ঢাকা, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২০, ২৬ আষাঢ় ১৪২৭ আপডেট : ৪ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ০৫ জুন ২০২০, ১৬:০৩

প্রিন্ট

আসুন, একটা কাল্পনিক গল্প শুনি...

আসুন, একটা কাল্পনিক গল্প শুনি...
রিয়াজুল হক

রুহুল আমিন (কাল্পনিক নাম) সাহেব একজন বিরাট পয়সাওয়ালা মানুষ। তার বেজায় বুদ্ধি। সবাই ওনার বুদ্ধির তারিফ করে। পরিবারের সদস্য চারজন। স্বামী স্ত্রী আর দুই ছেলে-মেয়ে।

রুহুল আমিন সাহেবের বাসায় নতুন একজন কাজের মানুষ দরকার। যদিও আগে থেকে রীনা নামের একটা মেয়ে কাজ করে আসছিলেন। এত বড় বাড়ি। দুইজন না হলে হয় না।

মেরিনা বানু নামের একজন পঞ্চাশোর্ধ মহিলাকে কাজের জন্য ঠিক করা হল। কাজের আইটেম অনুযায়ী মাসের বেতন দেয়া হবে। এভাবেই এখন সব জায়গায় বাসা-বাড়ীর কাজের বেতন দেয়া হয়।

বিষয়টা আরেকটু পরিষ্কার করে বলি। যেমন,

* কাপড় পরিষ্কারের জন্য ৭০০ টাকা;

* ঘর পরিষ্কারের জন্য ৭০০ টাকা;

* মাছ-মাংস ও সবজি কোটার জন্য ৭০০ টাকা;

* সকালের নাস্তা বানানোর জন্য ৭০০ টাকা।

অর্থাৎ এই চারটি কাজের জন্য মাস শেষে মেরিনা বানু ২৮০০ টাকা পাবেন। মেরিনা বানু ভেবেছিল যেহেতু বাসায় চারজন মানুষ, তাহলে এই বাড়ির কাজ শেষ করে তিনি আরেকটি বাড়ির কাজ নিতে পারবেন। কাজে লেগে গেলেন। কিন্তু সমস্যা বাঁধলো অন্য জায়গায়।

আগেই বলেছি রুহুল আমিন সাহেব অনেক পয়সাওয়ালা মানুষ। আর যাদের টাকা-পয়সা বেশি থাকে, তাদের আত্মীয়-স্বজনের সংখ্যা অনেক বেশি হয়ে থাকে। যে কারণে চারজনের বাসায় আত্মীয়-স্বজন সবসময় পাঁচ জনের বেশি থাকত।

এইসব আত্মীয়-স্বজনের কাপড়-চোপড় মেরিনা বানুকেই মানুষ পরিষ্কার করতে হয়। বাড়িতে মানুষজন বেশি থাকার কারণে ঘরবাড়িও বেশি নোংরা হয়। সেগুলো পরিষ্কার করতে হয়। প্রতিদিন সকালে নাস্তা তৈরি করতে হয় ৯ থেকে ১০ জন মানুষের। বাড়ির সবাই আবার ছোট মাছ, সবজি পছন্দ করে। সেইসব কাজ করতেও অনেক বেশী সময় লাগে।

মাসের বেতনের তুলনায় কষ্ট বেশিই হয়ে যায়, কিন্তু কিছুই করার নাই। তাকে তো ৪ রকম কাজের আইটেমের কথা বলে ঠিক করা হয়েছিল। প্রতিটা কাজের পরিমাণ কি হবে সেটা বলা হয়নি। কি আর করা? মেরিনা বানুর কাজ চলছিল।

হঠাৎ দেশে করোনা ভাইরাসের আবির্ভাব হলো।আত্মীয়-স্বজনরা যে যার মত করে নিজেদের বাড়িতে চলে গেল। মেরিনা বানু একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। যাক কাজের পরিমাণ একটু কমে আসছে। রুহুল আমিন সাহেব করোনার কারণে ছেলে-মেয়ে দুইজনকেই কানাডা পাঠিয়ে দিলেন। মেরিনা বানুর দৈনিক কাজের চাপ আরেকটু কমে গেল। তবে তিনি কখনো কাজে ফাঁকি দিতেন না। সব কাজ নিষ্ঠার সাথেই করতেন।

আগেই বলেছি, রুহুল আমিন সাহেবের বুদ্ধির প্রশংসা সবাই করে থাকে। যেহেতু অনেক পয়সাওয়ালা মানুষ, সেই কারণে এসব পয়সা পাহারা দেয়ার জন্য তিনি আর বিদেশে গেলেন না। কিন্তু তিনি চিন্তা করলেন, মেরিনা বানু এত অল্প কাজ করে মাসে ২৮০০ টাকা নিয়ে যাচ্ছে, এটা বেইনসাফি। তিনি খুব মন:পীড়ায় ভুগতে লাগলেন। বলে রাখা ভালো, রুহুল আমিন সাহেবের কাছে কাজের মানুষকে ২৮০০০ টাকা বেতন দেওয়াও কোন সমস্যা না।

তারপরেও ভাবতে লাগলেন, দুজনের সংসার। ঘরের কাজ কর্ম তেমন নাই। ঘরে এখন যে কাজ, তাতো রীনাই করতে পারে। তাহলে শুধু শুধু মেরিনাকে রেখে লাভ কি?

যেমন ভাবা, তেমন কাজ। মেরিনা বানুকে জানিয়ে দিলেন, এই মাসের পর তোমাকে আর আসতে হবে না। দেশের পরিস্থিতি ভালো না। সবকিছু ঠিকঠাক হোক। নতুন করে কাজের লোকের দরকার হলে, তোমাকেই অগ্রাধিকার দেয়া হবে।

দেশে করোনাকাল চলছে। মেরিনা বানু খুব ভালো করেই জানে, দেশের এই পরিস্থিতিতে কাজ চলে গেলে, নতুন কেউ তাকে কাজে রাখবে না। কিন্তু তার এখন কিবা করার আছে?

মেরিনা বানু শুধু একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলেছেন। চার জনের বাড়িতে যখন দশ জনের জন্য কাজ করতাম, কখনো সামান্য বেতন বাড়িয়ে দেয়া হয়নি। আর যখনই চারজন থেকে মানুষ কমে দুইজন হয়ে গেল, সাথে সাথে কাজ থেকে বাদ দিয়ে দেয়া হলো। কয়েকটা মাসও অপেক্ষা করা হলো না।

লেখক: যুগ্ম পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত
best