ঢাকা, শুক্রবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৯, ১৩ বৈশাখ ১৪২৬ অাপডেট : ৫ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০১৯, ১১:০৭

প্রিন্ট

মোদির জন্য নিয়মিত পূজা করেন তিনি!

মোদির জন্য নিয়মিত পূজা করেন তিনি!
মোদির স্ত্রী যশোদাবেন
অনলাইন ডেস্ক

ভারতে শুরু হয়ে গিয়েছে ভোট যুদ্ধ। গত বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়েছে লোকসভা নির্বাচন। মোট সাত দফায় ভোট হবে। এই ভোটের ডামাডোলের মধ্যে গুজরাটে গিয়েছিলেন কলকাতার আনন্দবাজার প্রতিনিধি। উদ্দেশ্য যশোদাবেনের সঙ্গে দেখা করা, তার হাল হকিকত তুলে ধরা। যশোদাবেনকে চিনতে পারছেন তো, তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী, নরেন্দ্র মোদির স্ত্রী, যাকে বিয়ের কিছুদিন পরেই ত্যাগ করেছেন মোদি। কিন্তু সেই নারী এখনও মোদিকেই স্বামী বলে মানেন, তার নামে মন্দিরে নিয়মিত পূজা দিয়ে যান। এবারও তার অন্যথা হয়নি।

তো যশোদাবেনের সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার গুজরাট প্রতিনিধির সাক্ষাৎকার কেমন হলো তারই বয়ানে শোনা যাক।

‘আপনি কলকাতা থেকে এসেছেন? কয়েক মাস আগেই তো আমি ওখানে গিয়েছিলাম। ঘরে ঢুকে খাটিয়াতে বসতে বসতেই ওই আগন্তুকের (আনন্দবাজার প্রতিনিধি) সঙ্গে নমস্কার বিনিময় শেষে হাসি মুখে কথাগুলো বললেন যশোদাবেন। হাতে ঝোলানো চামড়ার ভ্যানিটি ব্যাগটা নামিয়ে রাখলেন খাটিয়ায়। তারপর আচমকাই জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনাকে জল দিয়েছে?’ উত্তরের অপেক্ষা না করে পাশে বসা ভাইপো জয়কে, ‘ওকে জল দিয়েছো?’বছর কুড়ির জয় ঘাড় নেড়ে ‘হ্যাঁ’বলায় এ বার ফিরে তাকালেন আগন্তুকের দিকে। হেসে বললেন, ‘যা গরম! আপনি কিন্তু দুপুরের খাবার খেয়ে যাবেন।’

বড্ড নিচু গলায় কথা বলেন। মাঝে মাঝে দু’একটা শব্দ ঠিকঠাক শোনাই যাচ্ছে না। ঢাকা পড়ে যাচ্ছে ওপরের বহু পুরনো ফ্যানের আওয়াজে। মুখে সর্বদাই একটা হাসি লেগে। সবিনয়ে জানানো গেল, মেহসানায় একটু আগেই সকালের জলখাবারের পর্ব মিটেছে। কাজেই... এই কথার ফাঁকেই তিনি চামড়ার ব্যাগটায় হাত ঢুকিয়ে বার করে আনলেন একটা ছোট্ট ডায়েরি। বেশ কয়েকটা উল্টে একটা নির্দিষ্ট পাতা খুলে আগন্তুকের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এই দেখুন। এর বাড়িতে গিয়েছিলাম এয়ারপোর্ট থেকে।’ ইংরেজিতে একটা মোবাইল নম্বর। সঙ্গে গুজরাতিতে লেখা কয়েকটা শব্দ। তাকেই জিজ্ঞেস করলাম, কারও নাম লেখা কি? ঘাড় নেড়ে যশোদাবেন এক ভদ্রমহিলার নাম বললেন। তারপর ডায়েরিটা ফের ঢুকিয়ে রাখলেন।

এই যশোদাবেনের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির আনুষ্ঠানিক বিয়ে হয় যখন, তখন তার বয়স ১২। আর মোদির বয়স ১৪ বছর। দুই পরিবারের প্রথা মেনে দু’জনে অবশ্য একসঙ্গে থাকতে শুরু করেন তার বছর পাঁচেক পর, ১৯৬৮ সালে। যদিও সে সংসার বেশি দিন থাকেনি। সন্ন্যাসের টানে হিমালয়ের পথে বেরিয়ে পড়েছিলেন নরেন্দ্র। মোদির জীবনের পরের ইতিহাস অনেকেরই জানা। কিন্তু আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে যে ঘর বাঁধার স্বপ্ন ছিল যশোদাবেনের, পরিস্থিতির ধারায় তা অন্য খাতে বইতে শুরু করেছিল।

৫০ বছর পর, যে ঘরে আমরা বসে, সেটা মাঝারি মাপের। দারিদ্রের ছাপ দেওয়ালের প্রতিটা ইঞ্চিতে। পাল্লাহীন দেওয়াল-আলমারিতে জামাকাপড় গোঁজা। ইতিউতি ঝুলছে চিপস, মশলার নানাবিধ প্যাকেট। বাইরে বসে থাকা কুকুরটা রোদ্দুর চওড়া হওয়ায় একেবারে ঘরের ভিতর এসে সেঁধিয়েছে। এ সবের মধ্যেই বসে যশোদাবেন। পরনে খয়েরি রঙের শাড়ি। পাড়ের রংটা কোনও এক কালে সোনালি ছিল কি! ঘিয়ে আঁচলটা ট্র্যাডিশনাল গুজরাতি স্টাইলে সামনে দিয়ে ঘুরিয়ে আনা। দু’হাতে লাল রঙের পলার উপর পাথর বসানো। আলাদা ভাবে সরু পলাও রয়েছে। ডান হাতে লাল সুতো বাঁধা। তামাটে রঙের ফ্রেমের চশমা। কানে সোনার ছোট্ট টপ। কপালে মেরুন টিপ ঘিরে ছোট পাথরের সারি। তার ঠিক উপরেই যজ্ঞের লাল গোল তিলক— মন্দির থেকে এলেন যে।

ঘণ্টাখানেক আগে পৌঁছেছিলাম ব্রাহ্মণওয়াড়ায়। প্রথমে গ্রামের পোস্ট অফিস, তারপর এক পানদোকানির সহায়তায় খুঁজে পেয়েছিলাম অশোক মোদির বাড়ি। মেহসানা থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার এগিয়ে মেইন রাস্তা থেকে বাঁ দিকে নেমে যেতে হয় গ্রামের ভিতরে। তিন কিলোমিটার মতো গেলে ব্রাহ্মণওয়াড়া বাজার। সেখান থেকে একটু এগিয়েই অশোকদের পৈতৃক বাড়ি। এখন সেখানে তার ছোট ভাইয়ের পরিবার থাকে। এই বাড়িতেই জন্ম যশোদাবেনের। বিয়েও। মেহসানার উঞ্ঝায় বড় দাদা অশোকের কাছে থাকলেও, মাঝে মাঝেই বাপের বাড়িতে চলে আসেন যশোদা। পুজোআচ্চা আর উপোসের উপরেই থাকেন। উঞ্ঝা থেকে প্রায় প্রতি দিনই চলে আসেন ব্রাহ্মণওয়াড়ায়। ভাইয়ের বউয়ের সঙ্গে মায়ের সঙ্গে মন্দিরে যান। সেখানে পুজো সেরে বাড়ি ফিরে কোনও দিন খাওয়াদাওয়া করেন, আর যে দিন উপোস থাকে, সে দিন আর খাওয়া দাওয়া করেন না।

এই সাদামাটা জীর্ণ বাড়িতেই থাকেনমোদির স্ত্রী যশোদাবেন

যশোদার সঙ্গে কিন্তু সিকিউরিটি থাকে। তাই পলিটিক্স নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করে দিয়েছিলেন রেখেছিলেন জয়। যশোদার ছোট ভাইয়ের ছেলে জয়।

আধ ঘণ্টার মধ্যে বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায় একটি সাদা রঙের ইন্ডিগো। সেখান থেকে নেমে সোজা আগন্তুকের সামনে ঘরের একমাত্র সৌখিন আসবাব এই খাটিয়ায় বসেছেন যশোদাবেন। আর বসতে বসতেই জিজ্ঞেস করেছেন, ‘কলকাতা থেকে এসেছেন?’

মিনিট পাঁচেকও কাটেনি। তিন পুলিশকর্মী ঘরে এসে হাজির। কাঁধের ব্যাজে লেখা মেহসানা পুলিশ। তারা ওই প্রতিনিধিকে ঘিরে ধরলো। ‘কোথা থেকে এসেছেন? কেন এসেছেন?’ইত্যাদি নানা প্রশ্ন তাদের।

এবার যশোদাবেন থামালেন পুলিশকর্মীকে, গুজরাতিতে কিছু বললেন। দু’একটা শব্দ। পুলিশকর্মীটি কিছু একটা বললেন। তার পাল্টা কিছু বলতে শোনা গেল জয় এবং তার মাকে। গোটাটাই গুজরাতি। এর পর জয় কাউকে একটা ফোন করল। ‘বড় পাপা’ সম্বোধন করা সেই ফোন থামতেই ফের পুলিশকর্মীকে জয় কিছু বলল। এর পর আমার দিকে তাকিয়ে জয় বলল, ‘আপনি কথা বলুন। আমি বড় পাপাকে বলে দিয়েছি। শুধু কোনও পলিটিক্যাল কথা নয়।’

বড় পাপা হচ্ছেন জয়ের জ্যাঠা, অশোক মোদি। ‘আগেই জেনেছিলাম, অশোকের মুদির দোকান আছে উঞ্ঝায়। আর এই আধ ঘণ্টায় জেনেছি, এই যে ঘরে আমরা বসে আছি, এটা যেমন থাকার জায়গা মোদি পরিবারের, তেমনই পাড়ার দোকান। তবে সব মিলিয়ে কয়েকশো টাকার মালপত্রও দোকানে আছে কি না সন্দেহ।’

মন্দির থেকে পুজো দিয়ে ফিরলেন যশোদাবেন। আপনি কলকাতা কেন গিয়েছিলেন? প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে, আগে পুজোর প্রসাদ বার করে আগন্তুকের হাতে দিলেন যশোদাবেন। আর তিনি মুখ খোলার আগেই বলতে শুরু করলেন ওই পুলিশ কর্মী, ‘ঝাড়খণ্ড গিয়েছিলেন একটা মন্দিরে। তাই কলকাতা হয়ে গিয়েছিলেন। আপনি এ বার আসুন।’ সরাসরি দরজা দেখিয়ে দিলেন এ বার।

যশোদাবেন ওই কর্মীকে হাত দিয়ে থামিয়ে আগন্তুককে বললেন, ‘ঝাড়খণ্ডে একটা মন্দিরে যাওয়ার ছিল। এখান থেকে প্লেনে কলকাতা। তার পর শান্তির বাড়ি। সেখান থেকে সবাই মিলে গাড়ি করে ঝাড়খণ্ড। কলকাতা কিন্তু আমার বেশ ভাল লেগেছিল।’

‘আপনি এখন কোথা থেকে এলেন?’ফের পুলিশের প্রশ্ন। জানালাম, আমদাবাদ। ‘যাবেন কোথায়?’আমদাবাদ হয়ে বডোদরা। ‘ফোটো আইডি কার্ড দেখান।’ব্যাগ থেকে বার করে দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলে ছবি তুলে নিলেন তিনি। পুরো ঠিকানা, বাবার নাম, কেন এসেছি— আবারও হাজার প্রশ্ন। ‘মোবাইল নম্বর?’বলা মাত্রই ফোনে রিং হল। কেটেও দিলেন।

তার মধ্যেই যশোদাবেনকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার স্কুল কি এই গ্রামেই ছিল? ‘না না। এখান থেকে অনেকটা দূর। বাসে করেই যেতাম। প্রাইমারি স্কুল। অনেক ছাত্রছাত্রী।’ অবসর নিয়েছেন কবে? ‘তা-ও অনেক বছর হল। ২০০৯। হ্যাঁ ১০ বছর হয়ে গেছে। ৩১ বছর চাকরি করেছি। আর কত!’

‘আপনি এখানে কেন এলেন?’’ আবার পুলিশের প্রশ্ন। বললাম যে! এমনি দেখা করতে। ‘দেখা তো অনেক হল। এ বার আসুন।’এ বারের স্বরটা হুমকির মতোই লাগল। যশোদাবেনকে কার্যত অসহায় লাগছে। কিছু বলতেও পারছেন না, আবার অস্বস্তিটাও ডাকতে পারছেন না।

পরিস্থিতি একটু হালকা করতে যশোদাবেনকে জিজ্ঞেস করা গেল, আপনি কি মন্দিরে নিয়মিত যান? ‘হ্যাঁ ওটাই তো জীবনে আছে। ভগবানকে ডাকি মনপ্রাণ দিয়ে,’—জবাব এল।

কী বলেন ভগবানকে? ভীষণ হালকা স্বরে বললেন, ‘সবই ওর (মোদি) জন্য।’

‘আপনি কি উঠবেন?’পুলিশের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে যশোদাবেনের কাছে জানতে চাইলাম, ‘ওর জন্য মানে?’ একটা নীরব চাহনি দিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। জয়ের মা একটা জলভর্তি গ্লাস যশোদার হাতে ধরালেন। আর একটা গ্লাস দিলেন আগন্তুককে, ‘বাইরে যা গরম, খেয়ে নিন।’

সেখানেই থামলেন না। বললেন, ‘এই উঠোনেই তো নরেন্দ্র মোদি বিয়ে করতে এসেছিলেন। তখন যশোদাবেন বয়স আর কত! সে সব কি আজকের কথা! ওর জন্যেই এ সব করে।’ যশোদা কেমন ফ্যালফ্যালে দৃষ্টিতে তাকিয়ে।

এত ক্ষণ খাটিয়ার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন পুলিশ সদস্যরা। এক জন পুলিশকর্মী এ বার এগিয়ে এসে বললেন, ‘উঠুন। নেহি তো দিক্কত হো যায়েগা।’

আপনি উপোস করেন কেন? ‘সেকি আজ থেকে! কত্ত বছর হয়ে গেল। সপ্তাহে পাঁচ দিন উপোস থাকি। দু’দিন দু’বেলা খাই। বাকি দিনগুলো এক বেলা।’ কেন? এই বয়সে এত উপোস সহ্য হবে? হাসিসহ জবাব এল, ‘কাটিয়ে তো দিলাম।’

এ বার মোবাইল বার করলেন ওই পুলিশকর্মী। তাক করলেন আমার দিকে। উঠল ফোটো। ছবি তুলছেন কেন? কোনও জবাব নেই। দরজার বাইরে আঙুল দেখিয়ে বলা হল, ‘আসুন। অনেক দেখা হয়েছে।’ আর বসা যাবে না মনে হচ্ছে। চেয়ার থেকে উঠতে উঠতেই প্রশ্নটা করলাম। ভোট দেবেন তো? প্রায় তেড়ে এল পুলিশ। ‘আপকো মানা কিয়া না, অ্যায়সা কোয়েশ্চেন মত পুছো। চলো বহত হো গয়া।’

নমস্কার করে বেরতে যাব। নাম ধরেই ডাকলেন যশোদাবেন। ব্যাগ থেকে তত ক্ষণে বেরিয়ে পড়েছে একটা ৫০ টাকার নোট। বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘দুপুরে তো কিছু খেলেন না। যাওয়ার সময় বাজার থেকে একটু আখের রস খেয়ে যাবেন।’’ ধন্যবাদের সঙ্গে সবিনয়ে জানানো গেল, প্রয়োজন নেই। তার মধ্যেই তিনি জয়ের হাতে টাকাটা দিয়ে বললেন, ‘জয় যাও তো। ওকে একটু আখের রস খাইয়ে দাও।’

আখের রসের গ্লাস ১০ টাকা। বাকি ৪০ টাকা জয় বুক পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে বললেন, ‘শুধু সর্বক্ষণের পুলিশই আছে। আর কিছু নেই।’

সূত্র: আনন্দবাজার

এমএ/

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত
close
close