসেম্বর ট্রাস্টি বোর্ডের ১৭তম সভায় পদত্যাগপত্র গৃহীত হয়। সে সভায় প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টি বোর্ডের নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মো. নজরুল ইসলাম।

এ বিষয়ে প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার একেএম আশরাফুল হক বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, ‌‘ট্রাস্ট আইনের ৫১ ধারা অনুযায়ী ট্রাস্টিরা ফাউন্ডেশনের কোনো অর্থ ব্যক্তিগত বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে স্থানান্তর করতে পারেন না। এমনকি ফাউন্ডেশনে নিজের দেয়া চাঁদা তোলারও আইনগত বৈধতা নেই। কিন্তু এমএ খালেক প্রাইমএশিয়া ফাউন্ডেশনে যে চাঁদার টাকা জমা দিয়েছিলেন, তা তুলে নিয়েছেন। ফাউন্ডেশনে থাকা নিজের শেয়ারের টাকাও ব্যক্তিগত কোম্পানির কাছে স্থানান্তর করেছেন। ট্রাস্টের টাকা ব্যক্তিগত হিসাব, স্ত্রী, ভাগ্নে, কর্মচারীসহ স্বার্থসংশ্লিষ্ট হিসাবে স্থানান্তর করে আত্মসাৎ করেছেন। জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ার পর ট্রাস্টিদের চাপের মুখে পদত্যাগ করেছেন তিনি। কিন্তু ফাউন্ডেশনের আত্মসাত্কৃত অর্থ ফেরত দিচ্ছেন না। টাকা ফেরত চেয়ে তাকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। ফেরত না দিলে বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তি প্রদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। তবে অর্থের সংকট বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতিকে টেনে ধরছে। এছাড়া তিনি আমাকে বিভিন্নভাবে দৃশ্যমান হুমকি দিচ্ছেন যেহেতু অর্থ কেলেঙ্কারীর বিষয়টি আমার হাত দিয়েই প্রথম বের হয়েছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার আবুল কাশেম মোল্লা এ বিষয়ে বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, আমরা ফাউন্ডেশনের আত্মসাত্কৃত টাকা ফেরত দেয়ার ব্যাপারে কথা বলতে তার বাসায় গিয়েছিলাম। তিনি প্রথমে অভিযোগগুলো অস্বীকার করলেও পরে স্বীকার করেছেন। তবে কবে টাকা ফেরত দিবেন তা আমি বলতে পারব না। আমরা বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর আবদুল হান্নান চৌধুরী এই বিষয়ে বলেন, এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকা না। ফাউন্ডেশন ও ট্রাস্টির টাকা এগুলো। আর এ টাকা ২০১০ সালের দিকে নেয়া হয়েছে। আমি ২০১৭ সালে এসে ট্রাস্টি বোর্ড সভায় এ বিষয়ে আলাপ হতে দেখেছি। ট্রাস্টির বোর্ডের ব্যাপার হওয়ায় এখানে আমার বলার বা করার কিছু থাকে না।

এদিকে ট্রাস্টি বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান এমএ খালেকের নেতৃত্বে এ লুণ্ঠন হলেও দায় নিতে চান না বোর্ডের অন্য সদস্যরা।

উল্লেখ্য, প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয় ২০০৩ সালে। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা চার হাজার। ১২টি বিভাগে ২৫০ জন শিক্ষকসহ কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন প্রায় ৫০০ জন।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ/ইআই

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত