ঢাকা, মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২০, ২৩ আষাঢ় ১৪২৭ আপডেট : ৭ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০২০, ১৩:২২

প্রিন্ট

২১ বছর বাসেই ঘর সংসার ভবঘুরে সানির

২১ বছর বাসেই ঘর সংসার ভবঘুরে সানির
অনলাইন ডেস্ক

তার কোনো ঘরবাড়ি ছিলো না। থাকতেন লন্ডনের এক বাসে। ব্রিটেনে আশ্রয় নেয়ার আবেদনপত্রটি বাতিল হওয়ার পর গত ২১ বছর ধরে বাসেই রাত কাটিয়েছেন নাইজেরিয়ান নাগরিক সানি (ছদ্মনাম)। তাই বুঝি বিবিসি প্রতিবেদক আদর করে তার নাম দিয়েছে‘নাইট রাইডার’। এ যেন কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন। নইলে বলুন তো, সানি কি ইচ্ছে করে বাসি রাত কাটিয়েছেন। একজন আশ্রয়হীন মানুষ, যাকে সেখানে থাকার অনুমতি দেয়নি ব্রিটিশ সরকার, সে বাসে থাকবে না তো কি করবে! তবে সহজেই কোনো একটা আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিতে পারতেন। কিন্তু এসব আশ্রয়কেন্দ্র যে বড় অপছন্দ সানির।

সেইসব রাতে লন্ডনের ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় ধৈর্য নিয়ে অপেক্ষা করতেন সানি। মধ্যরাত পার হয়ে যায়, ক্লান্তিতে পা ধরে আসে। এসময় লন্ডনের বহুল পরিচিত লাল রঙের ডবল ডেকার বাসটি এগিয়ে আসে। দেখেই তার মুখে হাসি ফুটে। তাই বলে তিনি দ্রুত ফিয়ে বাসে উঠতেনন এমন নয়। বরং বাসস্টপে অপেক্ষমাণ অন্য যাত্রীদের আগে ওঠার সুযোগ দিতেন। এরপর বাসে উঠে নিজের ব্যাগটি জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়তেন। এরপর স্বপ্নে হয়তো নিজের দেশে থাকার বিবর্ণ দিনগুলো দেখতে পেতেন।

নাইজেরিয়ায় গণতন্ত্রের জন্য লড়েছিলেন তিনি। এই অপরাধে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড সাজা ঘোষণা করে স্থানীয় আদালত। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আগেই প্রচুর অর্থ ঘুষের বিনিময়ে তাকে ছাড়িয়ে আনেন তার পরিবার। এরপর সোজা লন্ডনে। এরপর যুক্তরাজ্যে বসবাসের জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করে আবেদন করেন সানি। কিন্তু সেই আবেদন বাতিল হওয়ার পর দুই দশক কেটে যায়। অথচ একদিন লন্ডনকে ঘিরে কত স্বপ্ন ছিলো তার। দ্বিতীয়বারের মতো বেঁচে থাকর সুযোগ পেয়ে তার মধ্যে এক ধরনের কৃতজ্ঞতাবোধ ছিল। ভেবেছিলেন যুক্তরাজ্যে নিরাপদ আশ্রয় মিলবে। তাই সেসময় তথ্যচিত্র তৈরির প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন সানি। ইচ্ছে ছিল লন্ডনের গৃহহীন মানুষদের নিয়ে তথ্যচিত্র বানাবেন। কিন্তু তখন তিনি কল্পনাও করেননি খুব শীঘ্রই লন্ডনের ভবঘুরেদের দলে ঠাঁই হবে তার।

কিন্তু রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন নাকচ হয়ে যাওয়ার পর সানির সামনে দুটো পথ খোলা ছিল। একটি হল সামরিক শাসকের অধীনে থাকা নাইজেরিয়ায় ফিরে যাওয়া যেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছে ফাঁসির দড়ি। অথবা আত্মগোপনে চলে যাওয়া। তিনি বেছে নেন যাযাবর জীবন। আর এই ভবঘুরে জীবনে এসেই বাসে থাকার খোঁজ পেয়ে যান সানি। অনুধাবন করেন, লন্ডনের রাস্তার চেয়ে বাসে চড়া অনেক আরামদায়ক এবং নিরাপদ।

লন্ডনের একজন ধর্মযাজিকা তাকে প্রথম একটি বাসে চড়ার মাসিক পাস কিনে দিয়েছিলেন। এরপর মাসের পর মাস তিনি এই সহায়তা চালিয়ে গেছেন। মাঝে মাঝে সেই ধর্মযাজিকার পরিচিতরাও তাকে বাসের পাস কিনে দিতেন। দিনের বেলায় সানি গির্জায় স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করতেন। মাঝে মাঝে দিনের বেলায় কাজ শেষ হয়ে গেলে চলে যেতেন লাইব্রেরিতে,বই আর খবরের কাগজ পড়ে সময় কাটাতেন।

বেশিরভাগ সময় রেস্টুরেন্টে কিছু খবার জুটিয়ে নিতেন। আর পয়সা না থাকলে উপোস। অনেক সময় ফ্রিতেও খাবার পেতেন সানি। এরপর রাত ৯টার মধ্যেই কোন একটা রাতের বাসে উঠে পড়তেন। কয়েক দিনের মধ্যেই বুঝে ফেললেন রাত কাটানোর জন্য কোন রুটের বাস সবচাইতে ভালো। জেনে গেলেন রুট ২৫শে উঠলে সারারাত ভালো ঘুমিয়ে কাটানো যায়।

অনেক দয়ালু বাস চালক বাসের ডিপোতে পৌঁছেও তাকে ঘুম থেকে উঠাতেন না। তার মতো আরও বেশ কয়েকজন গৃহহীন মানুষ নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে একইভাবে বাস ব্যবহার করেন। সানি তাদের ব্যাগ ওঠানামায় সহায়তা করতেন। যদিও তিনি নিজে সবসময় হালকা ব্যাগ বহন করেন। এর ফলে পশ্চিমা দেশগুলোতে গৃহহীনদের যে একটি চিরচেনা ইমেজ রয়েছে সেটি থেকে তাকে সহজেই আলাদা করা যায়।

বাসে অন্য যাত্রীদের বসতে যাতে অসুবিধা না হয় সে ব্যাপারে সচেতন ছিলেন সানি। ধীরে ধীরে বাসে কিভাবে ঘুমাতে হয় তার কায়দাকানুন শিখে যান তিনি। কোথায় বসলে বেশি আরাম পাওয়া যাবে সেটাও বুঝে গেলেন। তার মতে বাসের দোতালার চেয়ে নিচের তলায় বেশি আরাম। ভোর হলেই খিদেটা চাগিয়ে উঠতেই ম্যাকডোনাল্ডসে ঢুকে যান। সেখানকার কয়েকজন দয়ালু কর্মী তাকে টয়লেট ব্যবহার বা দাড়ি কামাতে দিতেন। তবে কখনো টাকার জন্য ভিক্ষা করেননি সানি।

বাসে থাকার বিষয়ে সানির যুক্তি হচ্ছে, আশ্রয়কেন্দ্রের চেঁচামেচি, গাদাগাদি করে ঘুমানো, সিগারেট, মদ ও মানুষের শরীরের গন্ধ তার ভাল লাগতো না। সে তুলনায় বাসের পরিবেশই বেশি আরামদায়ক। প্রতিদিন নিত্যনতুন মানুষের দিকে তাকিয়ে তাদের ভাষা ও উচ্চারণের বৈচিত্র্য, মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এগুলো সম্পর্কে শিখেছেন তিনি।

তবে শীতকালে সানির দৈনন্দিন জীবন কিছুটা ব্যতিক্রম ঘটে। গৃহহীনদের জন্য শহরের বিভিন্ন গির্জার পরিচালিত আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যেতেন তিনি। শীতকালগুলো সেখানেই কাটতো তার।

ব্রিটেনে ২০১৬ সালে ব্রেক্সিট গণভোটের পর অভিবাসীদের প্রতি বর্ণবৈষম্যমূলক আচরণ বেড়ে যায় বলে মনে করেন সানি। তখন তাকে প্রায়ই ‘নিজের দেশে ফিরে যাও’জাতীয় এমন বাক্য শুনতে হতো। তবে এজন্য তিনি ব্রিটিশ সরকারকে দোষ দেন না। নিজের এই দুর্দশার জন্য নিজের দেশ নাইজরিয়া সরকারকেই দায়ী করেন তিনি।

এক পর্যায়ে প্যারিসের নটরডেম ক্যাথেড্রালের হয়ে কাজ করে এরকম একদল আইনজীবী তার সহায়তায় এগিয়ে আসে। ব্রিটেনে একটানা ২০ বছর বাস করার কারণে আইনগতভাবে তিনি সেখানে থেকে যাওয়ার উপযুক্ত সেই যুক্তি তুলে ধরে তারা তার জন্য ব্রিটেনে থাকার আবেদন করেন। কিন্তু ২০ বছর ধরে বাসের রাত কাটানোর ফলে গৃহহীন সানির কাছে সেটি প্রমাণ করার কোন উপযুক্ত কাগজপত্র ছিল না। অবৈধভাবে বসবাসের জন্য তাকে সবসময় কর্তৃপক্ষের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে হয়েছে।

ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দফতর তার আবেদনের জবাবে জানিয়েছিল, কোন ধরনের বিদ্যুৎ বিল, বাড়ি ভাড়ার কাগজ বা ব্যাংকের হিসেব তার নেই। এরকম কাগজপত্র তার দরকার হবে। সানি তার সবচেয়ে পছন্দের বাস চালককে একটি চিঠি দিতে অনুরোধ করেছিলেন।

তখন লন্ডনের কয়েকটি গির্জা ব্রিটেনে তার বসবাসের ব্যাপারে কাগজপত্র দিয়ে সহায়তা করার চেষ্টা করে। লন্ডনে সানির বসবাসের ছবি সংগ্রহ করে সহায়তা করার চেষ্টা করেছিল তারা।

কিন্তু ইদানীং সানি নিজেই ছবি তুলছেন। সেগুলো অবশ্য মূলত রাতের বাসের খালি আসন। তথ্যচিত্র বানানোর যে প্রশিক্ষণ তিনি নিয়েছেন সেটি কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। তার মতো মানুষদের গল্প বলার জন্য।

২০১৭ সালে ৫৫ বছর বয়সে শেষ পর্যন্ত তাকে ব্রিটেনে বসবাসের অনুমতি পান সানি। কিন্তু বাসে রাত কাটানোর সেই অভ্যাস কিন্তু এখনও যায়নি তার। ফলে এখনও মন চাইলেই লন্ডনের কোনো ডবলডেকারে চেপে বসেন। যদিও তার কোথাও যাওয়ার নেই। তিনি এমনিতেই ঘুরে বেড়ান। আর আলো ঝলমল রাতের লন্ডন দেখেন। গত দুই দশক ধরে লন্ডনের এইসব বাসগুলোই যে ছিলো তার ঠিকানা। সেই কথা এত সহজে বিস্মৃত হন কীভাবে, লন্ডনের ‘রাইড রাইডার’সানি।

ফটোগ্রাফির নেশা তার রক্তে

এমএ/

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত