ঢাকা, বুধবার, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৫ মাঘ ১৪২৯ আপডেট : ৪৫ মিনিট আগে
শিরোনাম

এক মেঘলা দিনে হামহাম জলপ্রপাত

  নুসরাত তওরীন আহমেদ

প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০২২, ১৭:৩৭  
আপডেট :
 ০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ১৭:৫৬

এক মেঘলা দিনে হামহাম জলপ্রপাত
ফাইল ছবি
নুসরাত তওরীন আহমেদ

ভ্রমণ রসিকদের জন্য ঘুরে বেড়ানো এক প্রকার নেশা। সেই নেশার জেরে কারও গন্তব্য পাহাড় তো কেউ বা আবার সমুদ্র প্রেমি। কেউ ঘুরতে পছন্দ করে একা আবার কারও কাছে ঘুরতে যাওয়া মানেই বন্ধুর দলের আড্ডা। যাদের দুর্বলতা পাহাড় এবং জল তাদের ভালোবাসার এক জায়গা হতে পারে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি রিজার্ভ ফরেস্টের হামহাম জলপ্রপাত।

ঝরনার যৌবন হল বর্ষাকাল। ঝরনার ঝরে পড়া পানি জঙ্গলের ভিতর দিয়ে ঝিরি পথ তৈরি করে বয়ে চলেছে। এই রকম বিভিন্ন ছোট বড় ঝিরি পথ পেরিয়ে জঙ্গলের পথ পেরিয়ে ঝরনার কাছে পৌঁছাতে হয়। ঝরনায় যেতে হলে কুড়মা বন বিটের চাম্পারায় চা বাগান হয়ে যেতে হয়। চম্পারায় চা বাগান হতে ঝরনার দূরত্ব প্রায় ৭ কিলোমিটার। পথে অত্যন্ত খাড়া মোকাম টিলা পাড়ি দিতে হয় এবং অনেক ঝিরি পথ কাদামাটি দিয়ে পথ চলতে হয়। ঝিরি পথে কোথাও কোথাও চোরাবালিও তৈরি হয়, কিন্তু সেসকল স্থানে পর্যটকদের জন্য কোন নির্দেশিকা দেখা যায় না, সুতরাং আপনার নিজেকেই যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। এছাড়া গভীর জঙ্গলে বানর, সাপ, মশা এবং জোঁকের অত্যাচার সহ্য করে পথ চলতে হয়। বর্ষাকালে হামহামে যাবার কিছু আগে পথে দেখা পাওয়া যায় আরেকটি অনুচ্চ ছোট ঝরনার। হামহামের রয়েছে দুটো ধাপ, সর্বোচ্চ ধাপটি থেকে পানি গড়িয়ে পরছে মাঝখানের ধাপে এবং সেখান থেকে আবার পানি পড়ছে নিচের খাদে।

কমলগঞ্জের একেবারে শেষ গ্রামের নাম কলাবনপাড়া, যেটি তৈলংবাড়ি নামেও পরিচিত। বলতে গেলে এরপর থেকেই আর কোন জনবসতি নেই। আর এখান থেকেই শুরু হয় হামহাম যাওয়ার আসল অ্যাডভেঞ্চার। হামহাম যাওয়ার জন্য বনের ভিতরে দুটি পথ আছে। বনের শুরুতেই হাতের ডানে এবং বামে পাশাপাশি পথ দুটি। একটা দিয়ে যেতে হবে আরেকটা দিয়ে আসবেন। ডানের পথ দিয়ে ঢুকে বাম দিয়ে বের বের হবেন। এই ব্যবস্থাটি খুবই ভাল, কারণ ডানের পথটা দীর্ঘ এবং অনেক উঁচু টিলা ডিঙ্গাতে হয় যা ফেরার পথে পরলে খুবই কষ্ট হবে। হামহাম যাবার জন্য সাথে একজন গাইড নিয়ে যাওয়া অত্যাবশ্যক, কারণ যারা প্রথম বার যায় তাদের রাস্তা ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক। এছাড়া ভ্রমণের সময় পাহাড়ি পথে হাঁটার সুবিধার্থে এবং আত্মরক্ষার জন্য প্রত্যেকের সাথে বাঁশ নেয়া আবশ্যক। এছাড়া জোঁকের হাত থেকে রক্ষা পেতে সাথে করে লবণ ও সরিষার তেল নিয়ে নিলে ভাল। জারুল, চিকরাশি ও কদম গাছের ফাঁকে ফাঁকে রঙিন দানা মেলে দেয় হাজারো প্রজাপতি। চশমা বানরের আনাগোনা ডুমুর গাছের শাখায় চারদিকে গাছগাছালি ও প্রাকৃতিক বাঁশবনে ভরপুর এ বনাঞ্চল। ডলু, মুলি, মিটিংগা, কালি ইত্যাদি অদ্ভুত নামের বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশ এ বাগানগুলোকে দিয়েছে ভিন্ন এক রূপ। পাথুরে পাহাড়ের ঝিরি পথে হেঁটে যেতে যেতে সুমধুর পাখির কলরব মনকে ভাললাগার অনুভূতিতে ভরিয়ে দিবে। দূর থেকে কানে ভেসে আসবে বিপন্ন বন মানুষের ডাক। কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পর শুরুতে আপনার দুচোখের সামনে ভেসে উঠবে পাহাড় থেকে ধোঁয়ার মতো ঘন কুয়াশা ভেসে উঠার অপূর্ব দৃশ্য। এভাবেই হাঁটতে হাঁটতে একসময় জলপ্রপাতের কাছাকাছি চলে যাবেন আর কিছু দূর গেলেই শুনতে পাবেন হামহাম জলপ্রপাতের শব্দ। ওখানে গেলে আপনার ইচ্ছে হবে না চোখ সরাতে। মনে হবে অনন্তকাল দুচোখ ভরে দেখে নেই প্রকৃতির এই অপূর্ব সৃষ্টি। এই অদ্ভুত এক রোমাঞ্চকর পরিবেশে আপনি ভুলে যাবেন আপনি কোথায় আছেন, চারদিকে গহীন জঙ্গল, উপরে আকাশ, পায়ের নিচে বয়ে যাওয়া ঝির ঝির স্বচ্ছ পানির ধারা আর সামনে বহমান অপরূপ ঝরনা। বুনো পাহাড়ের ১৫০ ফুট উপর হতে গড়িয়ে পরা স্রোতধারা কলকল শব্দ করে এগিয়ে যাচ্ছে পাথরের পর পাথর কেটে সামনের দিকে তার গন্তব্য।

এমনি এক মেঘলা দিনে হামহামের উদ্দেশে যাত্রা শুরু। যাত্রার অবস্থানকাল ছিল কেবল একদিন। তবে হামহামে সৌন্দর্যে এক দিনে মন ভরবে না।

রাতে রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস আড্ডা থেকে রাত ১২টার বাসে সিলেটের শ্রীমঙ্গলের উদ্দেশে রওনা দিলাম। রাত ৩টায় পথে ২০ মিনিটের যাত্রা বিরতির পর আবার গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা।

বাক্তিগত ভাবে যাত্রায় আমার কখনো ঘুম আসে না সেই কারণে বাসের জানলা থেকে সূর্য উদয় দেখতে দেখতে ভোর ৬টায় শ্রীমঙ্গলে পৌঁছালাম। বাস থেকে নেমেই দেখি চান্দের গাড়ি অপেক্ষা করছে আমাদের।সেখানে ধানসিঁড়ি হোটেলে ধুঁয়া ওঠা খিচুড়ি সাথে মুরগির মাংশ দিয়ে নাস্তা সেরে হামহামে যাবার প্রস্তুতি। তবে বলে রাখা ভালো যদি পাহাড়ি পথে যাত্রা করেন তবে যতটুক সম্ভব ব্যাগ হালকা রাখবেন।

চান্দের গাড়ির ছাদে ওঠে বাতাসের বেগে সাথে পাল্লা দিয়ে পথে পাড়ি জমালাম। মাঝে কিছু সময় লাউওাছরা জাতীয় উদ্যানে থেমে আবার রওনা।

অবশেষে কলাবনপাড়া গ্রামে চলে আসলাম। নামতেই চোখে পড়ল বাঁশের লাঠি হাতে ছোট বাচ্চারা। ৫-১০ টাকা প্রতি পিস দামে লাঠি বিক্রি করে তারা। নিজেদের পছন্দ মতে কিনে নিতে পারেন।ব্যাতিক্রম না করে মজবুত লাঠি কিনে দিলাম হামহাম পাড়ি।

অবশ্যই সাথে গাইড ছিলেন। হামহামে গেলে সাথে লবণ ও হলুদ রাখবেন জোঁক থেকে রক্ষার জন্য। যেহেতু উঁচু নিচু বেশ কিছু পাহাড় চড়তে হবে তাই ভালো গ্রিপ সহ জুতো পড়বেন।

যত উৎফুল্লতা সহ রওনা দিয়েছিলাম ঠিক ততো তাড়াতাড়িই উচ্ছ্বাস হারিয়ে ফেললাম যখন মাঝ পথে পাহাড়ে বৃষ্টি নামতে শুরু করে। বৃষ্টির পানির জোরে পাহারে কাঁটা রাস্তা সমান হতে শুরু করে। তবুও সিদ্ধান্ত নেয়া হল না থেমে যাত্রা অব্যাহত রাখব। যে কথা সে কাজ করতে গিয়ে অবশ্য ২ থেকে ৩ বার ঢালু পাহাড়ে পরে যাতে হয়েছিলো। তবে মাথায় তখনও জলপ্রপাত দেখার নেশা কাজ করছিল।

ঝিরি পথের সামনে আসতেই অপেক্ষা করছিল ফ্ল্যাশ ফ্লাড। অতিরিক্ত মাত্রায় বৃষ্টি হওয়াতে পাহাড়ি ঢল নেমে ঝিরি পথে পানি ক্রমাগত বেড়ে যাচ্ছিল। গাইডের কথা মতো অপেক্ষা করেও খুব একটা কাজের আসে নাই। একবার ভাবলাম এবার হয়তো আর হামহাম দেখা হবে না। তার ঠিক পর মুহূর্তেই আবার ভাবলাম যত যাই হোক ঝর্ণাতে যেতেই হবে। আর কোন কিছু না ভেবে এক প্রকার জীবন মুখে নিয়ে নেমে পড়লাম সবাই ঝিরি পথে। প্রবল স্রোত যেন ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। একে অনন্যের হাত ধরে ১০ মিনিট যাবার পর কানে ভেসে আসতে শুরু করল ঝর্নার শব্দ।

সেই শব্দ যেন হারিয়ে যাওয়া মনোবল ফিরিয়ে দিলো।এরপর প্রতীক্ষার প্রহর শেষ সামনেই ভরা যৌবন সহ হামহাম জলপ্রপাত। ভয়ংকর সেই সৌন্দর্য সামনে দেখতে পেরে যেন সব কষ্ট সার্থক।

ঝর্ণা থেকে ফিরে এসে কলাবনপাড়া গ্রামেই সেরে ফেলতে পারবেন দুপুরের খাবার। তবে হামহামে যাবার আগে নিজেদের খাবার অর্ডার করে যেতে হবে।সেখানেই থাকছে গোসলের ব্যবস্থাও তবে সে ক্ষেত্রে গুনতে হবে জনপ্রতি ২০-৪০ টাকা।

দুপুরের খাবারে থাকছে সাদা ভাত, আলু ভর্তা, শাক ভাজি, ডাল, মুরগির মাংসের ঝোল এবং ভিন্নধর্মী চা-পাতার ভর্তা।

হামহামে যাবার আগে অবশ্যই কিছু সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে কলাবনপাড়ার স্থানীয়দের কাছ থেকে ভালো-মন্দ জেনে যাওয়া উচিৎ।সঙ্গে শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ পানি আর খাবার স্যালাইন রাখতে ভুলবেন না। জীবাণুনাশক ক্রিম আর তুলা সঙ্গে নেবেন। আর খুব সাবধানে চলাফেরা করতে হবে। অবশ্যই গাইড নিয়ে যাওয়া উচিত।

বাংলাদেশ জার্নাল/নুসরাত/এমএস

  • সর্বশেষ
  • পঠিত