ঢাকা, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০, ১১ কার্তিক ১৪২৭ আপডেট : ৯ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২০, ১৫:৩১

প্রিন্ট

সাংবাদিক হাবিবুর রহমানের নৈতিক মানদণ্ড, সত্যনিষ্ঠা আমাদের প্রেরণা

সাংবাদিক হাবিবুর রহমানের নৈতিক মানদণ্ড, সত্যনিষ্ঠা আমাদের প্রেরণা
আবু দারদা যোবায়ের

রোববার ৪ অক্টোবর ২০২০, আমাদের আব্বা প্রবীণ সাংবাদিক মরহুম মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান ভুঁইয়ার ১২তম মৃত্যুবার্ষিকী। দুই হাজার আট সালের এই দিনে ঈদুল ফিতরের একদিন পর তিনি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ইচ্ছায় দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। মৃত্যুবার্ষিকীর এইদিনে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে দোয়া করার পরিবর্তে সারা বছরই মৃত ব্যক্তির জন্য আল্লাহর কাছে গুনাহ মাফের জন্য দোয়া কামনা ও জান্নাত কামনার শিক্ষা জীবিতকালে তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন। ব্যক্তি জীবনে চর্চা করেছেন তেমনি তার সন্তানদেরও সেই শিক্ষা দিয়েছেন তিনি।

ব্রিটিশ ভারতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত একজন সাধারণ সহজ সরল মানুষ হয়েও কোরআন ও হাদিসের মৌলিক শিক্ষা সততা, ন্যায়-নিষ্ঠা ও হালাল হারাম বেছে চলার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন আপোষহীন।

আমি এবং আমার ভাইবোনেরা স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি থেকে অনেক কিছু শিখেছি। কিন্তু পরিবারের কর্তা আব্বার কাছ থেকে পারিবারিক যে শিক্ষা আমরা পেয়েছি তা বর্তমান জামানায় মেনে চলা অনেকটা কঠিন। তবুও যতটুকু সম্ভব আমরা মেনে চলার চেষ্টা করি যা বাবার কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা।

বর্তমান নারায়ণগঞ্জ জেলার আড়াইহাজার উপজেলার দুপ্তারা ইউনিয়নের পাঁচবাড়িয়া গ্রামে ১৯২২ সালে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন আমাদের আব্বা মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান ভুঁইয়া। শিশুকালে গ্রামের মক্তবে পড়াশুনা শেষে আব্বার চাচা উনাকে তৃতীয় শ্রেণিতে আড়াইহাজার স্কুলে ভর্তি করে দেন। সেই আমলে পাঁচবাড়িয়া গ্রামের বাড়ি থেকে পায়ে হেটে, নৌকায় চড়ে প্রতিদিন সাড়ে তিন মাইল-সাড়ে তিন মাইল মোট সাত মাইল আসা যাওয়া করে স্কুলে লেখাপড়া করেছেন তিনি।

ব্রিটিশ ভারতে ১৯৩৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আড়াইহাজার পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে আব্বা ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দর থেকে স্টিমারে চড়ে ফরিদপুরের গোয়ালন্দ যান। সেখান থেকে ট্রেনে কলকাতা। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় পাস করে, কলকাতায় খাদ্য বিভাগে সরকারি চাকরি নেন। বর্তমান কলকাতার ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের কাছেই দমকল অর্থাৎ ফায়ার সার্ভিস অফিস। তার পাশেই খাদ্য বিভাগ। মারা যাবার কয়েকবছর আগেও আব্বা কলকাতায় চিকিৎসার জন্য যান। আমার বড় বোন ও ছোট ভাই তালহা উনার সাথে ছিলেন। কলকাতার রাস্তায় হেঁটে হেঁটে অনেক স্মৃতি তিনি তাদের সাথে শেয়ার করেছেন।

কলকাতায় দিনে সরকারি চাকরি করার পাশাপাশি ১৯৪৩ সাল থেকে রাতে সংবাদ পত্রে তিনি কাজ করেছেন। কলকাতায় মাওলানা আকরাম খাঁ সম্পাদিত আজাদ পত্রিকা এবং আবুল মনসুর আহম্মদ সম্পাদিত ইত্তেহাদ পত্রিকায় কাজ করেছেন তিনি।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান সৃষ্টি হলে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। অন্যদের মত তিনি বদলি চাকরি হিসেবে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রকাশনা বিভাগে যোগ দেন। চাকরিরত অবস্থায় তিনি তৎকালীন সেন্ট গ্রেগরি কলেজ থেকে ১৯৫৪ সালে এইচএসসি পাশ করেন। পরবর্তীতে রাতের শিফটে কলেজে ভর্তি ও ক্লাস করে ১৯৬৩ সালে বিএ এবং সর্বশেষ ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিপ্লোমা ইন জার্নালিজম ডিগ্রি লাভ করেন।

সরকারি চাকরিতে ঘুষের দৌড়াত্ম পূর্বপাকিস্তান আমলেও ছিল। এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে আমার আম্মাকে না জানিয়ে তিনি ১৯৬৯ সালে হঠাৎ চাকরি ছেড়ে দেন। যদিও আরো সাত আট বছর তিনি চাকরি করতে পারতেন।

আম্মার কাছে শুনেছি, তিনি ব্যবসা করার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু নানা কারণে তা সম্ভব হয়নি। যা হোক পরবর্তীতে সাংবাদিকতাকেই তিনি বেছে নিয়েছিলেন।

স্বাধীন বাংলাদেশে আব্বা সাপ্তাহিক আরাফাত, দৈনিক আখবার, দৈনিক আজাদ এবং প্রতিষ্ঠাকালীন সময় ১৯৮৬ সাল থেকে দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকায় প্রথমে মফস্বল বার্তা সম্পাদক ও পরে সিনিয়র সাব এডিটর হিসেবে আন্তর্জাতিক পাতায় কাজ করেছেন। ইনকিলাব থেকে অবসর নেয়ার কয়েক বছর পর তিনি যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী আমার মেজো বোনের কাছে ২০০৪ সালে ইমিগ্রেশন ভিসায় আম্মাসহ নিউইয়র্কে যান। এক বছর পর আবার ফিরে এসে কয়েকমাস পর নিউইয়র্কে আবার গেছেন।

পেশাগত কারণে এটিএন বাংলার প্রতিনিধি হিসেবে জাতিসংঘের অধিবেশন কভার করতে আমি ২০০৫ সালে সেপ্টেম্বর মাসে দুই সপ্তাহের জন্য নিউইয়র্ক যাই। পরবর্তীতে আরো দুই তিন বার জাতিসংঘের সংবাদ কভার করতে গিয়েছি। সেখানে থাকার সময় আব্বার সাথে সকালে হাঁটতাম। বাসার সামনে আপেল গাছ, আঙ্গুর গাছ ছিলো।

হাসপাতালে গেছি। কত স্মৃতি কত কথা। বেশি অসুস্থবোধ করলে ২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসে অনেকটা জোর করে আম্মাকেসহ আব্বাকে নিয়ে দেশে ফিরি। দেশে উনার চিকিৎসা হয়েছে। ২০০৮ সালে অক্টোবর মাসের চার তারিখ সকাল আটটার কিছু পরে তিনি আমাদের নিজ বাসা কমলাপুরে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর আগের রাতে উনার পাশে বসে বেশ কয়েকবার সুরা ইয়াসিন পড়ার সুযোগ হলেও মৃত্যুর সময় আমি অন্য রুমে ছিলাম। আমার আম্মা ও মেজভাই প্রায় সারা রাত উনার পাশে ছিলেন।

যা হোক ইনকিলাব পত্রিকার সাংবাদিক শামসুল ইসলাম ভাইয়ের মাধ্যমে আব্বার মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে আমাদের বাসায় আসেন মাসিক মদিনার সম্পাদক মরহুম মাওলানা মুহিউদ্দিন খান ,মাওলানা আব্দুল লতিফ নেজামীসহ আরো অনেকে।

প্রথম নামাজে জানাজায় ইমামতি করেন মাওলানা মুহিউদ্দিন খান। আব্বার কাছে মাওলানা মুহিউদ্দিন খানের কথা শুনেছি। উনার পত্রিকার ডিক্লারেশনের সময় আব্বা সহযোগিতা করেছিলেন। নিজের পিতার সাথে সন্তানদের স্মৃতি কতো মধুর, বলে শেষ করা যাবে না।

ছোটবেলায় আব্বার সাথে বাজারে যেতাম। ফকিরাপুল বাজারে দুই টাকা চল্লিশ পয়সার কেরোসিন তেল কিনে দশ পয়সা আমাকে দিতেন। দশ পয়সায় আমি আইসক্রিম খেতে খেতে বাসায় আসতাম।

বিকেলে মাঠে ফুটবল, ক্রিকেট খেলে মাগরিবের আজানের পর বাসায় ফিরতেই হতো আমাদের। আর রাত এগারটার আগে ঘুমানোর সুযোগ ছিলো না। আইডিয়াল স্কুলের নৈশ প্রহরীর এগারটার ঘণ্টা বাজলেই আমরা বিছানায় ঘুমাতে যেতে পারতাম।

ঝড়ের দিনে আম কুড়িয়ে ও বৃষ্টিতে ফুটবল খেলে বাসায় ফিরে কত বকা শুনেছি মারও খেয়েছি আমি। কখনো কখনো আব্বা আমাকে বলতেন তুই সবচেয়ে খারাপ। আবার আব্বা আমাকে যোবায়ের বলেও ডাকতেন।

দেশে বিদেশে আব্বার সাথে আমার স্মৃতি বলে শেষ করা যাবে না। আবার ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে নামাজ পড়ে আব্বা আমাদের পাঁচ ভাইকে তিন নেতার মাজার, কার্জন হল সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঘুরে দেখিয়েছেন। হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত হয়ে যেতাম। ইতিহাস ঐতিহ্য আর নীতি নৈতিকতা, সততা, ন্যায়-নিষ্ঠা, হালাল-হারাম, ভালো-মন্দ বেছে চলার চর্চা সেই শিশু কাল থেকে সন্তানদের শিখিয়েছেন আমাদের পিতা। নীতি নৈতিকতার প্রশ্নে তিনি কখনোই আপোষ করেননি।

আশির দশকে তিনি সাপ্তাহিক আরাফাত, দৈনিক আজাদ ও পরে দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকায় সাংবাদিকতা করার সময় অফিস থেকে রেডলিফ বলপেন কলম দেয়া হতো। সেই কলম তিনি বাসার ব্যক্তিগত লেখা লেখি কিংবা দৈনন্দিন বাজারের হিসাব লেখার কাজে ব্যবহার করতেন না। কেন জানতে চাইলে তিনি বলতেন এটা অফিসের কলম। অফিস, অফিসের কাজে আমাকে দিয়েছে। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজে এই কলম ব্যবহার করা যাবে না। অন্য কলম দিয়ে প্রতিদিনের বাজার সদাইয়ের হিসাব অন্য লেখালেখি করতেন তিনি।

নব্বই সালের শেষের দিকে আমার সাংবাদিকতার ক, খ ,গ শেখা শুরু। বিভিন্ন সাপ্তাহিক পত্রিকায় প্রদায়ক প্রতিবেদক হিসেবে কাজ শুরু করি। সাংবাদিকতার বিষয়ে তিনি শুধু বলতেন ‘পাথর ঘসতে ঘসতে যেমন ক্ষয় হয়’ তেমনি সাংবাদিকতায় লিখতে লিখেতে হাত পাকা হয়।

আমাদের পারিবারিক কালচার হচ্ছে, ভোরে ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজ পড়ে, অন্তত এক আয়াত কোরআন শরীফ পাঠ করার নিয়ম করে লেখাপড়া শুরু করতে হতো। কখনো দেরিতে ঘুম থেকে উঠলেও এই নিয়মের ব্যাঘাত ঘটালে আম্মাকে আমাদের নাস্তা দিতে নিষেধ করতেন আব্বা। এই রীতির চর্চাটা আমাদের অনেক দূর শিখিয়েছে।

কিন্তু নব্বইয়ের দশকে পুরোদস্তুর রিপোর্টার হিসেবে এখানে সেখানে দাপিয়ে বেড়ানো আমি নামাজ কালাম প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম। মাস শেষে বেতন পেয়ে বাসায় মাছ তরকারি বাজার নিয়ে গেছি। আম্মা রান্না করার পর দুপুরে কিংবা রাতে আব্বা জিজ্ঞেস করতেন এটা ওটা কে এনেছে। আম্মা বলতেন যোবায়ের। আব্বা বলতেন না ও নামাজ পড়ে না ওরটা খাওয়া যাবে না।

যা হোক আব্বার কড়া শাসনে শয়তানের ধোঁকায় আর তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে ধর্ম চর্চা না করার বদঅভ্যাস আমায় দীর্ঘদিন আটকে রাখতে পারেনি। আব্বার কড়া কড়িতে জীবনে কিছুটা হলেও আমি লাইন ফিরে পেয়েছি।

আমাদের আব্বা মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন ও বলতেন পিটিয়ে গায়ে হাত তুলে সন্তানদের মানুষ করা যায় না। তিনি বলতেন লাউ জাতীয় গাছের আগা বা সামনের অংশ যেমন আলোর দিকে যায় আমার সন্তানরাও সেভাবে আলোর দিকে যাবে। মিথ্যা কথা বলা এবং শোনা তিনি একেবারেই পছন্দ করতেন না। মিথ্যাবাদী সে তার প্রিয় সন্তান হোক কিংবা ভাতিজা-ভাগ্নে যেই হোক তাকে তিনি ঘৃণা করতেন।

উনিশ’শ তিরানব্বই সালে আমি তখন দৈনিক সকালের খবর পত্রিকার রিপোর্টার। ফরিদপুরের আটরশির পীর সাহেবের দৈনিক পত্রিকা আল মুজাদ্দেদ পত্রিকা প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে। সাংবাদিক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান। পীরের মুরিদ আড়াইহাজার উপজেলার বাসিন্দা জাকির ইন্ডাষ্ট্রিজ এর অন্যতম কর্ণধার আমাদের পাশের গ্রামের জাকির ভাই। ঢাকার মালিবাগে উনাদের বাসা। তিনি আমাকে মুজাদ্দেদ পত্রিকায় কাজ করতে অনুরোধ করেন। তেজগাঁও এফডিসি গেটের কাছে মুজাদ্দেদ অফিসে একদিন চাকরির সাক্ষাৎকার দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন তিনি।

সকালে বাসা থেকে বের হবার আগে আব্বা আমাকে বলেছেন তুমি কোন মিথ্যা কথা বলবে না। চাকরি হলে হবে, না হলেও সমস্যা নেই। আটরশির মুরিদ কিনা জানতে চাইলে না বলবে।

সিনিয়র সাংবাদিক কবির সাহেব আমার সাক্ষাৎকার নিলেন। যথারীতি ঐ প্রশ্ন অর্থাৎ পরিবার আটরশির মুরিদ কিনা জানতে চাইলেন। আমি বিনয়ের সাথে জবাব দিয়েছি, না আমাদের পরিবার আটরশির মুরিদ না। পরে আমার আর চাকরি হয়নি। আব্বা বিশ্বাস করতের এক মিথ্যা কথা দশ মিথ্যা কথাকে ডেকে আনে। দিন যত ফুরাচ্ছে, আধুনিকতার ছোঁয়ায় আমরা একদিকে যত আগাচ্ছি, অন্যদিকে ততোই আমাদের সমাজে মিথ্যার জোয়ার বইছে।

যা হোক আব্বার কথা লিখে বলে শেষ করা যাবে না। তিনি যে সব শিক্ষা দিয়ে গেছেন তা আমাদের চলার পথে পাথেয় হয়ে থাকবে। যে জমানায় আমরা বেড়ে উঠেছি এবং আমাদের সন্তানরা বেড়ে উঠছে সেই সময়কাল কত কঠিন ও কপটতায় পরিপূর্ণ তা বিবেকবান মানুষ মাত্রই জানেন। আম্মা,আমরা পাঁচ ভাই, ছয় বোনসহ পরিবারের সবাই আমাদের আব্বাকে নৈতিক শিক্ষার মানদণ্ডে একজন সফল মানুষ হিসেবে দেখি। সততা ও ন্যায় নিষ্ঠা আর আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে দৈনন্দিন কাজ শুরু ও শেষ করার শিক্ষা তিনি আমাদের দিয়েছেন। তা ছিটে ফোটাও যদি আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম সন্তানদের শিক্ষা দিতে পারি তা হলেই আব্বা আপনাকে স্মরণ করা আমাদের সার্থক হবে। অন্যথায় বছর ঘুরে শুধু মাত্র আনুষ্ঠানিক মৃত্যুবার্ষিকী পালন করে দুনিয়া ও আখিরাতে আমরা লাভবান হতে পারবো না।

গ্রাম থেকে ব্রিটিশ ভারতের কলকাতা তারপর রাজধানী ঢাকায় চাকরি করলেও নিজের শিকড়ের প্রতি অর্থাৎ গ্রামের মানুষের প্রতি আব্বার আলাদা দরদ ও ভালবাসা ছিল। সরকারি চাকরি করার সময় সেই পূর্বপাকিস্তান আমলে পুরিন্দা থেকে পাঁচগাও হয়ে আড়াই হাজার যাবার রাস্তার জন্য তিনি তৎকালীন ঢাকা জেলা প্রশাসনের কাছে ইংরেজিতে চিঠি লিখেছেন। আমাদের পাঁচবাড়িয়া গ্রাম থেকে পশ্চিম দিকে পাঁচরুখি পর্যন্ত রাস্তার নির্মাণের জন্য তিনি নিজে অনেক জমি কিনেছেন। অন্যদেরও সহযোগিতা চেয়েছিলেন। অনেকেই আব্বার এই উদ্যোগকে ভালোভাবে নিয়েছিলেন।

আমাদের গ্রাম থেকে পশ্চিম দিকে ধানক্ষেতের মধ্য দিয়ে রাস্তাও হয়েছে। কিন্তু আব্বা দেখে যেতে পারেননি। গ্রামের প্রবীণরা যারা আব্বার সাথে চলাফেরা করেছেন তারা এর স্বীকৃতি দিয়েছেন। গ্রামে জমি কেনা ও বছরের পর বছর জমি ফেলে রাখা নিয়ে আমরা অনেক সময় আব্বার সাথে ঝগড়া করতাম। বলতাম গ্রামের জমি বিক্রি করেন। ঢাকায় কিছু করেন। জবাবে আব্বা বলতেন একদিন আমার গ্রামে ঢাকা শহর এসে ঠেকবে। সত্যি এখন তাই হচ্ছে। আশপাশে হাউজিং কোম্পানি গড়ে উঠেছে। গ্রামের আরো অধিবাসীর জমির সাথে আমাদের পিতার কেনা জমিতে এখন গড়ে উঠছে জাপানীদের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। আব্বা বেঁচে থাকলে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। উনার স্বপনের অনেকটাই দেখতে পারতেন।

যাহোক আব্বাকে নিয়ে আমাদের অনেক স্মৃতি। বলে শেষ করা যাবেনা। ঢাকায় জানাজা শেষে আমরা আমাদের প্রিয় পিতার লাশ তার জন্মস্থান পাঁচবাড়িয়া গ্রামে নিয়ে যাই। গ্রামের বাড়িতে দ্বিতীয় দফা জানাজায় দলমত নির্বিশেষ বিভিন্ন স্তরের মানুষ শরীক হন। পরে বাড়ির পাশে পারিবারিক গোরস্তানে আব্বাকে কবর দেয়া হয়েছে।

ঢাকা থেকে যখনই গ্রামের বাড়িতে যাই। আব্বার কবরের পাশে গিয়ে প্রিয় আব্বা, চাচাসহ আত্মীয়-স্বজন যারা কবরে শায়িত আছেন তাদের সবার জন্য দোয়া করি।

পরিশেষে বলবো, রাব্বির হাম-হুমা কামা রাব্বা ইয়ানি ছাগিরা। আল্লাহ আমার আব্বাকে জান্নাতের মর্যাদা দিন। আমিন।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

বাংলাদেশ জার্নাল/এনকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত