ঢাকা, শুক্রবার, ০৫ মার্চ ২০২১, ২০ ফাল্গুন ১৪২৭ আপডেট : ৩০ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৮:৩৮

প্রিন্ট

মিয়ানমারের ৭৩ বছর

মিয়ানমারের ৭৩ বছর
অং সান সু চি

জার্নাল ডেস্ক

১৯৪৮ সালে ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতার পর থেকেই বেশির ভাগ সময় সেনাশাসন চলেছে মিয়ানমারে। ১৯৬২ সালে বেসামরিক প্রশাসন বাতিল করেন জেনারেল নি উইন। সরকার পরিচালনার জন্য বেসামরিক প্রশাসন যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। পরের ২৬ বছর সরকার পরিচালনা করেন নি উইন। ১৯৮৮ সালে অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের প্রতিবাদে ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করেন তিনি। এর কয়েক সপ্তাহ পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনরুদ্ধারের কথা বলে সামরিক নেতাদের নতুন একটি দল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।

২০১১ সালে জান্তা সরকারের নেতা জেনারেল থান সুয়ে পদত্যাগ করেন। দেশের সংবিধান মেনে অবসরপ্রাপ্ত জেনারেলদের সমন্বয়ে গঠিত সরকারের কাছে তিনি ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। সর্বশেষ অং সান সু চি ও তার সরকারের সঙ্গে কয়েক সপ্তাহ ধরেই উত্তেজনা চলছিল মিয়ানমার সেনাবাহিনীর। এরই মধ্যেই সোমবার (১ ফেব্রুয়ারি) ক্ষমতা দখল করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। মিয়ানমারের পার্লামেন্টে প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল এদিন। কিন্তু সু চি, মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট ও অন্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের আটক করে সেনাবাহিনী। মিয়ানমারের সেনা অভ্যুত্থান ও অং সান সু চিসহ বেসামরিক নেতাদের আটকের খবরে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।

চলুন এক নজরে দেখে নেই মিয়ানমারের ১৯৪৮ থেকে ২০২১ সালের কিছু সংক্ষিপ্ত ইতিহাস:

১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ব্রিটিশ উপনিবেশ মিয়ানমারে (তৎকালীন বার্মা) অভিযান চালায় জাপান। জাপানে প্রশিক্ষিত বার্মা ইন্ডিপেনডেন্ট আর্মির সহায়তায় দেশটি দখল করে নেয় তারা। বার্মা ইন্ডিপেনডেন্ট আর্মি পরবর্তীতে অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট পিপলস ফ্রিডম লীগে (এএফপিএফএল) রূপান্তরিত হয় এবং মিয়ানমারে জাপানি শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

১৯৪৫ সালে অং সানের নেতৃত্বাধীন এএফপিএফএল’র সহায়তায় জাপানি দখলদারিত্ব থেকে মিয়ানমারকে মুক্ত করে ব্রিটেন। এর দুই বছর পর মিয়ানমারের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অং সান ও ছয় সদস্যকে হত্যা করে অং সানের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী উ স’র নেতৃত্বাধীন বিরোধীরা। জাপানি দখলদারিত্বের সময় মিয়ানমারের বা মও সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উ নু’কে এএফপিএফএল ও দেশটির সরকার প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

১৯৪৮ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উ নু ক্ষমতায় থাকাকালে মিয়ানমার স্বাধীনতা লাভ করে।

১৯৫৮ সালে ক্ষমতাসীন এএফপিএফএল-এ ভাঙন দেখা দিলে চিফ অব স্টাফ জেনারেল নে উইন এএফপিএফএল সরকারকে সরিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করেন।

১৯৬০ সালের নির্বাচনে এএফপিএফএল’র উ নু’র নেতৃত্বাধীন অংশ জয়ী হলে তার রাজনৈতিক নীতিমালা সেনাবাহিনীকে ক্ষুব্ধ করে।

১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উ নু’র সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। সেসময় তিনি মিয়ানমারের ফেডারেল ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে ‘নিজস্ব ঘরানার সমাজতন্ত্র’ চালু করেন। পাশাপাশি তিনি অর্থনীতিকে জাতীয়করণ ও সোশ্যালিস্ট প্রোগ্রাম পার্টি নামে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করেন। জেনারেল উইন দেশটিতে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমও নিষিদ্ধ করেন।

১৯৭৪ সালে দেশটিতে নতুন সংবিধান চালু হয়। সশস্ত্র বাহিনীর হাত থেকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা জেনারেল নে উইন ও অন্যান্য সাবেক সামরিক নেতাদের পরিচালিত পিপলস অ্যাসেম্বলির কাছে হস্তান্তর করা হয়।

১৯৮১ সালে জেনারেল নে উইন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল সান ইউয়ের কাছে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ছেড়ে দেন। তবে তিনি সোশ্যালিস্ট প্রোগ্রাম পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন।

১৯৮৭ সালে মিয়ানমারে মুদ্রার অবমূল্যায়ন করা হলে দেশটির জনগণ সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু করে। সেসময় সামরিক সরকারের হাতে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী নিহত হন। ১৯৮৮ সালে সরকার দ্য স্টেট ল অ্যান্ড অর্ডার রেস্টোরেশন কাউন্সিল (এসএলওআরসি) গঠন করে।

১৯৮৯ সালে মিয়ানমারে সামরিক আইন জারি করা হয়। সেসময় বার্মার নাম আনুষ্ঠানিকভাবে মিয়ানমার রাখার পাশাপাশি গণতন্ত্র ও মানবাধিকারপন্থি কয়েক হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা অং সানের মেয়ে ও এনএলডি নেতা অং সান সু চিকে গৃহবন্দি করা হয়।

১৯৯০ সালে বিশ্বব্যাপী সমাজতন্ত্রের পতনের পর মিয়ানমারে সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করা হয়। বিরোধী এনএলডি নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হলে সেনাবাহিনী সে ফল উপেক্ষা করে।

মিয়ানমারে শান্তিপূর্ণ উপায়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলন চালানোয় ১৯৯১ সালে সু চিকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।

১৯৯২ সালে সামরিক বাহিনীর থান সুয়ে এসএলওআরসি’র চেয়ারম্যান, প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে জেনারেল স মাউংকে ক্ষমতায় বসান।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে ও দীর্ঘদিন পশ্চিমের দেশগুলোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় থাকা মিয়ানমার সরকার ১৯৯৫ সালে অং সান সু চিকে ছয় বছর গৃহবন্দি রাখার পর মুক্তি দেয়। এর পরের বছর সু চি তার দলের প্রথম কংগ্রেসে যোগ দিলে সামরিক সরকার ২০০ জনের বেশি নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করে।

২০০০ সালে মিয়ানমারের ওপর ইউরোপ অবরোধ কঠোর করলে সামরিক জান্তা সু চিকে আবারও আটক করে। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে এর দুই বছর পর তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় সরকার। সেসময় সু চির দেশের বাইরে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞাও তুলে নেওয়া হয়।

সু চির গাড়িবহরে হামলার পর নিরাপত্তার কথা বলে তাকে আবারও গ্রেপ্তার করা হয় ২০০৩ সালে। বার্মা ক্যাম্পেইন ইউকে’র তথ্য মতে, সে বছরের মে মাসে সেনা সমর্থিত রাজনৈতিক মিলিশিয়া ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (ইউএসডিএ) সমর্থকদের হামলায় সু চির ৭০ জনের বেশি সমর্থক নিহত হন।

ইউএসডিএ পরবর্তীতে ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) নাম ধারণ করে। এই দলটিই সেনাবাহিনীর দল হিসেবে পরিচিত।

সামরিক সরকার জ্বালানি তেলের ওপর ভর্তুকি তুলে নিলে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ হয় ২০০৭ সালে। সেসময় সামরিক অভিযানে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী নিহত হন।

২০০৮ সালে মিয়ানমারে সামুদ্রিক ঝড় নার্গিস আঘাত হানলে এর দুই দিন পর দেশটিতে গণভোটের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শুরু হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সঙ্গে ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে আলোচনার পরিকল্পনা করলে পরের মাসে সু চি সামরিক জান্তার সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। সেসময় তাকে বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে আলোচনা করারও অনুমতি দেয় সরকার।

সামরিক সরকার ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে এনএলডি’র ভাইস প্রেসিডেন্ট তিন উ’কে এক দশকের বেশি সময় কারাবন্দির পর মুক্তি দেয়। সে বছরের মার্চে সরকার দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নির্বাচন আইন পাশ করে। এনএলডি’র একটি অংশ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পক্ষে মত দেয়।

দীর্ঘ ২০ বছর পর নভেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সেনা-সমর্থিত ইউএসডিপি বিজয় দাবি করে। বিরোধীরা সেই নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ তোলে।

সরকার নির্বাচনটিকে সামরিক শাসন থেকে বেসামরিক শাসনে যাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করে।

নির্বাচনের এক সপ্তাহ পর সামরিক জান্তা সু চিকে বন্দিদশা থেকে মুক্তি দেয়।

২০১১ সালের মার্চে থিয়েন সেইন দেশটির নতুন ও বেসামরিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। সে বছরের আগস্টে তিনি সু চির সঙ্গে দেখা করেন। অক্টোবরে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে মুক্তি দেওয়া হয়। নভেম্বরে সু চি ঘোষণা দেন তিনি পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী।

২০১২ সালের এপ্রিলে পার্লামেন্টের উপ-নির্বাচনে সু চিসহ এনএলডির প্রার্থীরা জয় লাভ করেন। সেসময় ইউরোপীয় ইউনিয়ন এক বছরের জন্য মিয়ানমারের ওপর থেকে সব বেসামরিক অবরোধ তুলে নেয়।

২০১৩ সালের এপ্রিলে পাঁচটি বেসরকারি দৈনিক পত্রিকার অনুমতি দেয় মিয়ানমার সরকার। প্রায় ৫০ বছর পর দেশটিতে বেসরকারি পত্রিকা অনুমতি পায়।

২০১৪ সালের অক্টোবরে সরকার ঘোষণা দেয় যে, ২০১৫ সালের শেষের দিকে মিয়ানমারে পার্লামেন্টারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেসময় সরকার ৩ হাজার বন্দিকে মুক্তি দেওয়ারও ঘোষণা দেয়।

২০১৫ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনে সু চির নেতৃত্বাধীন বিরোধী এনএলডি সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে জয় পায়।

২০১৬ সালের মার্চে হতিন কিয়াও প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিলে দেশটিতে নতুন যুগের সূচনা হয়। প্রায় ৫০ বছরের সেনা আধিপত্যের পর সু চির গণতান্ত্রিক আন্দোলন রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রভাব ফেলে।

প্রথম মুক্ত নির্বাচনের চার বছর পর ২০২০ সালের নভেম্বরে আবার পার্লামেন্টারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে ৪১২ আসনের মধ্যে ৩৪৬টিতে বিজয়ী হয় ক্ষমতাসীন এনএলডি এবং সেনা-সমর্থিত ইউএসডিপি জিতেছিল ৩৩ আসন।

নির্বাচনে ভরাডুবির পর দেশটির সামরিক বাহিনী ‘কারচুপি’র অভিযোগ তোলে। সেসময় থেকে সেনাবাহিনী ও বেসামরিক সরকারের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাড়তে থাকে। তখন থেকে সেনা অভ্যুত্থানের গুঞ্জন ওঠে। অবশেষে সেই গুঞ্জন বাস্তবে পরিণত হয় আজ। সূত্র: বিবিসি

বাংলাদেশ জার্নাল/এইচকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত