ঢাকা, বুধবার, ২৬ জুন ২০১৯, ১২ আষাঢ় ১৪২৬ অাপডেট : কিছুক্ষণ আগে English

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৯, ১৫:৩৬

প্রিন্ট

ইতিহাসের দীর্ঘতম শাট ডাউনে যুক্তরাষ্ট্র, উত্তরণ অনিশ্চিত

ইতিহাসের দীর্ঘতম শাট ডাউনে যুক্তরাষ্ট্র, উত্তরণ অনিশ্চিত
অনলাইন ডেস্ক

মেক্সিকো সীমান্তে দেয়ালের নির্মাণের বরাদ্দ নিয়ে ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্যদের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মত বিরোধের জেরে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের শাট ডাউন বা অচলাবস্থা অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে গেছে। গত ২১ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই অচলাবস্থা শুক্রবার মাঝরাতে ২২ দিন অতিক্রম করেছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একগুয়েমির কারণে এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের কোনো সম্ভবনাই দেখা যাচ্ছে না। দেয়াল নির্মাণে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না পেলে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছেন ট্রাম্প।

যদিও সম্প্রতি এক জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, ৬৯ ভাগ আমেরিকান এই প্রাচীর নির্মাণকে অত্যাবশ্যকীয় মনে করছেন না। আর এই অচলাবস্থার জন্য প্রেসিডেন্টকেই দুষছেন সে দেশের লোকজন।

ক্ষুব্ধ শ্রমিকদের বিক্ষোভ

শাট ডাউনের কারণে গত ২২ দিন ধরে বেতন পাচ্ছেন না যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের এক-চতুর্থাংশ বিভাগ ও সংস্থার আট লাখের বেশি কর্মী । এসব কর্মীদের অর্ধেক এখনো কাজে আসছেন।

কারারক্ষী, বিমানবন্দরকর্মী এবং এফবিআই এজেন্টসহ আরও অনেকগুলো সরকারি সংস্থার কর্মীরা শুক্রবার তাদের নতুন বছরের প্রথম বেতন পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এ নিয়ে বিক্ষুব্ধ কর্মীরা সড়কে নেমে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করেছেন। এদিন অনেক সরকারি কর্মী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের খালি ‘পে স্লিপ’র ছবি পোস্ট করেছেন।

এমন একজন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা’র মহাকাশ প্রকৌশলী অস্কার মুরিলো। তিনি টুইটারে তার শূন্য মার্কিন ডলারের চেক পোস্ট করেন লেখেন, ‘আসলে বাধ্যতামূলক কর্তনের কারণে আমি অর্থ হারিয়েছি।’

বেতন না পাওয়া সরকারি কর্মীদের জন্য শনিবার রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে একটি ফুড ব্যাংকের পক্ষ থেকে পাঁচটি পপ-আপ মার্কেট চালু করা হয়েছে।

বেতন দিতে না পারায় নিরাপত্তারক্ষীরা কাজে আসছেন না। যে কারণে ব্যস্ততম মিয়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি পুরো টার্মিনাল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

শাট ডাউনের কারণে কর্মী সঙ্কটের মুখে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে দেশের প্রায় অর্ধেক ন্যাশনাল পার্ক, স্মৃতিসৌধ ও ঐতিহাসিক স্থান। চলতি সপ্তাহের গোড়ার দিকে বন্ধ হয়ে গেছে ট্রি ন্যাশনাল পার্ক।

বেতন না পাওয়ায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ

জরুরি অবস্থা জারির হুমকি

যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না পেলে কংগ্রেসকে পাশ কাটাতে জরুরি অবস্থা জারির হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার মেক্সিকো সীমান্তের টেক্সাস অংশ পরিদর্শনের সময় তিনি পুনর্বার এ হুমকি দিয়েছেন।

২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারের সময় তিনি যে কোনো মূল্যে দেয়াল নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অন্যদিকে ডেমোক্রেটরা বলছে, তারা ‘জনগণের করের টাকায়’ এ প্রতিশ্রুতি পূরণ হতে দেবে না।

দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও বিভাগের ব্যয় নির্বাহে প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্থানের বিলটি আলোর মুখ দেখেনি। ট্রাম্প বলেছেন, দেয়াল নির্মাণের বরাদ্দ ছাড়া তিনি কোনো অর্থবিলে স্বাক্ষর করবেন না।

রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটদের এ পাল্টাপাল্টিতে গত ২২ ডিসেম্বর থেকে মার্কিন কেন্দ্রীয় সরকারের অসংখ্যা বিভাগ ও সংস্থায় অচলবাস্থা দেখা দেয়।

এখন জরুরি অবস্থা জারি করেই এই অচলাবস্থা নিরসন করতে চাইছেন ট্রাম্প। এ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা জাতীয় জরুরি অবস্থার ঘোষণা দিতে পারি। কিন্তু তা করা উচিত হবে না, এটি সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান।’

তবে প্রেসিডেন্ট জরুরি অবস্থা জারি করলে এর বিরুদ্ধে আইনী লড়াইয়ে নামত পারেন কংগ্রেসের ডেমোক্রেট সদস্যরা। আর ট্রাম্পের ধারণা, এ লড়াইয়ে তিনি সহজেই জিতে যাবেন।

শাট ডাউন বৈঠক থেকে ওয়াক আউট

শাট ডাউন কাটাতে বুধবার ডেমোক্র্যাট নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু দেয়াল নির্মাণে অর্থ ছাড়ের আশ্বাস না পাওয়ায় ওই বৈঠক থেকে ওয়াক আউট করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

বুধবারের বৈঠকে হাউজ স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি এবং সিনেট সংখ্যালঘু দলের নেতা চাক শুমার যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ না করার পূর্ব অবস্থানে অটল থাকলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আলোচনা থেকে বেরিয়ে আসেন।

ডেমোক্র্যাট নেতাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠককে ‘সময়ের সম্পূর্ণ অপচয়’ বলে উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প। প্রেসিডেন্ট পরে এক টুইটে ডেমোক্র্যাট দলের বড় নেতাদের উদ্দেশ্যে লেখেন ‘বাই-বাই’।

শাট ডাউন নিয়ে হোয়াইট হাউসের বাইরে দু পক্ষই একে অপরকে দোষারোপ করছে। হাউজ স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি ট্রাম্পকে বলেছেন, বিপুল সংখ্যক কেন্দ্রীয় কর্মচারীদের বেতন দিতে না পারাটা একই সঙ্গে আরেকটা ক্ষতি।

এ নিয়ে ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট তাদের প্রতি অসংবেদনশীল হচ্ছেন। তিনি (ট্রাম্প) হয়তবা মনে করছেন তারা তাদের বাবার কাছে অর্থ চাচ্ছেন।’

বৈঠকে ট্রাম্প স্পিকার পেলোসিকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি কি আমার দেয়াল নির্মাণের ব্যাপারে রাজী আছেন?’ পেলোসি উত্তর দেন, ‘না’। তখন ট্রাম্প উঠে দাঁড়ান এবং বলেন, ‘তাহলে আমাদের আলোচনা করার কিছু নেই।’ এরপর তিনি সেখান থেকে বেরিয়ে যান।’

বছরের পর বছর ধরে চলবে

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ডেমোক্র্যাট সদস্যদের হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত কংগ্রেস মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের অর্থ না দিচ্ছে ততক্ষণ সরকারে অচলাবস্থা বিদ্যমান থাকবে। এই অচলাবস্থা মাসের পর মাস এমনকি প্রয়োজনে বছরের পর বছর ধরে চলবে।

তিনি শুক্রবার কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক বৈঠকের পর এ বক্তব্য দেন। মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ করতে ৫৬০ কোটি ডলার প্রয়োজন বলে জানান ট্রাম্প। সন্ত্রাসবাদ ঠেকাতে মেক্সিকো সীমান্ত পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া প্রয়োজন বলে দাবি করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

ট্রাম্প বলেন, তিনি সরকারের অচলাবস্থা বহু বছর ধরে সহ্য করতে প্রস্তুত আছেন, কিন্তু মেক্সিকো সীমান্ত বন্ধ করে দেয়ার অবস্থান থেকে তিনি সরে যাবেন না।

মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের জন্য দাবিকৃত ৫৭০ কোটি মার্কিন ডলার বরাদ্দ ছাড়া কোনো অর্থ বাজেটে স্বাক্ষর করবেন না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প।

অন্যদিকে বিরোধী ডেমোক্রেটিক নিয়ন্ত্রিত যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভের নেতারা ‘জনগণের করের টাকায়’ ট্রাম্পকে তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে না দেওয়ার ‘প্রতিজ্ঞা’ করেছেন।

সঙ্কটের শুরু যেভাবে

গত ২১ ডিসেম্বর মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভ আগামী বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরকারের সব বিভাগের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দের একটি বিল উত্থাপন করেছিল।

কিন্তু মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না থাকায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিলটিতে স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি ওই বাজেট বিলে দেয়াল নির্মাণের জন্য অতিরিক্ত ৫৭০ কোটি ডলার অন্তর্ভূক্তির দাবি জানিয়েছিলেন।

এই প্রাচীর নির্মাণের অর্থ বরাদ্দকে কেন্দ্র করে গত ২২ ডিসেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের কাজকর্ম বন্ধ হয়ে গেছে। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে পার্লামেন্ট সদস্যদের মতবিরোধের কারণে ইতিহাসের দীর্ঘতম অচলাবস্থার মোকাবেলা করছে মার্কিন সরকার।

প্রেসিডেন্টে দেয়াল নির্মাণ বাবদ ৫৭০ কোটি ডলার বরাদ্দকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং অকার্যকর বলে মনে করছেন ডেমোক্র্যাটরা।

এ নিয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স সাংবাদিকদের বলেছেন, তিনি হতাশ। কারণ ডেমোক্র্যাটরা ভালো বিশ্বাস নিয়ে আলোচনা করতে রাজি ছিল না।

আরেক রিপাবলিকান নেতা কেভিন ম্যককার্থি বলেছেন, তিনি ডেমোক্র্যাট নেতাদের ব্যবহার ‘অস্বস্তিকর’ বলে মনে করেছেন।

এজন্য ট্রাম্পের একগুয়েমিকে দায়ী করছেন আমেরিকানরা

সূত্র: রয়টার্স/বিবিসি/ দ্য গার্ডিয়ান

এমএ/

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত
close
close