ঢাকা, বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৩ ফাল্গুন ১৪২৬ আপডেট : ২ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০৯:৪৮

প্রিন্ট

যেভাবে বিশ্বকে হুমকিতে ফেলছে চীন ও করোনা

যেভাবে বিশ্বকে হুমকিতে ফেলছে চীন ও করোনা
অনলাইন ডেস্ক

চীনে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসে মৃতের সংখ্যা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। প্রতিদিনই মৃত্যুর নতুন নতুন রেকর্ড তৈরি করছে এই ভাইরাসটি। বুধবার একদিনে ২৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে দেশটিতে। সেখানে এই ভাইরাসে একদিনে এখন পর্যন্ত এটিই সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা। আর এদের মধ্যে ২৪২ জনই হুবেই প্রদেশের বাসিন্দা। এর ফলে বিশ্বব্যাপী মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ালো ১৩৫৭ জনে।

এদের মধ্যে সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে করোনা সম্পর্কে আগাম তথ্য দেয়া চীনা চিকিৎসক লি ওয়েনলিয়াংয়ের মৃত্যু।

চীনে করোনা ছড়িয়ে পড়ার আগেই পাঁচ সপ্তাহ আগেই ড. লিকে উহানে তার হাসপাতালে নতুন ভাইরাস নিয়ে সহকর্মীদের সতর্ক করেছিলেন। যে কারণে তাকে শাস্তি দিয়েছিলো পুলিশ। পরে তিনি নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশটিতে জাতীয় শোক আর ক্ষোভের পরিস্থিতি তৈরি হয়।

করোনাভাইরাস নিয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য জানা নেই। বলা হচ্ছে মানুষের শরীরের আসার আগে এটি প্রাণীতে ছিলো। তবে এই ধারণাটি সম্পর্কেও নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হয়নি। উহানের বাজারে যেখানে বন্যপ্রাণীর বেচাকেনা হতো সেখান থেকেই নাকি এই ভাইরাসের উৎপত্তি। এর বাইরে বিজ্ঞানীরা উৎস থেকে মহামারি ঘটানো পর্যন্ত গোটা প্রক্রিয়া সম্পর্কে অল্পই বলতে পারছেন। তবে রোগটির উৎস চিহ্নিত করা নিয়ে এখন ব্যাপক কাজ করছেন তারা। তারপরেও একটি বিষয় সন্দেহের বাইরে।

আবিষ্কারের এক মাসের মধ্যেই পুরো চীনা সমাজ ব্যবস্থা ও রাজনীতিকে বড় ধরণের ঝাঁকুনি দিয়েছে করোনাভাইরাস।

ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এক ভাইরাস ইতোমধ্যেই তৈরি করেছে চরম বিপর্যয়, কেড়ে দিয়েছে হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ, ক্ষতি করে ফেলেছে বিলিয়ন ডলারের। গোটা উহান শহর বন্ধ হয়ে গেছে এবং প্রায় সেখানকার ৭ কোটি মানুষ বাসায় কোয়োরেন্টিন বা বন্দি হয়ে আছে। গণপরিবহন বন্ধ এবং কারও বাড়ির বাইরে যাবারও অনুমতি নেই বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া। এটা এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্বরূপ উন্মোচন করেছে যেভাবে সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যাপক এবং চরম ক্ষোভের সময় সেন্সরশিপ কাজ করে।

এখন এর পরিণতি কি সেটি কারও জানা নেই। তারা কি মহামারিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবে এবং পারলে তাতে কতটা সময় লাগবে?

বিশ্বজুড়ে কেউই নিশ্চিত না যে কিভাবে নিজ দেশে অল্প কয়েকজন আক্রান্ত হওয়ার পর কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিলো। মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে আতঙ্ক। তবে প্রমাণ বলছে যে শুরুর দিকে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে সঠিক পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

শুরুর দিকে ধারণা করা হয়েছিলো যে নতুন ভাইরাস প্রাণঘাতী কোনো ফ্লু। তবে এখন বলা হচ্ছে এটি আরও মারাত্মক এবং যারা সংক্রমিত হবে তাদের অন্তত এক শতাংশ প্রাণ হারাতে পারে। তবে ঝুঁকিটা বেশি আসলে বয়স্কদের জন্য এবং যারা অসুস্থ তাদের জন্য। কিন্তু এই মহামারিকে কেন্দ্র করে চীনের অভিজ্ঞতায় দুটি বিষয় বেরিয়ে এসেছে।

প্রথমত, স্বাস্থ্য সেবার ভয়ংকর অবস্থা যেখানে জনসংখ্যার বিরাট একটি অংশ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আশংকা আছে।

উহানে কয়েকদিনের মধ্যে নতুন দুটি হাসপাতাল করা হয়েছে আবার বড় স্টেডিয়াম ও হোটেলকে বানানো হয়েছে কোয়ারেন্টিন জোন।

কিন্তু এসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও বহু মানুষ চিকিৎসা পেতে সংগ্রাম করছে, ফলে ঘরেই মারা যাচ্ছে অনেকে। এমনকি মৃতদের অনেকে তালিকার বাইরেই থেকে যাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, এ ঘটনায় বেরিয়ে এসেছে যে যেকোনো নতুন ভাইরাসকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

এজন্য বিশেষজ্ঞরা মনে করে স্বচ্ছতা ও আস্থার ভিত্তিতে কাজ করতে হবে বিশেষ করে মানুষকে সঠিক তথ্য জানানো ও সময়মত সরকারের ব্যবস্থা নেয়া।

কিন্তু একটি কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থায় যেখানে কড়া সেন্সরশিপ কাজ করে ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাই সবকিছুর ঊর্ধ্বে।

চীন যে পদক্ষেপ নিয়েছে সেটি অনেকটা আতঙ্কের মতো- যেখানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কোয়ারেন্টিন এবং নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা। কিন্তু প্রাথমিকভাবে যেসব পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজনীয় ছিলো সেগুলো আসলে জটিলতায় পড়েছে।

বহু প্রমাণ আছে যে কিভাবে কর্তৃপক্ষ সতর্কতাগুলোকে এড়িয়ে গেছে।

ডিসেম্বরের শেষ দিকে উহানের একনজর স্বাস্থ্যকর্মী নিউমোনিয়ার একটি অস্বাভাবিক লক্ষ্মণ দেখতে পান যেগুলো উহানের বণ‍্যপ্রানীর বাজারের সাথে সম্পর্কিত ছিলো। গত ৩০শে ডিসেম্বর ড. লি ওয়েনলিয়াং একটি প্রাইভেট মেডিকেল চ্যাট গ্রুপে তার উদ্বেগগুলো শেয়ারে করেছিলেন। তার সহকর্মীদের নিজেদের সুরক্ষার পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। ওই চিকিৎসক সাতটি রোগী পেয়েছিলেন যাদের লক্ষ্মণগুলোর সাথে সার্সে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষ্মণে মিল ছিলো।

কয়েকদিন পর পুলিশ তাকে ডেকে নিয়ে এসব ‘গুজব’না ছড়ানোর নির্দেশ দেন এবং তাকে চরমভাবে হুঁশিয়ারও করে দেয়া হয়। এখন সেই বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর নানা কথা হচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন তখন চিকিৎসক লি ওয়েনলিয়াংয়ের সতর্কতাকে গুরুত্ব দিলে হয়তো করোনার বিস্তার রোধ করা সম্ভব হতো। কেবল লি নয়, উহানে আটজনের বিরুদ্ধে 'গুজব ছড়ানোর' অভিযোগ তদন্ত হচ্ছে।

যদিও ড. লি তার মেসেজ পোস্ট করার পরদিন চীন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে জানায় এবং এর একদিন পর সন্দেহজনক বাজারটি বন্ধ করে দেয়।

অথচ কয়েকটি ঘটনার পরেও এবং মানুষ থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমিত হওয়ার পরেও কর্তৃপক্ষ মানুষকে সুরক্ষা তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। চিকিৎসকরা এর মধ্যেই কোয়ারেন্টিন কক্ষ তৈরি করেছেন এবং আরও রোগী আশংকা করছিলেন অথচ উহানে তখন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সমাবেশ ছিলো। সেখানে কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা ভাইরাসটির কথা উল্লেখই করেননি।

দেশটির ন্যাশনাল হেলথ কমিশন বারবার বলছিলো সংক্রমণের ঘটনা সীমিত এবং মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হওয়ার প্রমাণ নেই। ১৮ জানুয়ারি উহান কর্তৃপক্ষ বড় কমিউনিটি সমাবেশের আয়োজন করে যেখানে প্রায় ৪০ হাজার পরিবার ছিলো। সেখানে রেকর্ড পরিমাণ খাবার সরবরাহ করা হয়। দুদিন পরেই চীন নিশ্চিত করে যে ভাইরাসটি মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ ঘটাচ্ছে।

পরদিন চীনের নতুন চান্দ্রবর্ষের নৃত্য পরিবেশনায় অংশ নিয়েছিলেন হুবেই প্রদেশের সিনিয়র কর্মকর্তাদের অনেকে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এ নিয়ে রিপোর্ট হয়েছে যদিও পরে তা ডিলিট করতে হয়েছে। তবে ওই রিপোর্টেই বলা হয়েছে যে অনেককেই অসুস্থ লাগছিলো।

পরে ২৩ জানুয়ারি যখন উহান শহরটি বন্ধ করা হলো ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। মহামারি তখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে। নতুন বছর উপলক্ষে বাড়ি বা অন্যত্র যেতে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ শহর ছাড়ে, পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়।

লি ওয়েনলিয়াং কাজে ফিরেছিলেন পরে এবং বুঝতে পারেন যে তিনি নিজেও সংক্রমিত হয়েছেন। পরে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও পাঁচ বছর বয়সী সন্তানকে রেখে চলতি মাসের গোড়ার দিকেই তিনি মারা যান। এমনিতেই সময়মত সতর্ক করতে কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতায় ক্ষোভ চরমে উঠেছিলো।

এর মধ্যে উহানের রাজনীতিকরা সরকারি কর্মকর্তাদের দায়ী করতে শুরু করেন এবং পাল্টা অভিযোগ আসে কর্মকর্তাদের দিক থেকে। কিন্তু ওই চিকিৎসকের মৃত্যু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়, যিনি তার সহকর্মীদের রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। তাদের ক্ষোভের লক্ষ্য ছিলো সামগ্রিক ব্যবস্থা। ক্ষোভ এমন পর্যায়ে যায় যে চীন দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বেইজিং সরকার ভেবে পাচ্ছিলো না কোনটি সেন্সর করবে আর কোনটি রাখবে।

এদিকে জনগণের আবেগ দেখে পার্টিও ড. লি'র প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শুরু করে এবং তাকে জাতীয় বীর হিসেবে আখ্যায়িত করে। চীনের শাসকগোষ্ঠী, যাদের কখনো ব্যালটের মুখোমুখি হতে হয়না, তাদের মধ্যে ক্ষমতা হারানোর একটি পুরনো ভয় কাজ করতে শুরু করেছে।

যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও রোগ রাজতন্ত্রকে একটা ঝাঁকুনি দেয়। কেননা কারণ অদৃশ্য সংকটের বিপদের একটি ঐতিহাসিক দিকও আছে। তারা জানে চেরনোবিল কি পরিণতি নিয়ে এসেছিলো সোভিয়েত ইউনিয়নের শাসক কমিউনিস্ট পার্টির জন্য।

তবে এটা ঠিক চীনে করোনা নিয়ে সচেতনতা আগের চেয়ে বেড়েছে এবং এতে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভূমিকা রয়েছে।

চলতি সপ্তাহে তিনি বৈঠক করেছেন করেছেন স্বাস্থ্য কর্মীদের সাথে, যারা নতুন ভাইরাস মোকাবেলায় কাজ করছেন। তিনি হাসপাতাল ও বেইজিংয়ের ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রেও গেছেন। অন্যদিকে তার প্রধানমন্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের উহানে পাঠিয়েছেন ও স্পেশাল ওয়ার্কিং গ্রুপ করে তার প্রধানকে নিয়োগ দিয়েছেন এই মহামারি মোকাবেলায়।

চীনা রাজনীতি বিশেষজ্ঞ জুডে ব্লানচেট বলছেন, ‘প্রেসিডেন্ট নিশ্চিতভাবে উদ্বিগ্ন এবং সেটা তার চেহারায় ফুটে উঠেছে।’ যদিও সেন্সরশিপ আরও প্রবল হয়েছে। বিশেষ করে অনলাইন মিডিয়ায় ওপর আরও নিয়ন্ত্রণের আদেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট শি।

চীনা চিকিৎসক লি ওয়েনলিয়াং

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এমএ/

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত