ঢাকা, শুক্রবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২০, ৪ মাঘ ১৪২৭ আপডেট : কিছুক্ষণ আগে English

প্রকাশ : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১:১০

প্রিন্ট

যশোরে আনসার সদস্য হত্যা মামলার নেপথ্যে...

যশোরে আনসার সদস্য হত্যা মামলার নেপথ্যে...

যশোর প্রতিনিধি

যশোর সদর উপজেলার হাশিমপুর বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা মামলার সাত সন্ধিগ্ধ সাত আসামিকে আটক করেছে ডিবি পুলিশ। এদের মধ্যে দুইজন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দীতে হত্যার দায় স্বীকার করেছে। বাকি ৫ জন পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। ওই জনের বিরুদ্ধে রিমান্ড চাওয়া হয়েছে আদালতে।

এছাড়া ওই হত্যার কাজে ব্যবহৃত একটি চাকু, দুটি মোটরসাইকেল ও ১২টি মোবাইল ফোনসেট জব্দ করা হয়েছে। গত রোববার দুপুরে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিং জানানো হয় খালীর ২৩ মামলার আসামি জুয়েল ও একাধিক মামলার আসামি মুন্নার নেতৃত্বে হোসেন হত্যাকান্ড ঘটানো হয়। এই দুইজনই গুলি করে হোসেনকে। মুন্না সে সময় মুখে মাক্স পড়ে ছিল। আর আটক ছোট বাবু এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। বাজারের অবস্থানকারী মানুষের সামনে ওই গুলি ছোড়া হয়েছিল।

এ সময় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) তৌহিদুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ক সার্কেল গোলাম রব্বানী, ডিবি পুলিশের ওসি মারুফ আহম্মদ, কোতয়ালি থানার ওসি মনিরুজ্জামান, ডিবির এসআই এসআই মফিজুল ইসলাম প্রমুখ পুলিশ কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। প্রেস ব্রিফিং এ জানানো হয়, হত্যাকাণ্ডে জড়িত অভিযোগে আটককৃতরা হলো, যশোর সদর উপজেলার কায়েতখালি গ্রামের মধ্যপাড়ার মহাসিন আলী ওরফে হোসেন আলীর ছেলে রাসেল কবির (২৫), একই গ্রামের মোল্লাপাড়ার সাইফুল ইসলামের ছেলে আনোয়ার হোসেন (২৪), নূর ইসলাম মোল্লার ছেলে হাবিল হোসেন ওরফে বার্মিজ (২২), মুকুন্দ কুমার বিশ্বাসের ছেলে বিজয় কুমার বিশ্বাস (২১), হাশিমপুর গ্রামের কেনায়েত আলী বিশ্বাসের ছেলে সুজন হোসেন (২৩), মিলন হোসেনের ছেলে সজল হোসেন (২২) ও হাশিমপুর মধ্যপাড়ার আরাফাত আলীর ছেলে আলী রাজ বাবু ওরফে ছোট বাবু (২৪)।

এদের মধ্যে আনোয়ার হোসেন ও ছোট বাবু রোববার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে। সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট গৌতম মল্লিক দুইজনের জবানবন্দী রেকর্ড করেছেন বলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মফিজুল ইসলাম জানিয়েছেন। যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম জানান, গত ৩০ নভেম্বর হোসেন আলী হত্যাকাÐের পর মামলাটি ১০ ডিসেম্বর ডিবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। মামলা তদন্তের দায়িত্ব পান এসআই মফিজুল ইসলাম। এর আগে পুলিশ সদর উপজেলার ফুলবাড়ি গ্রামের আমিনুর রহমান মিঠুকে (৪৬) আটক করে।

মিঠুর দেয়া তথ্যসহ গোয়েন্দাতথ্য, সন্দিগ্ধদের মোবাইল ফোন তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে পুলিশ আসামিদের অবস্থান চিহ্নিত করে অভিযান শুরু করে। গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক টিক ১৩ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে ঢাকার ভাসানটেক ও কাফরুল থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে রাসেল কবির (২৫), আনোয়ার হোসেন (২৪), হাবিল ওরফে বার্মিজ (২২) ও বিজয় কুমার বিশ্বাসকে (২১) আটক করে। ১৪ ডিসেম্বর হাশিমপুর বাজার থেকে আটক করা হয় সুজন হোসেন ও সজল হোসেনকে। এদিন গভীর রাতে মাগুরার শালিখা উপজেলার আড়পাড়ায় প্রধান অভিযুক্ত জুয়েলের শ্বশুরবাড়ি থেকে আটক করা হয় আলী রাজ বাবু ওরফে ছোট বাবুকে। ছোট বাবুর কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত চাকু উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়াও পুলিশ হত্যাকাÐে ব্যবহৃত দু’টি মোটরসাইকেল ও আসামিদের ১০টি মোবাইল ফোন জব্দ করেছে। উদ্ধার করা পালসার ব্রান্ডের মোটরসাইকেলটি (যশোর-ল ১১-৩৮৬৭) রাসেলের এবং ডিসকোভার ব্রান্ডের মোটরসাইকেলটি (যশোর-হ-১৫-৮০০৪) তারকের। এই হত্যাকান্ডে আরো একটি মোটরসাইকেল ব্যবহৃত হয়েছিল। সেটি উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

তৌহিদুল ইসলাম আরও জানান, আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে প্রাথমিকভাবে তিনটি বিষয় উঠে এসেছে। হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত জুয়েল ও মুন্নার সাথে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে হোসেন আলীর বিরোধ ছিল। বছর দু’য়েক আগে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় মুন্নার পিতা আমিরুল ইসলাম বুলি ও জুয়েলের ভাই বাবলা। জুয়েল ও মুন্নার ধারণা ওই হত্যাকাণ্ডের পেছনে আনসার সদস্য হোসেন আলীর হাত রয়েছে। এছাড়া এলাকায় বৈদ্যুতিক খুঁটি স্থাপন নিয়েও আসামিদের সাথে হোসেন আলীর বিরোধ ছিল। এসব কারণে আনসার সদস্য হোসেন আলীকে হত্যা করা হয়েছে।

তিনি আরো জানান, নিহত আনসার সদস্য আগে পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিল। সাবেক চরমপন্থী এই সদস্য ১৯৯৯ সালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করে বিশেষ আনসার ব্যাটালিয়নে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তারপরও তার পূর্বের সাথীদের সাথে দূরবর্তী যোগাযোগ ছিল। এই সমস্ত বিষয়ই এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি জুয়েল ও মুন্নার নেতৃত্বে ওই এলাকায় একটি কিশোর অপরাধী গ্যাংও রয়েছে। ১৫ থেকে ২০ সদস্যের এই গ্যাংসহ সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী চক্র এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক বিক্রিসহ বিভিন্ন অপরাধ মূলক কর্মকাণ্ড এবং ভাড়াটে খুনি হিসেবেও কাজ করে।

প্রেস ব্রিফিংয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক সার্কেল) গোলাম রব্বানী জানান, একসময় মুন্নার পিতা আমিরুল ইসলাম বুলি ওই সন্ত্রাসী চক্রকে পরিচালনা করতো। এখন এর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে মুন্নার হাতে। পুলিশ মুন্না ও জুয়েলকে আটকের জন্য বেশ কয়েকটি এলাকায় অভিযান পারিচালনা করেছে।

হাশিপুর এলাকার একটি সূত্রে জানাগেছে, হত্যাকারীদের নানাভাবে তেঁতিয়ে (রাগিয়ে) তুলেছিলেন নিহত হোসেন আলী। জুয়েলের ভাই বাবলা খুন হওয়ার আগে একটি ভারি অস্ত্র রেখে দিয়েছিলেন জুয়েলের কাছে। গত বছরের শেষের দিকে জুয়েল একটি মামলায় আটক হওয়ার পরে জেলে যায়। তার আগে একই গ্রামের মানিক নামে এক যুবকের কাছে ওই ভারি অস্ত্রটি রেখে যায়। ওই ভারি অস্ত্রের সংবাদ জেনে ফেলেন হোসেন। তিনি বাড়িতে ফিরে মানিকের কাছ থেকে ওই অস্ত্র নিজের দখলে নেন। জুয়েল সম্প্রতি জেল থেকে বের হয়ে ওই অস্ত্রের সন্ধান করে তা হোসেনের কাছে আছে বলে জানতে পারে। সে অস্ত্রটি ফেরৎ চাইলেও হোসেন অস্ত্রটি ফেরৎ দেয়নি। এই নিয়ে বিরোধ তৈরি হয় উভয়ের মধ্যে। এছাড়া হোসেনের বাড়ির মধ্যে পল্লী বিদ্যুতের একটি খুঁটি রয়েছে। অভিযুক্ত তারক বিদ্যুতের কাজ করে থাকে। নিহত হোসেন আলী ওই খুঁটি সরিয়ে নেয়ার জন্য তারককে ১৭ হাজার টাকা দেন। কিন্তু টাকা নিয়ে তারক কোন কাজ করেনি। এই বিষয়টি আনোয়ারও জানে। এই নিয়ে বাজারে তারকের সাথে হোসেনের কর্তবিতর্ক হয়। যা বাজারের অনেকে প্রত্যক্ষ করেছেন। পরে জুয়েল বিষয়টি জানতে পারে। সে হোসেনকে মারবে বলে অনেকের কাছে বলে। এই সংবাদটি হোসেনের কানে যায়। হোসেন একদিন জুয়েলের বাড়িতে গিয়ে বলে ‘কী রে তুই না-কি আমারে মারবি। জানিস আমার হাত অনেক লম্বা’। তখনই ক্ষোভ তৈরি হয় জুয়েলের মধ্যে।

সূত্রটি জানিয়েছে, মৃত্যুর আগের দিন এলাকায় রাস্তায় চলার পথে জুয়েলের সামনা সামনি হন হোসেন। সে দিনও হোসেন জুয়েলকে ক্ষেপিয়ে তোলেন। তাকে মারা সহজ না বলে হোসেন জানালে ওই দিনই পরিকল্পনা হয় হোসেনকে হত্যা করার। পরিকল্পনা অনুযায়ী ৩০ নভেম্বর প্রকাশ্যে গুলি করে ও ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয় হোসেনকে। হত্যাকারীদের অনেক সহযোগী ঘটনার পরও বাজারে থেকে নিহতের ছবি উঠায় মোবাইলে। পরে তা হত্যাকারীদের কাছে সরবরহ করা হয়। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলো ছোট বাবু। ওই ছবি দেখিয়ে বা হত্যার কথা জানিয়ে জুয়েল ইতোমধ্যে এলাকায় চাঁদাবাজি করেছে। পালিয়ে আছে এবং মামলা চালাতে খরচ হবে এই কথা বলে মোবাইল ফোনে চাঁদাবাজি করছে জুয়েল। অনেক রাজনৈতিক নেতাদের সাথেও জুয়েলের যোগাযোগ আছে। জুয়েল এখন একাধিক মোবাইল ফোন ও সিমকার্ড ব্যবহার করছে। যে কারণে তাকে আটক বা তার অবস্থান শনাক্ত খুব বেশি সহজ হবে না বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।

বাংলাদেশ জার্নাল/আরকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত