ঢাকা, রোববার, ০৫ এপ্রিল ২০২০, ২২ চৈত্র ১৪২৬ আপডেট : ৪৫ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৮:২৫

প্রিন্ট

নব্বই দশকের নায়িকা সন্ধ্যার একাল-সেকাল

নব্বই দশকের নায়িকা সন্ধ্যার একাল-সেকাল

ইমরুল নূর

‘প্রিয় তুমি’ সিনেমা দিয়ে ১৯৯৫ সালে রুপালি পর্দায় অভিষেক ঘটেছিল চিত্রনায়িকা সন্ধ্যার। কলেজে পড়ার সময় শখের বসে মডেলিং করতেন। আর সেই সময়েই পরিচালক হাফিজ উদ্দিনের মাধ্যমে ‘প্রিয় তুমি’ সিনেমাতে কাজ করার প্রস্তাব পান। ওমর সানি, মৌসুমী, হেলাল খান অভিনীত এই সিনেমায় হেলাল খানের বিপরীতে অভিনয় করে নবাগতা হিসেবে হাজির হন এই নায়িকা। প্রথম ছবিতে ভালো সাড়া পাওয়ায় নিয়মিতই কাজ করতে থাকেন। এরপর প্রিয় যুদ্ধ, স্বপ্নের রাজা, আমার অন্তরে তুমি, দরদী সন্তান, গুণ্ডা পুলিশ, ভালোবাসি তোমাকে, প্রেমের বাজিসহ অল্প ক্যারিয়ারে কাজ করেছেন ১৮টি সিনেমাতে। নায়ক হিসেবে পেয়েছিলেন হেলাল খান, রুবেল,বাপ্পারাজ, মাহফুজ আহমেদ, সালমান শাহ,মান্না সহ আরও অনেককেই। এরপর ২০০০ সালে শোবিজ থেকে আড়াল হয়ে যান এই নায়িকা।

অশ্লীলতা ইন্ডাস্ট্রিতে গ্রাস করতে শুরু করছে দেখে নিজেকে গুটিয়ে নেন। পরের বছর বিয়ে করে আমেরিকায় চলে যান। সেখানে পনের বছর বসবাস করার পর আবার ২০১৬ সালের দিকে দেশে ফিরে আসেন সন্ধ্যা। দেশে আসলেও শোবিজের কোথাও দেখা যায়নি তাকে। নিজের পরিচয়কে আড়াল করেই রেখেছিলেন অনেকটা।

তবে সম্প্রতি তাঁর খোঁজ পাওয়া গেলো। বর্তমানে তিনি নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন পরিবার ও ব্যবসায় নিয়ে। একটি ফ্যাশন হাউজ খুলেছেন অনেক বছর আগে। এখন সেটারই দেখাশোনা করছেন। বাস করছেন রাজধানীর ইস্কাটনে। বাংলাদেশ জার্নালের সঙ্গে এক আলাপচারিতায় তাঁর ক্যারিয়ার ও সেসময়ের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন নব্বই দশকের চিত্রনায়িকা সন্ধ্যা।

তার সঙ্গে আলাপকালে সন্ধ্যা জানান, ‘এখন অনেকের কাছেই শুনি সিনেমা নেই, হল নেই। আগের মত তেমন সিনেমা হচ্ছে না। আর লগ্নিকৃত টাকাও ফেরত আসছে না। খুবই খারাপ সময় যাচ্ছে। অথচ নব্বই দশকটা ছিল সিনেমার জন্য বেশ রমরমা। তখন অনেক বেশি পরিমাণ সিনেমা হতো আর ব্যবসাও করতো। কয়েকবছর কাজ করেছি কিন্তু যখন দেখেছি অশ্লীলতা গ্রাস করছে ইন্ডাস্ট্রিতে, তখন নিজেকে সেখান থেকে সরিয়ে নিই।’

হঠাৎ করে সিনেমা ছেড়ে দেওয়ার কারণ প্রসঙ্গে এই নায়িকা বলেন, ‘অশ্লীলতা তখন মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিলো। বড় বড় সব পরিচালক, প্রযোজক ও নায়ক-নায়িকরাও অশ্লীলতায় ডুবে গেল চোখের সামনে দেখলাম। বুঝতে পেরেছিলাম সময় খুব খারাপ। তখন নিজ থেকেই সরে যাই। আমার পক্ষে সম্ভব ছিলো না ওই স্রোতে গা ভাসানো। আর যারা অন্য স্রোতে কিছুটা চেষ্টা করছিলেন ভালো সিনেমা করার তার সংখ্যা ছিলো খুবই কম। হতাশ ছিলাম আসলে।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘অনেক নায়িকাকেই দেখেছি ইন্ডাস্ট্রিতে এসে রাতারাতি বাড়ি-গাড়ির মালিক হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আমার সেরকম ইচ্ছা ছিল না। কারণ ইন্ডাস্ট্রিতে আসার আগে থেকেই আমার বাড়ি ও গাড়ি ছিল। আমার বাবার পাঁচতলা বাড়ি ও তিনটা গাড়ি ছিল। তাই শিল্পের নামে ওইসব নোংরামি করে রাতারাতি কিছু হয়ে যাওয়ার ইচ্ছা আমার মধ্যে কখনওই ছিল না। যখন অন্যান্য নায়িকারা রাতারাতি গাড়ি-বাড়ি করার পেছনে ছুটত তখন আমি এফডিসিতে শুটিং করতে যেতাম গাড়ি নিয়ে। অনেক স্বপ্ন নিয়ে সিনেমায় এসেছিলাম। কিন্তু সেই স্বপ্নটা ভাঙতে বেশি সময় লাগেনি।

কিছু নোংরা লোক ছিল ইন্ডাস্ট্রিতে যারা শুধু বাজে প্রস্তাব দিত। এসব মনমানসিকতা নিয়ে কাজ করতে পারিনি আমি। এই গিভ এন্ড টেক পলিসিতে কাজ করার মেয়ে আমি নই। খুবই স্পষ্টবাদী। ভালো কাজ করতে চাইতাম পরিচ্ছন্নভাবে, ভালো থাকতে পছন্দ করতাম। পরিচালক শহীদুল ইসলাম খোকন, আসিফ উদ্দিন, কমল সরকার, শওকত জামিল, মোস্তাফিজুর রহমান বাবু এদের সঙ্গে আমি কাজ করেছি। এরা সবাই তখন অনেক বড় পরিচালক। হেলাল খান, রুবেল,বাপ্পারাজ, মাহফুজ, সালমান শাহ, মান্না- এদের সঙ্গে আমি কাজ করেছি। যে কয়েকটা কাজ করেছি, ভালো কাজ করার চেষ্টা করেছি। আমার মধ্যে তৃপ্তি আছে।’

আমি স্পষ্টবাদী ছিলাম বলে আমাকে নিয়ে কেউ নোংরামি করতে পারেনি। আর এইসব নোংরামি দেখেই আমি নিজেকে সেখান থেকে গুটিয়ে নেই। বাইরে থেকে যতটা পরিষ্কার মনে হয়, ভিতরটা আসলে ততটা পরিষ্কার ছিল না। শখের বসে সিনেমাতে এসেছিলাম। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখি সিনেমা করতে হলে অনেক কিছুই করতে হয়। ওটা করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। আমার কোয়ালিটি থাকলে সেটা দেখে আমাকে কেউ কাজে নিবে নাহলে না নিবে। কারও সাথে কিছু করে আমি কাজ করতে নারাজ ছিলাম। এগুলোর সাথে নিজেকে মানিয়ে দিতে পারিনি।

অল্প সময়ের ক্যারিয়ারেই প্রায় ১৮টির মত সিনেমায় অভিনয় করেছেন সন্ধ্যা। তারমধ্যে সালমান শাহের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাকে সেরা বলে মানেন তিনি। সন্ধ্যা বলেন, ‘ক্যারিয়ারে স্মরণীয় বা আনন্দঘন মূহুর্ত অনেক আছে। তবে আমার কাছে সবচেয়ে সেরা হলো সালমান শাহের সঙ্গে কাজ করা। কারণ সালমান ছিল আমারও স্বপ্নের পুরুষ। তার সাথে কাজ করতে পেরেছি দুইটা সিনেমাতে। এটা আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া। আর সবচেয়ে বড় আফসোসটা হলো সালমানের সঙ্গে একটি সিনেমাও আমার মুক্তি পায়নি।

‘প্রেমের বাজি’ নামের যে ছবিটি করেছিলাম সেটির শুটিং হয়েছিলো বেশ অনেকটাই। গানও করেছিলাম একটি। কিন্তু সালমানের অকাল প্রয়াণে ছবিটি আর হয়নি। তবে ছবির একটা গান ‘ওদের ধর’ নামের সিনেমায় যোগ করে দেয়া হয়েছিলো। ‘ওদের ধর’ সিনেমার জন্যও আমি আর সালমান কাজ শুরু করেছিলাম। পরে আর হয়নি। আমি নায়ক হিসেবে অনেককেই তো দেখেছি তবে সালমান ছিল সবার চেয়ে আলাদা। সবকিছুতে সবার চেয়ে অনেক এগিয়ে। ওর কথা বলে শেষ করা যাবে না। আল্লাহ তাকে শান্তিতে রাখুক।’

আর কখনও সিনেমায় আসার ইচ্ছে নেই জানিয়ে চিত্রনায়িকা সন্ধ্যা বলেন, ‘সিনেমায় আসার কথা ভাবি না আর। তবে সিনেমা প্রযোজনা করার ইচ্ছা আছে। অবশ্য কয়েক বছর আগেই একবার প্রযোজনা করবো বলে ভাবছিলাম। কিন্তু আশেপাশের অবস্থা ও মানুষজনের কথা শুনে আর শুরু করিনি। টাকা ফেরত না এলে লগ্নি করার সাহসটা আসে কী করে!’

শোবিজ ছেড়ে দিলেও নিজের মধ্যে কখনও আফসোস কাজ করেনি সন্ধ্যার। তবে ইন্ডাস্ট্রিকে মিস করতেন ভীষণভাবে। তিনি বলেন, ‘মিস করেছি অনেক। এটা একটা অন্য জগত। একটা মোহ। একটা ভালোবাসা। সিনেমা করবো, নায়িকা হবো সেই স্বপ্ন খুব রঙিন ছিলো। যদি সময়টা খারাপ না হতো তাহলে হয়তো সিনেমা থেকে সরে যেতাম না।’ আড়ালে থাকার এই ২০ বছরে শোবিজের কারও সঙ্গে কি যোগাযোগ হয়েছে- এমন প্রশ্নে তিনি জানান, ‘হ্যাঁ। অনেকের সাথেই যোগাযোগ হয়। শাবনূর হচ্ছে আমার বান্ধবী। ওর সাথে আমার তুই তুই সম্পর্ক। ওর সাথে নিয়মিতই যোগাযোগ হয় আমার। মৌসুমী আপার সঙ্গেও খুব ভালো সম্পর্ক। উনার সাথে যোগাযোগ হয়।’

বর্তমানে ‘শপারস ডিজাইনার হাউজ’ নামে ফ্যাশন হাউজ পরিচালনা করছেন সন্ধ্যা মাজিদ। বসুন্ধরা সিটিতে দুইটা আউটলেট রয়েছে ১৫ বছর ধরেই। গত সপ্তাহে বনানীতে নতুন আউটলেট খুলেছেন তিনি। সেইসঙ্গে সুখী দাম্পত্যে সন্ধ্যার নয়নের মণি তার দুই সন্তান। এক ছেলে নাসিফ মাজিদ ও লেবেল শেষ করেছে। ছোট মেয়ে সোহা মাজিদ এখন ৮ম শ্রেণিতে পড়ছে।

আইএন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত