ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২০, ২৫ আষাঢ় ১৪২৭ আপডেট : ১ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২০, ০০:৪৪

প্রিন্ট

অন্তরাশ্রম ও কবি এনামূল হক পলাশকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা

অন্তরাশ্রম ও কবি এনামূল হক পলাশকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা
পলিয়ার ওয়াহিদ

কবি এনামূল হক পলাশ ১৯৭৭ সালের ২৬ জুন নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা উপজেলার বাদে চিরাম গ্রামে মাতুলালয়ে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক নিবাস একই উপজেলার বামনগাঁও গ্রামে। কবি এনামূল হক পলাশ এর প্র-পিতামহ মরহুম হাজী বাহাদুর আলী তালুকদার ছিলেন ইউনিয়ন কাউন্সিলের সন্মানিত প্রেসিডেন্ট। তাঁর বড় পুত্র মরহুম আব্দুল মালেক তালুকদার হচ্ছেন কবির পিতামহ। নেত্রকোনার মদন উপজেলার চানগাঁও দেওয়ান বাড়ির কন্যা মরহুমা দেওয়ান রেজিয়া আক্তার কবির পিতামহী। মরহুম আব্দুল মালেক তালুকদার ও মরহুমা দেওয়ান রেজিয়া আক্তারের প্রথম পুত্র মরহুম এমদাদুল হক এর ঔরসে এবং একই উপজেলার বাদেচিরাম গ্রামের মরহুম আব্দুল মান্নান তালুকদার ও মরহুমা হাজেরা খাতুনের প্রথম কন্যা নুরুন্নাহার হক এর গর্ভে কবি এনামূল হক পলাশ জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর দাদা প্রথম জীবনে ব্যবসায়ী, পরে গৃহস্থ এবং নানা ছিলেন ভিলেজ পোস্ট মাস্টার ও একই সাথে স্বচ্ছল গৃহস্থ। পিতা ছিলেন বড় ব্যবসায়ী ও উদার মনা, দিল খোলা, বে খেয়ালী, অপরিনামদর্শী মানুষ। প্রচÐ সম্ভাবনা ও স্বচ্ছলতার ভেতর দিয়ে কবির শৈশব কেটেছে। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে কবি সবার বড়। ভাইয়ের নাম এহতেশামুল হক এবং বোনের নাম আকলিমা হক।

শিশুকাল নিজ গ্রামে কাটালেও পিতার ব্যবসাজনিত কারনে তাঁর শৈশব কেটেছে বারহাট্টার গোপালপুর বাজারে। প্রথমে তিনি বারহাট্টার গোপালপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশু শ্রেনীতে ভর্তি হন এবং এক বছর পরে বারহাট্টা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে একই স্কুল থেকে ১৯৮৮ সালে ট্যালেন্টপুল বৃত্তি পেয়ে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। বারহাট্টা সি.কে.পি. পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে তিনি মাধ্যমিক শিক্ষা শুরু করে অষ্টম শ্রেণিতে সাধারণ বৃত্তি পান এবং পরের বছর ড. ইন্নাছ আলী বৃত্তি প্রাপ্ত হয়ে ১৯৯৪ সালে বিজ্ঞান শাখায় প্রথম বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বারহাট্টা পাবলিক লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর নিয়মিত পাঠক হিসেবে ব্যাপক অধ্যয়ন করেন। ১৯৯৪ সালে উপজাতীয় কালচারাল একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘মাটির সুবাস’ নামক একটি পত্রিকায় তাঁর একটি কবিতা প্রকাশিত হয় যা ছিল ছাপার অক্ষরে তাঁর প্রথম কবিতা। প্রকাশিত কবিতার জন্য তিনি মনি অর্ডার যোগে চল্লিশ টাকা সন্মানী প্রাপ্ত হয়েছিলেন। উক্ত চল্লিশ টাকার খরচ বাদে সাতত্রিশ টাকা পঁচিশ পয়সা হাতে পেয়েছিলেন তিনি।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ^ বিদ্যালয় ইন্টারমিডিয়েট কলেজে তিনি উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা শুরু করে ১৯৯৬ সালে প্রথম বিভাগে এইচ এস সি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এ সময় তিনি ময়মনসিংহ শহরের কেওয়াটখালী এলাকায় রেলওয়ে কলোনীকে বসবাস করতেন। সাপ্তাহিক যায়যায়দিন পত্রিকার বিশেষ সংখ্যায় নিয়মিত লেখা পাঠাতেন। প্রায় সংখ্যায়ই তাঁর লেখা ছাপা হতো এবং তিনি মনি অর্ডার যোগে সন্মানী পেতেন।

১৯৯৭ সালে পিতার অংশীদারী ব্যবসার সুবাদে তিনি ঢাকায় চলে যান এবং সেখানে দৈনিক ২০০ টাকা বেতনে চাকরী নিয়ে সরকারী তিতুমীর কলেজে উদ্ভিদ বিজ্ঞানে অনার্স ভর্তি হন। ১৯৯৮ সালে বন্যা জনিত কারনে পিতার ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ায় পারিবারিক সংকট এড়াতে মায়ের কানের দুল বিক্রি করে বাসা ভাড়া পরিশোধ করে তিনি টিসি নিয়ে নেত্রকোনা সরকারী কলেজে চলে আসেন এবং একই কলেজ থেকে ২০০২ সালে দ্বিতীয় শ্রেনীতে স্মাতক (সন্মান) উত্তীর্ণ হন। নেত্রকোনা সরকারী কলেজে উদ্ভিদ বিজ্ঞানে মাস্টার্স পড়ার সুযোগ না থাকায় তিনি গুরু দয়াল সরকারী কলেজে মাস্টার্স ভর্তি হয়ে ২০০৪ সালে উদ্ভিদ বিদ্যায় দ্বিতীয় শ্রেনীতে মাস্টার্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৯৮ সালে একটি প্রগতিশীল বাম সংগঠনের সাথে তাঁর যোগাযোগ স্থাপন হয় এবং তিনি প্রগতিশীল বিপ্লবী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় রাজনৈতিক বিষয়ে ব্যপক অনুশীলন ও পড়াশোনা করেন। পিতার ব্যবসায়িক অবস্থা খুব খারাপ থাকায় পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি ও কোচিং করিয়ে নিজের খরচ সংগ্রহ করতেন। এই সময়টা তিনি অনেক পড়াশোনা এবং কবিতা লেখার ভেতর দিয়ে কাটিয়েছেন। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন সময় কয়েকটি জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকার সাথে যুক্ত থেকে সাংবাদিকতা করেছেন। ২০০৩ সালে তিনি রাজনীতি ছেড়ে সরকারী চাকুরিতে যোগদান করেন। ২০০৫ সালে পারিবারিক সম্মতিতে নেত্রকোনা শহরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের কন্যার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর স্ত্রী মাহবুবা এনাম সোমা পেশায় একজন প্রাইমারী শিক্ষক।

২০০৬ সালে অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় পিজি হাসপাতালে থাকাকালীন সময়ে মৃত কন্যা সন্তানের জন্ম হয় এবং নিজ হাতে কন্যাকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করেন যা তাঁর জীবনের বেদনাদায়ক এক অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করেন কবি। ২০০৭ সালে কোরবানী ঈদের দিন নামাজে যাওয়ার রাস্তায় কবির পিতা স্ট্রোক করেন। পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সংসারের সকল দায়িত্ব তখন থেকে কবির উপর বর্তায়। ২০০৯ সালে তিনি পুত্র সন্তানের জনক হন। তাঁর পুত্রের নাম আহনাফ তাজওয়ার হক। বর্তমানে পুত্রের বয়স আট এবং দ্বিতীয় শ্রেনীতে পড়ে। একই সালে কবির প্রথম বই ‘অস্তিত্বের জন্য যুদ্ধ চাই’ প্রকাশিত হয়। ২০১৫ সালে দ্বিতীয় কাব্য গ্রন্থ ‘জীবন এক মায়াবী ভ্রমণ’ প্রকাশিত হয়। ২০১৬ সালে তৃতীয় কাব্য গ্রন্থ ‘অন্ধ সময়ের ডানা’ প্রকাশিত হয় ও ‘লেখা প্রকাশ সাহিত্য সন্মœাননা- ২০১৬’ এবং বাংলাদেশ শিক্ষা পর্যবেক্ষক সোসাইটি কর্তৃক ‘অমর একুশে স্মৃতি পদক- ২০১৬’ প্রাপ্ত হন।

২০১৬ সালে কবি নির্মলেন্দু গুণ প্রতিষ্ঠিত নেত্রকোনার মালনী এলাকায় বিশ^ কবিতার আবাসস্থল বা হোম অব ওয়ার্লড পয়েট্রি খ্যাত ‘কবিতাকুঞ্জ’ প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্ন থেকে অবকাঠামো গঠনের কাজে যুক্ত থেকেছেন এবং একই প্রতিষ্ঠানের প্রথম পরিচালক হিসেবে কবি কর্তৃক নিযুক্ত আছেন। ২০১৭ সালে কবি, লেখক ও সংস্কৃতি কর্মীদের ব্যবহারের জন্য তিনি নেত্রকোনা শহরের মালনী এলাকায় গড়ে তুলেছেন ‘অন্তরাশ্রম’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। তিনি এর প্রতিষ্ঠাতা ও মহতি আচার্য। ২০১৭ সালে চতুর্থ কাব্য গ্রন্থ ‘অন্তরাশ্রম’ ও পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ ‘মেঘের সন্ন্যাস’ প্রকাশিত হয় এবং নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার চর্চা সাহিত্য আড্ডা কর্তৃক তাদের শততম আসরে অন্যান্যদের সাথে ‘চর্চা শুভেচ্ছা সন্মাননা- ২০১৭’ প্রাপ্ত হন।

২০১৮ সালে ষষ্ঠ কাব্য গ্রন্থ ‘পাপের শহরে’ প্রকাশ হয় এবং কবির চল্লিশ পূর্তি উপলক্ষে কবির জীবন ও কর্ম নিয়ে ‘আশ্রম পাখির মায়াপথ’ নামে একটি প্রকাশনা গ্রন্থ বের হয়। ২০১৯ সালে সপ্তম কাব্য গ্রন্থ ‘জল ও হিজল’। ২০২০ সালে একটি শিশুতোষ বই ‘বইয়ের পাতায় ফুলঝুরি’ এবং ‘ভূমি ব্যবস্থাপনার সরল পাঠ’ নামে একটি গবেষণাধর্মী বই প্রকাশিত হয়। একই বছর তিনি ভারত ভ্রমণ করেন। তার সাথে কথা হলে তিনি জানান, ‘জীবনের বিচিত্রতা আমাকে দিন দিন সহজ হওয়ার সাধনার দিকে নিয়ে গেছে। তাই সহজের সাধনা করি। আমি সাধু নই। সাধু হতেও চাইনা। সহজ হতে চাই। অন্তরাশ্রমের পথ বেয়ে পৃথিবীর পথে পথে ছড়িয়ে দিতে চাই ভালোবাসা ফুল।’

কবি এনামূল হক পলাশের এই দীর্ঘপরিক্রমা এই কারণে শোনালাম যে একজন কবির বেড়ে ওঠা নিহিত থাকে তার কাব্যে এবং বোধে। প্রথমে কবিকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে চাই এবং আমার সাথে কবির দেখা, প্রথম পরিচয়, কবির আন্তরিকা ও কবিতায় মুগ্ধ হওয়াসহ তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ‘অন্তরাশ্রম’ নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই।

দেরিতে হলেও গৌরবের বিষয় এনামূল হক পলাশের কবিতার সাথে পরিচিত হতে পেরেছি। অভিযোগ ছিলো যে, এই কবিতা আরো আগে পাইনি কেন? নিজের সীমাহীন অযোগ্যতার খতিয়ানে ঘাড় গুজে চুপ থাকতে হলো। কবিতা পড়ে ভালো লাগলে মুখফুটে বলতে দ্বিধা করিনি কখনো। হঠাৎ নেত্রকোণা ভ্রমণে গেলে আহমেদ তোফায়েল পলাশ ভাইয়ের কাছে নিয়ে যান। অবশ্য আমি ওকে বলেছিলাম কার কার সাথে সাক্ষাত করা যায়। সে রকম কিছু মানুষের কাছে নিয়ে চলো। বলতেই ভূমি অফিসে উপস্থিত হই আমরা। সেখানে গিয়ে আবিস্কার করি এই শক্তিমান নিভৃতচারি কবিকে। যদিও উনার নাম শুনেছি আগে। কিন্তু কবিতা পড়া হয় নি। মানুষের দায়িত্ব পালনে যিনি কবিতা লেখার চেয়ে বেশি আনন্দ পান তিনি নিজের দুটো কবিতার বই উপহার দিলেন। মলাট উল্পে চোখ বুলালাম। সাথী ছিল ননষ্টট ধূমপান! অফিস বিধায় কাচুমাচু করলে পলাশ ভাই বললেন- ‘পলিয়ার জ¦ালিয়ে যাও’। এই উনার সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ। গাছ, নদী, জলের সাথে আড্ডা দিয়ে সে রাতে আমরা তোফায়েলের মেসে ফিরি।

যে দুটি বই আমাকে দিলেন একটার নাম ‘অন্তরাশ্রম’ অপরটি ‘মেঘের সন্ন্যাস’। নাম শুনেই কবির অন্তর্দৃষ্টি অনুভব করা যায়। সকালে ট্রেনে ফেরার সময় ব্যাগ থেকে ‘অন্তরাশ্রম’ বের করি। প্রথমে নাম কবিতা অন্তরাশ্রমে ঢুকেই বের হয়ে যাই। তারপর আমাকে চুষে নেয় ‘আধুনিক সংসার’ শিরোনামের কবিতাটি। নাকি আমি কবিতাটিকে ছেনে নিতে থাকি; বুঝতে পারি না। বার বার পাঠ করি। পলাশ ভাইকে ফোন করি। ভাই এ কেমন কবিতা লিখলেন? আমাকে তো শূন্য করে ফেলল! এতো সার্থক কবিতা যে কতো দিন পড়িনি। মনটা আমার শূন্য থেকে পূর্ণ হতে চলেছে। যেন মহামূল্যবান কিছু একটার সাথে পরিচিত হতে পেরেছি। তিনি জানেন অল্প কথায় কীভাবে ফিলোসফি কবিতার শরীরে গেঁথে দিতে হয়। কাব্য টেকনিককে বাদ দিয়ে কবিতায় বাকপ্রতিমা স্থাপন করতে সিদ্ধহস্ত। এখন কবিতাটি পাঠ করে আসি।

‘খালের স্রোতে হাঁটু পানিতে নাইমা

চালুনে খেও দিয়া মলা-পুঁটি ধরতেছি।

তুমি পেছনে পুরোনো চুকরা হাতে খাড়াইয়া

মারা মাছ ভরতে থাকো ভরতে থাকো।

আমি মাছ মারা নিয়ে ব্যস্ত,

তুমি মাছ ভরা নিয়ে ব্যস্ত।

মাছের ভারে পুরোনো চুরকার তলা

ভেঙে গেছে আগোচরে কেউ কইতেই পারি না।’(আধুনিক সংসার-অন্তরাশ্রম)

তিনি নিজস্ব জনপদের মুখের ভাষাকে কবিতায় স্থান দিয়েছেন বুক উঁচু করে। গোয়ো আর আঞ্চলিক তকমাকে গায়ে না মাখিয়ে উল্লাসে প্রকাশ করেছেন কবিতার আপন বৈভব। কি অসাধারণ উপমায় আধুনিক সংসারকে ইঙ্গিত করলেন। সত্যি বিস্মিত না হয়ে পারি না। এনামূল হক পলাশ ভাইয়ের কবিতা মূলত পাঠের, তা লিখে বোঝানো সত্যিই বোকামী। প্রতিটি কবিতা তিনি দর্শনরসে চুবায়ে পরিবেশন করেন সাদামাঠাভাবে। আর এখানেই তার মুন্সিয়ানা ধরা পড়ে ষোলআনা। এতো সহজ ভাষায় প্রকাশ করেন যে, পাঠের পর রয়না মাছের মতো ফাঁদে হা হয়ে পড়ে থাকা ছাড়া উপায় থাকে না! যেন কি অজানাই না আমি জেনে গেলাম। বা এ তো আমার জানা কিন্তু এমনভাবে ধাক্কা আগে তো কেউ দিতে পারিনি। এটুকুই মূলত পলাশ ভাইয়ের কবিতার প্রাণ। এই কবিতাটি নিয়েই আমি আলোচনা চালিয়ে যেতে চাই। ‘স্বামী পানিতে নেমে মাছ ধরছেন আর বউ ডাঙায় বসে চুকরাতে মাছ ভরছেন। একজন মাছ ধরতে ব্যস্ত আরেকজন মাছ ভরতে ব্যস্ত। মাছের ভারে যে কখন পুরোনো চুরকার তলা ভেঙে গেছে কেউ খেয়ালই করিনি।’ সংক্ষেপে কবিতটি এমনই। এই গল্প দিয়ে পলাশ ভাই কি বলতে চেয়েছেন? তা আমরা কমবেশি বুঝি। আধুনিক যে ক্ষুদ্র সংসার আমরা বিভিন্ন কারণে গড়ে তুলছি। তার পরিণতি কি ভয়াবহ! কিছুটা আভাস দিয়েছেন বোধ করি। আধুনিকতার নামে আমরা যে পরস্পরের কাছ থেকে দূরে চলে যাচ্ছি। পারস্পারিক ভালোবাসা ও বন্ধন টুটে যাচ্ছে। সেদিকে আমাদের কোনো খেয়াল নেই। আমরা সবাই উন্নতি করতে ব্যস্ত। কিন্তু এ কোন উন্নতি? যে উন্নতি মায়ের সেবা করতে দেয় না। সন্তানকে সময় দিতে দেয় না। স্বামী-স্ত্রীকে একা করে তোলে। শুধু কি টাকা আর বাড়ি-গাড়ি দিয়ে জীবন চলে? জীবনের জন্যই তো এতো সব। তাহলে কেন আমরা জীবনকে তুচ্ছ করে। সম্পর্ককে তুচ্ছ করে। মানবিক সম্পর্ককে তুচ্ছ করে। শুধু জাগতিক বস্তুতে আসক্তি হয়ে পড়ছি। আমরা সাদা চোখে দেখাচ্ছি, আমাদের কততলা বাড়ি হলো? কয়টা গাড়ি হলো? কিন্তু তলে তলে যে আমাদের প্রেম-ভালোবাসা-সম্পর্ক-মায়া ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল! সেদিকে কারো খেয়াল করার সময় কোথায়? আধুনিকতার ভয়াবহতা এতো সুন্দর করে প্রকাশ এর আগে আর কেউ করেছে কিনা আমার জানা নেই। কিন্তু কবিতায় রূপকের অন্তরালে সেটা আবার জানিয়ে দিলেন। একজন জেলে স্বামী হিসেবে। কবিতার ভাষাই এমন। ইঙ্গিত করে, ইশারা করে বলে যাওয়া। যার বোঝার সে বুঝে নেবে। সভ্যতার গোড়া পত্তন যারা করেন তারা তো এক ধরণের কাক। আর কোকিল নামের ছলনাময়ীরা তার ফল ভোগ করেন। তেমনি আধুনিক সংসারের ফল অন্যের হাতে তুলে দিয়ে নিজের আখের খতম হবার আগেই সাবধান হওয়া উত্তম। এই জন্য একজন কবি কলম ধরেন। মানুষকে সতর্ক করেন। কারণ তিনি ভবিতব্য সবচেয়ে ভালো দেখতে পারেন। এই দার্শনিক কবিকে আমার অন্তর থেকে প্রেমময় ভালোবাস জানাই।

আর তিনি কবিতা প্রকাশ করেন সম্মানিত ভাষায়। কিন্তু তুমিকে আপনি বলার মাঝে কোনো চাতুর্য নেই। কবিতার পরতে পরতে আছে শ্রদ্ধার জলপাত্র আর ভালোবাসার নিবিড় ছায়া। এ কারণে পলাশ ভাইয়ের কবিতার পাঠক খুব সহজে তার কবিতার ভেতর প্রবেশ করতে পারেন। মজা বা রসের আস্বাদন করতে পারেন। ক্লান্তি দূর করে ফুরফুরে হয়ে উঠতে পারেন। ঝিমুনি থেকে সজাগ হয়ে উঠতে পলাশ ভাইয়ের কবিতার জুড়ি নেই। তাঁর কবিতার ভাষা আটপৌড়ে। একেবারে মা-খালাদের মুখের ভাষার কাছাকাছি। কিন্তু পার্থক্য হচ্ছে তিনি আধুনিক রূপক ব্যবহার করেন সর্তকতার সাথে। নতুন নতুন শব্দ আবিস্কারেও তিনি উন্মুখ। নিরব, লাজুক ও পরিমিত টাইপের ব্যাক্তি পলাশ ভাইয়ের ব্যবহারের সাথে তাঁর কবিতার মিল খুঁজে পাওয়া যায় এটা খুবই আনন্দের।

‘ঘাসফুল’ কবিতাটি দুই লাইনের। কিন্তু কবিতা তো কবিতাই। লাইন একটা বা দুটো দিয়ে কি হবে। চিন্তার খোরাক দিতে পারলেই সার্থক। কবিতাটি পাঠ করে ফেলি। ‘যাওয়া হবে না বৃক্ষের কাছাকাছি/ তাই দাঁড়িয়েছি সূর্যের মুখোমুখি।’ কি অর্থপূর্ণ চিন্তা। জীবনযুদ্ধে শুয়ে পড়া মানুষকে যেন আরো উসকে দেয়া। কারণ আমরা যতই সাধনা করি না কেন, চেষ্টা করি না কেন বৃক্ষ হবার মিথ্যে আশা পূরণ হবে না। ঠিক কিন্তু তার চেয়ে বড় সাধনা আমরা হরহামেশা করে ফেলি। কারণ সূর্যতো আরো বড় কিছু। তার কাছে পৌছানো তো দূরের কথা ভাবাই যায় না। তার মানে মানুষ যে অসাধ্য সাধন করতে পারেন বা তারা সেই সাহস রাখেন; সেটাই মূলত কবি বলতে চেয়েছেন। আমাদের মতো ভীতু পাঠককে তিনি নরম কোমল বৃক্ষের কাছে না নিয়ে সরাসরি সূর্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবার সাহস সঞ্চায় করতে বলেন। এটাই একজন প্রকৃত কবির কাজ বলেই আমি মনে করি।

তাঁর ‘ভাসানী’ কবিতাটিও আমার প্রিয়। ‘পৃথিবীর বাস্তুচ্যুত যে সকল মানুষ/ বেদনাকে অবলীলায় শক্তি বানিয়েছেন/ নিজের কাঁধে তুলে বয়ে নিয়ে ফিরছেন/ অবদমনের বিষ আর দলন নিপীড়ন,/ তাদের সকলের নাম ভাসানী।’ আহারে ভাসানীর মাজার সন্তোষে গিয়ে আমি শীতল হয়ে গিয়েছিলাম। আগুনের মতো মানুষদের কাছে থেকে আমরা কি শিখলাম?

‘মা’ শিরোনামের কবিতাটি একটু পড়ি। ‘জীবনের যতটুকু দুঃখবোধ আছে/ সবটুকু লুকিয়ে আছে মায়ের আঁচলে/ পৃথিবীর জননীর রূপ চিরায়ত দুঃখ/ আর সন্তানেরা এক একজন পরিব্রাজক/ শীতল অনুভূতি দূরে দূরে চলে যেতে থাকে/ একাকী নিঃসঙ্গতা চাপে পরিব্রাজকের ঘাড়ে।’ মা আমাদের কত বড় সম্পদ অথচ তিনি চিরকাল দুঃখ নিয়ে হাসেন। আমরা বড় হতে থাকি। মায়ের স্বপ্ন বড় হতে থাকে। আমাদের কাছে অন্যের স্বপ্ন এসে হাজির হয়। মাকে আমরা ভুলে যায়। আমাদের সন্তান হয়। আমরা পিতা হই। মাতা হই। তখনও আমাদের মা-ই একা। আমাদের মায়ের নাম যেন দুঃখ পরিবহন! এই লেখাটা লিখতে পেরেছি কবি সরোজ মোস্তফা ভাই ও ছোট ভাই কবি আহমেদ তোফায়েলের তাগেদায়। দুজনকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ। আজ জন্মদিনে কবিকে আবারও আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত
best