ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই ২০২১, ১৪ শ্রাবণ ১৪২৮ আপডেট : ১ মিনিট আগে

চেরি ফুলের দেশে

  -শাহজাহান সরদার

প্রকাশ : ০৪ নভেম্বর ২০২০, ০৪:৪৯

চেরি ফুলের দেশে

-শাহজাহান সরদার

৫. টোকিও টাওয়ার

১৭ই সেপ্টেম্বর বিকেলে সিটি বাস টার্মিনাল থেকে আমরা টোকিও-র দর্শনীয় স্থান দেখার জন্য রওনা হই। আমাদের সাথে ছিলেন এফপিসি’র কর্মকর্তা। ট্যুরিস্ট গাইড সংস্থার একটি বাসে আমাদের যাত্রা শুরু। টোকিও সহ সারা জাপানে এমন অসংখ্য গাইড সংস্থা রয়েছে। টোকিও-এর সংস্থাগুলো ২৪ ঘণ্টাই সার্ভিস দিয়ে থাকে। টোকিও মর্নিং, টোকিও আফটারনুন এবং টোকিও নাইট-এ তিন ধরনের কর্মসূচিতে ভিন্ন ভিন্ন দর্শনীয় স্থান দেখানো হয়ে থাকে। আমরা টোকিও আফটারনুন-এর গাড়ি ধরি। লিমোজিন বাস সার্ভিস। শীতাতম নিয়ন্ত্রীত। আমরা ১০ জন, এফপিসি’র কর্মকর্তাসহ আরও ১২ জন ট্যুরিস্ট ছিলেন। মাথাপিছু ১০ হাজার ইয়েন ভাড়া। আমাদের ব্যয় বহন করে এফফিসি। আমাদের সাথে ভারতের বোম্বে শহরের এক পরিবার ছিল। এক শিখ ব্যবসায়ী, তাঁর স্ত্রী, তিন ছেলেকে নিয়ে জাপান দেখতে এসেছেন। ১৫ দিন থাকার পর চলে যাবেন লন্ডন হয়ে বোম্বে। বাসে তার সাথে আমার অনেক কথা হয়।

সিটি টার্মিনাল থেকে প্রথমেই আমরা রওনা হই টোকিও টাওয়ারে। আগে শুধু নাম শুনেছি। দেখার সৌভাগ্য হয়নি। এত উপরে উঠতে পারব বলে বেশ আনন্দ। আমাদের গাইড টোকিও এর আদি বাসিন্দা মি. সাতো। তিনি বাস ছাড়ার সাথে সাথে যেসব স্থানে নিয়ে যাওয়া হবে সেসবের বিবরণ দিলেন। সাথে তাঁর নিজের এবং টোকিও-র বিবরণ দিতেও ভোলেননি। সাতোর বাংলা অর্থ চিনি। ইংরেজিতে সুগার। রসিকতা করে তিনি বললেন, তোমরা আমাকে মি. সুগার ও বলতে পার। মি. সাতোর কণ্ঠ এবং ব্যবহারও বেশ মিষ্টি। অত্যান্ত সুন্দরভাবে বর্ণনা দেন সব কিছুর। কাজেই কিছুক্ষণের জন্য হলেও তিনি আমাদের সত্যি সত্যি সুগারের আমেজে ভরিয়ে রাখতে পেরেছিলেন। সাতো জানান, টোকিও রাজধানী হওয়ার আগে ছিল মৎস্যজীবীদের বাসস্থান। নদীতে মাছ ধরে জেলেরা এখানে মাছ শুকাতো এবং বসবাস করত। আর আজ এটি বিশ্বের সবচাইতে ব্যয়বহুল স্থান। জাপানের রাজধানী টোকিও। মি. সাতের আকর্ষণীয় ধারাবিবরণী শুনতে শুনতে টোকিও টাওয়ারের কাছে এস পৌঁছি। সাতো মাইকে বার বার বলে দিচ্ছেন এখানে মাত্র ৪৫ মিনিট অবস্থান। যদি এর মধ্যে কেউ না আসে তাহলে গাড়ি চলে যাবে। যিনি গাড়ি ধরতে পারবেন না তিনি যেন উপরে বসে হাওয়া খান অথবা সাথের পাঁচতারা হোটেলে থেকে যান। তাঁর কিছু করার থাকবে না। সাতো সাথে সাথে আবার বললেন, এ দুটোই তোমাদের জন্য অসম্ভব। কাজেই সময়মত তোমাদের নিচে আসতেই হবে।

বিশ্বের উচ্চতম এ টাওয়ারের উচ্চতা ৩৩৩ মিটার। মূলত টেলিভিশন অনুষ্ঠান সম্প্রচারের জন্য জাপানের রাজধানী টোকিও-র কেন্দ্রস্থল টাওয়ারটি নির্মাণ করা হয়েছে। বিশ্বের অত্যাশ্চর্য দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে এ টাওয়ার অন্যতম। জুন ১৯৯২ পর্যন্ত বিশ্বের ১০ কোটি লোক টাওয়ারটি পরিদর্শন করেছে। জাপানের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিনই অসংখ্য স্কুল ছাত্র-ছাত্রী নারী-পুরুষ আসে পরিদর্শনে। টোকিও টাওয়ার দেখানোর মধ্যে দিয়ে বিভিন্ন পর্যটন ও পরিভ্রমণ সংস্থার দিনের দিনের কর্মসূচি শুরু হয়। ৪ হাজার টন স্টীল দিয়ে তৈরী টাওয়ারের শীর্ষে বিমান চলাচলের গতি নিয়ন্ত্রক সিগন্যাল রয়েছে। আর ২৫০ মিটার থেকে উপরে আছে এনএইচকে (জাপান) জেনারেল টিভি, শিক্ষা টিভি, টিভি আশাই, ফুজি টিভি, টিবিএস টিভি, এনটিভি, টোটিও টিভি এবং এয়ার টিভি’র সিগন্যাল। মাঝে আছে বাতাসের গতি নিয়ন্ত্রক। এরই নিচে আছে টোকিও শহরের ট্রাফিক মনিটরিং সিস্টেম।

বেশ কিছুদূর হেঁটে টাওয়ারের পাসে এস হাজির হলাম সবাই। লিফটে উপরে উঠতে হবে। বিশাল বিশাল লিফট। ৩০ থেকে ৪০ জন ওঠা যায়। আমাদের গাইড টিকিট করে নিয়ে এসেছিলেন আগেই। জাপানে সব স্থানেই টিকিট দরকার হয়। অর্থ ছাড়া কোনো দর্শনীয় স্থানে যাওয়া যায় না। টিকিট আগাম বিক্রি হয়। আমরা সবাই লিফটে উঠলাম। জাপানে তখন বসন্তকাল। স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রী এবং বিদেশী পর্যটকদের ভীড় সর্বত্র। টোকিও টাওয়ারের একই অবস্থা। টাওয়ারের মাঝামাঝি লিফট। চারদিকে কাঁচঘেরা। ওঠা নামার সময় সব দেখা যায়। শো করে যেন লিফটে উপরে নিয়ে যায়। প্রথমবার ওঠার সময় ভয় না পেয়ে উপায় নেই। এতে রয়েছে গতি নিয়ন্ত্রক ক্যামেরা, এন এইচ কে রেডিও, টোকিও রেডিও এবং জাপান রেডিও এর সিগন্যাল। টোকিও সামুদ্রিক এন্টেনা, টিভি স্টেশন রিলে এন্টেনা, জাপান রেলের এন্টেনা আছে ১৬০ মিটার উপরে। নিচে আছে বেশকিছু রেস্তোরাঁ, স্যুভেনির দোকান, টিকিট অফিস, দোতলায় খেলাধুলার ব্যবস্থা। তৃতীয় তলায় জাদুঘর। ৪র্থ তলায় সরকারি তথ্য এবং বিভিন্ন প্রদর্শনী কেন্দ্র। ৫ম তলায় টিভি স্টেশনসমূহের অফিস। ৫ম তলা থেকে ১৫০ মিটার উচ্চতায় বাতাসের গতি নিয়ন্ত্রক ও ভূমিকম্প ডিটেক্টর বসানো আছে। ১৫০ মিটার উপরে দর্শকদের জন্য তৈরি দুটি তলা, এ দু’তলায়ই রেস্তোরাঁ রয়েছে। আরও আছে দর্শকদের হাঁটাহাঁটি করা এবং বিরাট বিরাট কয়েকটি বাইনোকুলার। বাইনোকুলার দিয়ে উপর থেকে টোকিও শহরকে কাছে দেখা যায়। দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত দু’টি তলার উপর আরেকটি বিশেষ তলা আছে। বিদেশী কোন সম্মানিত অতিথি পরিদর্শনে গেলে তাঁকে সে তলায় নিয়ে যাওয়া হয়। এ তলায় অত্যাধুনিক বিশ্রাম কক্ষ রয়েছে। রাতের আকাশে ১৪৮টি বাতি দিয়ে এ টাওয়ার টোকিও-র সৌন্দর্যকে আরও সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তোলে। টাওয়ারের বিভিন্ন দোকান, রেস্তোরাঁসহ অন্যান্য কাজে সহস্রাধিক নারী-পুরুষ বিভিন্ন শিফটে কাজ করে।

টাওয়ার পরিদর্শনে বয়স্কদের জন্য টিকিট ৭২০ ইয়েন, ছাত্রদের জন্য ৪২০ ইয়েন। টাওয়ার-এর সার্বিক ব্যবস্থাপনায় আছে নিপ্পন টেলিভিশন সিটি কর্পোারেশন। টাওয়ারের দর্শকদের পরিদর্শন স্থানগুলোতে সুন্দর সুন্দর দোকান ও রেস্তোরাঁয় কাটতি বেশ। দেড়শ’ মিটার উপর থেকে আমরা দেখলাম টোকিও নগরী। এত উপরে উঠে ভয়ও হচ্ছিল বেশ। পুরো টোকিও শহন যেন চোখের কাছে। বিশাল বিশাল অট্টালিকা ছোট ছোট হয়ে চোখে আসে। সে এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। স্মৃতিতে ধরে রাখার জন্য ছবি তোলার হিড়িক। মা ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে দেখায় টোকিও শহরকে। ছাত্র-ছাত্রীরা হাত ধরাধরি করে কৌতূহল হয়ে বিস্ময়ে দেখে। আর প্রেমিকাযুগল গলাগলি করে এত উপরে উঠেও জোড় ছাড়া হয় না। থেকে যেতে যায় যেন উপরেই। দেখতে দেখতে ৪০ মিরিট পার হয়ে গেল। আমাদের গাইড সাতো হৈ-চৈ শুরু করে দিলেন গাড়ি চলে যাবে বলে। তাড়াহুড়া করে সবাইকে নিয়ে লিফটে একতলায় নেমে আসি। একতলা থেকে হেঁটে ভিন্ন ভিন্ন দিক দিয়ে আমরা দৌড়াদৌড়ি করে নেমে নিচে এলাম। কিন্তু নির্দিষ্ট স্থানে গাড়ি দেখতে না পেয়ে মাথায় হাত। এদিক ওদিক ছুটাছুটি শুরু করতে থাকি। সদাহাস্যময় গাইড সাতোর মুখ শুকনা হয়ে গেল। এমন সময় এফপিসি’র কর্তা দৌঁড়ে এসে বললেন গাড়ি মূল ফটকে আছে। চলে যাচ্ছিল, তিনি দৌড়ে যেয়ে ধরেছেন। আমরা সবাই প্রায় কয়েক মিনিট দৌঁড়িয়ে বাসে উঠতে পেরে স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলি। গাড়ি চলার সাথে সাথে সাতোর ধারাভাষ্য শুরু হল। তার ম্লান মুখে আবার হাসি। আমাদের মুখেও।

এবার আমাদের যাত্রা টোকিও-এর ৫ তলা একটি মন্দির। মন্দিরের নাম আসাকুসা ক্যানন টেম্পল। মন্দিরের চাইতে মনে হল পর্যটকদের আকর্ষণ পাশের সারিবদ্ধ বিভিন্ন দোকান। এসব দোকানে রয়েছে হরেকরকম জিসিনপত্র। আমাদের ঢাকার হকার্স মার্কেটের মত ছোট ছোট দোকান। তবে বেশ উন্নতমানের। জায়গা একটু বেশি। এ মার্কেটে বেশির ভাগই পর্যটকদের দেখা যায়। এখানে আমাদের সময় ৩০ মিনিট। আমি আর শ্রীলংকার শান দু’জনে দোকানে দোকানে ঘুরে মন্দিরের সামনে যেয়ে উপস্থিত হয়ে দেখি হাজার হাজার কবুতর। মানুষের গায়ে পর্যন্ত কবুতর বসছে। অনেকেই এসব কবুতরকে খাবার দিচ্ছিল। মন্দিরের সামনে রক্ষিত এক পাত্রে ভাগ্য পরীক্ষার কাগজপত্র। এটা বৌদ্ধ মন্দির। শান নিজেও বৌদ্ধ। তাই সে ভাগ্য পরীক্ষার কাগজ তুলে নিল ১০ ইয়েন দিয়ে। কিন্তু কাগজে জাপানি লেখা বুঝতে না পেরে জাপানি গাইডকে পড়তে দিল। গাইড যা বুঝাল তাতে শানের ভাগ্য প্রসন্ন নয়। সে হতাশ হল।

পরের যাত্রাস্থল টোকিও-র বিখ্যাত নদী সুমিদা নদী। এ নদীতে নৌবিহারের ব্যবস্থা আছে। দু’শ যাত্রীর বিরাটাকার যান্ত্রিক নৌকায় আমরা অবতরণ করি। ৪০ মিনিটের নৌবিহার, বড় জাহাজের মত দেখতে এ নৌকা। সুন্দর রং করা এবং উন্নতমানের আসনের এ নৌকাটা দোতলা। সুমিদা নদীর প্রশস্ততা সাড়ে ৩ কিলোমিটার। আমরা এপাশ-ওপাশ অতিক্রম করে আবার তীরে ফিরে আসি। নদীর পানি কাল। আশে পাশে অনেক শিল্প-প্রতিষ্ঠান। তিন কিলোমিটারের মধ্যে নদীর উপর দু’টো ব্রীজ। ব্রীজের উপর দিয়ে কার, বাস, ট্রেন এবং অন্যান্য যানবাহনের আলাদা আলাদা রাস্তা রয়েছে। কমপক্ষে ৪ তলা ব্রীজ। নৌবিহারের বেশির ভাগ যাত্রীই পর্যটক। আর রয়েছে জাপানি প্রেমিক-প্রেমিকা, বন্ধ-বান্ধব। যুগলরা যান্ত্রিক সভ্যতার বাইরে নৌবিহারে যেয়ে সময় কাটায়। একই জাহাজে করে তারা কয়েকবার ভ্রমন করে।

নৌবিহার শেষে আমরা যাই টোকিও-র বিখ্যত পার্ল হাউজে (মুক্তার দোকান)। বিশ্বের ধনী ব্যক্তিরা সপরিবারে এসে এসব দোকান থেকে মুক্তার গহনা ক্রয় করে। সমুদ্র থেকে শামুক তুলে এনে মুক্তা তৈরির প্রক্রিয়াও দেখানো হয় পার্ল হাউজে। এজন্য টিকিট করতে হয়। ঝিনুক থেকে দর্শকদের সম্মুখে যে মুক্তা তৈরি করা হয় তা পরে লটারীর মাধ্যমে দর্শকদেরই দিয়ে দেয়া হয়। মুক্তার জন্য জাপান বিখ্যাত। চোখ ধাঁধানো ডিজাইনের মুক্তার গহনা। কিন্তু তারাই এ গহনা ক্রয় করতে পারে যাদের কোটি কোটি টাকা আয়। ভারতের সুনীল সদ্য বিবাহিত। সে তাঁর স্ত্রীর জন্য একটি মুক্তার মালা ক্রয়ের জন্য বেশ কিছুক্ষণ ঘুরাঘুর করেছিল। শেষ পর্যন্ত দামে মিলাতে পারেনি। পার্ল হাউজের দোকানগুরো দেখে হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা দেই সন্ধ্যা ৬টায়।

আবার মি. সাতো সক্রিয় হলেন। তিনি যাবার পথে প্রতিটি রাস্তার ইতিবৃত্ত, এমনকি ঐতিহাসিক ভবনের ইতিহাস বলে যাচ্ছিলেন। ফিরে আসার সময় শেষ রাস্তা গিনজা। জাপানের মূল বাণিজ্যিক কেন্দ্র গিনজা। দেশের ব্যবসা বাণিজ্য এখান থেকেই নিয়ন্ত্রিত হয়। জাপানের বড় বড় লোকের বাসস্থান ও ভবন। গিনজায় যার ভবন আছে তিনিই জাপানের বড়লোকদের তালিকায়। মি. সাতো বললেন জাপানি সাধারণ নাগরিকরা গিনজা দিয়ে শুধু হেঁটে যেতে পারে। থাকা-খাওয়ার কথা কল্পনাও করতে পারে না। কোন জাপানি নাগরিক এখন আর গিনজায় জায়গা কিনার কথা ভাবে না। তিনি জানালেন গিনজায় এখন প্রতি বর্গমিটার জমির মূল্য ২ শত ৫০ হাজার ডলার। অর্থাৎ বর্তমান ডলারের (১৯৯২) বিনিময় হার অনুযায়ী ১ কোটি টাকা। গিনজা মানে টাকা, গিনজায় টাকা তৈরি হয়, টাকা যোগায়। বিশাল বিশাল ভবনের বিভিন্ন তলায় রয়েছে বাণিজ্যিক অফিস, দোকাপাট, রেস্টুরেন্ট, বার ইত্যাদি। গিনজার ভবনে ভবনে পরিবার পরিজনের বসবাস আছে। ছেলে-মেয়েরা দল বেঁধে হাঁটে এ এলাকায়। বারে রেস্তোরাঁয় আড্ডা দেয়। সেই গিনজার মিতসুই আরবান হোটেলে আমাদের থাকার স্থান। এখানে থাকা সৌভাগ্যের কথা। কিন্তু জিনিসপত্রের দাম অসম্ভব বেশি অথবা ভাল এবং দামী জিনিস বিক্রি হয়। এ কারণে যে হোটেলে আমরা থেকেছি সে হোটেলে বেশি খাওয়া হয়ে ওঠেনি। কেননা এ হোটেলে প্রতিবার সাধারণ খাবারের জন্যই ৪ হাজার থেকে ১০ হাজার ইয়েন দিতে হয়। অন্য স্থানে একই ধরনের খাবার আরও অল্প মূল্যে পাওয়া যায়। হোটেলে গাড়ি আমাদের পৌঁছে দিয়ে বিদায় নিলো সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায়। সাতোর সাথে আর কোনদিন দেখা হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে ভদ্রলোককে মনে থাকবে। দুপুরে জাপান প্রেসক্লাবে খেয়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু ঘুরাঘুরিতে বেশ ক্ষুধা লেগে গেছে। কিন্তু খাব কি? কোথায় খাব। খাবারের সমস্যা কাটছে না। রুমে এসে শুয়ে পড়ি। এমন সময় টেলিফোন বেজে ওঠে। রিসিভার তুলে নেপালের রাইয়ের কণ্ঠ শুনতে পাই। একই প্রশ্ন তাঁর। খাব কোথায়? আমি তাঁকে বললাম, আজ খুঁজে দেখব এশিয়ান কোন হোটেল অথবা কোন রুটির দোকান পাওয়া যায় কিনা। আমার কথায় রাই রাজী হল। সাথে সাথে রাই, শ্রীলংকার শান, পাকিস্তানের হাশমী ও ভারতের সুনীলের কাছে টেলিফোন করে আমাদের পরিকল্পনার জানালে তাঁরাও রাজী হন। সাড়ে ৭টায় আমরা হোটেল থেকে দল বেধে বের হয়ে ৪ থেকে ৫শ’ গজ দূরে হেঁটে একটি রেল স্টেশনে যেয়ে পৌঁছি। এ স্টেশনের নাম শিমবাশি। জাপানের রেলস্টেশন মানেই ৪ তলা/৫ তলা। আন্ডারগ্রাউন্ডও আছে। নিচ-উপর দিয়ে সমানে রেল চলে।

স্টেশনের মূল কেন্দ্রে ঘুরতে ঘুরতে খুঁজে পেলাম ম্যাকডোনালস্ এর দোকান। সমস্যা হল বেয়ারারা কথা বুঝে না। ম্যাকডোনালস্ বইতে ছবি আছে। ছবি দেখিয়ে অর্ডার দিলাম। বারগার কোক এবং চিকেন। বনরুটির মধ্যে কিমা করা গরুর কাবার, দু’টুকরা মুরগী, চাইনিজের মত করে ভাজা আর একটি কোকের দাম ৮শ’ ইয়েন। আমাদের টাকায় প্রায় ২শ’৭০ টাকা (১৯৯২ সালের হিসাবে)। পিজা প্যালেসে এসব আইটেম খেতে ৭০-৮০ টাকার মত লাগবে। বেশ ক’দিন পর রুচি সহকারে পেট ভরে খেলাম। এরপর থেকে টোকিও যতদিন অবস্থান করেছি ততদিন অন্তত একবেলা এ বারগারের দোকানে খেয়েছি। ভালই লেগেছে। নাস্তার সময় রোজ যেতাম। দোকানের বেয়ারাদের সাথে পরিচয় হয়ে গিয়েছিল। ম্যাকডোনালস চেইন রেস্টুরেন্ট। বাংলাদেশে কেএফসি পিৎজাহাট এসেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ম্যাকডোনাল্ড আসেনি।

রাতের খাবার সেরে হোটেলে এলে বাসার চিন্তায় অস্থিরতা বেড়ে যায়। এতদিন যোগাযোগ হয়নি। আজ টেলিফোন করব। কিন্তু এখন নয়। রাত ১১টার পরে। কেননা ১১টার পরে টেলিফোনের জন্য কম মূল্য দিতেহয়। আর তিন ঘণ্টা সময়ের ব্যবধান। টোকিও-এর রাস্তায় কয়েক কদম হাঁটলেই বা অফিসে অফিসে টেলিফোন পাওয়া যায়। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার টেলিফোন রয়েছে। কার্ড কিনতে পাওয়া যায় দোকানে, হোটেলে। কার্ড দিয়েই টেলিফোন করা যায়। নগদ পয়সা দিতে হয় না। যত বেশি সময় কথা বলবে তত বেশি ম্যুলের কার্ড ব্যবহার করতে হবে। ইদানিং আমাদের দেশেও কার্ড ফোন চালু হয়েছে-আধুনিক টেলিফোন টেনওয়ার্ক। সার্ভিস খুবই ভালো। কিছুক্ষণ শুয়ে-থেকে ১১টায় হোটেল লবিতে এসে এক হাজার ইয়েনের একটি কার্ড কিনে বাসার টেলিফোন নাম্ভারে রিং করলাম। সাথে সাথে ধরলেন আমার স্ত্রী। আবেগের জিজ্ঞাসা- কেমন আছি? কথা হল ছেলেদের সাথেও। একহাজার ইয়েনের কার্ড দিয়ে তিন মিনিট কথা বলা যায়। তিন মিনিট শেষ হতেই কথা বন্ধ হয়ে গেল। আমরা কাছিাকাছি থেকে আবর সেই দূরত্বে। পরদিনের জন্য অপেক্ষা। (চলবে)

আরও পড়ুন- আগের পর্ব

বাংলাদেশ জার্নাল/আর

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত