ঢাকা, সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০১৯, ৯ বৈশাখ ১৪২৬ অাপডেট : ৮ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০১৯, ০০:৩১

প্রিন্ট

পহেলা বৈশাখ নিয়ে ভুল ধারনা

পহেলা বৈশাখ নিয়ে ভুল ধারনা
আলম শাইন

বাংলাদেশের মানুষ শান্তি প্রিয়, নিঃসন্দেহে বলতে পারি আমরা। দেশের অধিকাংশ মানুষ ধর্মভীরু হলেও অতটা ধর্মান্ধ নয়। বিপদগামী কিছুসংখ্যক মানুষের উদাহরণ টেনে লাভ নেই। ওরা আগাছা হয়ে জন্মেছে যেমনি, তেমনি নিড়ানির আঁচড়ে বিলীন হয়ে যাবে। এটি সত্যি যে, আমাদের দেশে পাকিস্তান-আফগানিস্তানের মতো অস্থিতিশীল পরিবেশ নেই। নেই রাজনৈতিক অস্থিরতারও। থাকলেও সেটি ভিন্ন কথা। তার মানে এই নয়, দেশ বানের জলে ভেসে যাচ্ছে, সুযোগ নিয়ে যা ইচ্ছা তা করব আমরা। সেই ধরনের মতবাদ পোষণকারীদেরকে বলতে হচ্ছে, রাজনীতি রাজনৈতিক বলয়ে ঘুরপাক খাবে। রাজনীতির সঙ্গে ধর্মযোগ বড়ই বেমানান। ধর্মচর্চার সঙ্গেও ধর্মান্ধতা তদ্রূপ। মানুষকে না বাঁচিয়ে ধর্মচর্চা করা বৃথা সাধনা। কৃষ্টিকালচার, ঐতিহ্য কিংবা সংস্কৃতি চর্চাতে বিগ্ন ঘটিয়ে ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ করে দেওয়া যায় ঠিকই কিন্তু ফলাফল লবডঙ্কার সামিল।

দেশের তরুণ সমাজ এবং জঙ্গিগোষ্ঠিরা ভিন্নধারার হলেও বাংলা নববর্ষ এবং থার্টি ফাস্ট নাইটে বেপরোয়া হয়ে উঠেন। ধর্মান্ধরা কৃষ্টিকালচার লালনকে বেদাত আখ্যা দিয়ে উৎসব বানচাল করার চেষ্টা করেন। অপরদিকে তরুণরা উৎসবে অংশগ্রহণ করে তরুণীদেরকে যৌনহয়রানিসহ নানান ধরনের নাজেহাল করে থাকেন। এ কাজটি প্রায় প্রতিটি বছরই করে থাকেন তরুণ সমাজ। এদের বেশিরভাগই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া। সাকুল্যে বিষয়টা দাঁড়িয়েছে উৎসব বানচাল অথবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর হস্তক্ষেপ।

আমরা লক্ষ্য করছি বাংলা নববর্ষ কিংবা থার্টি ফাস্ট উদযাপন হালে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তরুণ সমাজের অতিরিক্ত বেহায়াপনার কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাধ্য হচ্ছেন লাগাম টেনে ধরতে। সে ক্ষেত্রে থার্টি ফাস্ট উদযাপন বন্ধ প্রায়। ঠিক সেরকমটি হতে যাচ্ছে বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখের ক্ষেত্রেও। ধর্মান্ধ এবং কিছু কিছু তরুণের কুরুচিপূর্ণ মানসিকতার কারণে নববর্ষের আনন্দে ভাটা পড়তে যাচ্ছে। তথাপিও আমরা লক্ষ্য করছি শত বাধা উপেক্ষা করেও পহেলা বৈশাখ বেগবান হচ্ছে ক্রমান্বয়ে। এ সময় নতুন জামা কাপড় পেতে ছোটরা মরিয়া হয়ে ওঠে। বড়রা কম যায় কিসের। ফতুয়া-পাঞ্জাবী, শাড়ী-চুড়ি চাই-ই চাই। পান্থা-ইলিশের কথা বাদ দেয়া যায় না। অন্যথা পহেলা বৈশাখ জমে-ই না। ওই সময় দুই বাংলার মানুষের মাঝে বাঁধভাঙ্গা উৎসবের আমেজ বয়ে যায়। সেই সুযোগটি নিতে ভুলছে না অসাধু ব্যবসায়ীরাও। জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে রীতিমত বাজার অস্থির করে ফেলে। জাতীয় মাছ ইলিশ নিয়ে তো মহা হৈচৈ কাণ্ড বেধে যায় তখন। ক্ষেত্রবিশেষ ইলিশের দাম খাসি ছাগলের দামকেও হার মানিয়ে দেয়। ইচ্ছে করলেও গরিব দু:খীর পক্ষে পান্থা-ইলিশ ভূরিভোজ সম্ভব নয় ওইদিন। তবুও উৎসবের খাতিরে আমরা মেনে নিচ্ছি সেসব। একদিনই তো!

বাঙালি জাতির রয়েছে হাজার বছরের ঐতিহ্য। ইতিহাসও সাক্ষী দেয় তাই। বারো জাতির সমন্বয়ে বাঙালি জাতির অভিষেক ঘটেছে এ দেশে। সেই অটুট বন্ধনটি টিকে রয়েছে আজ অবধি। কেউ মসজিদে যাবেন, কেউ মন্দিরে কেউবা যাবেন গির্জা-প্যাগোডায়। এতে দোষের কিছু নেই। এ ব্যাপারে কারো আপত্তি নেই; তা আমরা ভালো করেই লক্ষ্য করেছি। কারণ আমরা জানি, ধর্মচর্চায় মনূষ্যত্ববোধ বাড়ায়। পাপ থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা পাওয়া যায়। সেই যে ধর্মেরই হোক না কেন। ভালো কাজের নির্দেশনা পাই আমরা।

আমাদের দেশে ধর্মচর্চায় অন্যের গাত্রদাহ খুব একটা নজরে পড়ে না অবশ্য। বলা যায় স্বাধীন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ও। বিচ্ছিন্ন ঘটনা ধর্তব্য মধ্যে পড়ে না। সেই বিছিন্নতাকারীদেরকেও প্রতিহত করা আবশ্যক। প্রতিহত করা আবশ্যক তাদেরকে যারা পহেলা বৈশাখকে বাঙালি সংস্কৃতি হিসাবে না মেনে উল্টো প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছেন। তাদেরকে জ্ঞান দিতে হবে এটি কোন ধর্মীয় সংস্কৃতি নয়, এটি বাঙালির সংস্কৃতি। পহেলা বৈশাখের জনক একজন মুসলমান ছিলেন, তা পরিষ্কার করে জানাতে হবে। সেই ইতিহাস জানলে কিছুটা হলেও মানসিকতার পরিবর্তন হবে। জানাতে হবে, ভারতবর্ষে মুগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করত। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদের খাজনা পরিশোধ করতে হতো। খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন। সম্রাটের আদেশ মতে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরি সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খিষ্ট্রাব্দে ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় ৫ নভেম্বর ১৫৫৬ থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়।

তাহলে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে পহেলা বৈশাখ পালনে ধর্মীয় বাধাটা কেন! বরং পহেলা বৈশাখ নিয়ে আমাদের গর্বিত হওয়া উচিত। বারো জাতির বন্ধনে অমন একটি দিন পালনের সুযোগ পাচ্ছি আমরা। দেশ আনন্দের জোয়ারে ভাসে ওই দিন। গণমাধ্যমের কল্যাণে তা আমরা উপভোগ করার সুযোগও পাই। বারোয়ারী মেলায় গিয়ে ছোটরা আনন্দে মেতে ওঠে; পাশাপাশি বড়রাও। মুড়ি-মুড়কি, খেলনা কিংবা মাটির তৈজসপত্র ক্রয়ের মাধ্যমে বাঙালিআনার স্বাদ মিলে ওইদিন। সুতরাং দিবসটিকে আমরা মনেপ্রাণে লালন করে এগিয়ে যেতে পারি। তরুণ সমাজ এ ব্যাপারে সচেষ্ট হবেন বোধকরি। কুরুচিপূর্ণ আচরণ পরিহার করে নববর্ষকে বেগবান করতে সহায়তা করবেন, যাতে করে জঙ্গিবাদীরা কোন ধরনের সুযোগ নিতে না পারে। খেয়াল রাখতে হবে কৃষ্টি কালচার যেন বন্ধ না হয়, তাহলে পরবর্তী প্রজন্ম বোকাসোকা হয়ে সাঁতরে বেড়াবে। এ দায় কিন্তু আজকের কুরুচিপূর্ণ আচরণকারী তরুণদেরকেই নিতে হবে। সুতরাং সাবধান হবে আশাকরি।

লেখক: আলম শাইন, কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও বন্যপ্রাণী বিশারদ। [email protected]

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত
close
close