ঢাকা, মঙ্গলবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২০, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ আপডেট : ২৭ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২০, ১৬:২২

প্রিন্ট

বাঘ সংগ্রহে ওয়াইল্ড টিম

বাঘ সংগ্রহে ওয়াইল্ড টিম
ফিচার ডেস্ক

শুরুটা হয়েছিল ২০০৩ সালে। ইউএনবি বাংলাদেশের এমডি এনায়েতুল্লাহ খানের হাত ধরে। তিনি চিন্তা করেছিলেন বন এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্যে কিছু কাজ করবেন। একটা প্রতিষ্ঠান করবেন।

এনায়েতুল্লাহ খান খবর দিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. আনোয়ারুল ইসলামকে। নিজের পরিকল্পনার কথা বললেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির সাবেক অধ্যাপক হারুনুর রশিদকে। তারও বন ও বন্যপ্রাণী বিষয়ে আগ্রহ আছে।

তিনজন একসাথে বসেন দুপুরের খাবার খেতে। অধ্যাপক মো. আনোয়ারুল ইসলাম নিজেও ভেবেছিলেন এরকম একটা প্রতিষ্ঠানের কথা। প্রফেসর হারুনুর রশিদেরও টান আছে এই বিষয়ে। তিনি লেখালেখি করেন বন এবং বন্যপ্রাণী নিয়ে। এনায়েতউল্লাহ খান যোগাযোগ করেন তার কিছু ভারতীয় বন্ধুদের সাথে। তারাও কাজ করে থাকেন ভারতের বন এবং বন্যপ্রাণী নিয়ে।

প্রতিষ্ঠা হলো ওয়াইল্ড টিম। প্রথমে নির্দিষ্ট কোন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের কথা ভাবেননি তারা। যতটুকু সাধ্যের ভিতরে ছিল ততটুকু নিয়েই কাজ শুরু করতে চাচ্ছিলেন।

বাঘ ছাড়াও ভাল্লুক, উল্লুক, কয়েক প্রজাতির পাখিসহ নানান ধরনের গবেষণা করছে ওয়াইল্ডটিম। কিন্তু ওয়াইল্ড টিম কাজ করছে সুন্দরবনের বাঘ নিয়ে এবং সেখানকার অন্যান্য প্রাণী নিয়ে। আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণ করলেই সমস্ত প্রাণী সংরক্ষণ করা সম্ভব। তাই আলাদাভাবে অন্যান্য প্রাণী সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই'।

কিভাবে? সেটাও ব্যাখ্যা করেন তিনি। হরিণ বাঘের খাবার। তাই হরিণ হত্যা করলে বাঘ সংকটে পরবে। এজন্য হরিণ হত্যা করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের কাজটা করতে হবে মানুষের ভালোর জন্যেই। তাই ওয়াইল্ডটিম ঠিক করল সুন্দরবনের আশি শতাংশ গ্রামের মানুষের সাথে তারা যোগাযোগ স্থাপন করবেন। এই আশি শতাংশ এলাকার মানুষের সাথে যোগাযোগ করে ওয়াইল্ডটিম গঠন করল ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিম (ভিটিআরটি)।

সুন্দরবনের সব বাঘই কিন্তু মানুষখেকো না। বাঘ বনের ভিতর শিকার না পেলে অনেক সময় লোকালয়ে ঢুকে পরে গরু-ছাগল মেরে খাওয়ার চেষ্টা করে। তখন বাঘের হাতে মানুষ নিহত হয়। তারপরে মানুষের হাটে বাঘ। সুন্দরবনে অনেকে মধু, গোলপাতা ইত্যাদি সংগ্রহে যায়। অনেক সময় তখনো বাঘের খপ্পরে মানুষের প্রাণ যায়।

গ্রামের মানুষ বাঘের পাল্লায় পড়লে তাৎক্ষণিকভাবে সহায়তা দেয়ার চেষ্টা করে থাকে এই ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিম বা ভিটিআরটি। ওয়াইল্ডটিমের ভিটিআরটির হট লাইনে যোগাযোগ করলে তারা এই সহায়তা প্রদান করে থাকেন। ২০০৭ থেকে বন বিভাগের সাথের যৌথভাবে এই সহায়তা দিয়ে আসছে ভিটিআরটি।

কোনোভাবে দ্বারা এলাকাবাসী হুমকির সম্মুখীন হলে বাঘকে অচেতন করে বনবিভাগের হাতে তুলে দেয়া হয়। এইরকম কাজ করে থাকে ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিম বা ভিটিআরটি। এছাড়া ভিটিআরটি টিম বনের পশু পাখি রক্ষা বিষয়ক আইন সম্পর্কে এলাকাবাসীদের সচেতন করে আসছে। এই দলটি বনের ভিতরের বাঘের খপ্পরে পরা মানুষদেরও সাহায্য করে থাকে। এই সহায়তা সপ্তাহের যেকোনো দিন পাওয়া যায়। সাহায্য করার জন্যে নদীতে নৌকা নিয়ে প্রস্তুত থাকে ভিটিআরটি।

সুন্দরবনের আশেপাশে যারা বাস করে, তাদের জীবনযাত্রাও কিন্তু পরিবেশের উপর প্রভাব ফেলছে। এজন্য ওয়াইল্ডটিম তিনটি গ্রামকে মডেল ভিলেজ ধরে সেখানে পাঁচশ পরিবারকে পরিবেশ বান্ধব উন্নত চুলা প্রদান করেছে। যাতে করে গ্রামবাসীদের জ্বালানীর জন্যে বনে যেতে না হয়। এছাড়া পরিবারগুলোকে প্রদান করা হয়েছে সোলার লাইট। বাঘ নিশাচর প্রাণী, আলো পছন্দ করে না ফলে বাঘ থেকে একটু হলেও সুরক্ষা পাওয়া যাবে।

৬০ জন বাঘবন্ধু বা টাইগার স্কাউট এবং অন্যান্য মানুষেরাই এই ব্যাপারগুলোর দেখাশোনা করে থাকেন। প্রতি বছর কর্মশালা আয়োজন করা হয়ে থাকে এবং সেখানে বাঘ এবং অন্যান্য প্রাণী নিয়ে আলোচনা করা হয়। এছাড়া এই মডেল ভিলেজ গুলোতে গঠন করা হয়েছে পাঠাগার। ২০১২ সালে 'সুন্দরবন মায়ের মতন' এই স্লোগানে একটি প্রচারাভিযান করে ওয়াইল্ড টিম। স্থানীয় মানুষদের বাঘসহ অন্যান্য বন্য প্রাণী সম্পর্কে সচেতন করাই ছিল এই প্রচারাভিযানের লক্ষ্য।

ড. আনোয়ারুল ইসলাম আরো বলেন, আমরা সুন্দরবনের আশে পাশের কিছু অঞ্চল নিয়ে গবেষণা করে দেখেছি যে সুন্দরবনে প্রতি বছর মাত্রাতিরিক্ত আকারে হরিণ মারা পরে। ফলে বাঘ খাবারের সন্ধানে ঢুকে পড়ছে গ্রামের ভিতর। গত বছর জুলাই মাসে শেষ হওয়া 'বাঘ' প্রকল্পরে কথাও বললেন তিনি। সাড়ে চার বছর ধরে চলা এই প্রকল্পে বাঘ সংগ্রহে নানা ধরনের কাজ চালায় ওয়াইল্ড টিম। যার অর্থায়নে ছিল ইউএসএআইডি। এছাড়া মংলার পাশে চারপাই নামক এলাকায় গবেষণাকেন্দ্র গড়ে তুলেছে ওয়াইল্ড টিম।

বাঘবন্ধু, ভিটিআরটি, টাইগার স্কাউট দের ট্রেনিং দেয়ার পাশাপাশি নানা ধরণের বাঘ এবং প্রাণী নিয়ে গবেষণামূলক কাজ করা হয় এখানে। এছাড়া সুন্দরবনে পর্যটকদের জন্যে ইনফরমেশন সেন্টারের কথা ভাবছে ওয়াইল্ডটিম।

বাঘের প্রজনন বৃদ্ধি এবং বাঘ নিধন বন্ধে কাজ করে যাচ্ছে ওয়াইল্ডটিম। যার ফলে ওয়াইল্ড টিম ২০১১ সালে বঙ্গবন্ধু ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন পদক পায়।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত