ঢাকা, রোববার, ২৫ জুলাই ২০২১, ১০ শ্রাবণ ১৪২৮ আপডেট : ৩ মিনিট আগে

প্রকাশ : ১১ নভেম্বর ২০২০, ০২:১৫

প্রিন্ট

চেরি ফুলের দেশে

চেরি ফুলের দেশে

-শাহজাহান সরদার

৬. জাপানের রাজনীতি

১৮ই সেপ্টেম্বর। জাপানের রাজনীতি সম্পর্কে সেমিনার। বক্তা টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর। রাজনীতি সম্পর্কে আমার আগ্রহ সব সময়ই বেশি। কেননা রিপোর্টার থাকাকালে আমি বেশির ভাগই রাজনৈতিক রিপোর্ট করেছি। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়ও লিখেছি রাজনীতি নিয়ে। তাই জাপানি রাজনীতি, সরকার ব্যবস্থা, দলীয় অবস্থা, নির্বাচন পদ্ধতি জানার জন্য বিশেষ আগ্রহ। এ জন্য ও গবেষণার বিষয় হিসেবে রাজনীতিই বেছে নেই। জাপানি রাজনীতি বিষয়ে টপযরহফধ এর লেকচারের পরেও আমি এ বিষয়ে তাঁর সাথে আরও কথা বলি, সে দেশের সরকারি ও বিরোধীদলের নেতাদের সাথেও আমি বলেছি। জাপান যেমন উন্নত দেশ রাজনীতিও তেমন ব্যয়বহুল। অর্থ ছাড়া রাজনীতি নড়াচড়া করে না। কল্পনাতীত অর্থ ব্যয় করে দল চালাতে হয়। নির্বাচনে ব্যয় হয় দেদার। তাই জাপানি রাজনীতিতে অর্থ কেলেঙ্কারী লেগেই আছে। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, দলের বড় বড় নেতা, এমপি এবং আমলাদের বিরুদ্ধে প্রায়শ দুনীতির অভিযোগ উঠে থাকে। দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে কয়েকজন প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। আর রাজনীতিতে নারী কেলেংকারীর ঘটনাও অহরহ ঘটছে। গোপনে গোপনে অনেক হাই ফাই রমণী প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, এমপি, আমলাদের কুপোকাত করে ফায়দা লুটে নেয়। রাজনীতিবিদরা কেউ কেউ এ ধরনের সোসাইটি গার্লদের খপ্পরে পড়ে পদ ও পথ হারিয়েছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী তোশিকা কাইফুকে নারী কেলেংকারীর কারণে পদত্যাগ করতে হয়েছে। এর পরও থেমে নেই নারী কেলেংকারী। বিভিন্ন লবিস্ট ফার্মের হয়ে সুন্দরী সুন্দরী রমণীরা কাজ করে। তাদের কাজই থাকে বড় বড় কর্তাদের বাগে এনে কাজ আদায় করা। দিনে অফিস পাড়াসহ রাতে বারে-ক্যাবারে তাঁদের পদচারণ লক্ষ্যণীয়। বিত্তশালী ঘরের ললনারাও কেউ কেউ প্রভাবশালীদের সাথে সম্পর্ক গড়ে ফায়দা লুটে নেয়। বাগিয়ে নেয় বড় বড় ব্যবসা।

শান্তি এবং গণতন্ত্র্রকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে ১৯৪৬ সালে জারীকৃত জাপানের সংবিধানে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সর্বতোভাবে স্বীকৃত। সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশ জাপানে আবার রয়েছে রাজতন্ত্র, সম্রাট-সম্রাজ্ঞী। সম্রাটের দেশ পরিচালনায় কোন ক্ষমতা নেই। সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিক বিভিন্ন কার্যাদি তাঁর দ্বারা সম্পাদিত হয়। তিনি রাষ্ট্র ও জনগণের ঐক্যের প্রতীক। সার্বভৌম ক্ষমতা জনগণের হাতে। সংসদের মাধ্যমে এ ক্ষমতা প্রয়োগ করে জনগণ। সংসদকে বলা হয় ডায়েট। ডায়েটের দু’টি কক্ষ রয়েছে। একটি হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ এবং অপরটি হাউজ অব কাউন্সিলরস। হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভের সদস্যগণ জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন। প্রতি ৪ বছর অন্তর নির্বাচন হয়ে থাকে। হাউজ অব কাউন্সিলরস আপার হাউজের মেয়াদ ৬ বছরের। নির্বাহী ক্ষমতা মন্ত্রী পরিষদের হাতে ন্যস্ত। প্রধানমন্ত্রী এর প্রধান হিসাব কাজ করেন। মন্ত্রী পরিষদ ডায়েটের নিকট দায়বদ্ধ। এ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে স্বশাসিত প্রশাসন ব্যবস্থা রয়েছে।

জাপানের বর্তমান সম্রাট আকিহিতো ১৯৮৯ সালের ৭ই জানুয়ারি এ পদে অভিষিক্ত হন। তাঁর স্ত্রী সম্রাজ্ঞী মিচিকো। আকিহিতো প্রেম করে বিয়ে করেছেন মিচিকোকে। তাঁদের তিন সন্তান। বড় ছেলে ক্রাউনপ্রিন্স নারিহিতো (প্রিন্স হিরো নামে অধিক পরিচিত)। নারিহিতোও দীর্ঘদিন প্রেম করেছেন জাপানের সাবেক পররাষ্ট্র উপমন্ত্রীর কন্যা ওয়াদার সাথে। পরে তাঁরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। দু’জনই পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষত। ওয়াদা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কূটনীতিক হিসাবে কাজ করতেন। এখন সম্রাট পরিবারের কঠোর বিধিনিষেধ মেনে চলতে হয়। আনুষ্ঠানিক বা রাষ্ট্রীয় কোন কর্মসূচি ছাড়া জনসমক্ষে তাঁদের দেখা যায় না। সম্রাট ও সম্রাজ্ঞীর অপর দুই সন্তানের একজন প্রিন্স ফুমিহিতো (প্রিন্স আইয়া নামে পরিচিত)। অপর জন কন্যা প্রিন্সেস মাইয়াকো (প্রিন্সেস নূরী নামে পরিচিত)। সম্রাট আকিহিতোর ছোট ভাই প্রিন্স হিটাচী। স্ত্রী হানাকু। ডায়েট হচ্ছে জাপানের রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। আইন প্রণয়নের একচ্ছত্র ক্ষমতা ডায়েটের। হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ ও হাউজ অব কাউন্সিলের সমন্বয়ে গঠিত ডায়েট। হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভের বর্তমান সদস্য সংখ্যা ৫১২। আর হাউজ অব কাউন্সিলের আসন সংখ্যা ২৫২। হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিবের সদস্যরা সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন। দেশের ১৩১টি আসন থেকে ৫১২ জন সদস্য নির্বাচিত হন। কোনও কোনও আসন থেকে ৬ জন আবার কোনও আসন থেকে ২ জন নির্বাচিত হয়ে থাকেন। জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। এতে একই আসনে একই পার্টির একাধিক প্রার্থী থাকে। এক পার্টির একাধিক প্রার্থীও নির্বাচিত হয়ে থাকেন। জাপানের রাজনৈতিক দলগুলোতে উপদল স্বীকৃত। কোনও কোনও দলে ৬টি উপদলও রয়েছে। যে কারণে একটি আসন থেকে ৬ জন পর্যন্ত সদস্য নির্বাচিত হওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। ৬ সদস্যের আসনে একটি পার্টি থেকে ৬ জনকে মনোনয়ন দেয়া হয়। আসনের ভোটাররা তাদের পছন্দমত ৬ জনকে ভোট দেন। প্রাপ্ত ভোটের ক্রমানুসারে প্রার্থীদের নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। এতে দেখা যায় যে কোনও একটি আসন থেকে একই দলের ৬ জন প্রার্থীও বিজয়ী হন। আবার কোনও আসনে বিভিন্ন দলের মধ্যে সদস্য ভাগাভাগি হয়। জাপানের এ বহু সদস্য বিশষ্টি আসন ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক বিভিন্ন কেলেংকারির জন্য দায়ী করা হয়ে থাকে। কেননা একই দলের মধ্যে স্বীকৃত উপদল থাকায় নেতৃত্বেও কোন্দল দেখা যায়। তাছাড়া প্রত্যেক উপদলের নেতারা আলাদা আলাদাভাবে কর্মসূচি পালনসহ অর্থ সংগ্রহ করে থাকেন। রাজনীতির জন্য চাঁদা আদায় জাপানে বৈধ। তবে এজন্য সীমা নির্ধারণ করা আছে। কোন সংস্থার কাছ থেকে এককালীন (১৯৯২ সালের তথ্য মতে) ১ লাখ ৫০ হাজার ইয়েনের বেশি চাঁদা গ্রহণ করা যাবে না। বর্তমানে এ পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে কিনা জানা সম্ভব হয়নি। চাঁদা আদায়ের পরিমাণ নির্ধারিত থাকলেও এ নিয়ম মানা হয় না বলে অভিযোগ। বড় বড় ব্যবসায়ীরা, শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকরা ক্ষমতাসীন নেতাদের বিপুল অংকের চাঁদা দিয়ে থাকেন গোপনে। বিনিময়ে তারা ব্যবসায়িক সুবিধা হাসিল করে নেন। বেশি চাঁদা গ্রহণ ও দেয়ার ঘটনা ধরা পড়লে শাস্তির বিধান আছে। ক্ষমাতসীন থাকাকালীন এলডিপি’র বড় উপদলের নেতা শিন কেনেমারু গোপনে বেশি চাঁদা গ্রহণ করে ধরা পড়েছেন। জাপানে এ নিয়ে মহা হৈ-চৈ হয়। ক্ষমাতার দাপটের কারণে আদালতকেও তিনি অগ্রাহ্য করতে থাকেন। আমার টোকিও অবস্থানকালে প্রতিদিনই তাঁর সম্পর্কে সংবাদপত্রে খবরাখবর ছাড়া হত। পরে কেনেমারু আদালতে আত্মসমর্পণ করে বিচারের সম্মুখীন করা হয়।

হাউজ অব কাউন্সিলরের সদস্য সংখ্যা ২৫২। ৬ বছরের জন্য তাঁরা নির্বাচিত হন। তিন বছর পর পর কউন্সিলরের অর্ধেক সদস্য পরিবর্তন হয়ে নতুন সদস্য নির্বাচিত হয়ে থাকেন। হাউজ অব কাউন্সিলরের একশ’ সদস্য জাতীয় আসনগুলো থেকে নির্বাচিত হন। আর ১৫২ সদস্য নির্বাচিত হন ৪৭টি প্রিফোকচার (জেলা) আসন থেকে। হাউজ অব কাউন্সিলর এবং হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ এক সাথে বিভিন্ন সময়ে সাধারণ, এক্সট্রা অর্ডিনারী এবং বিশেষ অধিবেশনে মিলিত হয়ে থাকে। ডায়েটর সাধারণ অধিবেশন বছরে একবার আহ্বান করা হয়ে থাকে এবং চলে ১৫০ দিন। সাধারণ অধিবেশনেই বাজেট পেশ করা হয়ে থাকে। হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভের ক্ষমতার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মন্ত্রী পরিষদের বিরুদ্ধে অনাস্থা এবং আস্থা জ্ঞাপন। হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভের কার্যক্রম পরিচারনার দায়িত্ব স্পীকার এবং ভাইস স্পীকারের। অপরদিকে হাউজ অব কাউন্সিলের রয়েছে প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট। জাপানি ২০ বছরের সকল নাগরিকই ভোটদানের অধিকারী। ২৫ বছর বয়সীরা হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ এবং ৩০ বছর হলে হউজ অব কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচনের প্রার্থী হওয়ার যোগ্য।

জাপানের রজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ৬টি দল রয়েছে মোটামুটি বড় ধরনের। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), জাপান সোস্যলিস্ট পার্টি, কোমিওতো পার্টি, ডেমোক্রেটিক সোস্যালিস্ট পার্টি, জাপান নিউ পার্টি, জাপান কমিউনিস্ট পার্টি এবং ইউনাইটেড সোস্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাসীন এলডিপি’র নেতৃত্বে জাপান উন্নতির শিখরে পৌঁছে। কিন্তু তাদের শাসনের শেষ দিকে উন্নয়নের গতি থেমে যায়। দেখা দেয় বেকারত্ব। রাজনৈতিক অস্থিরতা। অহমিকায় পেয়ে বসে এলডিপি’কে। যে কারণে ১৯৯৩ সালের নির্বাচনে এলডিপি’র বিপর্যয় ঘটে। বিরোধীরা মিলে কোয়ালিশন সরকার গঠন করে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পায়।

রাজধানী টোকিওতে সরকারি অফিসগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবস্থিত। মন্ত্রণালয়গুলো আমাদের দেশের মত একই স্থানে নেই। আলাদা আলাদা ভবনে দূরে দূরে। আমাদের সচিবালয়ের মত বিরাট স্থান জুড়ে এক একটি মন্ত্রণালয়। অনেক বড় বড় ভবন। সামনে প্রচুর ফাঁকা স্থান। টোকিওতে জমির মূল্য ও বাসা ভাড়া অস্বাভাবিক বেশি। তাই রাজধানীসহ জাপানের বিভিন্ন স্থানে সাধারণ নাগরিকরা বাস করে ছোট ছোট ফ্ল্যাট কিংবা বাসায়। বাসায় জায়গা খুবই কম। সরকারি অফিসগুলো এর ব্যতিক্রম। বিশাল বিশাল অফিস। তবে অফিসগুলোতে বড় বড় হলরুমের মত রুমে বসে কর্মকর্তা, কর্মচারীরা এক সাথে কাজ করে। প্রত্যেকের টেবিলই কম্পিউটার। বড় বড় কর্তাদের আলাদা চেম্বার আছে। তবে চেম্বার ্আকারে খুব বড় নয়। অফিসগুলোতে আমাদের দেশের মতো পিয়ন নেই। যার যার কাজ নিজেরই করতে হয়। চা-নাস্তা খেতে হলে কেন্টিন আছে কিংবা রয়েছে ব্রেন্ডিং মেশিন।

১৮ই সেপ্টেম্বর সকালে রাজনীতির ওপর সেমিনার শেষে অপরাহ্নে আমরা জাপান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যাই। প্রেস সেন্টার থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বেশি দূরে নয়। কোয়ার্টার মাইল হবে। তাই হেঁটেই যাত্রা। টোকিও-র রাস্তায় রাস্তায় হাঁটার মানুষের ভিড়। পা বাড়ালেই ট্রেন ধরা যায়। সকলরেই গাড়ি আছে। জাপানে প্রতি নাগরিক পিছু গাড়ির সংখ্যা দেড়টি। তবুও সবাই হাঁটে। রাস্তা দিয়ে এত গাড়ি চলে যে ট্রাফিক জ্যামের কারণে গাড়ি ব্যবহার করতে চায় না অনেকে। তবে ট্রেনে চড়া লোকের সংখ্যা বেশি। বেশিদূরে নয় বলে আমরা হেঁটেই রওনা দিই। আমাদের সাথে ছিলেন ফরেন প্রেস সেন্টারের সেমিনার সমন্বয়কারী মি. কোজিমা সান। আগেই আমাদের আসার কর্মসূচি নির্ধারিত ছিল। কোজিমা সান সিকিউরিটির লোকদের সাথে আমাদের আসার কথা বলে নিয়ে বসালেন অর্ভ্যর্থনা কক্ষে। নিচের তলার অভ্যার্থনা কক্ষে দেখলাম বেশ কিছু টেলিভিশন ক্রু বসে আছেন। তাঁরা পররাষ্ট্র মন্ত্রীর সাক্ষাৎকার নেবেন। বিবিসি’র স্টাফ। লন্ডন থেকে এসেছে। আরও অনেক দেশি-বিদেশি লোক বসা ছিলেন। কাউন্টারে দু’জনে মহিলা পরিচয় জেনে ভিতরে প্রবেশের সিকিউটিটি পাস দিচ্ছিলেন। কোজিমা সান আমাদের ১০ জনের জন্য পাস আনলেন। আমরা লিফটের দিকে এগিয়ে গেলাম। লিফট সব অটোমেটিক। অপারেটর নেই। ৬ তলায় নামার পর মি. কোজিমা আমাদের দক্ষিণ এশীয় ৫ জনকে এবং আফ্রিকান ৫ জনকে আলাদা করে ফেললেন। কারণ আলাদা আলাদা কর্মসূচি নির্ধারিত। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রয়েছে পৃথক পৃথক দেশের জন্য পৃথক পৃথক অফিস। কর্মকর্তারা আলাদা। সংশ্লিষ্ট দেশসমূহের এক একজন বিশেষজ্ঞ সেসব দেশের সকল খবর রাখেন।

আমাদের দক্ষিন এশীয় ৫ জন সাংবাদিককে দক্ষিণ এশীয় দেশসমূহের অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। এ বিভাগের উপ-পরিচালক গৎ. ঐরফবহনঁ ঝযড়নধংযরসধ. একটি ছোট্ট সম্মেলন কক্ষে আমাদের বসার ব্যবস্থা। সংশ্লিষ্ট দেশসমূহের জাপানি অর্থ সাহায্য এবং বিভিন্ন সংস্কার কার্যকমের সুপারিশমালা সংক্রান্ত রিপোর্ট এবং নিজ নিজ দেশের ব্যাপারে তাদের সাহায্য সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কাগজপত্র সরবরাহ করা হয়। জাপানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিছুদিন পর পরই বিভিন্ন দেশের উপর পর্যালোচনা মূল্যায়নপূর্বক মূল্যায়ন রিপোর্ট তৈরি করে। ঝযড়নধংযরসধ উন্নয়শীল দেশসমূহের ব্যাপারে জাপানি দৃষ্টিভঙ্গী, সাহায্যের ব্যাপারে তাদের নীতি ব্যাখ্যা করে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। তিনি জানান যে, জাপান এখন তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত দেশসমূহের সর্বোচ্চ সাহায্যদাতা। তাদের সাহায্যের সাথে গণতন্ত্র ও উন্নয়ন সম্পর্কযুক্ত। তাঁর বক্তব্যের পর সাংবাদিকরা তাঁদের নিজ নিজ দেশের সমস্যা নিয়ে জাপানি মনোভাব সম্পর্কে জানতে চান। ঝযড়নধংযরসধ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যান। তাঁর উত্তরে স্পষ্ট যে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকটি দেশের প্রতিটি বিষয় তাঁর নখদর্পণে।

পাকিস্তানের হাশমী এক পর্যায়ে কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন করেন। আর এতে ভারতের সুনীল পাল্টা প্রশ্ন করেন। আমার এক পাশে ছিল হাশমী, অন্য পাশে সুনীল। হাশমীর প্রশ্নের সাথে সাথে সুনীল আমার দিকে চেয়ে বলতে থাকে, পাকিস্তানিরা সুযোগ পেলেই কাশ্মীর প্রসঙ্গ টেনে আনে। দুজনের পাল্টাপাল্টি প্রশ্নে উত্তেজনা ভাব। দক্ষ কূটনীতিক বুঝতে পেরে উত্তরও দিয়েছিলেন কূটনৈতিক চালে। যাতে কেউই অখুশি হতে পারেনি। মাঝে আমি রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা সম্পর্কে জাপানের দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চাইলে কূটনীতিক যেন রেহাই পেলেন। তিনি জবাব দিলেন বাংলাদেশের জন্য এটি বড় সমস্যা। তবে এ সমস্যা বাংলাদেশ ও মায়নমার একত্রে বসে সমাধান করুক এটাই কাম্য। জাতিসংঘের উদ্বাস্তুবিষয়ক হাইকমিশন (ইউএনএইচআর) এ ব্যপারে মধ্যস্থতা করতে পারে। ইউএনএইচআরের মধ্যস্থতায় সুন্দর ফয়সালা হতে পারে। আমি যখন জাপান সফরে যাই, তখন কাফকো সমস্যা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বেশ মনোমালিন্য। এমনকি কিছুদিন আগে তৎকালীন পাটমন্ত্রী হান্নান শাহ (মরহুম) জাপান সফরকালে বেশ সমস্যায় পড়েন। যে কারণে দেশে জরুরি টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন। আমি কাফকো সমস্যা সম্পর্কে তাদের সর্বশেষ অবস্থান জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন আর তেমন সমস্যা নেই। বাংলাদেশ জাপানের কথা মতো খবঃঃবৎ ড়ভ মঁৎধহঃবব দিতে রাজি হয়েছে। আর জাপানও আগের চেয়ে শর্ত কিছুটা শিথিল করেছে। তিনি আশা করেন যে, ভবিষ্যতে আর কোনো সমস্যা হবে না। শ্রীলঙ্কার শান তামিল গেরিলাদের ব্যাপারে জাপানের ভূমিকা জানতে চান। আর নেপালের রাই জানতে চান তাদের কাঠমান্ডু বিমানবন্দরে রাডার স্থাপন প্রকল্পের জন্য নেপাল সরকার যে অর্থ সাহায্য চেয়েছে, তা কবে নাগাদ পাওয়া যাবে। রাই জানালেন কাঠমান্ডু বিমানবন্দরে রাডার না থাকার কারণে বিমান ওঠা-নামায় বেশ অসুবিধা হয়, দুর্ঘটনা ঘটে। তাঁর বক্তব্যের সত্যতা পাই আমরা জাপান থাকার সময়ই। পাকিস্তানি একটা বিমান সে সময় কাঠমান্ডু বিমানবন্দরের সন্নিকটে দুর্ঘটনায় পড়ে এবং সব যাত্রী নিত হয়। ঝযড়নধলংযরসধ রাইকে জানিয়েছিল শীঘ্রই জাপান এ ব্যাপারে অর্থ সাহায্য দেবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বের হতে সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়ে আসে। ততক্ষণে আমাদের আফ্রিকান বন্ধুরা চলে গেছেন। এশিয়ান পাঁচজন আমরা হাঁটতে থাকি। হাঁটতে হাঁটতেই সিদ্ধান্তে আসতে চেষ্টা করি, রাতের খাবার কোথায় সেরে নেয়া যায়। হাঁটতে হাঁটতে আমরা একটি পার্কে এসে উপস্থিত হলাম। পার্কের নাম হিবিয়া পার্ক। গাছপালা আমাদের দেশের মতোই। তবে ছিমছাম পরিষ্কার। বড় বড় গাছপালাও এমন করে ছেঁটে রাখা হয়েছে, যাতে জঙ্গল মনে হয় না। আর বসার ব্যবস্থা খুব সুন্দর। পরিবার-পরিজনদের নিয়ে কিছু কিছু লোকজনকে পার্কে দেখা যায়। তবে তরুণ-তরুণীর সংখ্যা বেশি। প্রেমিক যুগল। আমাদের পার্কগুলোতে যেমন অসংখ্য লোকজন বেড়াতে যায় টোকিওতে এমন মনে হয়নি। অভিজাত এলাকার বিখ্যাত পার্ক এই হিবিয়া পার্ক। আমরা কতক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে খুঁজতে থাকি জাপান ফরেন প্রেস ক্লাব। হিবিয়া পার্ক এলাকায়ই এ ক্লাবের অবস্থান। সবাই এ সিদ্ধান্তে আসি, সেখানে গেলে রাতের খাবারও হবে আর ফরেন প্রেস ক্লাবও দেখা যাবে। জাপানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অনেক সাংবাদিক কর্মরত। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর অফিস আছে। এ ছাড়া বিশে^র বড় বড় পত্রিকার প্রতিনিধি আছে। বহুজাতিক খ্যাতিসম্পন্ন টিভির অফিসও আছে। এসব বিদেশি সাংবাদিক গড়ে তুলেছেন ফরেন প্রেস ক্লাব। একটু খোঁজাখুঁজি করতেই আমরা ক্লাব পেয়ে যাই। টোকিওর ২০ নম্বর গিনজার একটি বহুতল ভবনের ২০ তলায় এ ক্লাব। এ ২০ নম্বর ঠিক রাখতে ফরেন প্রেস ক্লাব কর্তৃপক্ষকে অধিক অর্থ দিতে হয়েছে বাড়িওয়ালাকে। জাপানে কর্মরত বিদেশি সাংবাদিকরা ছাড়াও বিদেশের বিভিন্ন সংবাদপত্র, সংবাদ সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমের জাপানি প্রতিনিধিরাও এ ক্লাবের সদস্য। আমরা কাউন্টারে যেয়ে পরিচয় দিয়ে ক্লাবের অতিথি কার্ড দেখাতেই অভ্যর্থনা থেকে আমাদের ভেতরে যেতে বলা হয়। সেদিন আবার ক্লাবের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টের সংবর্ধনা ছিল, তাই ভিড়। প্রেস ক্লাবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কম্পিউটার টেলেক্স, ফ্যাক্স দেখতে পাই। বিদেশি সাংবাদিকরা তাঁদের ইচ্ছেমতো এখান থেকে সংবাদ পাঠাতে পারেন। ক্যান্টিন, বার, লাইব্রেরি, কনফারেন্স রুমসহ আরো অনেক ধরনের রুম। আমাদের পূর্ব পরিচিত কেউ ছিল না, তাই কার সাথে কথা বলব। এদিক সেদিক ঘোরাঘুরি করছিলাম। এক সময় সুনীল বলল, তাদের দেশের একজন সংবাদিক দীর্ঘদিন ধরে জাপানে আছেন। তিনি দৈনিক হিন্দু-এর প্রতিনিধি। মি. মুখার্জী। টোকিওতে কোনো সংবাদপত্র বা সংবাদ সংস্থার প্রতিনিধি রাখা বা অফিস রাখা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপালের মধ্যে একজনই মাত্র প্রতিনিধি আছেন। আমরা তাঁর খোঁজ করলাম। কাউন্টারে বলতে মাইকে ঘোষণাÑমুখার্জীর অতিথি অপেক্ষা করছেন। ফরেন প্রেস ক্লাবের প্রতি রুমে রুমে মাইক লাগানো আছে, কারো খোঁজ করতে হলে মাইকে ঘোষণা দেয়া হয়। আমরা ঘোষণার পর অপেক্ষা করছিলাম। পাঁচ মিনিট পর এক বৃদ্ধ এগিয়ে এসে আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন। তিনিই মুখার্জী। সুনীল কথা বলল প্রথম। পরে সবার সাথে পরিচয়। তিনি আমাদের নিয়ে গেলেন ক্যান্টিনে। তাঁর হাতে সময় কম। তাই কথা বেশি হলো না। তিনি চলে যাওয়ার পর আমরা বেয়ারা ডেকে খাবারের মেন্যু জানতে চাইলাম। মেন্যু বই পাওয়ার পর পছন্দমতো অর্ডার দিয়ে খাবার সেরে নিলাম ফরেন প্রেস ক্লাবে। ক্লাবে জাপানি, পশ্চিমা ও এশিয়া সব ধরনের খাবার আছে। কোনো সমস্যা নেই। খাবার সেরে সাড়ে ৯টার দিকে আমরা হোটেলে ফিরে আসি।

জাপানে শনি ও রোববার দুদিন সাপ্তাহিক ছুটি। কার্যদিনগুলো যেমন কর্মচঞ্চল থাকে, পদভারে অফিস-আদালত ভরে ওঠে, রাস্তায় ট্রাফিকজ্যাম, ভিড় লেগেই থাকে। ছুটির দিন ঠিক এর বিপরীত। মানুষ ও গাড়ি চলাচল কম। বড় বড় অট্টালিকার অফিসগুলো দেখে মনে হয় না এগুলোতে আলো জ¦লে। সপ্তাহে পাঁচ দিন অক্লান্ত পরিশ্রমের পর দুদিন আমোদ-প্রমোদ করে বিশ্রাম করে। বাড়ির কাজকর্ম করে। রাজধানী টোকিওসহ বড় বড় শহরের পার্ক, জাদুঘর, চিড়িয়াখানা আনন্দ ভ্রমণ এলাকায় নারী-পুরুষ-শিশুর ভিড় হয় ভীষণ। আর অনেকে রাজধানী কিংবা শহর থেকে দূরে গ্রামে চলে যায়। ছুটি কাটিয়ে ফেরে শহরে। বারে-ক্লাবে সময় কাটায় অনেকে। পাঁচ দিন যে পরিমাণ পরিশ্রম করে দুদিনের আনন্দ ফুর্তি শেষে আবার নতুন প্রেরণায় কাজে লেগে যায়। চলবে...

আরও পড়ুন- চেরি ফুলের দেশে (পর্ব - ৫)

বাংলাদেশ জার্নাল/আর

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত