ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট ২০১৯, ৫ ভাদ্র ১৪২৬ আপডেট : ১ ঘন্টা আগে English

প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০১৯, ১৭:১৪

প্রিন্ট

মধুপুরের যাত্রী

মধুপুরের যাত্রী
আশেক হোসেন

আমাদের পাশেই রহিম কাকার বাসা। বাবার অধস্তন হলেও, মা তাকে ছোট করে দেখেন না, দেবরের মত স্নেহ করেন। আমরা তাকে কাকা ডাকি। তার সাথে আমার এবং ভাই-বোনদের খুব ভাব।

উদার আকাশের নিচে সবুজ গাছপালায় ঘেরা আমাদের এ-লোকালয়টি ছবির মত সুন্দর। ছিমছাম রেলস্টেশন, ঝকঝকে উচ্চ বিদ্যালয় এবং টিনশেড দোকানে সাজানো ছোটখাট বাজার স্থানটির বৈশিষ্ট্য। অধিকাংশ কাঁচাবাড়ির মাঝে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু সম্ভ্রান্ত পাকাবাড়ি নিয়ে গড়া গ্রামটির পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে একটি ছোট্ট নদীর মিষ্টি বারিধারা। আমরা বিকেলের কোমল ছায়ায় সেখানে ঘুরে বেড়াই, রহিম কাকার সাথে। এভাবে বয়সের ব্যবধান সত্ত্বেও আমাদের বন্ধুত্ব গাঢ় হয়।

রহিম কাকা এতদিন একাই ছিলেন। সম্প্রতি স্ত্রীকে এনেছেন। তাই আমাদের পাশের বাসাটি ভাড়া করেছেন। কাকি হাসিখুশি শ্যামলা মহিলা। এখনও নি:সন্তান। আমার মত বালকের উপদ্রব তিনি হাসিমুখেই সহ্য করতে লাগলেন। সবকিছু ভালই চলছিল। কিন্তু ক্রমেই একটি বিষণ্ন ছায়া বাসাটিকে গ্রাস করতে শুরু করল। প্রায় রাতে আমরা কাকির কান্নার করুণ সুর শুনতে পেতাম; সেই সঙ্গে কাকার উঁচু কণ্ঠের রূঢ় ব্যবহার। আমার বালক মন কষ্ট পেতো। মাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি এড়িয়ে যেতেন।

-ছোটদের ওসব কথা শুনতে নেই।

এমন কথা বললেও, তিনি যে নিজেও কষ্ট পান, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না।

মাঝে মধ্যে বলে বসেন, ‘রহিমটা ভাল লোক কিন্তু বউকে কষ্ট দেয়।’

রহিম কাকা মায়ের কাছে প্রায়ই কাকির বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। কি অভিযোগ তা অবশ্য আমি বুঝি না। তবে একদিন শুনলাম, তিনি বেশ শক্ত করে বলছেন, ‘না ভাবি , আমি ওকে নেব না। বাঁঝা মেয়েকে নিয়ে সংসার করবো না।’

মা অনেক বোঝালেন কিন্তু কাকা গোঁ ধরে বসে রইলেন। একসময় মুখ শক্ত করে উঠে গেলেন। আমি ভেবে পেলাম না, অমায়িক লোকটি এত কঠোর হলেন কিভাবে।

সেদিন গোটা রাত কাকি কাঁদলেন। তার কান্নার করুণ সুরে আমার ঘুম ভাল হল না। মাও ঘুমাতে পারলেন না। বাবা গম্ভীর হয়ে রইলেন। আমি প্রশ্ন করতে সাহস পেলাম না। সকালে, রহিম কাকা বাক্স পেটরাসহ কাকিকে নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলেন। কাছেই রেলস্টেশন। আমার মা-বাবা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে রইলেন। কাকি আমাদের সাথে দেখা করতে এলেন না। আমরাও গেলাম না, কারণ বিষয়টি অনধিকার চর্চার পর্যায়ে পড়ে। কিন্তু আমি খুব কষ্ট পেলাম যখন শুনলাম, কাকিকে চিরদিনের মত পরিত্যাগ করে তাকে বাপের বাড়ি রেখে দিতে গেলেন রহিম কাকা। শ্যামলা রঙের হাসিখুশি মহিলাটি আর কোনদিন ঐ বাড়ির চৌকাঠে পা দেবেন না।

রহিম কাকা আমাদের প্রতি যতই অমায়িক হন না কেন, এ মুহূর্তে তাকে নিদারুণ পাষণ্ড মনে হল। আমি তাকে কোন দিন ক্ষমা করব না। আমার হৃদয়ে তাঁর জন্য ঘৃণা বাসা বাঁধল, আর কালো মহিলাটির জন্য জাগ্রত রইল সমবেদনা।

তারপর অনেক পাতা ঝরে গেছে, অনেক পানি গড়িয়ে গেছে। আমি আর বালক নই, স্কুল ছেড়ে কলেজে ঢুকেছি। একদিন মায়ের কাছে শুনলাম রহিম কাকা এখন ডাকসাইটে লোক। নতুন বৌ ও ছেলেমেয়ে নিয়ে তার বাড়ন্ত ঘর সংসার। থাকেন জেলা শহরে, চাকু ধরে অফিসারের কাছে ঘুষের বখরা নেন। একদিন আমাদের সাথে দেখা করতে এলেন। গর্দানের মেদ দেখে বোঝা গেল, যা রটে তা কিছু কিছু বটে।

মাকে দাওয়াত করলেন, ‘ভাবী, আমার বাড়িটা একবার দেখে যান।’ আমাকে বললেন, ‘খোকা বাবু, মাকে নিয়ে এসো।’

সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকার। তেমন কার্যকর নয়। তদুপরি কোথায় যেন আত্মম্ভরিতা আছে। তাই সে নিমন্ত্রণ রক্ষা করিনি। সহজেই ভুলে গেছি আপাত মূল্যহীন ক্ষণটির কথা। কিন্তু মানুষের জীবনে কোন মুহূর্তই যে তাৎপর্যহীন নয় তা বুঝতে সময় লেগেছে আরও কয়েক বছর। প্রতিটি মানুষের জীবন এক একটি মহাকাব্য যার পর্বগুলো খুবই ধারাবাহিক।

ভাল ছাত্র সুবাদে আমি এখন একটি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করি। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ক্লাসরুম, বিকেলে লাইব্রেরি এবং সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে ক্যান্টিনে আড্ডা, এ নিয়ে ছকে বাঁধা মজার জীবন। আমার একগুচ্ছ বন্ধু আছে যাদের নিয়ে আমি গর্বিত।

গতরাতে তেমন এক বন্ধু মাহবুবের কাছে ধার করেছি ‘বিচিত্রা’র একটি বিশেষ সংখ্যা। এর মধ্যে আছে মানুষের অদম্য সংগ্রামের কাহিনী। দক্ষিণ আমেরিকার আকাশে উড়ছে একটি বিমান। পাড়ি দিচ্ছে আন্ডিজ পর্বতমালা। বিমানে আছে একদল রাগবি খেলোয়াড়। মানুষকে আনন্দ দেবার জন্য তারা দেশে বিদেশে ঘুরে বেড়ায়। তবে, এখন তাদের মধ্যে আনন্দ নেই। সবার চোখে মুখে আতঙ্ক। কারণ খারাপ আবহাওয়ায় পড়ে প্লেনের বেসামাল অবস্থা। তাকে উদ্ধার করার জন্য পাইলট প্রাণান্তকর চেষ্টা করছেন বটে, তবে শেষ রক্ষা করতে পারলেন না। প্লেনটি আন্ডিজের পাদদেশে ভেঙে পড়ল। অধিকাংশ যাত্রী নিহত হলেও বিস্ময়কর ভাবে কয়েক জন বেঁচে গেল। কিন্তু কোন উদ্ধারকারীদল তাদের হদিস পেল না। চিলির দুর্গম পর্বত অঞ্চল ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া তাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিল। অপরদিকে, ভীষণ শীত ও বরফের মধ্যে, ভগ্ন প্লেনের খোলে রক্ষা পাওয়া কিছু মানুষের শুরু হল বেঁচে থাকার সংগ্রাম।

পত্রিকাটি পড়া হয়নি। গল্পটি শুনেছি মাত্র। জমিয়ে পড়ব বলে ধরে রেখেছি। ওটা নাড়াচাড়া করছি এমন সময় এমদাদ হাজির।

- রৌদ্রোজ্জ্বল সকাল পড়ার জন্য নয়। গহীন অরণ্যের কাহিনী পড়বে গভীর রাতে।

- তাহলে এখন কিসের সময় ? সিনেমা দেখার, না মেয়েদের পেছনে ঘোরার?

- কোনটাই নয়। এখন সময়, নিষ্কাম ভ্রমণের।

সারা সকাল শহরের যত্রতত্র হৈ হৈ করে ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। তাই, হোস্টেলে ফিরে ঝাড়া গোসল দিয়ে শ্রান্তি দূর করলাম। মধ্যাহ্ন ভোজনের পরে বিছানায় শুয়ে কেবল বিচিত্রাটি হাতে নিয়েছি, অমনি টুপি পরা এক ভদ্রলোক ঘরে প্রবেশ করলেন। আমি উঠে বসলাম কারণ তিনি আমার নাম উচ্চারণ করেছেন। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাতেই তিনি বলে উঠলেন, ‘আমাকে চিনতে পারছ না, খোকাবাবু ? আমি রহিম, তোমার রহিম কাকা।’

আমি ভদ্রলোকের মুখের দিকে তাকিয়ে তাকে চেনার চেষ্টা করি। সময় কত কিছুই না পরিবর্তন করে দেয়। রহিম কাকা তাঁর ছোট মেয়েকে এ শহরের একটি কলেজে ভর্তি করেছেন। সে কাজেই তিনি এসেছেন। এসেই যখন পড়েছেন তখন আমার সাথে দেখা করাটা উচিত মনে করেছেন। মায়ের কাছে ঠিকানা পেয়েছেন। রহিম কাকা বেশিক্ষণ থাকলেন না বটে কিন্তু আমার বিচিত্রা পড়া ভণ্ডুল করে গেলেন।

কিছুক্ষণ পরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি এল, সাথে বাদল দিনের পাগল হাওয়া। আমগাছের মগডালগুলো বাতাসের ঝাপটায় লুটোপুটি করল। বৃষ্টিরা নেচে গেয়ে চারিদিক মাতিয়ে তুললো। বৃষ্টি মানেই আনন্দ। এ সময়ে কি আর পড়ার পাতায় চোখ রাখা যায়! কিছুক্ষণ পরেই শিল পড়তে শুরু করল। আস্তে আস্তে হোস্টেল মাঠের সবুজ চত্বর সাদা হয়ে গেল। বরফের টুকরো ছিটকে পড়ছে আমাদের বারান্দায়। হোস্টেলের ছেলেরা লুটোপটি করে সেগুলো সংগ্রহ করছে গা ভিজিয়ে। বিকেলে বৃষ্টি থেমে গেলেও আকাশের মুখ গোমড়া হয়ে রইল। দূরের অট্টালিকাগুলি ভিজে জবুথবু হয়ে গেছে। প্রকৃতির এই থমথমে চেহারা আমার মোটেই ভাল লাগে না। চারিদিকে বিষাদের ছায়া আর সব হারানোর সুর গ্রাস করে আমার চিত্তের আনন্দ। অবশেষে সন্ধ্যের আঁধার নিয়ে এল স্বস্তির বৃষ্টি। গুমোট ভাবটি কেটে গেল।

রাতে খাবার পরে বিছানায় শুয়ে গভীর মনঃসংযোগে পড়লাম বিচিত্রার আর্টিকেল ‘জীবন যেখানে যেমন’। বাইরে বৃষ্টির টিপটিপ তালে, আমার মন চলে গেল আন্ডিজ পর্বতের পাদদেশে চিলির দুর্গম বরফভূমিতে, যেখানে কিছু মানুষ বেঁচে থাকার জন্য দুরন্ত সংগ্রামে লিপ্ত। মানুষের বেঁচে থাকার কী আকুতি, কী আকাক্সক্ষা! কারণ জীবন সুন্দর। অথচ একটি জীবন দু’শ পৃষ্ঠার উপন্যাস বা দু’ঘণ্টার চলচ্চিত্র বই কিছু নয়; দু’ঘণ্টাতেই শেষ হাসিকান্নার সকল কাহিনী।

রহিম কাকার মেয়ের নাম রুপা । বেশ দেখতে, ছিমছাম তন্বী। প্রথম দেখাতেই আপন করে নিল, যেন কত দিনের পরিচয়। তার সাথে বেশ কিছুক্ষণ একত্রে কাটানোর পরে যখন ফেরার পথ ধরলাম তখন বুঝলাম, ওকে আমার ভাল লেগেছে। ভাল লাগাটা ভালবাসায় রূপান্তরিত হতে বেশি দিন লাগলো না। এক সময় আমরা পরস্পরের প্রেমে পড়ে গেলাম। আমাদের মধ্যে যাতায়াত বেড়ে গেল।

ছুটির দিনে, নির্জন দুপুরে হাঁটতে আমার ভাল লাগে। এ সময় পৃথিবীকে মনে হয় নিরুপদ্রব বিশ্রামের নীড়। তাই, মাথার উপর রোদ নিয়ে রুপাদের হোস্টেলে উপস্থিত হলাম। দারোয়ান বিরক্ত হল। কারণ, ঠিক সাক্ষাতের সময় এটা নয়। রুপার বান্ধবীরা মুখ টিপে হাসল। তবে রুপা বিব্রত হল না। আমরা পাশাপাশি বসলাম। পরস্পরের স্পর্শ অনুভব করলাম।

- দুপুর বেলাটা বুঝি বেড়াবার সময় হল?

- দুপুরে বেড়াতে আমার খুব ভাল লাগে। তোমার?

- মোটেও না।

- না কেন? আমাদের সব ভাল লাগা এক হতে হবে। আজকে দুপুরে আমি এলাম, আরেক দুপুরে তুমি যাবে।

- ছেলেদের হোস্টেলে যেতে আমার বয়ে গেছে। তোমার ঘরে তুমি একা থাক। লোকে কি বলবে?

- লোকে বলার কে ধার ধারে।

- দুষ্টুমি। আমি কিছু বুঝি না বুঝি?

যাই বলুক, একদিন দুপুরে রুপা সত্যই এল।

‘ঐ যে সবুজ বনবীথিকা, দূর দিগন্তের সীমানায়।’ এটি গানের কলি। গাইছে একটি মেয়ে, তালে তালে ছবি আঁকছে একটি ছেলে। সবুজ দিগন্তরেখা। তার মাঝে কুঁড়েঘর যেখানে প্রেমিকার প্রিয় থাকে। রুপাদের কলেজে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ পেয়েছি। সেখানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে গানের তালে তালে ছবি আঁকা। প্রতিযোগিতার গানটি পরিচিত, তবে এতযে আবেদন তা আগে বুঝিনি। বিচারক হলে আমি এ জুটিকে প্রথম পুরস্কার দিতাম। রুপাকে সে কথা বললাম। - ও সোমা, আমার বান্ধবী। সত্যই ভাল গায়। একসময় পরিচয় করিয়ে দিব।

সোমার সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা বাড়তে লাগলো। মেয়েটি তার গানের মত সৌম্য-শান্ত। এ যেন তরঙ্গহীন স্বচ্ছ জলাধার। তার সাথে কথা বলতে, তার গান শুনতে আমার খুব ইচ্ছে করে। কিন্তু রুপার জন্য ভয় হয়। তাই, একটু দূরে দূরেই থাকি। তবে, বেশিদিন ধৈর্য ধরতে হল না। কি একটা প্রয়োজনে রুপা বাড়ি গেল।

আমরা তখন কাছাকাছি হলাম। রুপা যদি নদী হয়, তবে সোমা সাগর। আমার অনুশোচনা হল, কেন আমি সোমাকে আগে দেখিনি। তারপরেও ওকে না ভালবেসে পারলাম না। তার সাগরে ডুব দিলাম। সে আমাকে গান শোনাল,

- মনে কর আমি নেই, বসন্ত এসে গেছে, কৃষ্ণচূড়ার বন্যায় চৈতালি ভেসে গেছে।

- তেমন বসন্ত আমার চাই না।

আমি তার চুলের অরণ্যে মুখ গুঁজলাম।

আরেক দুপুরে সোমা এল আমার ঘরে।

- দুপুর বেলায় যে!

- তুমি দুপুর ভালোবাস, তাই।

- আমি বাসলে কি, তুমি তো বাস না।

- আমি বাসি। তুমি যা পছন্দ কর, আমি তাই করি। এই দেখ, তোমার জন্য কি এনেছি।

সোমা আমার বিছানায় এসে বসলো। হ্যাণ্ডব্যাগ খুলে বের করল একটি আম।

- আম! কাঁচা আম! আমার কিশোরবেলার প্রেম। তুমি কোথায় পেলে সোনামণি।

- আমি পেড়েছি। আমাদের হোস্টেলের গাছ থেকে। এই দেখ, বোঁটায় এখনও টাটকা আঠা লেগে আছে।

- আছে বুঝি! আরে, আরে, নষ্ট কর না। লাগিয়ে দাও, লাগিয়ে দাও। আমাদের প্রেমের মাঝে লাগিয়ে দাও।

- মাসুম, তুমি কাঁচা আম ভালোবাস। আমি কি করে জানলাম, বলত?

- তুমিই বল।

- কারণ আমিও গ্রীষ্মের রোদে টো-টো করে ঘুরে বেড়ানো বালিকা, যে আমগাছে ঢিল মেরে দুপুরের ঘুম ভাঙাত।

- ওরে গেছো মেয়ে, সে সময় যদি আমাদের দেখা হত!

- তাহলে এত পথ পাড়ি দিতে হত না। যাই হোক, তোমার ঘরে ছুরি আছে ? দাও তো। ছিলে কেটে খাওয়াই।

- ছুরির কি দরকার, দুষ্টু বালিকা। দাঁত দিয়ে ওটি ছেল, কামড় দিয়ে দু’ভাগ করে একভাগ আমাকে দাও। তবেই তো বুঝবো, তুমি আমার কিশোরবেলার প্রেমিকা, পথ ভুলে অন্যদিকে গিয়েছিলে।

- দুষ্টু বালক, এই নাও, কাজটি তুমি কর। কারণ বালকেরা কখনও বালিকাদের এঁটো খায় না। - আজ সে নিয়ম অচল। কারণ বালিকাটি এখন প্রেমের দেবী, বালকটি তার সেবাদাস। সুতরাং প্রেমের ফলের সেভাবেই গতি হোক।

প্রগলভা নারীর চটুল হাসি হঠাৎ উবে গেল। গভীরভাবে সে আমার হাত চেপে ধরল। তার চোখ কিছু বলছে। পাথর যুগের ভাষা, অতি প্রাচীন কিন্তু চিরন্তন।

রুপা ফেরেনি। তাই, সোমা আবার এল।

- তুমি অবাক হওনি ?

- না, তোমার অপেক্ষায় ছিলাম। শোন, আমি তোমার মত গাইতে পারিনা। তবু তোমাকে একটা গান শোনাব। শুনবে ?

- সত্যি, তুমি গাইবে ? আমি ধন্য হব।

আমি গাইলাম - ‘সারাদিন তোমায় ভেবে, হলনা আমার কোন কাজ, হলনা তোমাকে পাওয়া, দিন যে বৃথায় গেল হায়।’

সোমা ফুঁপিয়ে উঠল।

- কেঁদো না সোমা, আমার দিন বৃথা যায়নি। তুমি এসেছ।

সোমা আমার বুকে মাথা রাখল। গভীর মমতায় আমি ওকে জড়িয়ে ধরলাম।

- আর কতদূর যাবে মাসুম?

- যতদূর তুমি নিয়ে যাবে।

- রুপা এলে কি করবে?

- আসুক’ত।

- প্রেমের মধুপুরে কি আমরা পৌঁছুতে পারবো?

- পারবো, যদি তুমি সাথি হও।

সন্ধ্যার মুখে মুখে সোমা আমার বাহুডোর থেকে বেরিয়ে এল।

- আজকে তাহলে যাই।

- আরও কিছুক্ষণ থাক।

- সন্ধ্যা হয়ে এলো যে। হোস্টেলে ফিরতে হবে।

- আচ্ছা, তাহলে এসো। কালকে আবার দেখা হবে।

পরের দিন সোমা এলো না, এলো রুপা, রণরঙ্গিণী মূর্তি হয়ে।

- মাসুম, এসব কি শুনছি ?

- কি শুনছ ?

- তুমি বিশ্বাস ভঙ্গ করেছ। সোমার সাথে তোমার কি সম্পর্ক, ওর সাথে এতো মাখামাখি কেন? কদিন ছিলাম না, তাতেই তোমার এতো অধঃপতন!

- রুপা শোন, এতো অস্থির হয়ো না। কেবল বাড়ি থেকে এসেছ। হোস্টেলে গিয়ে রেস্ট নাও।

- অস্থির হব না মানে, আমার সব শেষ হয়ে যাচ্ছে, আর আমি ঘরে বসে রেস্ট নেব! তাতে তোমাদের খুব সুবিধা হয়, তাই না? বুঝেছি, ঐ ডাইনী তোমার মাথা খেয়েছে। ওকে আমি ছাড়বো না।

- রুপা, চিৎকার কর না। লোকজন জড় হয়ে যাবে। তারা ভাববে কি?

- হোক জড়। তারা জানুক, তুমি আমার, কেবল আমার। কাউকে আমি ভাগ বসাতে দেব না। তোমাকে সব দিয়েছি। তুমি কোথাও যেতে পারবে না।

- ঠিক আছে। এখন চলত, তোমাকে রেখে আসি।

- রেখে আসতে হবে না, আমি নিজেই যেতে পারি।

পরের দিনেও সোমা এলো না, তবে রুপা ঠিকই এলো। উদভ্রান্ত চেহারা। বেশভূষা পরিপাটি না। এমনকি চুলটাও ভালমত বাঁধেনি।

- মাসুম, তোমার কি হয়েছে ? বড় যে এড়িয়ে চলছ। আমাকে কি আর ভাল লাগছে না ?

- রুপা, লক্ষ্মী মেয়ে, শান্ত হও।

- এতক্ষণ পরে আদর করে ডাকলে! তোমার মুখে হাসি নেই, কেন? কোথায় গেল সেই বুক ভরা ভালবাসা? দেখ, আমার দিকে তাকাও, আমাকে আদর কর। অমন কর না মাসুম, তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না।

রুপা কান্নায় ভেঙে পড়ল। আমি নিথর হয়ে বসে রইলাম। ওকে বুকে টেনে নিতে পারলাম না। সেস্থান এখন অন্যের দখলে। আমার মনে পড়ে গেল, বহু বছর আগে রহিম কাকার শ্যামলা রঙের বউটি এভাবেই কেঁদেছিল। ঘটনাটি আমি এখনও ভুলতে পারিনি। তবে কি আমার অবচেতন মন প্রতিশোধ নিচ্ছে ? না, সেটা ঠিক হবে না। আমি ওর মাথায় হাত রাখলাম। সে কেঁদেই চললো।

পরের দিন দুর্ঘটনাটি ঘটলো। আমি তখনও বিছানা ছাড়িনি, এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে বন্ধু স্বপন ঘরে ঢুকলো।

- ওঠ, ওঠ, কাপড় পর। বেরুতে হবে।

তার উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর শুনে বুঝলাম, খারাপ কিছু ঘটেছে। যদিও সব কিছুর জন্যই প্রস্তুত আছি, তবু ভয় লাগলো।

- কি হয়েছে রে?

- খারাপ খবর আছে। তোর বান্ধবী রুপা হাসপাতালে। গতরাতে অনেকগুলি ঘুমের ঔষধ খেয়েছে। অবস্থা খুব একটা ভাল না।

শেষে রুপা এমন কাজ করল! আমি স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলাম। স্বপন আবার তাগাদা দিল।

- স্বপন, ওকে বাঁচাতে হবে রে। কিছু একটা হয়ে গেলে, আমি মুখ দেখাব কিভাবে?

- ঘাবড়াস না। এখন সাহস হারালে চলবে না। আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করবো। সব ঠিক হয়ে যাবে, ইনশাল্লা।

রুপা অচেতন হয়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে। তার সুন্দর মুখে অক্সিজেনের মাস্ক, পেলব বাহুতে স্যালাইনের সুঁচ। আমার প্রেমিকা মৃত্যুশয্যায়। এই মুহূর্তে, তার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে নিজেকে বড় অপরাধী মনে হল। রুপার বান্ধবীরা আমার দিকে ঘৃণাভরে তাকাচ্ছে। সোমাও এসেছে। তবে মাথা নিচু করে পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।

আমার বন্ধুরা পর্যাপ্ত পরিশ্রম করছে। তাদের প্রচেষ্টায় রোগীর চিকিৎসা বা সেবার ত্রুটি হচ্ছে না। তবু, খুব হতাশ ও বিচলিত হয়ে পড়লাম। সম্ভবত, তা লক্ষ্য করে বন্ধুরা আমাকে বাইরে নিয়ে এলো।

- অত হতাশ হচ্ছিস কেন ? অবস্থা আগের চাইতে ভাল।

- রুনু, একটা কিছু কর ভাই। ওকে বাঁচা।

- ভেঙে পড়িস না, আমরা আছি তোর পাশে। দেখিস, কিচ্ছু হবে না। চল, মুখে একটু পানি দে। তোর মুখের দিকে তাকান যাচ্ছে না।

রুপার অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। হাসপাতালে রহিম কাকাকে দেখলাম। প্রথমে না দেখার ভান করলেন। পরে করুণ সুরে নালিশ করলেন, ‘খোকা বাবু, তোমার কি ক্ষতি করেছিলাম আমরা ?’

মাথা নিচু করা ছাড়া কোন সদুত্তর দিতে পারলাম না।

আজকে ডাক্তাররা রুপাকে আশঙ্কামুক্ত ঘোষণা করলেন। আমি সোমার সাথে দেখা করার সিন্ধান্ত নিলাম। আমার পাশের রুমে থাকে মিয়া ভাই। সহপাঠী হলেও বয়সে বড় বলে, তাকে ঐ নামে ডাকি। মিয়া ভাই সোমাকে ডেকে দেবার দায়িত্ব নিল। এরা আমার কমরেড, কোন কাজে না বলে না।

বিকেলে সোমার সাথে দেখা হলো। আমরা দু’জনে পদ্মার ধারে গেলাম। এই জায়গাটি অনেকের মত আমাদেরও সন্ধ্যা ভ্রমণের স্থান। আমরা বাঁধের ধারে একটি রকে বসলাম। অনেকক্ষণ এক সাথে বসে রইলাম। সোমা আমার দিকে, আমি সোমার দিকে গভীরভাবে তাকালাম। সোমার চোখে এত গভীরতা আগে দেখিনি।

- কি দেখছ?

সোমা স্মিত হাসল।

- সোমা, প্রেম কাকে বলে?

- মরণকে।

তার শীতল কণ্ঠস্বর একটুও কাঁপলো না।

- ধর, আমরা দু’জনে যদি মরে যাই তবে মরণের পরে কি আমাদের মিলন হবে? তুমি কি আমাকে চিনতে পারবে?

- আমার নাম ধরে ডেকো, আমি ঠিক তোমাকে চিনে নেব।

আঁধার ঘন হয়ে আসছে। বর্ষার আকাশ, যে কোন সময়ে বৃষ্টি নামতে পারে। চারিদিক জনশূন্য প্রায়। তবুও আমরা বসে রইলাম। আমাদের ফেরার তাড়া নেই। নিচে প্রমত্ত পদ্মা প্রবল বেগে বইছে। - মাসুম, আমরা প্রেমের মধুপুরে যেতে চেয়েছিলাম। আমাকে নিয়ে যাবার কথা ছিল তোমার। একটি কুঁড়েঘর বানাবে তুমি সেখানে। সেটাই হবে আমাদের প্রেমের নীড়। আমি নীল পাহাড় থেকে চন্দনা পাখিদের ডেকে আনব। তারা হবে আমাদের মধুমিলনের সাক্ষী। তুমি কিন্তু ওদের তাড়িয়ে দিও না।

সোমা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ওকে বুকের মধ্যে ধরে আমিও কাঁদতে লাগলাম। হঠাৎ আমার বুকে সহস্র পুরুষের সাহস ভর করল। মনে হল, আমি কালাপাহাড়ের বংশধর।

- হাঁ, সেখানেই যাব আমরা। তোমার ভয় করবে না তো, সোনামণি?

- আমাকে এভাবে ধরে রেখ। তাহলে আমার মোটেও ভয় করবে না।

- পদ্মার ওপারে, ঐ দেখ মধুপুর। হাজার বছর ধরে পদ্মা আমাদের মাতৃভুমির উপর দিয়ে বইছে। কত মানুষকে

সে তার জঠরে আশ্রয় দিয়েছে। তাকে ভয় কি? সে আমাদের ঠিক মধুপুরে নিয়ে যাবে।

পরেরদিন সকালে, জেলেরা পদ্মার চরে ওদের যুগলবন্দি লাশ উদ্ধার করল। লক্ষণীয় বিষয়, তাদের চেহারায় মৃত্যু যন্ত্রণার কোন চিহ্ন ছিল না।

এরপরে কাহিনী সংক্ষিপ্ত। মাসুমের অকাল মৃত্যুতে তার বন্ধুরা শোকসভার আয়োজন করল। অনুষ্ঠানে, স্বপন ‘শোকসভা চাই না’ শিরোনামে একটি কবিতা পড়ল। অতি সম্প্রতি সে কবিতাটি রচনা করেছে।

এদিকে, রুপা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলে তার বাবা তাকে বাড়িতে নিয়ে গেলেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যে সুপাত্র দেখে বিয়ে দিলেন। বিয়ের অনুষ্ঠানে মাসুমের মা কনের জন্য একটি সোনার হার পাঠালেন। উল্লেখ্য, হারটি তিনি পুত্রবধূর জন্য রেখেছিলেন। রুপা তা ফিরিয়ে দেয়নি।

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত
close
close