কী হচ্ছে ঢাবিতে?

প্রকাশ : ২৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৩:২৭ | অনলাইন সংস্করণ

  জোবায়ের আহমেদ নবীন

ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর ও তার সঙ্গী বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতাকর্মীদের ওপর ডাকসুতে হামলার পর প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। দেশসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত ভিপির ওপর একের পর এক হামলায় সোশ্যাল মিডিয়াতেও সমালোচনার ঝড় বইছে। ঘটনার পরপরই জড়িতদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। একইসঙ্গে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দেন। এরপর হাসপাতালে ভিপি নুরসহ আহতদের দেখতে যান আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন দলের নেতারা। 

২২ ডিসেম্বর ডাকসু ভবনের ওই হামলায় ভিপি নুরসহ অন্তত ৩১জন আহত হন। এরমধ্যে ৮ জন মারাত্মক জখম হন। একজনকে আইসিইউতে নেয়া হয়।

ওইদিনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে একের পর এক ঘটনা ঘটছে। দিন দিন পরিস্থিতি অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। হামলার পর সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব, তদন্ত কমিটি গঠন, নেতিবাচক মন্তব্য, মামলা, পাল্টা মামলা, ককটেল বিস্ফোরণের পরেও হামলার প্রমাণ চেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একইসঙ্গে এই হামলার প্রতিবাদে প্রায় প্রতিদিনই বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করছে বিভিন্ন সংগঠন। সবকিছু মিলে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। জটিলতা কমার বদলে আরও বাড়ছে। এরফলে সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকসহ দেশবাসীর মনে প্রশ্ন উঠেছে ঢাবিতে আসলে হচ্ছে টা কী?

এদিকে ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর এবং তার সঙ্গী বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এক ছাত্রলীগ কর্মী পাল্টা মামলা করেছেন, যেখানে হত্যাচেষ্টার সঙ্গে মানিব্যাগ, মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগ আনা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের ছাত্র ডিএম সাব্বির হোসেন বুধবার ঢাকার শাহবাগ থানায় এ মামলা দায়ের করেন বলে রমনা জোনের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ কমিশনার এস এম শামীম জানান।

তিনি বলেন, নুরসহ ২৯ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১৫ থেকে ২০ জনকে সেখানে আসামি করা হয়েছে। ডাকসু ভবনে বহিরাগতদের নিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ, ছাত্রলীগ ও মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও মারধরের অভিযোগ আনা হয়েছে মামলার এজাহারে। মামলার বাদী সাব্বির হোসেন সার্জেন্ট জহরুল হক হল ছাত্রলীগের সাবেক সহ সভাপতি। এখন কোনো পদে না থাকলেও তিনি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়ের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

এজাহারে নাম থাকা আসামিরা হলেন— ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নূর, সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক হাসান, মুহাম্মদ রাশেদ খান, এপিএম সুহেল, মশিউর রহমান, আবু হানিফ, ওই সংগঠনের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন, আমিনুল ইসলাম, তুহিন ফারাবী, মেহেদী হাসান, সালেহ উদ্দিন সিফাত, নাজমুল হাসান, রবিউল হোসেন, আয়াতুল্লাহ বেহেশতী, আরিফুর রহমান, দ্বীন ইয়ামিন মোল্লা, তরিকুল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম, আরিফুর রহমান, আব্দুল্লাহ হিল বাকী, আকরাম হোসেন, আসিফ খান, সানা উল্লাহ হক, আতাউল্লাহ, শাকিল মিয়া, হাসানুল বান্না, রবীরুল ইসলাম, রাজ ও আরিফুল ইসলাম।

সেখানে বলা হয়, আসামিরা ‘অবৈধভাবে জনতবদ্ধ হয়ে ডাকসু ভবনে অনধিকার প্রবেশ’ করে এবং লাঠিসোঁটা ও দেশীয় ধারালো অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ চালিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল, সাধারণ সম্পাদক আল মামুন, এ এম এম আল সনেট, ইয়াসিন আরাফাত, তৌহিদুল ইসলাম মাহিম, মাহবুব হাসান নিলয়, ইয়াদ আল রিয়াদ, ইমরান সরকারসহ আরও অনেককে গুরুতর জখম  করে। সাব্বির নিজেও আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার কথা এজাহারে লিখেছেন। মামলার বিষয়ে কথা বলতে তাকে ফোন করা হলে বন্ধ পাওয়া যায়।

বৃহস্পতিবার এ মামলার এজাহার ঢাকার হাকিম আদালতে গেলে মহানগর হাকিম ধীমান চন্দ্র মণ্ডল সেটি গ্রহণ করে শাহবাগ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আরিফুর রহমান সরদারকে অভিযোগ তদন্ত করে ৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনের পশ্চিম পাশের ফটকের বাইরে ও ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) পুরোনো ফটকের সামনে থেকে অবিস্ফোরিত একটি ককটেল উদ্ধার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে এ ককটেল উদ্ধার করা হয়। পরে দুপুর ১২টার দিকে পুলিশের বম্ব ডিসপোজাল ইউনিট এসে ককটেলটি বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিষ্ক্রিয় করে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এ কে এম গোলাম রব্বানী বলেন, ‘একটি গোষ্ঠীর’ ক্যাম্পাসকে ‘অস্থিতিশীল’ করার অপপ্রয়াস থেকে এটিকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যাচ্ছে না। যে গোষ্ঠীটি’ ক্যাম্পাসকে ‘অস্থিতিশীল’ করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে, ককটেল উদ্ধারের ঘটনাটি তার থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে বলে জানা তিনি।

এছাড়া ভিপি নুর ও তার সহযোগীদের ওপর হামলার ঘটনায় তথ্যপ্রমাণ দেয়ার জন্য আহ্বান করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের গঠন করে দেয়া তদন্ত কমিটি। বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। তদন্তের স্বার্থে তথ্য প্রদানকারীর নাম ঠিকানা গোপন রাখা হবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ডাকসু ভবন এবং মধুর ক্যান্টিন এলাকায় সংঘটিত অনাকাঙ্খিত ঘটনা সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য উপাচার্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং ঘটনা সম্পর্কে তথ্য দিতে আগ্রহী ব্যক্তিদের প্রমাণসহ ঘটনার বিবরণ জমা দিতে অনুরোধ করা হলো। আগামী ২৮ ডিসেম্বর বেলা ২টার মধ্যে লিখিতভাবে তথ্য প্রদানকারীর নাম, ঠিকানা এবং টেলিফোন নম্বরসহ তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও কলা অনুষদের ডিনের দপ্তরে সংরক্ষিত বক্সে তথ্য জমা দিতে হবে।

এরআগে ২২ ডিসেম্বর ডাকসু ভবনে নিজের কক্ষে হামলার শিকার হন ভিপি নুর ও তার সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের একদল নেতা-কর্মী। মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে ভিপির কক্ষে ঢুকে বাতি নিভিয়ে সেখানে থাকা সবাইকে এলোপাতাড়ি পেটায় বলে আহতদের ভাষ্য। পরদিন নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির এসআই রইচ হোসেন শাহবাগ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। ডাকসু ভবনে ভিপি নুরুল হক নূরসহ তার সঙ্গীদের ওপর হামলা চালিয়ে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয় সেখানে।

মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের কেন্দ্রীয় সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল, কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আল মামুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এএসএম আল সনেট, সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিন আরাফাত তূর্যসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৩৫ জনকে ওই মামলায় আসামি করা হয়। তাদের মধ্যে আল মামুন ও তুর্যসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ রিমান্ডে নিয়েছে। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ।

সাব্বিরের করা মামলায় যাদের আহত বলা হচ্ছে, তাদের অনেকেই পুলিশের করা মামলায় আসামি। আবার সাব্বির যাদের আসামি করেছেন, তাদের অনেকেই আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। পুলিশ মামলা করার পরদিন আহত নুরের পক্ষে মামলা করতে শাহবাগ থানায় যান ডাকসুর সমাজ সেবা সম্পাদক  আখতার হোসেন। হামলার জন্য ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস ও সাধারণ সম্পাদক ডাকসুর এজিএস সাদ্দাম হোসাইনসহ ৩৭ জনের বিরুদ্ধে সেখানে অভিযোগ করা হয়।
নুরের পাঠানো ওই অভিযোগেও মোবাইল ও অর্থ ছিনিয়ে নেয়ার কথা বলা হয়েছিল। তবে মামলাটি আলাদাভাবে নথিভুক্ত না করে আগের দিন পুলিশের করা মামলার সঙ্গেই নুরের অভিযোগের তদন্ত করা হবে বলে সেদিন জানিয়েছিলেন শাহবাগ থানার ওসি আবুল হাসান। সেদিন হামলার ঘটনার পর মোট ৩১ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল।

নুর বলছেন, ২২ ডিসেম্বর বেলা ১২টার দিকে হঠাৎ করে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ অতির্কিতে ডাকসু ভবনে ঢুকে লাঠিসোঁটা নিয়ে তাদের উপর প্রথম দফা হামলা চালায়। তখন তারা ডাকসুর কর্মচারীদের সহায়তায় ভবনের মূল ফটকে তালা লাগিয়ে দেন। কিছুক্ষণ পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ দাস এবং সাধারণ সম্পাদক ও ডাকসুর এজিএস সাদ্দাম হোসাইনের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা মূল ফটকের তালা খুলে হত্যার উদ্দ্যেশে হামলা চালায়।

অন্যদিকে হামলায় ছাত্রলীগের জড়িত থাকার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে সাদ্দাম সেদিন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ওই ঘটনা ছিল মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ ও সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের সংঘর্ষ। ওই দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নিলে তারা তা থামাতে গিয়েছিলেন।

আর ডাকসুর জিএস গোলাম রাব্বানী এক ফেইসবুক পোস্টে দাবি করেন, সেদিন ছাত্রলীগ নেতারা নুরকে ‘উদ্ধার করতে’ গিয়েছিলেন। নুরের সাথে থাকা সহযোগীদের ‘অসৌজন্যমূলক আচরণে ও তীর্যক মন্তব্যে’ তারা ফিরে আসেন।

বাংলাদেশ জার্নাল/জেডআই