ঢাকা, রবিবার, ২৪ মার্চ ২০১৯, ১০ চৈত্র ১৪২৬ অাপডেট : ২ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০১৯, ০৩:১৪

প্রিন্ট

মিডিয়া ভাবনা

সামাজিক মাধ্যম আমাদের অসামাজিক করে তুলছে না তো?

সামাজিক মাধ্যম আমাদের অসামাজিক করে তুলছে না তো?
এহসানুল হক মিথুন

বর্তমান সময়ে যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনলাইনে বিভিন্নরকম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসমূহ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এগুলোর মধ্যে ফেইসবুক, ম্যাসেঞ্জার, টুইটার, ইমো, হোয়াটসঅ্যাপ ও বিভিন্ন ব্লগিং সাইট অন্যতম। ছোট থেকে বড় প্রায় সবাই এসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসমূহের সঙ্গে পরিচিত। প্রযুক্তিতে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দু’টো দিক রয়েছে। এসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসমূহ তার বাইরে নয়। এসব মাধ্যমসমূহ যেমন মানুষের যোগাযোগকে সহজ করেছে, দিয়েছে বিনোদন। আবার অন্যদিক দিয়ে জীবনকে হতাশাগ্রস্থ করে তুলে চলার গতি পিছিয়ে দেয়।

বর্তমান তরুণ-তরণীদের মধ্যে যা দেখা যায়, তারা ঘন্টার পর ঘন্টা এসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসমূহে সময় কাটায়, এমনকি পড়াশোনা করার সময়ও। কিন্তু একজন মানুষের পক্ষে দু’টি কাজে একইসাথে পূর্ণমনযোগ দেয়া সম্ভব নয়। এভাবে এদেশের তরুণ-তরুণীদের লক্ষ লক্ষ কর্মঘন্টা নষ্ট হচ্ছে, অর্থাৎ দেশ পিছিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিনকার অভ্যাসবশত সবার কাছে এটা সাধারণ ব্যাপার মনে হলেও আসলে ব্যাপারটি ভয়াবহ। আমরা ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছি, তাই দেশও পিছিয়ে যাচ্ছে। উন্নত দেশগুলো কিন্তু এমন নয়, সেসব দেশের তরুণ-তরুণীরা এভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে সময়ের অপব্যয় করে না। এদেশের তরুণ-তরুণীরা আনুষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করে তাদের বেশিরভাগই চাকরির সন্ধানে ঘুড়ে, কিন্তু চাকরির জন্য সরকারি-বেসরকারি খাতগুলোতে আসন সীমিত। যে হারে চাকরি প্রার্থী বাড়ছে সেই হারে আসন সংখ্যা মোটেই বাড়ছে না। শুধু ভাগ্যের দোষ দিলে হবে না, আমাদের তরুণ-তরুণীদের এই বিষয়টি বুঝতে হবে। শুধু চাকরির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ হবে এই চিন্তা মাথা থেকে বাদ দিতে হবে। তাদেরকে আত্মকর্মসংস্থানমূলক কাজ যেমন: ব্যবসায়, প্রত্যক্ষ সেবা, সৃজনশীল ও উদ্ভাবনীকর্ম এই জাতীয় কিছু শুরু থেকেই ভাবতে হবে।

চাকরি না পেয়ে হতাশাগ্রস্থ হয়ে এদেশের লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণী বেকার হয়ে ঘুড়ে বেড়ায়, কেউ কেউ আবার আত্মহত্যাও করে। কিন্তু প্রতিদিন যতটুকু সময় এসব মাধ্যমসমূহের পেছনে অপব্যয় করে, তা যদি পড়াশোনা করার পাশাপাশি ক্যারিয়ার গড়ার পেছনে কাজে লাগাতো। তাহলে শিক্ষা জীবন শেষ করে তাদেরকে আর হতাশাগ্রস্থ হয়ে ঘুড়তে হতো না। কথায় আছে, জ্ঞানহীন মানুষ পশুর সমান এবং শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। বিদ্যা শিক্ষা মানুষের জীবনকে সহজ ও সুন্দর করে। কিন্তু কেউ যদি বিদ্যা শিক্ষা লাভ করাকে জীবিকা নির্বাহের সরাসরি মাধ্যম মনে করে তখনই সে ভুল করে, জীবনে চলার পথে হোচট খায়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে মানুষের মধ্যে এক ধরনের বিকৃত মানসিকতার প্রবণতাও লক্ষণীয়। আমাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয় কে কার আগে নতুন ও দামি পোশাক পরে ছবি, নামীদামী রেস্টুরেন্টগুলোতে গিয়ে খাবারের ছবি, নতুন মডেলের ও দামি গাড়ি এবং স্মার্টফোন ইত্যাদির ছবি শেয়ার করবে। এভাবে সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে মানুষের মধ্যে প্রভেদ ও হীনমন্যতার সৃষ্টি হয়। যারা নতুন ব্যবহারকারী তারাও পুরাতনদের দেখাদেখি এ ধরনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে প্রচুর সময় কাটানোর ফলে শারিরীক ও মানসিক বিভিন্নরকম ক্ষতি হয়। দীর্ঘক্ষণ একটানা ল্যাপটপ, স্মার্টফোন ইত্যাদি সব ডিভাইসের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ধাঁধিয়ে যায়, চোখ দিয়ে পানি পড়াসহ চোখে বিভিন্নরকম সমস্যার সৃষ্টি হয়। দীর্ঘক্ষণ একটানা ব্যবহারের ফলে বিভিন্নরকম মানসিক সমস্যার সৃষ্টিতো হয়ই, সেই সাথে অনেকের আবার কিছুক্ষণ পরপর এসব সামাজিক মাধ্যমে লগইন করার মানসিক সমস্যা রয়েছে। তাছাড়া অত্যাধিক ব্যবহারের ফলে শ্রবণশক্তি হ্রাস পাওয়া, দেরিতে ঘুম আসা, নিদ্রাহীনতা ও মস্তিষ্কে নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। সামাজিক মাধ্যমগুলোতে অত্যাধিক সময় কাটানোর ফলে কেউ আর খেলাধুলা কিংবা ব্যায়াম করার জন্য তেমন উৎসাহবোধ করে না। ফলে সহজেই তাদের স্থুলতা বৃদ্ধি পায়, শারিরীক ও মানসিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে না।

অত্যাধিক পরিমাণে এসব সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের ফলে অনেকেই আবার পরিবারের সদস্যদের প্রতি সময় দিতে পারে না। ফলে ছোট-বড় সবার মধ্যেই সম্পর্কের দূরত্ব বাড়ে। আমরা পারিবারিক-সামাজিক জীব না হয়ে সামাজিক মাধ্যমগুলোর অনুগত জীব হয়ে যাচ্ছি, ফলে জীবন হয়ে যাচ্ছে এককেন্দ্রিক।

একসময় যখন এসব সামাজিক মাধ্যমসমূহ ছিল না তখনকার সময়ে বইপ্রেমী অনেক পাঠক ছিল, তারা বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান লাভ করতে পারতো। কিন্তু বর্তমানে বই পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়ার কারণে মেধা বিকাশে বাধা হয়ে দাড়াচ্ছে এসব সামাজিক মাধ্যমসমূহ।

অনলাইন জগতে কোনো কিছুই নিরাপদ নয়, সহজেই যে কারো আইডি হ্যাক হয়ে যেতে পারে, চুরি হতে পারে কারো ব্যক্তিগত তথ্য, এমনকি উক্ত তথ্যের ভিক্তিতে কেউ নাশকতার শিকার হতে পারে, জিম্মি হতে পারে।

গণমাধ্যমের চেয়ে সামাজিক মাধ্যমে স্বল্প ব্যয়ে তাৎক্ষণিক কোনো ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ে, তবে এ ধরনের খবর নির্ভযোগ্য ও পেশাদার নাও হতে পারে, এমন কি ভূয়া খবরের মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাছাড়া অনেক সময় ষড়যন্ত্রমূলকভাবে নাশকতার উদ্দেশ্যে ভূয়া খবর ছড়ানোর মাধ্যমে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেয়া হয়।

একদিকে যেমন এসব সামাজিক মাধ্যমসমূহ অত্যাধিক ব্যবহারের বিভিন্নরকম ক্ষতিকর দিক রয়েছে, অন্যদিকে সঠিকমাত্রায় ব্যবহারের ফলে এসব সামাজিক মাধ্যমসমূহ আমাদের জীবনকে করতে পারে আরো সহজ, সুন্দর ও গতিময়।

এক সময় দূরদেশে কারো সাথে যোগাযোগ করা যেমন ব্যয়বহুল ছিল তেমন সহজসাধ্য ছিল না। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমসমূহের কল্যাণে যে কেউই সহজে ও স্বল্প ব্যয়ে দূর দেশে কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারে। খুব সহজেই ও নামমাত্র ব্যয়ে অডিও এবং ভিডিও কলের মাধ্যমে কথা বলতে পারে, ছবি ও ভিডিও শেয়ার করতে পারে।

জীবনে চলার পথে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজন ইত্যাদি সবার সাথে একই সাথে একই সময়ে যোগাযোগ রাখা সম্ভব হয় না। কিন্তু বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে এই সমস্যা দূর হয়েছে। চাইলেই যে কেউ তার সুখ-দুঃখ, সুবিধা-অসুবিধা, দুরবস্থা ও বিপদ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদির অবস্থা, ছবি ও ভিডিও সবার সাথে শেয়ার করতে পারে।

এসব মাধ্যমসমূহে যে কেউ কোনো বিষয়ে জানতে পারে, শিখতে পারে, সাহায্য চাইতে পারে, এমনকি কোনো বিষয়ে অন্য সবাইকে সর্তকও করতে পারে। জনমত গঠনে ও সচেতনতা সৃষ্টিতে ফেইসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাছাড়া অমুনাফাভোগী, শিক্ষামূলক, সামাজিক উন্নয়নমূলক, জনকল্যাণমূলক ইত্যাদি সংগঠনগুলো আজকাল বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসমূহের কল্যাণে সহজেই ও স্বল্প ব্যয়ে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছে এবং সহজেই তাদের সেবা ব্যবহারকারী বা মানুষের নিকট পৌছে যাচ্ছে।

ই-কমার্সের ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যমগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব মাধ্যমসমূহ বিভিন্নরকম ব্যবসায়মূলক কাজের ক্ষেত্রে পণ্যের প্রচার ও প্রসার, বেচা-কেনা বৃদ্ধি ইত্যাদির জন্য ব্যবহৃত হতে পারে, এমনকি চাইলেই সহজে যে কেউ স্বল্প ব্যয়ে তার পণ্যের বিজ্ঞাপন দিতে পারে। অন্যদিকে এসব সামাজিক মাধ্যমসমূহে প্রকাশিত হওয়া বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঘরে বসেই যে কেউ তার প্রয়োজন ও পছন্দমাফিক বিভিন্ন ধরনের পন্য ক্রয় করতে পারে, সেবা পেতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, এসব সামাজিক মাধ্যমসমূহ আর্শীবাদ না অভিশাপ তা সম্পূর্ন নির্ভর করে মানুষের ব্যবহারের উপর।

লেখক: সফ্টওয়ার ইঞ্জিনিয়ার ও ভিডিও গেইমমেকার

বাংলাদেশ জার্নাল/জেডআই

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত
close
close