ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২ ফাল্গুন ১৪২৬ আপডেট : ৮ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০২০, ১১:২১

প্রিন্ট

বাংলা গানের কালজয়ী স্রষ্টাকে হারানোর ১ বছর

বাংলা গানের কালজয়ী স্রষ্টাকে হারানোর ১ বছর
বিনোদন ডেস্ক

বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রখ্যাত গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলকে হারানোর একবছর আজ। ২০১৯ সালের ২২ জানুয়ারি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৬৩ বছর বয়সে মারা যান তিনি। কিন্তু চলে গিয়েও যারা রয়ে যান আরও বেশি গভীরভাবে, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল তাদেরই একজন। তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এ কিংবদন্তিকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে বাংলাদেশ জার্নাল

বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতে অবিস্মরণীয় এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। তিনি ছিলেন একাধারে গীতিকার, সুরকার এবং সঙ্গীত পরিচালক। এককথায় বাংলা গানের বিরল এক প্রতিভা ছিলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। ১৯৫৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাজধানী ঢাকার নয়াপল্টনে তার জন্ম। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের পৈতৃকবাড়ি নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জের আটিয়াকান্দি।

তার পিতার নাম ওয়াফিজ আহমেদ ও মাতার নাম ইফাদ আরা নাজিমুন নেসা। ঢাকার আজিমপুরের ওয়েস্টটেন্ট উচ্চ বিদ্যালয়ে তিনি মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন এবং পরবর্তীতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ইমতিয়াজ বুলবুল ছাত্রজীবনে মাধ্যমিকে অধ্যয়নরত অবস্থায় মাত্র ১৫ বছর বয়সে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেন। এসময় তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের ২ নাম্বার সেক্টরে মেজর আবু তাহের মোহাম্মদ হায়দারের অধীনে যুদ্ধ করেন।

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অপারেশন সার্চলাইটের পর বুলবুল ও তার বন্ধুরা মিলে পাকিস্তানিদের কাছ থেকে অস্ত্র ছিনতাই করে ছোট একটি মুক্তিযোদ্ধা দল গঠন করেন যাদের ঘাঁটি ছিল ঢাকার জিঞ্জিরায়। জুলাইয়ে বুলবুল ও তার বন্ধু সরোয়ার মিলে নিউ মার্কেটের ১ নাম্বার প্রবেশমুখের কাছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর লরিতে গ্রেনেড হামলা করেন। এরপর অগস্টে ভারতের আগরতলায় কিছুদিন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং ঢাকায় ফিরে ‘ওয়াই (ইয়াং) প্লাটুন’ নামে একটি গেরিলা দল গঠন করেন।

অক্টোবরে পুনরায় ভারত যাওয়ার সময় বুলবুলসহ চারজন কুমিল্লা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাঝামাঝি তন্তর চেকপোস্টে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আটক হন। আটক হওয়ার পর প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগারে ও পরে এ অঞ্চলের শান্তি কমিটির প্রধান কার্যালয়ে নির্যাতনের শিকার হন। পরবর্তীতে বয়সে ছোট হওয়ায় তিনি মুক্তি পান কিন্তু ঢাকায় তার নিজ বাসা থেকে পুনরায় গ্রেফতার হন ও জাতীয় সংসদের মানিক মিয়া এভিনিউ’র হোস্টেলে নির্যাতনের শিকার হন।

সেখান থেকে তাকে রমনা থানায় স্থানান্তর করা হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয়ী হওয়ার পর মুক্তিবাহিনী রমনা থানা থেকে আহতবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে তাকে পিজি হাসপাতালে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) চিকিৎসা প্রদান করা হয়।

১৯৭০ দশকের মাঝামাঝিতে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্প বা ঢালিউডসহ সঙ্গীত শিল্পে সক্রিয় হন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। ১৯৭৮ সালে ‘মেঘ বিজলি বাদল’ ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন। তিনি স্বাধীনভাবে গানের অ্যালবাম তৈরি করেছেন এবং অসংখ্য চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে যেন একচেটিয়াে অধিকাংশ জনপ্রিয় ও সুপার-ডুপার হিট সিনেমার সঙ্গীত পরিচালক এবং একইভাবে অগণিত গানের সুরারোপও করেছিলেন কিংবদন্তি এই সঙ্গীতজন। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল তিন শতাধিক চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন। তিনি সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা, সৈয়দ আব্দুল হাদি, এন্ড্রু কিশোর, সামিনা চৌধুরী, খালিদ হাসান মিলু, আগুন, কনকচাঁপাসহ বাংলাদেশী প্রথমসারির প্রায় সকল জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পীদের নিয়ে কাজ করেছেন।

দেশের সঙ্গীতে অসামান্য অবদানের জন্য আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল রাষ্ট্রীয় অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্মাননা একুশে পদক-এ ভূষিত হন। চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করে পেয়েছেন দুই বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। এর মধ্যে শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে ‘হাজার বছর ধরে’ চলচ্চিত্রের জন্য ২০০৫ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। একইভাবে ২০০১ সালে ‘প্রেমের তাজমহল’ চলচ্চিত্রে শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হন। তিনি রেকর্ড সংখ্যক এগারোবার বাচসাস পুরস্কার লাভ করেছেন। এছাড়াও শিখা অনির্বাণ পদক, সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস এবং শহীদ আলতাফ মাহমুদ পদকসহ বহু পুরস্কার-সম্মাননায় ভূষিত হন।

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ২০১২ সালের আগস্টে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী ও জামায়েত ইসলামী নেতা গোলাম আযমের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করেন। তারই জের ধরে পরবর্তীতে আততায়ীরা খুন করে তার ছোট ভাই মিরাজকে। ২০১৩ সালের ৯ মার্চ রাতে ঢাকার কুড়িল উড়ালসেতুর পাশ থেকে পুলিশ বুলবুলের ছোট ভাই আহমেদ মিরাজের লাশ উদ্ধার করে।

তার ভাইয়ের মৃত্যুর পর তিনি সরকারের কাছে তার নিরাপত্তা বৃদ্ধির আবেদন করেন এবং এটাও উল্লেখ করেন যে সাক্ষ্য দেওয়ার পর তিনি বেশ কিছু হত্যার হুমকি পেয়েছেন। ফলে গত ছয় বছর ধরে পুলিশ পাহারায় একপ্রকার চাপা অভিমান নিয়ে অনেকটা গৃহবন্দির মত ছিলেন তিনি। এমনি আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে শঙ্কা আর ছোট ভাইকে হারানোর কষ্ট বুকে নিয়ে নীরবে-নিভৃতে একমাত্র ছেলেকে সাথে করে দিনযাপন করছিলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল।

আজ ২২ জানুয়ারি ভোর ৪টার দিকে আফতাব নগরের বাসায় স্ট্রোক করার পর দ্রুত তাকে রাজধানীর আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। কীর্তিমান এই সঙ্গীতজ্ঞের মৃত্যুর খবরে দেশের সঙ্গীত তথা সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তার মত এমন কিংবদন্তিতুল্য গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালকের চলে যাওয়া মানে দেশের সঙ্গীতের জন্য বিরাট এক শূন্যতা। যা সত্যি অপূরণীয়। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল স্বমহিমায় বেঁচে থাকবেন, সৃষ্টির উজ্জ্বলতায় জীবন্ত হয়ে থাকবেন তার অনবদ্য সব সৃজনের মাঝে। কীর্তিমান এই সঙ্গীতজনের মৃত্যুতে তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

তার সঙ্গীত পরিচালনায় উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে- নয়নের আলো, মরণের পরে,সহযাত্রী, মায়ের অধিকার, চাওয়া থেকে পাওয়া, বিয়ের ফুল, তেজি, আম্মাজান, আব্বাজান,মুক্তি চাই, প্রেমের তাজমহল, প্রেমের জ্বালা, মিনিস্টার, ইতিহাস, মায়ের সম্মান, অন্যায়ের প্রতিবাদ, প্রাণের চেয়ে প্রিয়, পড়েনা চোখের পলক, তোমাকে চাই, লুটতরাজ, মহৎ, তুমি বড় ভাগ্যবতী, লাভ স্টোরি, ভুলনা আমায়, সমাজ কে বদলে দাও, আজ গায়ে হলুদ, লাভ ইন থাইল্যান্ড, কাল নাগিনীর প্রেম, দেশ প্রেমিক, আন্দোলন, প্রেম কেন কাঁদায়, অনেক দিনের আশা, নিষিদ্ধ নারী, ফুল নেব না অশ্রু নেব, আনন্দ অশ্রু, অন্ধ ভালবাসা, তুমি আমারি, আত্ম-অহংকার, আমার অন্তরে তুমি, বিক্ষোভ, সুখের ঘরে দুঃখের আগুন, কিলার, মহা মিলন, কাজের মেয়ে, দুই নয়নের আলো, বিদ্রোহ চারিদিকে, কাবিননামা, মা আমার স্বর্গ, মা আমার বেহেশত, মাটির ঠিকানা, আমার পৃথিবী তুমি (যৌথ), রাজা সূর্য খাঁ (যৌথ)।

তার সুরারোপিত গানের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- সব কটা জানালা খুলে দাও না, ও মাঝি নাও ছাইড়া দে ও মাঝি পাল উড়াইয়া দে, সেই রেল লাইনের ধারে, সুন্দর সুবর্ণ তারুণ্য লাবণ্য, ও আমার আট কোটি ফুল দেখ গো মালি, মাগো আর তোমাকে ঘুম পাড়ানি মাসি হতে দেব না, একতারা লাগেনা আমার দোতারাও লাগে না, আমার সারাদেহ খেয়ো গো মাটি, আমার বুকের মধ্যেখানে, আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন, আমি তোমারি প্রেমও ভিখারি, ও আমার মন কান্দে- ও আমার প্রাণ কান্দে, আইলো দারুণ ফাগুনরে, আমার একদিকে পৃথিবী একদিকে ভালোবাসা, আমি তোমার দুটি চোখে দুটি তারা হয়ে থাকবো, আমার গরুর গাড়িতে বৌ সাজিয়ে, পৃথিবীর যত সুখ আমি তোমারই ছোঁয়াতে যেন পেয়েছি, তোমায় দেখলে মনে হয়, হাজার বছর আগেও বুঝি ছিল পরিচয়, ঐ চাঁদ মুখে যেন লাগে না গ্রহণ, বাজারে যাচাই করে দেখিনি তো দাম, আম্মাজান আম্মাজান, এই বুকে বইছে যমুনা, সাগরের মতই গভীর, আকাশের মতই অসীম, আমি জীবন্ত একটা লাশ, প্রেম কখনো মধুর, কখনো সে বেদনা বিধুর, পড়ে না চোখের পলক, যে প্রেম স্বর্গ থেকে এসে, কী আমার পরিচয়- ঠিকানা কী জানি না, অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে, তুমি আমার জীবন- আমি তোমার জীবন, তোমার আমার প্রেম এক জনমের নয়, তুমি হাজার ফুলের মাঝে একটি গোলাপ, জীবনে বসন্ত এসেছে, ফুলে ফুলে ভরে গেছে মন, ঘুমিয়ে থাকো গো স্বজনী, আমার হৃদয় একটা আয়না, বিধি তুমি বলে দাও আমি কার, এই তুমি সেই তুমি যাকে আমি চাই, তুমি মোর জীবনের ভাবনা, হৃদয়ে সুখের দোলা, তুমি আমার এমনই একজন, একাত্তুরের মা জননী কোথায় তোমার মুক্তিসেনার দল, বিদ্যালয় মোদের বিদ্যালয় এখানে সভ্যতারই ফুল ফোটানো হয়, জীবন ফুরিয়ে যাবে ভালবাসা ফুরাবে না জীবনে, অনেক সাধনার পরে আমি পেলাম তোমার মন, ওগো সাথি আমার তুমি কেন চলে যাও, একদিন দুইদিন তিনদিন পর- তোমারি ঘর হবে আমারি ঘর, নদী চায় চলতে, তারা যায় জ্বলতে, ও ডাক্তার,ও ডাক্তার, শেষ ঠিকানায় পৌঁছে দিয়ে আবার কেন পিছু ডাকো, চিঠি লিখেছে বউ আমার, আট আনার জীবন, আমার দুই চোখে দুই নদী।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ/আইএন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত