ঢাকা, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ২৯ কার্তিক ১৪২৬ আপডেট : কিছুক্ষণ আগে English

প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০১৯, ১৭:৫৪

প্রিন্ট

গ্রামীণফোন-রবির সঙ্গে চুক্তি স্থগিত ও বাতিলের নির্দেশনা

গ্রামীণফোন-রবির সঙ্গে চুক্তি স্থগিত ও বাতিলের নির্দেশনা
নিজস্ব প্রতিবেদক

লাইসেন্সিং নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিবেচনায় ফাইবার অপটিক ব্যবহারে গ্রামীণফোনের সঙ্গে রেলওয়েকে চুক্তি স্থগিত ও রবির সঙ্গে বিটিসিএলকে চুক্তি বাতিল করতে বলেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।

মূলত রেলপথের সমান্তরালে স্থাপিত অপটিক্যাল ফাইবার ভাড়া দিতে লাইসেন্স পাওয়ার আগেই গ্রামীণফোনের সঙ্গে চুক্তি করে রেলওয়ে। টেলিযোগাযোগ আইনে দেয়া বাধ্যবাধকতার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সালে রেলওয়েকে লাইসেন্স দেয়া হয়। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিবেচনায় রেলওয়েকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও ব্যাংক গ্যারান্টি প্রদানের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। লাইসেন্সের শর্ত ও কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, রেলওয়ে শুধু তাদের ট্র্যাকের সমান্তরালে স্থাপন করা অপটিক্যাল ফাইবারের অব্যবহূত সক্ষমতা অন্যদের ভাড়া দিতে পারবে।

যদিও সম্প্রতি রেলপথের বাইরেও নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে গ্রামীণফোনের সঙ্গে চুক্তি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। গত মাসে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের অনুমতি চেয়ে বিটিআরসির কাছে আবেদন করে রেলওয়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটিকে গ্রামীণফোনের সঙ্গে চুক্তির আওতায় নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ কার্যক্রম বন্ধ বা স্থগিত রাখতে চিঠি দিয়েছে বিটিআরসি।

চিঠিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ রেলওয়ে বিভিন্ন অপারেটরের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে আর্থিক সুবিধাসহ অন্যান্য সুবিধার বিনিময়ে অপারেটরদের সহযোগিতায় নতুন অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক স্থাপন, ইজারা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করিয়ে নিচ্ছে। এ ধরনের কার্যক্রম এনটিটিএন লাইসেন্সের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এরই মধ্যে রেলওয়ের অব্যবহৃত অপটিক্যাল ফাইবার ভাড়ার ভিত্তিতে অন্য সব অপারেটরকে ব্যবহারের সুযোগ দিতে কমিশন থেকে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এছাড়া ডমেস্টিক নেটওয়ার্ক কো-অর্ডিনেশন কমিটির (ডিএনসিসি) সভায় রেলওয়ের অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহারে আগ্রহী অন্য অপারেটরদের ইজারা দেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এতে আরো বলা হয়, অন্য সেলফোন অপারেটরের আর্থিক সহায়তা নিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্র্যাকের বাইরে নতুন করে অপটিক্যাল ফাইবার স্থাপনের মাধ্যমে ওই অপারেটরকে তা ব্যবহারের সুযোগ দেয়া প্রচলিত বিধিবিধান-বহির্ভূত। এ লক্ষ্যে গ্রামীণফোনের সঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ে চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা বন্ধ বা স্থগিত রাখার অনুরোধ করা হলো। পাশাপাশি ডিএনসিসির সিদ্ধান্ত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করে কমিশনকে জানাতে বলা হয়েছে।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক কাজী মো. রফিকুল আলম রেলওয়ের প্রধান সংকেত ও টেলিযোগাযোগ (টেলিকম) প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। পরে প্রধান টেলিকম প্রকৌশলী মুহম্মদ আবুল কালামও বিষয়টি সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য কিছু জানাতে পারেননি। তিনি বলেন, আমি সম্প্রতি এ পদে যোগ দিয়েছি। গ্রামীণফোনের সঙ্গে চুক্তির বিষয়টি তেমনভাবে জানি না। না জেনে মন্তব্য করতে পারছি না।

চুক্তি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করতে চায়নি গ্রামীণফোন।

এদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত আরেক প্রতিষ্ঠান বিটিসিএলকেও এনটিটিএন লাইসেন্স দেয়া হয়েছে আবেদন ফি, লাইসেন্স ফি ও পারফরম্যান্স ব্যাংক গ্যারান্টি ছাড়াই। নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে সেলফোন অপারেটর রবি আজিয়াটার সঙ্গে চুক্তি করেছে বিটিসিএল। এ চুক্তির আওতায় গৃহীত কার্যক্রম বন্ধ বা স্থগিত রাখার পাশাপাশি চুক্তি বাতিল করতে বিটিসিএলকে নির্দেশ দিয়েছে কমিশন।

প্রতিষ্ঠানটিকে সম্প্রতি দেয়া চিঠিতে বলা হয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী রবির মনোনীত তৃতীয় পক্ষের প্রতিষ্ঠানকে দেশব্যাপী অপটিক্যাল ফাইবার স্থাপন, সম্প্রসারণ ও রক্ষণাবেক্ষণসহ গ্রাহক পর্যায়ে সংযোগ প্রদানের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এছাড়া বিটিসিএলের অনুমতি নিয়ে রবি অপটিক্যাল ফাইবার লিজ বা সাব-লিজ দিতে পারবে বলে চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে। চুক্তির এ ধরনের ধারা এনটিটিএন নীতিমালার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক ও বেআইনি। এজন্য বিটিসিএল ও রবির এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করা প্রয়োজন বলে মনে করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, টেলিযোগাযোগ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর সুষ্ঠু পরিচালনার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। বিদ্যমান নীতিমালার আওতায় এ ধরনের চুক্তির সুযোগ নেই। এ বিষয়ে আইন ও নীতিমালার আলোকে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

এনটিটিএন ও ইনফ্রাস্ট্রাকচার শেয়ারিং নীতিমালা অনুযায়ী, দেশে ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক স্থাপন ও তা ব্যবসায়িকভাবে ভাড়া প্রদানের জন্য এনটিটিএন লাইসেন্স নেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০১১-এর ধারা ৪০ অনুযায়ী, বিটিআরসির অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান দেশে টেলিযোগাযোগ সেবা দিতে পারে না। সরকারের পূর্ব অনুমোদনসাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে এ অনুমতি দিতে পারে কমিশন।

জানা গেছে, লাইসেন্স ছাড়া অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক উন্নয়ন, নির্মাণ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে। এনটিটিএন লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ট্যারিফের ভিত্তিতে টেলিযোগাযোগ খাতের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেবা দিতে পারে।

সিগনালিং ব্যবস্থার আধুনিকায়নে ১৯৮৭-৯২ পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে ট্রেন লাইনের সমান্তরালে অপটিক্যাল ফাইবার কেবল স্থাপনে উদ্যোগ নেয়া হয়। নরওয়ে সরকারের আর্থিক অনুদানে মেইন লাইন সেকশনে এ ব্যবস্থা চালু করা হয়। এতে ২ হাজার ১০ কিলোমিটার অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে রেলওয়ের ৩০০ স্টেশন সংযুক্ত হয়। সে সময় সক্ষমতার বড় অংশই অব্যবহূত ছিল। এজন্য ১৯৯৭ সালে গ্রামীণফোনকে অপটিক্যাল ফাইবার ইজারা দেয় রেলওয়ে। ২০০৪ সালে এ চুক্তি সংশোধন করা হয়। আর ২০০৭ সালে আবারো চুক্তি নবায়ন করা হয়। রেলওয়ের কাছ থেকে নেয়া ফাইবার অপটিক কেবল লিজ বাবদ প্রতি বছর প্রায় ১০০ কোটি টাকা ভাড়া প্রদান করছে গ্রামীণফোন।

স্বাভাবিকভাবে অপটিক্যাল ফাইবারের আয়ুষ্কাল ১৫ বছর। এ সময়ের পর ফাইবার পরিবর্তন করতে হয়। ১৯৯৭ সালে ভাড়া নেয়া দুই কোরের কেবল পরবর্তীতে গ্রামীণফোন নিজ খরচে পুনরায় স্থাপন করে। ওই সময় ৩২-৪৮ কোরের ফাইবার স্থাপন করে প্রতিষ্ঠানটি।

এনটিটিএন লাইসেন্স পাওয়ার পর রেলওয়ের অপটিক্যাল ফাইবার ভাড়া নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে একাধিক সেলফোন অপারেটর। এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেও জানিয়েছে তারা। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ডিএনসিসির ২৯তম সভায় রেলওয়ের অব্যবহূত অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহারে আগ্রহী অন্য সব প্রতিষ্ঠানের জন্য উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি অব্যবহৃত অপটিক্যাল ফাইবার লিজ দিতে দরপত্র আহ্বান করেছে রেলওয়ে। তবে এ দরপত্রেও বৈষম্যের অভিযোগ রয়েছে সংশ্লিষ্টদের। জানা গেছে, গ্রামীণফোনের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী মাসে মিটারপ্রতি ৭০ পয়সার কম আয় হলেও দরপত্রে ন্যূনতম দর বেঁধে দেয়া হয়েছে ৩ টাকা। ফলে অন্য অপারেটরদের রেলওয়ের কাছ থেকে একই ফাইবার ভাড়া নিতে হবে গ্রামীণফোনের চেয়ে চার গুণের বেশি দামে।

প্রসঙ্গত, নিজস্ব অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্কের অতিরিক্ত সক্ষমতা অন্য প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া ভিত্তিতে ব্যবহারের সুযোগ দিতে ২০১৪ সালে লাইসেন্স পায় রাষ্ট্রায়ত্ত দুই প্রতিষ্ঠান— বাংলাদেশ রেলওয়ে ও বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)। নেশনওয়াইড টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক (এনটিটিএন) লাইসেন্সধারী এ দুই প্রতিষ্ঠান নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে যথাক্রমে দুই সেলফোন অপারেটর গ্রামীণফোন ও রবি আজিয়াটার সঙ্গে চুক্তি করেছে।

বাংলাদেশ জার্নাল/জেডআই

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত