ঢাকা, সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯, ৫ কার্তিক ১৪২৬ আপডেট : কিছুক্ষণ আগে English

প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০১৯, ১৮:১৩

প্রিন্ট

বুয়েটের হলে হলে যেভাবে চলে ভয়াবহ নির্যাতন

বুয়েটের হলে হলে যেভাবে চলে ভয়াবহ নির্যাতন
নিজস্ব প্রতিবেদক

আবরার হত্যাকাণ্ডের পর একে একে বেরিয়ে আসছে বুয়েটে শিক্ষার্থীদের নানা অপকর্ম। যার মধ্যে অন্যতম ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের টর্চার সেলের কথা।

সেখানকার শিক্ষার্থীরা জানায়, বুয়েটের গেস্টরুম, ২০১১ ও ২০০৫ নম্বর রুমে চরম নির্যাতন চলতো। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই শিক্ষার্থীরা বুয়েটের ভয়াবহ নির্যাচনের আদ্যেপান্ত তুলে ধরেন।

১৭ ব্যাচের এক শিক্ষার্থী বলছিলেন, ‘২০১৮ সালের ১৪ ডিসেম্বর বুয়েট অডিটরিয়ামে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের একটি অনুষ্ঠান ছিল। সেখানে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের তখনকার সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী (সম্প্রতি বহিষ্কৃত) উপস্থিত ছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে হলের সবাইকে থাকতে বলা হয়েছিল। অনেকে গিয়েছিল, অনেকে আবার পড়াশোনার জন্য যেতে পারেনি। যারা অনুষ্ঠানে যায়নি, সেদিন রাতে এমন ৫০-৬০ জনকে হলের গেস্টরুমে ডেকে নেয়া হয়। সবাইকে চড়- থাপ্পড়, এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি দেয় ফুয়াদ মুনতাসীর। এরপর সবাইকে ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আবারো মারধর করে রাফিদ, সকাল ও বিটু। ছাদে ও গেস্টরুমে যাদের মারধর করে আমি তাদের একজন।’

এ শিক্ষার্থী আরো বলেন, ‘রাফিদ, বিটু ও সকাল কথায় কথায় শিক্ষার্থীদের ২০১১ নম্বর রুমে নিয়ে পেটাতো। যেমন বড় ভাইদের সালাম দিসনি কেন? বড় ভাইদের সম্মান করিস না কেন? ঊনিশ থেকে বিশ হলেই মারধর করতো। বর্তমানে বুয়েটের সবচেয়ে জুনিয়র ব্যাচ হলো- ১৮ তম ব্যাচ। আমাদের র‍্যাগিংয়ের জন্য ১৭ তম ব্যাচের ছাত্রলীগের সদস্য নাহিয়ান, শামীম বিল্লাহদের দায়িত্ব দেয় ছাত্রলীগ। ওরা ইচ্ছামতো রুমে ডেকে নিয়ে র‍্যাগ দিতো। কথা না শুনলে তোদের মেরে মাটিতে পুঁতে ফেলবো, কেউ জানবেও না।’

১৭তম ব্যাচের ওই শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা কয়েক বছর ধরে এসব রাগিং দেখছি। কেউ কখনও কারও কাছে অভিযোগ করার সাহস দেখায় না। কারণ, ছাত্রকল্যাণ বিভাগ কোনো কিছুই করতে পারে না।’

১৭তম ব্যাচের ওই শিক্ষার্থী জানান, আবরার ফাহাদকে মারার তিনদিন আগে ২০১১ নম্বর রুমে আরেকটি নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। ১৮তম ব্যাচের সিয়াম নামের এক ছাত্রকে পাঁচতলা থেকে দোতলার ২০১১ নম্বর রুমে নিয়ে আসার চেষ্টা করছিলেন ছাত্রলীগের কর্মীরা। প্রথমে সিয়াম তার রুম না খুলে ডিএসডব্লিউকে ফোন দিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। সিয়ামকে রুম থেকে টেনে হিঁচড়ে পাঁচতলা থেকে দোতলার ২০১১ নম্বর রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন রাফিদ। তাদের দেখে রাফিদ বলেছিলেন, ‘এই দুইজনকে আনতে দেরি হয়েছে কেন? ওরা না আসতে চাইলে নিয়ে আসলি কেন? পাঁচতলা থেকে নিচে ফেলে দিলেই হতো।’

ওই শিক্ষার্থী আরো জানান, অনেকে এ নির্যাতন সইতে পেরেছেন। তবে আবরার ভাই পারেননি, তাই চলে গেছেন।’

১৮তম ব্যাচের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘র‍্যাগিংয়ের জন্য আমাদের রুমে ডেকে নিয়ে এক পায়ে দাঁড় করানো হতো, কান ধরে দাঁড় করানো হতো, চেয়ার ছাড়া চেয়ারে বসার ভান করতে বলা হতো, মাটিতে বসে দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে কান ধরে মুরগি হতে বলা হতো। কারও ওপর বেশি ক্ষোভ থাকলে তাকে স্ট্যাম্পের ওপর বসানো হতো। যদি কেউ দীর্ঘক্ষণ দাঁড়াতে গিয়ে বসে পড়ে যেত তখন তাকে মারধর করা হতো এবং বলা হতো, মরে গেলেও করতে হবে।’

গত রোববার দিবাগত মধ্যরাতে বুয়েটের সাধারণ ছাত্র ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ফাহাদকে শেরেবাংলা হলের দ্বিতীয় তলা থেকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যান। সোমবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

সোমবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে ঢামেক ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. মো. সোহেল মাহমুদ বলেন, বাঁশ বা স্ট্যাম্প দিয়ে পেটানো হয়ে থাকতে পারে বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদকে। এর ফলেই রক্তক্ষরণ বা পেইনের (ব্যথা) কারণে ফাহাদের মৃত্যু হয়েছে।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত