ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৯ এপ্রিল ২০২০, ২৬ চৈত্র ১৪২৬ আপডেট : ৫ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০২০, ১৩:১৯

প্রিন্ট

নারীদের জন্য কাজ করতে হবে প্রতিদিনই

নারীদের জন্য কাজ করতে হবে প্রতিদিনই

Evaly

সালমা আফরোজ

চলে গেল ৮ মার্চ, বিশ্ব নারী দিবস। আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে সারা বিশ্বে সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়ে আসছে এ দিনটি। যার আদি নাম আন্তর্জাতিক কর্মজীবী নারী দিবস। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বেই জাতিসংঘের আহ্বানে এ দিনকে যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে উদযাপন করা হয়ে থাকে। ব্যতিক্রম ছিল না এবারও। এই দিনে নারীদের জন্য থাকে বিশেষ বিশেষ আয়োজন। রেস্তোঁরা, সোনার দোকান, সুপারশপ, বিভিন্ন আউটলেটগুলোতে থাকে তাদের জন্য বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা।

এদিন বাসার কাজের বুয়া বিধবা খালার কাছে জানতে চাইলাম, ‘খালা, আজ নারী দিবস, জানেন? উনি অবাক চোখে তাকিয়ে থাকেন, ‘মানে কি খালা?,’ উল্টো আমাকে জিজ্ঞেস করেন।

রাস্তায় বড়-ছোট মেয়েরা বেগুনি রংয়ের জামা আর শাড়ি পরে চলাচলা করেছে। এটা দেখে রাস্তার পাশের নারী মসলাওয়ালী বলে, ‘আজ মাইয়াগো কি হইছে, সব বেগুনি জামা পরছে? পাশে ছিলাম তাই বললাম, ‘আজ ৮ মার্চ নারী দিবস।’

না বুঝে আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন উনি। পরে বলেন, ‘আর নারী দিবস! আমি সকালে রান্না করে এখানে আসি মসলা বিক্রি করতে।’ কথায় কথায় বলেন, দুপুরে স্বামী ভাত খেতে বাসায় আসেন, তিনি না গেলে তার স্বামী নিজে ভাত নিয়ে খাবে না। বসে থাকবে বউয়ের জন্য।

কিন্তু উত্তর দিবো? মসলা কিনে চলে এলাম। আমার কাছে অবশ্য কোনও উত্তর চাননি উনি।

সোহানার বিয়ে হয়েছে ১০ বছর। এই দীর্ঘ বছর ধরে সোহানা তার স্বামীর হাতে মার খেয়েই আসছে। আমি তাকে বাবার বাড়ি চলে যাওয়ার পরামর্শ দিলাম। কিন্তু পরামর্শটা তার পছন্দ হলো না। সে জানায়, ‘বাড়িতে সব তো সব অবিবাহিত ভাই-বোন। তাদের বিয়ে-শাদির ব্যাপার আছে। আমি গেলে ওদের বিয়েতে সমস্যা হতে পারে। তাছাড়া বাবা-মাও বিষয়টা মেনে নেবে না।’

এটাই চূড়ান্ত সত্য। একজন বিবাহিত মেয়ের দায়িত্ব নিতে চায় না কেউ। স্বামীর সংসারে যত কষ্টই হউক তাইতো বাবা-মা মেয়েকে সেখানেই থাকার জন্য জোরাজুরি করে। এমনকি সংসার ভেঙে গেলে বেশিরভাগ বাবা-মা নিজের মেয়ের দোষই দেয়।

পরিবারের ভেতরে সহিংসতা রোধে বাংলাদেশে পারিবারিক সহিংসতা সুরক্ষা ও প্রতিরোধ আইন হয়েছে।

মূলত নারীর ওপর শারীরিক, মানসিক ও যৌন নিপীড়ন বন্ধের লক্ষ্যে তৈরী করা এ আইনের খসড়া মন্ত্রিপরিষদ নীতিগত অনুমোদন করেছে। নারী আন্দোলন কর্মীদের মতে প্রতিদিন ৭০ শতাংশের বেশি নারী পরিবারের ভেতরে যে নির্যাতনের শিকার হয় তা বন্ধে এ আইনটির কার্যকর প্রয়োগ একটি মাইলফলক হিসাবে কাজ করতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় এ আইনের ফলে পারিবারিক সহিংসতার শিকার যে কোনও আবেদনকারীকে বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে প্রাথমিক নিরাপত্তা দেয়া হবে।

কিন্তু আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন না হলে নারীরা যুগে যুগে নির্যাতিত হয়েই যাবে। অনেক ক্ষেত্রে নারীদের রুখে দাঁড়াতে হবে। সমাজ ব্যবস্থা এমন যে ছোটবেলা থেকে পুরুষদের পাখি পড়ার মতো শেখানো হয়, নারী তোমাদের অধীনস্থ। নারীর উপরে সে যে কোনও আধিপত্য বিস্তার করতে পারে। অন্যদিকে নারীদের শেখানো হয় সে শারীরিক আর মানসিকভাবে দুর্বল, এজন্য তাকে পুরুষের অধীনেই থাকতে হবে। স্বাধীনভাবে চলাফেরার কোনও অধিকার তার নেই।

নারী দিবস একদিন না প্রতিদিন হোক। একটা মেয়ে যখন ছোট থাকে তখন বাবা ভাইয়ের কথা মতো তাকে চলতে হয়ে, বিয়ের পর স্বামীর আর বুড়ো হলে ছেলের কথা মতো। তার নিজস্ব মতামত বলতে কিছুই থাকে না। তাদের কোনও ছুটি নাই, সকাল থেকে রাত পযর্ন্ত ঘরের কাজ করেই তারা জীবন পার করছে। যারা চাকরি করে তারা তো ২৪ ঘন্টার মধ্যে নিজের জন্য ১০ মিনিটও সময় পায় না।

অতীতে আর্থ-সামাজিক কাঠামোর কারনে শিক্ষার অভাবে নারীরা পুরষতান্ত্রিক পরিবেশে দুঃসহ জীবন যাপন করত। এখন দিন পাল্টে গেছে। এখন তারা শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে, চাইলেই সে বুঝে নিতে পারে, তাকে কি করতে হবে। নারীদের অধিকার আদায়ে তাদের সচেতন হতে হবে। পুরুষ যেমন মানুষ, তেমনি নারীও মানুষ। একজন মানুষ হিসেবে তাদেরও ইচ্ছামতো জীবনযাপন করার অধিকার আছে। তাই নিজেদের কোনওভাবেই দুর্বল ভাবা যাবে না। নারীদের আত্মনির্ভরশীল ও অধিকার সচেতন হতে হবে। নারীরা যদি জেগে ঘুমিয়ে থাকে তাহলে এই অধিকার আন্দোলন যুগ যুগ ধরে চললেও আদায় হবে না। জন্মগত অধিকার সবার থাকে, সেটা কার্যকর কারার মতো শুধু নারীদের সাহস থাকতে হবে।

তাই নারী দিবস বিশেষ দিন হিসেবে পালন করার কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। যে সব প্রতিষ্ঠান নারী দিবসে নারী কর্মীদের জন্য বিশেষ আয়োজন করে প্রমান করতে চায়, নারীদের সমঅধিকারে তাদের পাশেই আছে, তাদের বলি, বছরে একবার নারীদের জন্য বিশেষ আয়োজন না করে সারাবছর সচেতনামূলক কিছু কার্যক্রম করুন। তাহলে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন আসতে পারে।

তাদের জন্য দিন পাল্টে গেছে। এখন তারা শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে, চাইলেই সে বুঝে নিতে পারে, তাকে কি করতে হবে। নারীদের অধিকার আদায়ে তাদের সচেতন হতে হবে। পুরুষ যেমন মানুষ, তেমনি নারীও মানুষ। একজন মানুষ হিসেবে তাদেরও ইচ্ছা মতো জীবনযাপন করার অধিকার আছে তাই অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করার কোনও প্রয়োজন নাই। নিজেদের কোনওভাবেই দুর্বল ভাবা যাবে না। নারীদের আত্মনির্ভরশীল হতে হবে। নারীরা যদি জেগে ঘুমিয়ে থাকে তাহলে এই অধিকার আন্দোলন যুগ যুগ দলে চললেই আদায় হবে না। জন্মগত অধিকার সবার থাকে, সেটা কার্যকর কারার মতো শুধু নারীদের সাহস থাকতে হবে।

নারী দিবস বিশেষ দিন হিসেবে পালন করার কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। যে সব প্রতিষ্ঠান নারী দিবসে তাদের জন্য বিশেষ আয়োজন করে প্রমান করতে চায়, নারীদের সমঅধিকারে তাদের পাশেই আছে, তাদের বলি বছরে একবার নারীদের জন্য বিশেষ আয়োজন না করে সারাবছর সচেতনামূলক কিছু কার্যক্রম করলে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন আসতে পারে। তাদের জন্য কিছু করতে চাইলে ঘরে ঘরে নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। কোনও নারী যাতে ধর্ষিতা না হয়, কোনও শিশু যাতে লালসার শিকার না হয়, যৌতুকের জন্য কোন মেয়ের যেন সংসার না ভাঙ্গে, প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হলে কেউ যেন এসিডে দগ্ধ না হয়, রাস্তাঘাট-বাস-অফিসে কেউ যেন কোন নারীকে যৌন হয়রানি করতে না পারে। কত শত শত মেয়ে আছে ইচ্ছার বিরুদ্ধে পতিতা পল্লীর অন্ধাকারে দিন কাটাতে বাধ্য হয়। সত্যি যদি নারীদের জন্য কেউ কিছু করতে চায় তাহলে এই সমস্ত অবিচার কীভাবে চিরতরে বন্ধ করা যায় সেটা নিয়ে ভাবতে হবে জোরালো ভাবে।

২০২০ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ‘প্রজন্ম হোক সমতার, সকল নারীর অধিকার’। এ বছরের নারী দিবসের হ্যাশট্যাগ ‘ইচ ফর ইক্যুয়াল’। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নারী দিবস উদযাপন হয় ভিন্ন ভিন্ন ভাবে।

নারীরা ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে লক্ষ্য অর্জন করে। শুধু তাই নয়, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা এসডিজি অর্জনে নারীকেন্দ্রিক বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। জাতীয় উন্নয়নকে টেকসই করতে নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূর করে সমতা আনায় গুরুত্ব দিতে হবে। নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া, নারীর সক্ষমতা বাড়ানো, স্বাবলম্বী করা এবং নারীদের নিজেদের ভাগ্য নিজেদেরই গড়ার সুযোগ কর দেয়ার মাধ্যমে বৈশ্বিক উন্নয়নের মূল ধারায় তাদের যুক্ত করতে হবে। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশ্বের হাজারও সংগঠন, রাজনৈতিক দল এবং প্রতিষ্ঠানকে একযোগে কাজ করতে হবে।

শুধু আইন নয়-সমাজে নারীর গুরুত্ব প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। আজকের বৈশ্বিক আবহে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণে অর্থনৈতিক উন্নয়ন দৃশ্যমান। তবে এটি সামগ্রিক উন্নয়নের তুলনায় অপ্রতুল। অতীতে পারিবারিক কাজে পুরুষের সুনির্দিষ্ট কিছু ভূমিকা ছিল। বর্তমানে নারীরা সেসব দায়িত্ব সমভাবে পালন করছে।

নারী দিবসে সংহতি জানাতে বিশ্বের নানা দেশে জমায়েত হয় লাখো লাখো নারী-পুরুষ। দিবসটির উদ্দেশ্যে সভায় নারী-পুরুষের বেতন বৈষম্য, নারী নির্যাতন, মেয়েশিশু নির্যাতন এবং গর্ভপাত-এসব বিষয়ে হাজারও তথ্যচিত্র উপস্থাপন করা হয়।

তাই নিজেদের জন্যই নারীদের ঘুরে দাঁড়াতেই হবে। নারী, তোমরা সাহসী হয়ে উঠো, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ যাতে তোমাদের দমিয়ে রাখতে না পারে।

এমএ/

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত