ঢাকা, বুধবার, ২৩ জুন ২০২১, ৯ আষাঢ় ১৪২৮ আপডেট : ১ ঘন্টা আগে

প্রকাশ : ০৮ মে ২০২১, ১৮:৫৪

প্রিন্ট

শেষ হয়েও আমি হবো না শেষ: নুসরাত ইমরোজ তিশা

শেষ হয়েও আমি হবো না শেষ: নুসরাত ইমরোজ তিশা
‘রক রবীন্দ্র’ নাটকের শুটিংয়ে নুসরাত ইমরোজ তিশা, ছবি: আতিক রহমান

ইমরুল নূর

নব্বইয়ের মাঝামাঝিতে টেলিভিশন পর্দায় আগমন ঘটেছিলো এক তরুণীর, যিনি অভিনয় গুণে খুব অল্প সময়েই হয়ে উঠেন তুমুল জনপ্রিয়। সময়ের পালাবদলে উপহার দিয়েছেন বহু জনপ্রিয় নাটক। শুধু নাটকেই নয়, বিজ্ঞাপনেও যিনি ছিলেন অনবদ্য। দুই দশক পেরিয়ে আজও দাপটের সঙ্গে অভিনয় করে যাচ্ছেন যিনি, তিনি নুসরাত ইমরোজ তিশা। একাধারে তিনি একজন অভিনেত্রী, গায়িকা, নৃত্যশিল্পী এবং চলচ্চিত্র প্রযোজক। নানামাত্রিক চরিত্রে হাজির হয়ে নিজেকে ভার্সেটাইল অভিনেত্রী হিসেবে প্রমাণ করেছেন বহুবার। ঈদকে ঘিরে এখন বেশ ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি। সেই ব্যস্ততার ফাঁকেই শুটিং সেটে কথা হয় নন্দিত এই অভিনেত্রীর সঙ্গে। সেই আলাপচারিতার চুম্বকাংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো...

বাংলাদেশ জার্নাল: প্রথমে জানতে চাইবো ‘রক রবীন্দ্র’ কাজটি নিয়ে...

নুসরাত ইমরোজ তিশা: ‘রক রবীন্দ্র’ নাটকটি পরিচালনা করেছেন মহিদুল মহিম। এখানে আমার সঙ্গে রয়েছেন অপূর্ব। নাটকের গল্প নিয়ে এতটকুই বলবো, এখানে খুনসুটি আছে, ভালোবাসা আছে। এক কথায় খুনসুটি আর ভালোবাসার গল্প।

বাংলাদেশ জার্নাল: এক সময়ের প্রভাবশালী ও দর্শকপ্রিয় জুটি বলা হয় অপূর্ব ও তিশাকে। মাঝখানে অনেকগুলো বছর নেই। এটা কেন?

নুসরাত ইমরোজ তিশা: আমরা একসঙ্গে অনেকগুলো কাজই করেছিলাম যেগুলো দর্শকরা বেশ পছন্দ করেছিলো। কাজের কারণেই দর্শকদের কাছে এই জুটিটা প্রিয় হয়ে উঠেছিলো। সেই জুটিই আবার একসাথে কাজ করছি এটাই তো বড় কথা (হাসি)। আগেও আমরা অনেক ভালো কাজ করেছি, ভবিষ্যতেও যেন সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারি, এখন সেটাই চাইবো। দর্শকরা আগেও যেমন আমাদের কাজ পছন্দ করেছে, আশা করবো আগামীতেও তাই করবে, আগের মতো সেই ভালোবাসাটুকু দেবে।

বাংলাদেশ জার্নাল: অপূর্বর সঙ্গে জুটি বেঁধে অনেকগুলো কাজই করেছেন। অনেকদিনের চেনা-জানা আপনাদের। জানতে চাইবো সহশিল্পী হিসেবে অপূর্ব কেমন?

নুসরাত ইমরোজ তিশা: সংক্ষেপে বললে বলবো কো-অপারেটিভ, একটিভ এবং সাপোর্টিভ। আর একটু বিস্তারিত যদি বলি তাহলে বলবো, একজন শিল্পী কিন্তু এটাই চায় যে তার সহশিল্পী যেন ঠিক এরকমই হয়, তার মধ্যে যেন এই তিনটি গুণ থাকে। সিকুয়েন্সগুলোতে সাপোর্ট করবে, স্ক্রিন শেয়ারের ক্ষেত্রে একটিভ থাকবে, সাপোর্ট করবে। তাহলে কিন্তু দুজনের কম্বিনেশনটা ভালো হয়। আর অপূর্বকে নিয়ে আমি নতুন করে আর কী বলবো, দর্শকই সেটা বেশ ভালো জানে। তার সঙ্গে সহশিল্পী হিসেবে যারা কাজ করছেন তারাও সেটা জানেন যে, অপূর্ব মানুষ হিসেবে খুবই ভালো আর শিল্পী হিসেবে গ্রেট। হি ইজ অ্যা গ্রেট অ্যাক্টর। আর অপূর্বর সঙ্গে আগেও কাজের অভিজ্ঞতা ভালো ছিলো, এখনো ভালো এবং সামনেও সেটা ভালোই হবে।

বাংলাদেশ জার্নাল: দর্শকদের এই প্রিয় জুটিকে কি তাহলে এখন থেকে নিয়মিত দেখা যাবে?

নুসরাত ইমরোজ তিশা: মাত্র তো কাজ শুরু করেছি। পরিচালকরা আমাদের নিয়ে কাজ করতে চাইলে অবশ্যই দেখা যাবে।

বাংলাদেশ জার্নাল: এখন আগের চেয়ে কাজ অনেক কমিয়ে দিয়েছেন। তারপরও জানতে চাইবো এবার ঈদে আপনার কতগুলো কাজ যাচ্ছে?

নুসরাত ইমরোজ তিশা: এবার ঈদে খুব বেশি কাজ করিনি। প্যান্ডামিক সিচুয়েশনের কারণে কাজ করবো না ভেবেছিলাম। না করতে করতেই হঠাৎ করে কাজে নেমে পরেছি। ঈদের আগে ২/৩ টা কাজ করতেছি, এগুলো যাবে। আর আগে করা কিছু কাজের মধ্যে হয়তো ২/৩ টা নাটক প্রচার হতে পারে।

বাংলাদেশ জার্নাল: জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বায়োপিকে অভিনয় করেছেন। বঙ্গবন্ধু স্ত্রী ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের চরিত্রে। ইতিহাসের দলিল হয়ে থাকবে, এরকম একটি কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়া ও কাজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে চাই....

নুসরাত ইমরোজ তিশা: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বায়োপিক হচ্ছে এবং সেখানে আমি একটা অংশ হতে পেরেছি যেটা কিনা ইতিহাসের একটা দলিল হয়ে থাকবে। আমি সেখানে কোন চরিত্র বা কী করছি সেটার চেয়ে কাজটিতে অংশ হতে পেরেছি; এটাই আমার জীবনের সেরা পাওয়া হয়ে থাকবে। এরকম একটা কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে আমি সত্যি অনেক সম্মানিত বোধ করছি। যেহেতু এটা ইতিহাস হয়ে থাকবে সেই ইতিহাসের অংশ হতে যেই চরিত্রটি করছি তার জন্য ঠিক যতটুকু প্রস্তুতি নেওয়া দরকার, সেটুক নেওয়ার চেষ্টা করেছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বসেছি, যারা যারা এটার সঙ্গে এবং রিসার্চের সঙ্গে জড়িত সবার সঙ্গে বসেছি, জেনেছি। সময় নিয়েছি নিজেকে প্রস্তুত করার জন্য। চেষ্টা করেছি সর্বোচ্চটা দিয়ে কাজ করার জন্য।

আর অভিজ্ঞতা যদি বলি তাহলে বলবো, অসাধারণ। তার মানে এই না যে, আমাদের বাংলাদেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা খারাপ। একেক জায়গার বাজেট কিংবা সিস্টেম একেক রকম। আমরা যেমন সীমিত বাজেটে যথেষ্ট সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে নিজেদেরকে খাপ খাইয়ে নিয়ে কাজ করি, এনজয় করি সেখানকার ক্ষেত্রে ভিন্নতা তো কিছুটা আছেই। তাদের বিগ বাজেট, বিশাল বড় পরিসর; সবকিছুই লাক্সারিয়াস। সেখানেও এনজয় করে কাজ করেছি। আমি বলবো অভিজ্ঞতা দুই জায়গাতেই ভালো।

বাংলাদেশ জার্নাল: নতুন কোনো সিনেমার খবর আছে কি?

নুসরাত ইমরোজ তিশা: নতুন বলতে এখন আমার তিনটি সিনেমার কাজ চলছে। এরমধ্যে ‘প্রীতিলতা’র কাজ বাকি রয়েছে এক দুই দিনের। ‘রক্ত জবা’ সিনেমার একদিনের প্যাচওয়ার্ক বাকি আছে। আর ‘বঙ্গবন্ধু’; যেটার ৮০ ভাগ অংশের কাজ মুম্বাইতে শেষ করে এসেছি। বাকি ২০ ভাগ অংশের কাজ এখনও রয়েছে, সেটা খুব সম্ভবত সেপ্টেম্বরে শুরু হবে।

বাংলাদেশ জার্নাল: সেই সাতানব্বই থেকে শুরু। সুদীর্ঘকাল ধরে এখনো স্বমহিমায় অভিনয় করে যাচ্ছেন। আপনার দীর্ঘ পথচলাটা সহজ ছিলো না নিশ্চয়। এ পথচলায় আপনার সংগ্রামের কিছু গল্প যদি শোনান….

নুসরাত ইমরোজ তিশা: শুধু যে আমার তা কিন্তু নয়। প্রত্যেকটা মানুষকেই কিন্তু অনেকটা সংগ্রাম করে পথ চলতে হয়। যেকোনো মানুষ বলি কিংবা প্রফেশন বলি সবখানেই কিন্তু উথান-পতন থাকেই। এটা সবাইকেই ফেইস করতে হয়। আমার জীবনেও নানা বাধা-বিপত্তি এসেছে, চরাই-উৎরাই পার করেছি। কিছুই ফেইস করিনি এমন না, অনেক বাঁধাই অতিক্রম করেছি। তবে আমি সবসময় চেষ্টা করেছি সৎ থাকার আর পরিশ্রম করার। পরিশ্রম করে নিজেকে ইমপ্রুভ করার চেষ্টা করেছি। ‘বিং অনেস্ট টু মাই জব, হার্ড ওয়ার্কার এন্ড টু ইমপ্রুভ’ এই তিনটি জিনিস আমি সবসময় মেইনটেইন করে চলেছি। যার কারণে অনেক বাঁধা-বিপত্তি আসলেও তা উৎরে যেতে পেরেছি। নিজেকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইমপ্রুভ করার চেষ্টা করেছি অনেক। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে অভিনয়টাকে ইমপ্রুভ করা, খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। যার কারণে সবকিছু স্ট্রংলি হ্যান্ডেল করতে পেয়েছি।

বাংলাদেশ জার্নাল: এখন সব শিল্পীরাই ওটিটি প্ল্যাটফর্মের দিকে ঝুঁকছেন। টিভি পর্দা আর ওটিটি কনটেন্টের মধ্যে কী কোনো পার্থক্য চোখে পড়ে?

নুসরাত ইমরোজ তিশা: একজন শিল্পীর কাজ কিন্তু অভিনয় করা; সেটা যেকোনো প্লাটফর্মেই হতে পারে। আমি যখন ভাল স্ক্রিপ্ট এবং ভালো পরিচালক পাবো তখন আমি যেকোন জায়গাতেই কাজ করতে রাজি। সেটা টেলিভিশন হোক, ইউটিউব বা ওটিটি। আমি এত বেশি পার্থক্য খুঁজতে যাই না। আমি শুধু ভাল স্ক্রিপ্টটা দেখি যেখানে আমি এফোর্ট দিতে পারবো। সেটা সিনেমারও হতে পারে আবার নাটকের কিংবা ওয়েব সিরিজও।

বাংলাদেশ জার্নাল: একটি নাটক/সিনেমা নির্বাচন করা বা সাইনের আগে কোন বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেন? নুসরাত ইমরোজ তিশা: অবশ্যই গল্প এবং চরিত্র। তারপর দেখি পরিচালক। কারণ সেই গল্পটাকে কতটা ভালোভাবে প্রেজেন্ট করবেন, সেটা কিন্তু পরিচালকের হাতে থাকে।

বাংলাদেশ জার্নাল: ১৯৯৫ সালে ‘নতুন কুড়ি’তে অংশ নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। সেটাও গানের মাধ্যমে। এরপর ১৯৯৭ সালে ‘সাত প্রহরের কাব্য’ নাটক দিয়ে অভিনয়ে যুক্ত হন। অভিনয়ে আসার পর আপনাকে আর গানে পাওয়া যায়নি কেন?

নুসরাত ইমরোজ তিশা: আমার গান করা হয়েছিলো শুধুমাত্র আমার বাবার জন্যই। গান আমার বাবার খুব পছন্দের জনরা ছিলো। বাবা মারা যাওয়ার পর আমার আর গান করা হয়ে উঠেনি। এরপর থেকে আমার ছোট্ট একটা ট্রমা কাজ করে গান নিয়ে। আর নাটকে যুক্ত হয়ে যাওয়ার পর অভিনয়ের মাধ্যমে আমার নাচ, গান সবকিছুকেই ব্যবহার করতে পারছি; এটা ভেবেও আর কখনও গানে মনোনিবেশ করা হয়নি।

বাংলাদেশ জার্নাল: জীবন নিয়ে আপনার কী ভাবনা? যদি একদিন এই তারকাখ্যাতি বা স্টারডম হারিয়ে যায়, তখনকার জীবন নিয়ে কিছু ভেবেছেন?

নুসরাত ইমরোজ তিশা: আমি যখন মিডিয়াতে আসি তখনই এটা মাথাতে স্থির করে নিয়েছি যে, উথান যখন আছে তখন সেটার পতনও আছে। যেই মিডিয়াতে কাজ করছি সেখানে বা সেই ক্যামেরার সামনে আমি সবসময় নায়িকা থাকবো না! এখনও যেহেতু শেষ হয়ে যায়নি সময়টা, তাই শেষ হয়ে যাওয়ার আগে আমি আমার জনরাটাকে অন্য সেক্টরের দিকে নিয়ে যাবো। তখন কিন্তু আমি শেষ হয়েও হবোনা শেষ।

সহজ করি যদি বলি তাহলে বলবো, এখন কিন্তু আমি কাজ কম করি। আগে ঈদে যেখানে ত্রিশটা কাজ করতাম এখন সেখানে করি ৫টা। এক্সক্লুসিভ কাজগুলো করি, র‍্যান্ডম কাজ করি না। কিন্তু ওই যে বললাম শেষ হয়েও হবো না শেষ; অভিনেত্রীর বাইরেও কিন্তু আমি একজন চলচ্চিত্র প্রযোজক। ওয়েব সিরিজ, সিনেমা প্রযোজনা করছি। তাই, আমি কিন্তু আছি। ক্যামেরার সামনেও কাজ করছি, পেছনেও কাজ করছি। সারাজীবন তো আর ক্যামেরার সামনে কাজ করবো না, আর আমি চাই ও না। তবে সামনে কাজ না করলেও পেছনে তো আছি।

বাংলাদেশ জার্নাল/আইএন

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত