ঢাকা, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১ আশ্বিন ১৪২৭ আপডেট : ১ ঘন্টা আগে English

প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০২০, ২০:৪৭

প্রিন্ট

ছোটগল্প

আলুদোষে দোষী

আলুদোষে দোষী
রাজীব কুমার দাশ

আরব্য রজনী উপন্যাসে আলিফ লায়লা সিরিয়ালে সিন্দাবাদ-সোলেমানি তরবারি, জাদুকর, দস্যু কেহেরমান, ডাইনি, জিন, পরী, দৈত্য উড়ে চলা চাদর দেখে আমি বেশ শিহরিত, পুলকিত, রোমাঞ্চিত, আমোদিত। মনে হতো আমিই সিন্দাবাদ। যারা বিটিভিতে সিরিয়ালগুলো দেখেছেন তাঁরা একমত হবেন।

শিশু, কিশোর, যুবক, যুবতী, বৃদ্ধ কেউ বাকি নেই। যেদিন পর্ব থাকতো, সবাই রান্নাবাড়া শেষ করে বসে যেতো। আমি আশ্চর্য হতাম, পরিচালক কাহিনীচিত্র এতো সুন্দর ফুটিয়ে তোলার জন্যে। যা ঘটতো, তা মনের গভীরে সারা দিনরাত রিলে হতো। ঘুমের ঘোরে সিন্দাবাদ হয়ে কখনো ভয়ংকর ডাকাত সর্দার কেহেরমানকে মেরেছি। প্রথম প্রেম নিয়ে পরী জুলিয়া, নেলিয়ার পেছন-পেছন জাদু চাদরে চড়ে সাহারা মরুভূমিতে ক্যাকটাস ফুলের মালা দিয়ে প্রেম নিবেদন করেছি।

আমার নিষ্পাপ প্রেম কবুল করে জুলিয়া বললো, দ্যাখো আমরা পরী, তোমরা মানুষ! আমার সমাজ মেনে নেবে না। আমি গদগদ রোমান্স চোখে বলি-জুলি কি যে বলো না সোনা! আমি কোনোদিন যাবোই না। মানুষ একটা প্রজাতি হলো? এখনো এ প্রজাতিকে নিয়ে গবেষণা হয়। এখনো হোমো স্যাপিয়েন্স প্রজাতি বলে। গবেষণ শেষ হলেই আমি তোমাকে নিয়ে চলে যাবো। জুলির উত্তর-না সিন্দাবাদ তা হয় না। পবিত্র মেঘ পুষ্প শয্যায় পরীদের বাসর হয়! গন্দম খেয়ে তোমার জন্ম, আমার জন্ম পারিজাত ফুলে।

সিন্দাবাদ বলো তো- তুমি আমার কাছে কি চাও? কেন জুলি! চম্পাকলি! হান্ড্রেড পার্সেন্ট লাভ, তোমাকে চাই। দ্যাখো, আমি পরী সমাজ ছেড়ে তোমার কাছে যাবো। তোমাকে মন দিতে পারবো, দেহ পারবো না। কেন আমার জুলিয়া? তুমি পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। মনে মনে ফন্দি আঁটলাম, যদি জুলিকে পরীসমাজ হতে কৌশলে একবার নিতে পারি, আমিই শাহেনশাহ বাদশা। মোদি, ডোনাল্ড ট্রাম্প, জিনপিং, বিল গেটস, মার্ক জুকারবার্গ সব হাতের মুঠোয়। জুলির তারা (star) জাদুর কাঠিতে আমিই হবো দুনিয়ার বাদশা। দেহের দরকার নেই, দেহ লক্ষ-কোটি পাবো। জুলি সব জেনেছে।

পরীদের সুক্ষ্মদর্শী বিশ্লেষণ।আমি নকল সিন্দাবাদ! জুলির হাতে ধরা খেলাম। এদিকে জুলির-আমার প্রথম প্রেম বলে কথা! প্রথম প্রেমের স্মৃতি ভোলা যায় না। সারাজীবন বাতের ব্যাথার মতো চিনচিন করে কামড়ায়। বুড়া হলে ও কান্না আসে। এখন কী করবো? কী সমাধান! আমার কিছুই মাথায় আসছে না। জুলির পিঠে চড়ে বিশ্বজয়! বেশ গরম লাগছে। একি! সাহারা মরুভূমির বালুগুলো এমন দেখা যাচ্ছে কেন? জুলি আমাকে ছেড়ে জাদু কার্পেটে কেন! জুলির বিরহের কান্নাগুলো ফোঁটা হয়ে হীরে হয়ে ঝরছে। আহা! আমার জুলি বলে কথা। দেখতে হবে না, প্রেমটা কার! আমার প্রেম বলে কথা। একেবারে কাঁঠালের আঠালো প্রেম! একবারই লাগে।

হঠাৎ জুলির প্রশ্ন-আলুর দোষ কি? জানি না! বইতে পড়োনি? না। পুরুষ কতো প্রকার? উত্তম, মধ্যম, প্রথম বা নাম পুরুষ। বাহ্ এবার রতির পুরুষ বলো-শশক, মৃগ, বৃষ, অর্শ্ব পুরুষ। তুমি কোন পুরুষ? জুলি! আমি প্রেম পুরুষ, প্রেম বিলাতে এসেছি। প্রেম-কাম-শৃঙ্গার বিলিয়ে ত্রিভুবনে প্রেমবীর হবো।

সিন্দাবাদ আমি চলে যাচ্ছি, আমি তোমায় আসল সিন্দাবাদ ভেবে ভুল করেছি। মন যখন দিয়েছি, ফেরত নিতে পারবো না। নতুন করে পরীসমাজ আমায় আর নেবে না। তোমার বাম তালুতে ঘষা দিলে আমি তোমার কাছে যাবো। বাহ্ ইউরেকা! বেশ আনন্দ হচ্ছে! আনন্দের তেমন কিছু নেই। 'যখন তুমি বার বার আলুর দোষে দোষী হবে' আমাকে ডাকিও,সাড়া দেবো। নিরীহ উপকারি সবজির যখন সর্বস্ব বিলিয়ে তোমাদের টিপ্পনী-উপহাস তুচ্ছতাচ্ছিল্য হতে রেহাই মেলেনি!আমার কি হবে, তা আমি জেনে গেছি।

জাদুর চাদরে চেপে আমার প্রথম প্রেম হারিয়ে যাচ্ছে। এখনো কান্না থামেনি। আমার জুলি বার বার বলে পথ বাতলে কেহেরমান, মায়াবী জোছনা হতে দূরে যেতে সাবধান করছে। শোঁ-শোঁ মরুঝড় মাড়িয়ে জুলির হৃদয় ভাঙ্গার গান শুনছি-

১/মন দিয়া তোর মন পাইলাম না, দুঃখ এই অন্তরে রে, আর আমি মন দেবো কারে।

২/দেখা হবে প্রিয় তোমারি সনে,পরপারে হিয়াতটে বাহুডোরে তোমায় নিয়ে বাঁধিবো ঘর, মেঘমালা অন্তরীণে। আমি কাঁদছি আর জুলিকে ডাকছি। জুলি আমাকে নিয়ে যাও, আমি তোমার মন হয়ে পাশে থাকবো। কোনোদিনই তোমাকে কষ্ট দেবো না। আমার কাছে এসো, হাতদুটো ধরো! জুলি! জুলি! জুলি!!! আমি চিৎকার করে কাঁদছি।

হঠাৎ বুকে আলতো হাতের স্পর্শ। ফিস ফিস করে কানে এক চেনা নারীকণ্ঠের অস্তিত্ব। সবেমাত্র ভোর হয়েছে। ষাঁড়ের মতো আমায় জুলি-জুলি ডাকছো কেন? সবাই হাসাহাসি করছে! ধর্মের ঢোল বাতাসে নড়ে। আমি বলেছিলাম না, আমার প্রেম সত্যি হলে তোমায় পাবো? তোমায় নিয়ে তিন রাস্তার মাথা বটগাছে যাবো, ওখানে ডালে বাঁধা আমার লাল মানত সুতাটি তোমার হাতে খোলাবো।

মেজাজের পারদ ধরে রাখতে পারলাম না। বকা দিতেই হাউ-মাউ কান্না। জুলি হলো, আমার বড় ভাইয়ের মেঝ শ্যালিকা, সম্পর্কে বেয়াইন। এবার ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স কমপ্লিট করেছে। সারাজীবন আমাকে নিয়ে গবেষণা করেছে। এমনকি কখন আমার কোষ্ঠকাঠিন্য হয়েছে তার হিসাবও রেখেছে। কিন্তু কোনোদিনই সে আমার হৃদয় প্রাচীরে আসতে পারেনি। আমি বললাম, দেখো জুলি, তুমি যথেষ্ট ম্যাচিউর, আবেগের বয়স নেই। একতরফা ভালোবাসা হয় না। আমি স্বপ্নে সিন্দাবাদ হয়ে পরী জুলিকে ডাকছি তোমাকে না!

জুলির উত্তর আপনি চোখ খুলে আমায় ডাকছিলেন। স্বাভাবিক, এখন লজ্জায় বলতে পারছেন না, এইতো? আরে না, আমার চোখ ঘুমেও খোলা থাকে। জুলির উত্তর-আপনার কথা বিশ্বাস করি না।

আস্তে আস্তে সব ঠিক হয়ে যাবে। এবার মেজাজ ধরে রাখা গেলো না। দিলাম এক ধমক! বেরিয়ে যাও রুম থেকে। এবার জুলির বোন পলি (ভাবি) সহ্য করতে পারলেন না। জুলির পক্ষে চে গুয়েভারা মার্কা চরম প্রতিবাদ করলেন। সাত সকালে এক বিশ্রী ব্যাপার! আমি রাগ করে ব্যাগপত্র নিয়ে রওনা দিলাম। পিছনে আর তাকাইনি। কানে জুলির অভিশাপ বাজলো সারাজীবন মেয়েদের বকা খাওয়ার দণ্ড দিলাম। আপনার আলুর দোষ আছে। জুলির অভিশাপে হয়তো আমি এখনো সকাল বিকাল মেয়েদের বকা খাই।

আমি নিরীহ ঘরানার শশক পুরুষ। বৃষ, মৃগ, অশ্ব নই। উপকারী সবজি আলু, স্নিগ্ধ আলো দিয়ে চাঁদ, যেখানে তুচ্ছতাচ্ছিল্য চরিত্রদোষ, কলংকের বেড়াজাল একবিংশ শতাব্দীতে পেরোতে পারেনি! সেখানে জুলিদের অভিশাপে হয়তো আমরা সবাই আলিফ লায়লার পাথর রাজার অভিশপ্ত পুরুষ। আলুর দোষে দোষী হয়ে জীবন কাটাচ্ছি। সত্যিকারের সিন্দাবাদ হয়ে শশক, বৃষ, মৃগ,অশ্ব পুরুষের চরিত্র কালিমামুক্ত করতে কোনো একদিন সোলেমানি তরবারি হাতে আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন। সেদিন পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

লেখক: পুলিশ পরিদর্শক, বাংলাদেশ পুলিশ।

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত