ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৩ আশ্বিন ১৪২৮ আপডেট : ১৪ মিনিট আগে

ছেলেকে বাঁচিয়ে মারা গেলেন মা

  নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০২১, ১৯:৫৩

ছেলেকে বাঁচিয়ে মারা গেলেন মা
নিজস্ব প্রতিবেদক

করোনা আক্রান্ত চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে একজন মুমূর্ষু মা তার ছেলের জন্য নিজের আইসিইউ শয্যা ছেড়ে দেবার কিছুক্ষণ পর শ্বাসকষ্টে মারা গেছেন। গত মঙ্গলবার রাতে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের করোনা ইউনিটে হৃদয়বিদারক এই ঘটনাটি ঘটেছে। এই ঘটনা নাড়া দিয়েছে চিকিৎসকদেরও। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের অ্যানেসথেসিয়া এবং আইসিইউ কনসালটেন্ট ডা. রাজদ্বীপ বিশ্বাস এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

রাজদ্বীপ বিশ্বাস বলেন, ঘটনাটি খুব মর্মান্তিক। এই ধরণের পরিস্থিতিতে মানসিক শক্তি নিয়ে কাজ করাটাও একটা চ্যালেঞ্জের বিষয়। কিন্তু আমাদেরতো ভেঙে পড়ার উপায় নেই। যতটুকু আছে, সেটা দিয়েই কাজ করে যেতে হবে।

গত ১৫ জুলাই চট্টগ্রাম শহরের সিএমপি কলোনি এলাকার বাসিন্দা কানন প্রভা পাল (৬৫) করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের করোনা ইউনিটে মহিলা আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি হন। এর কয়েকদিন পর তার ছেলে শিমুল পালও (৪৩) করোনায় আক্রান্ত হয়ে একই হাসপাতালের পুরুষ আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি হন।

এরপরে মায়ের শারীরিক অবস্থার ক্রমেই অবনতি হতে থাকে। এক প্রকার সংকটাপন্ন অবস্থায় তাকে গত ২২ জুলাই করোনা ইউনিটের তাৎক্ষণিক খালি থাকা একটি নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র- আইসিইউ শয্যায় দ্রুত ভর্তি করা হয়। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিলেন।

এদিকে আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন ছেলের অক্সিজেন স্যাচুরেশনও দ্রুত নেমে যেতে থাকে। এক পর্যায়ে চিকিৎসকরা তাকে আইসিইউতে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। কিন্তু জেনারেল হাসপাতালসহ চট্টগ্রামের কোন হাসপাতালে আইসিইউ বেড খালি পাওয়া যায়নি। পরে ছেলের অবস্থা খুব খারাপ জানতে পেরে মৃত্যুশয্যায় থাকা মা নিজের আইসিইউ বেড ছেড়ে দিয়ে ছেলেকে চিকিৎসা দেয়ার জন্য চিকিৎসকদের ইশারা করেন। এমন খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসকের সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বললে তারা সকলেই জানিয়েছেন যে, এ বিষয়টা তারা অবগত নন।

তবে ডা. রাজদ্বীপ বিশ্বাস বলেন, তখন ওই মায়ের অবস্থা বেশ ক্রিটিক্যালই ছিল।

অন্যদিকে মা আইসিইউতে নন-ইনভেসিভ ভেন্টিলেটরের সাপোর্টে থাকলেও তার অবস্থা অনেক ক্রিটিকাল ছিল, কোন উন্নতি হচ্ছিল না। তার অক্সিজেন স্যাচুরেশন বার বার কমে যাচ্ছিল। পরবর্তীতে ছেলেরও অক্সিজেন কমতে থাকলে তারও আইসিইউ সাপোর্টের দরকার হয়। কিন্তু কোথাও কোন আইসিইউ (বেড) খালি ছিল না।

মায়ের এই ক্রিটিকাল পরিস্থিতির খবর যখন চিকিৎসকরা পরিবারের সদস্যদের জানান, তখন পরিবারের সদস্যরাই শিমুল পালকে তার মায়ের আইসিইউতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত দেয় বলে হাসপাতালটির চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। তারা বলেন,পরিবারের সদস্যরা অনুরোধ করেন যেন মা প্রভা পালকে আইসোলেশনে চিকিৎসা দিয়ে, তার জায়গায় ছেলে শিমুল পালকে আইসিইউ সাপোর্ট দেয়া হয়।

পরে পরিবারের অনুরোধে এবং তাদের থেকে লিখিত অনুমোদনের পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার দুপুর একটার দিকে মুমূর্ষু মাকে আইসিইউ থেকে বের করে আইসোলেশন সেন্টারে রাখা হয়। আর ওই আইসিইউতে জায়গা দেয়া হয় ছেলেকে। আইসিইউ থেকে বের করার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই মায়ের শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং এক পর্যায়ে কয়েকঘণ্টার মাথায় করোনার কাছে হার মেনে মারা যান এই মা। তবে মায়ের জীবন ত্যাগের মধ্য দিয়ে আইসিইউ শয্যা মিললেও এখন ছেলের অবস্থাও সংকটাপন্ন বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের আইসিইউ ইনিচার্জ ডা. তানজিম আহমেদ।

জানা গেছে, শিমুল পালের অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৬৫তে নেমে গেছে। যেখানে কিনা ৯০ এর ওপর থাকার কথা। আর তাকে নন ইনভেসিভ ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দেয়া সত্ত্বেও অক্সিজেন স্যাচুরেশন বার বার নেমে যাচ্ছে।

প্রসঙ্গত, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা আছে ১৮টি। সংকটাপন্ন রোগীর চাপ বাড়ায় সব শয্যাই গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই একদম পূর্ণ বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ জার্নাল/কেএস/ওয়াইএ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত