ঢাকা, মঙ্গলবার, ১২ নভেম্বর ২০১৯, ২৮ কার্তিক ১৪২৬ আপডেট : কিছুক্ষণ আগে English

প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২৩:০৮

প্রিন্ট

একজন লড়াকু যোদ্ধা ফিরোজা বেগম

একজন লড়াকু যোদ্ধা ফিরোজা বেগম
বঙ্গ রাখাল

নারীরাও যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন কিন্তু এটা বলতে দ্বিধা নেই। যুদ্ধে নারীরা হয়েছে সহযোগী আর পুরুষ হয়েছে বীর। কিন্তু হতাশার বিষয় হলো তাদের বীরাঙ্গনা উপাধি দিয়েই আমরা আমাদের দায় শেষ করেছি। শত শত সন্তান তার মাকে, পিতা তার মেয়েকে হারিয়েছে। ধর্ষিত নারীর গণবিদারী চিৎকারে স্তব্ধ হয়ে গেছে চারপাশ। অথচ আজ আমরা ভুলতে বসেছি মুক্তিযুদ্ধে নারীদের উপর নির্যাতন, ধর্ষণ, নিপীড়নের হৃদয়বিদারক গাঁথা।

অনেক ক্ষেত্রে নারী রেখেছে পুরুষের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। অথচ এ নারীরাই বঞ্চিত হয়েছে বিভিন্ন সময়।

মুক্তিযুদ্ধ বলতেই হয়তো আমরা ধরে নেই দুইটা দেশের সেনাদের মধ্যকার যুদ্ধ। আসলে এটা কোনো সেনাদের যুদ্ধ ছিলো না এটা ছিলো এদেশের সাধারণ মানুষের হাজার বছরের লড়াই সংগ্রামের পরিসমাপ্তির এক জনযুদ্ধ। যে কারণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ‘এদেশের মানুষ মুক্তি চায়, এদেশের মানুষ বাঁচতে চায়’।

পুরুষকে লড়তে হয়েছে পাকিস্তানি বাহিনি ও এদেশিও শত্রুদের বিরুদ্ধে আর একজন নারীকে লড়তে হয়েছে পরিবার, সমাজ, ধর্মী ও পুরুষতান্ত্রিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা কোন সংগঠনের সাথে।

মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা কোন আকস্মিক ঘটনা না। এর পিছনে রয়েছে হাজার হাজার বছরের অবহেলা, নির্যাতন, নিপীড়নের ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধে এই সক্রিয় অংশগ্রহণই ছিলো তাদের সচেতন প্রয়াস।

তেমনই একজন মুক্তিযোদ্ধা লড়াকু নারী ফিরোজা বেগম। বাড়ি ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার যুগীপাড়া গ্রাম। যুদ্ধের সময় তার বয়স ঊনিশ বছর দশ মাস। স্বামী রুস্তম যুদ্ধে গেছে। কোলে নয় মাসের মেয়ে আফরোজা নাসরিন লিপি। বার বার রাজাকার বাহিনি তাকে নানা হুমকি-ধামকি দিয়েছে তবে যে তাদের মধ্যে তাকে কেউ সাবধান করে নিরাপদ জায়গা চলে যেতে বলেনি তা নয়। কারণ এ অঞ্চলে যারা রাজাকারে নাম লেখিয়েছে তারা সবাই তার পরিচিত। যে কারণে তাকে মাঝে মাঝে সাবধানও করে দিয়েছে। কারণ পাকিস্তানিদের নজরে পড়লে তার কোন রক্ষা নেই। আবার কিছু কিছু রাজাকার এসব দেখে অন্য রাজাকারদের বলতো নিজের ভাইদের সাথে গাদদারী করতে পরবে না।

রাজাকার ,পাকিস্তানি আর্মিরা তাদের টিন আর খড়ের ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। সাতদিন ধরে গোলার ধান পুড়েছে। স্বামী ছিলেন ঝিনাইদহের মুক্তিযোদ্ধাদের কুরিয়ার। তিনি তাদের চিঠিপত্রের আদান-প্রদান করতেন। ফিরোজা বেগম নিজে বর্ষার সময় পানি সাঁতরে জীবন বাঁচিয়েছেন। ততোদিনে শিখে নিয়েছেন আর্ম চালানো। নিজের কাছে সব সময় আর্ম থেকেছে। তিনিও মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজ-খবর নিয়েছেন। এই বিপদের সময় হিন্দুদের আমানত রক্ষা করেছেন। বার বার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন এই নারী। চোখের সামনে পুড়তে দেখেছেন নিজের তিলে তিলে গড়ে তোলা সুখের সংসার আর যত্নে সাজানো ঘরের তৈজসপত্র। এমনভাবেই স্মৃতিচারণ করছিলেন ভারাক্রান্ত নয়নে।

সে সময়ের কথা বলতে বলতে বললেন, তখন না যতটা কষ্ট পেয়েছি তার চেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছি যুদ্ধের পর। সিপিবির দল বলে আমার স্বামীকে সিপিবি আবার রক্ষীবাহিনী বলে আমাদের বাহিনীতে যোগ দিতে হবে কিন্তু আমার স্বামী কোনদিনই অন্যায়কে মেনে নেয়নি। যে কারণে একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও যুদ্ধের পর তাকে বার বার বিভিন্ন দলের লোক ধরে নিয়ে গেছে। কিন্তু আল্লাহর মহিমায় তিনি আবার বেঁচে এসেছে। পুলিশ দিয়েও সব সময় তার উপর অত্যাচার করা হয়েছে যা মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তাকে করা হয়নি। কোন জায়গা কিছু হলেই তাকে দোষ দেওয়া হতো এবং তাকে পুলিশ দিয়ে নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছে।

এভাবেই নানাভাবে নিজের জীবনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তিনি আমাদের শুনিয়েছিলেন গত ২৪ সেপ্টেম্বর তার ধানমন্ডির বাসায় এবং বার বার অশ্রুসিক্ত হয়ে যাচ্ছিলেন। তার কোন প্রত্যাশা নেই। আজ আমার সন্তানেরা মানুষের মতো মানুষ হয়েছে। তারা স্বাধীন বাংলাদেশে জন্মেছে এটাই আমার অনেক পাওয়া। কিন্তু মাঝে মাঝে অনেক খারাপ লাগে। যখন দেখি যারা যুদ্ধের সময় বিরোধীতা করেছিল আজ তারাই বড় মুক্তিযোদ্ধা। এভাবেই নিজের মনে জমে থাকা সেই বিভৎসময় সময়ের কথা বললেন আর মুহূর্তের নিরবতার দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠল বাসার পরিবেশ।

বাংলাদেশ জার্নাল/এইচকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত