ঢাকা, বুধবার, ২০ নভেম্বর ২০১৯, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ আপডেট : কিছুক্ষণ আগে English

প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০১৯, ১৫:৩৩

প্রিন্ট

অনন্ত যৌবনা সাঙ্গু

অনন্ত যৌবনা সাঙ্গু
আশিক সারওয়ার

চলতে চলতে আমরা আন্ধারমানিক অঞ্চলে এসে পড়েছি, সে এখানে আরো ঐশ্বর্যবতী হয়ে উঠছে, স্চ্ছ শংখের জলের রঙে সবুজ ছোঁয়া লাগে, ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তার জলধারায় নিবিড় বন্যতা। এ অঞ্চলটির একটি বিশেষত্ব বিশাল সব বৃক্ষরাজি আর প্রানীদের চাঞ্চল্য, গাছের ঘন ছায়ায় শংখের বুকে সূর্যকিরণ খুব কমই পৌঁছায়। এখানকার আরেকটি বৈচিত্র‍্যপূর্ণ এক স্থানের নাম নারিশা ঝিরি, দু’পাশে সটান করে উঠে যাওয়া খাড়া দেয়াল, নিচে পাথুরে ঝিরি।

পাহাড়ি দেয়ালগুলোর মাথায় গাছের ছায়ার কারণে, দিবালোকের প্রবেশ বাধায়, আলো-আধারের শীতল স্পর্শ মেলে বলেই একে আন্ধারমানিক বলে। চোখ ধাঁধানো অপূর্বতা তার।এঁকেবেঁকে চলে যায় কয়েক কিলোমিটার ব্যাপী। অপরপাশে গড়ে উঠেছে আরেকটি মুরং পাড়া, নারিশা পাড়া। দু’ধাপের পাড়াটির অপূর্বতা অনন্য, যে শত বছরের যান্ত্রিকতা থেকে রেহাই চায় তার এই পাড়ায় জিরিয়ে নেওয়া এক স্বর্গীয় অনুভুতিই হবে।

আন্ধারমানিক দর্শনের পর, বিকেল যখন ছুঁই ছুঁই, সবুজ সাংগুর উপর গাছের আবরণে এ যেন কোনো গুহা, আর আমরা ছুটছি তার অন্য ফটকের অনুসন্ধানে। এক পর্যায়ে সে সবুজে ঘেরা টানেলটির অন্য ফটকের যখন দেখা মিললো, সূর্য আবারো পশ্চিমে চিম্বুক রেঞ্জের পাহাড়গুলোতে ডুবে যাওয়ার পায়তারা করছে, আমরাও আজকের মতো শংখ যাত্রার বিরতি দিতে চাই। স্বাগত জানালো দুর্দান্ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সম্পন্ন আন্ধার মানিক পাড়া। এক কথায় সে অনন্য বৈচিত্র‍্যের একপাশে শংখ, একপাশে চিম্বুক রেঞ্জের ঘন জংগল। যেন শংখের বেশ খানিকটা রুপ নিংড়ে বসে আছে পাড়াটি।

খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে পাড়াটির আশপাশ ঘুরে, মেঘের ডানপিটেপনা লক্ষ্য করা, আর অসাধারণ সব ল্যান্ডস্কেপ, জুমঘর, ছোট ছোট বাচ্চাদের ডানপিটেপনা একটি দারুণ দিনের সূচনা দেয়। পুবের মদক রেঞ্জ থেকে সূর্যমামার উঁকিতে জমাট সাদা মেঘেদের মধ্যে যে অপূর্ব সোনালি আভা তৈরী হয়ে শংখের জলে প্রতিফলিত হয় তা অপার্থিব।আন্ধারমানিক পাড়া থেকে ভোর দেখাটা বিস্ময়কর হওয়ার কারণ অনেক। যেমন একপাশে চিম্বুক রেঞ্জের পাহাড় সমূহ, আরেক পাশে মদক রেঞ্জের হাতছানি আর মাঝে রূপসী শংখ তো আছেই।

আন্ধারমানিক পাড়া থেকে শংখ বয়ে বয়ে যখন বড় মদকের দিকে ঢোকে তখন বসতি আর সভ্যতা আরো ঘনীভূত হতে থাকে। আর তীরে তীরে মানুষের আনাগোনা, বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের আধিক্য লক্ষ্যণীয়। উজানের দিক থেকে বাজার বলতে বড় মদক বাজারকেই বলা যায়। এখান থেকে দুর্গম এর বাসিন্দারা তাদের নিত্যনৈমিত্তিক চাহিদার সদাই কেনে, শস্যাদি বেচাকেনা করে। নৌকার ঘাট, উপাসনালয় তথা সবকিছুর একটা ভালো যোগান মেলে এখানে।

শংখ পাড়ের মানুষগুলোও খুবই আন্তরিক, উজানের দিকে মুরং সম্প্রদায়ের আধিক্য থাকলেও বড় মদকের পর থেকে অন্যান্য সম্প্রদায়ের পাড়া লক্ষ্য করা যায়। তাদের প্রধান জীবিকা জুম চাষ হলেও, একটু সচ্ছল পরিবারগুলো অন্যান্য পেশায় তাদের জীবিকা নির্বাহ করে।

কেউ কেউ বার্মা থেকে ইঞ্জিন কিনে বোট চালিয়েও অর্থ উপার্জন সংগ্রাম করে। বর্ষায় বা যখন শংখে পানির প্রাচুর্য থাকে,তখন সবার যাতায়াতটা একটু সহজতর হয়। অন্যথায় স্থানীয়রা পায়ে হেঁটেই বড় মদক থেকে ছোট মদক হয়ে রেমাক্রি অতঃপর প্রয়োজন মেটাতে থানচি যায়। তবে এ হাঁটাপথটা অনেক কঠিন আর সময় সাপেক্ষ।

মোটামুটি বড় মদকের পর থেকে শংখ পূর্ণরূপে নৌ চলাচলযোগ্য প্রায় পুরো মৌসুম। বোট এবার সাই সাই করে পূর্ণযৌবনা শংখের বুকে ছুটছে, ছোট মদকের আগে শংখের পাথুরে সাম্রাজ্যের প্রতিফলন পাওয়া যায়, মাছখুম নামক এলাকায়। শংখ এখন সাবলম্বী ও ঐশ্বর্যবতী হয়ে গেছে,আমাদের যাত্রারও আর বেশী পথ বাকি নেই। ছোটমদক পেরিয়ে আমরা এখন রেমাক্রি, যেখানে শংখ আরো একদফা মিলিত হয়ে তার প্রকৃত পূর্ণতা লাভ করে রেমাক্রি খাল থেকে। রেমাক্রি বাজার থেকে শংখযাত্রায় আমাদের শেষ ভাগ ২ ঘণ্টা দূরের থানচি বাজার।

বলা হয়, বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর নৌযাত্রা হচ্ছে থানচি থেকে রেমাক্রি পর্যন্ত। যতবারই এই যাত্রা কেউ করুক, তার একঘেয়েমি কখনওই আসবে না। তাহলে সম্পূর্ণ শংখের যাত্রা কেমন অপার্থিব ছিল, তা নিশ্চিত কল্পনাতীত। বর্ষায় হয়তো এ যাত্রা আমাদের সম্ভব হতো না, ঘন বর্ষা, অতি বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢলে এই জীবনদায়িনী ভয়াল আর রুদ্র রূপ ধারণ করে। নদীর তীরে গড়ে ওঠা ঘর, দোকানগুলো তখন বাধ্য হয়ে আরো উপরে উঠাতে হয়।

নয়তো ভয়াল শংখ ঘর আর প্রাণ দুটোই ভাসিয়ে নিতে পারে, তখন এর জলের রঙ অস্বচ্ছ আর কাদাটে হয়, স্রোতে নৌ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে বিধায় বন্ধও করে দেওয়া হয়।কিন্তু শংখ তার যাত্রা থামায় না, সময় আর শংখ কারো জন্য অপেক্ষা করেও না বটে। সে চলতে থালে তার গতিতে।

শঙ্খ নদীর এই যাত্রার দূরত্ব প্রায় ২৭০ কি: মি:। এটা থানচি থেকে তার যাত্রা অব্যাহত রেখে রুমা হয়ে রোয়াংছড়ি এবং বান্দরবান সদর হয়ে চন্দনাইশের ধোপাছড়ি হয়ে পশ্চিম দিকে গিয়ে আবার বাঁশখালী খানখানাবাদ ইউনিয়নে এবং আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর হয়ে কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় মিলিত হয়ে তার দীর্ঘতম ও বিচিত্রতম যাত্রার সমাপ্তি টানে। ১৮৬০ সালে তৎকালীন ইংরেজ সরকার এ নদীটিকে গেজেট ভুক্ত করে। তখন এ নদীটির নাম করা হয় সাংগু রিভার ।

বাংলাদেশের প্রধান কয়েকটি পাহাড়ি নদীর মধ্যে সাঙ্গু নদী অন্যতম। বাংলাদেশের বেশির ভাগ নদী উত্তর হতে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে। কিন্তু সাঙ্গু নদী বান্দরবানের পূর্ব-দক্ষিণাঞ্চলে সৃষ্টি হয়ে উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়ে পশ্চিমে বাঁক নিয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে শেষ হয়েছে।

সাংগু/শংখ শুধু একটি নদী নয়, এটি একটি জীবনযাত্রা, তার এই যাত্রার উপর নির্ভর করে অসংখ্য মানুষের বেঁচে থাকার পন্থা। কিন্তু দিন দিন সাংগু তার গহ্বরে অস্বস্তি অনুভব করছে, দূষিত হচ্ছে তার জল, প্রকৃতি। এমনকি তার প্রাণ, তার তীরে তীরে বর্তমান বনও নিধন হচ্ছে প্রতিনিয়ত, পাথর-বালিও উত্তোলিত হচ্ছে নিয়মিত। বন-পাথর না থাকলে ঝিরি-ছড়া শুকিয়ে যাবে আর ঝিরি-ছড়া শুকিয়ে গেলে কি সাংগু বেঁচে থাকবে?

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত