ঢাকা, সোমবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২১, ১১ মাঘ ১৪২৭ আপডেট : কিছুক্ষণ আগে English

প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০২১, ০০:২৮

প্রিন্ট

চেরি ফুলের দেশে

চেরি ফুলের দেশে

-শাহজাহান সরদার

১৫. ওকাইয়ামা

৩০ সেপ্টেম্বর বুধবার। হিরোশিমা গ্র্যান্ড হোটেল থেকে ট্যাক্সিযোগে রেল স্টেশনে এসে পৌঁছি ৮টায়। সোয়া ৮টায় ট্রেনে উঠে ওকাইয়ামার উদ্দেশ্যে যাত্রা। আমরা যে ট্রেনে উঠে যাত্রা করি জাপানি ভাষায় একে বলা হয় শিনকানসেন। বুলেট ট্রেন হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত। বুলেটের গতিতে চলে বলে একে বুলেট ট্রেন বলা হয় দূরের ভ্রমণের জন্য জাপানি ও বিদেশিরা এ ট্রেনে চড়ে থাকে। ভিতরের আসন বিমানের মতো। দূর-দূরান্ত থেকে বুলেট ট্রেন দিয়ে জাপানিরা বিভিন্ন শহরে যেয়ে অফিস করে। কিছুদিন আগে এ ট্রেনের গতি ছিল ঘণ্টায় ৩শ’ কিলোমিটার। সম্প্রতি সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে ৩শ’ ৪০ কিলোমিটার গতিতে শীঘ্রই এ ট্রেন চলবে। ভবিষ্যতে এর গতি আরও বাড়ানোর পরীক্ষা চলছে। বিমানের বিভিন্ন ইঞ্জিন ট্রেনে ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে।

জাপানের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগর ওসাকা হতে ৫শ’ ৪০ কিলোমিটার রাস্তা মাত্র পৌনে দু’ঘন্টা সময়ে পার হয়ে অনেকে টোকিওতে এসে দৈনিক অফিস করে। মোটামুটি সকল বড় বড় শহরের সাথে বুলেট ট্রেনের সংযোগ আছে। স্টেশনগুলো বিরাট বিরাট। সব কম্পিউটারাইজড। স্টেশনে এসে আপনা-আপনি ট্রেনের দরজা খুলে যায় লাইন ধরে যাত্রীরা অপেক্ষা করে। টিকিটেই দরজার নম্বর থাকে। কাজেই যাত্রীরা নির্দিষ্ট দরজায় লাইন ধরে। কোনো হৈচৈ নেই। দৌঁড়াদৌঁড়ি নেই। সারা জাপানে এমনিতে রেলব্যবস্থা ভীষণ উন্নত। শহরগুলোতে পাতাল রেল। আর বাইরে সাধারণ রেল। এর মধ্যে বুলেট ট্রেন এক যুগান্তকারী সৃষ্টি। বুলেট ট্রেন ওকাইয়ামা স্টেশনে এসে পৌঁছে ৪৫ মিনিটের মধ্যে।

ওকাইয়ামা ছোট্ট শহর। লোকসংখ্যাও কম। কিন্তু কৃষি উৎপাদিত পণ্যের বাজার, সামুদ্রিক মৎস্য বাজারজাতকরণ এবং সেতুর জন্য ওকাইয়ামা বিখ্যাত। আর ঐতিহাসিক স্থান বটে। খুবই নিরিবিলি শহর, সবুজের সমারোহ। ট্রেন থেকে নেমেই পরিচয় হয় পাকিস্তানি নাগরিক মোহাম্মদ রইসের সঙ্গে। তিনি ওকাইয়ামায় বিখ্যাত শিল্প প্রতিষ্ঠান, ওষুধ ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান হায়াসাইবারা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (জনসংযোগ)। রইস আগে বাংলাদেশে ছিলেন। আশুগুঞ্জ সার কারখানা নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ফস্টার হুইলারে কর্মরত ছিলেন ঢাকায়। তিনি ঘোড়াশালেও কিছুদিন কাজ করেন। জাপানি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হয়ে তিনি বাংলাদেশে কাজ করেন। গত ১০ বছর ধরে আছেন ওকাইয়ামায়। ওকাইয়ামায়ই ছেলে-মেয়েসহ থাকেন। তিনি জাপানি ভাষায় অনর্গল এমন কথা বলতে পারেন যাতে অনেক জাপানীও হার মানে। রইস গাড়ি নিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ওকাইয়ামায় হোটেলে না গিয়ে সরাসরি আমরা যাই জাপানের এবং বিশ্বের দীর্ঘতম রেল সেতু হনসু-শিকুকু সেতু দেখতে।

জাপানের বড় চারটি দ্বীপের মধ্যে দুটি দ্বীপের সংযোগ সেতু এটা। প্রথমে আমরা যাই ওকাইয়ামায় সেতু কর্তৃপক্ষের অফিসে। দীর্ঘ ৩৭ কিলোমিটারের সেতুতে যানবাহন সঠিকভাবে চলছে কিনা বা কোনও সমস্যা হচ্ছে কিনা তা দেখার জন্য দিবানিশি কর্মচারীরা কাজ করছেন। কতৃৃপক্ষ অফিসে কম্পিউটার সংযোজন করে কম্পিউটারে সার্বক্ষণিক মনিটর করা হচ্ছে কোথায় কীভাবে কোন যানবাহন চলছে। সেতুর উপর দিয়ে গাড়ি চলে আর নিচে ট্রেন। ১৯৭৮ সাল থেকে ১০ বছর ৯০ লাখ শ্রমিক কাজ করে এ ব্রিজ নির্মাণের পর যানবাহনের জন্য খুলে দেয়া হয় ১৯৮৮ সালে। ৬টা ব্রিজের সমন্বয়ে হনসু-শিকুকু সেতু কর্তৃপক্ষ। সংক্ষেপে এ ব্রিজকে ‘সেতু’ বলা হয়ে থাকে। কর্তৃপক্ষ অফিসে বসে পরিচালনা ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ করা হয়।

আমরা সেখান থেকে ব্রিজের উপর দিয়ে বাসে করে ফিশারম্যান ভিলেজ-এ যাই। এ ভিলেজে মৎস্যজীবীরা থাকে। কিন্তু ভিলেজ বলে মনে হয় না। পুরো শহর। প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক এখানে আসে। ভিলেজের নদীর পারে রয়েছে ওকাইয়ামা মৎস্যজীবীদের কেন্দ্র। এতে বেশ কিছু দেশি-বিদেশি খাবারের হোটেল বিভিন্ন ধরনের হিমায়িত ও তৈরি মাছে খাবার, কাঁচা মাছ সহ অনেক দোকানপাট, পর্যটকদের আকর্ষণের জন্য নাচগানের ব্যবস্থা। আমরা ঘুরাঘুরি করি। কথা হয় ফিশারম্যানদের সাথেও। গভীর সমুদ্র থেকে মাচ ধরে আনেন তারা। কিন্তু মৎস্যজীবীর মতো নয়। আমাদের শহুরে বাবুর চাইতেও বেশভূষায় অনেক পরিপাটি। দুপুরে আমরা ফিশারম্যান ভিলেজের জাপানি স্টাইলের এক হোটেলে মাছ দিয়ে তৈরি বিভিন্ন ধরনের খাবার খাই। তারপর নৌবিহার। ফিশারম্যান ভিলেজের নদীতে অসংখ্য ছোট বড় নৌবিহারের জাহাজ ও নৌকা প্রতিনিয়ত চক্কর দিচ্ছে। আমরাও একটা জাহাজে চড়ে ঘণ্টাখানেক নদীতে ঘোরাফেরা করি। গ্রামের দিকে যাই।

নদীতে মাছ ধরা শেষ করে ফিরে এসে আবার ভিলেজে। নদীর নীল পানিতেও স্বচ্ছতা স্পষ্ট। এখানে অনেক মানুষের বাড়ি। বের হয়ে আসার একমাত্র যানবাহন নৌকা। কিন্তু কোনো অসুবিধা হয় না। সার্বক্ষণিক প্রহরা। টাইফুন এগিয়ে এলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। ওকাইয়ামা মৎস্য ভিলেজ থেকে জাপানের বিভিন্ন স্থানে মাছ সরবরাহ করা হয়ে থাকে। পরে মৎস্য ভিলেজ থেকে জাপানের বিভিন্ন স্থানে মাছ সরবরাহ করা হয়ে থাকে। পরে মৎস্য ভিলেজ থেকে বাসে করে কয়েক কিলোমিটার দূরে নতুন নির্মাণ করা রেল স্টেশনে পৌঁছি। পাশেই ওকাইয়ামা বিখ্যাত নদীবন্দর। বন্দরেও এক চক্করের সুযোগ পাই। ওকাইয়ামায় লবণ উৎপাদন হয় প্রচুর। তাই গড়ে উঠেছে অনেক লবণ কারখানা। ওকাইয়ামা বন্দরে সাধারণত বিদেশ থেকে তেল এসে থাকে। তাই রয়েছে বড় বড় তেল শোধনাগার। সেতু ব্রিজের উপর দিয়ে বাসে ওকাইয়ামা বন্দর, নতুন রেলস্টেশন ঘুরে আমরা নিচে রেললাইন দিয়ে ফিরে আসি শহরে। ট্রেনে আসার সময় নদী দেখা যায় কাছ থেকে। আর বাসে অনেক উপর থেকে। দীর্ঘ এ সেতু না দেখলে বোঝার কোনও উপায় নেই কীভাবে এটা তৈরি সম্ভব হয়েছে। অনেক উঁচু এ সেতুর ওপর দাঁড়ালে মাথা চক্কর দেয়। সেতু দেখে আমরা আসি হেড অফিসে। বিকেল হয়ে গেছে। সেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর। প্রবেশপথে স্বাগত জানান তিনিই। পরে সংক্ষেপে বর্ণনা দেন কোম্পানির।

এ কোম্পানির ১৯টি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান আছে। হায়াসাইবারা নামক এক ব্যক্তি ১৮৮৩ সালে এ প্রতিষ্ঠান চালু করেন। সামাজিকভাবে দয়ালু ও নৈতিকতাবোধসম্পন্ন ব্যক্তিটি দরিদ্রের চিকিৎসার জন্য প্রতিষ্ঠান থেকে সস্তায় ওষুধ সরবরাহের জন্য উদ্যোগী হন। পরবর্তীতে এ কোম্পানি মানুষের বিভিন্ন জটিল রোগ ক্যান্সার, যক্ষ্মা ও এইডস-এর মৌলিক ওষুধ উৎপাদন শুরু করে। তাদের তিনটি মৌলিক গবেষণা প্রতিষ্ঠা আছে। মানবদেহের কোষ নিয়ে গবেষণা অন্যতম কার্যক্রম। বর্তমানে এ কোম্পানির ওষুধ উৎপাদনের প্রতিষ্ঠান, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান। পঙ্গুদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে একটা ইলেকট্রনিক কোম্পানি। তারা রেডিও-টিভি সংযোজন করে থাকে। পরিদর্শনে দু’দিন রইস ছিলেন আমাদের সার্বক্ষণিক সঙ্গী। সারাক্ষণ আমাদের মাতিয়ে রাখতেন ভদ্রলোক। চলবে...

আগের পর্ব (১৪) পড়ুন

বাংলাদেশ জার্নাল/আর

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত