ঢাকা, রবিবার, ১৬ জুন ২০১৯, ২ আষাঢ় ১৪২৬ অাপডেট : ৩ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০১৯, ০০:৫০

প্রিন্ট

একাত্তরের নববর্ষ

একাত্তরের নববর্ষ
মুহম্মদ সবুর

৪৮ বছর আগে ১৩৭৮ সালে পয়লা বৈশাখ এসেছিল কিনা আমাদের জানা ছিল না। জীবন বাঁচাতে, আশ্রয়ের সন্ধানে আমাদের পরিবারগুলোর ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। তরুণ-কিশোরের দল সীমান্ত পাড়ি দিচ্ছে। চোখে মুখে প্রতিরোধের দৃপ্ত শপথ। একাত্তরের একত্রিশে মার্চ চট্টগ্রাম শহরের পতন। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে দক্ষিণ চট্টগ্রামের পতনের পর সীমান্ত পাড়ি দেয়ার সংখ্যা বেড়ে যায়। রামগড় সীমান্ত হয়ে মানুষেরা ছুটছিল ঊর্ধ্বশ্বাসে। সে এক জীবন-মরণ সন্ধিক্ষণে আক্রান্ত মানুষেরা। সে বার হালখাতা খোলা হয়নি। হানাদাররা তখন দখলে মত্ত। সীমান্তে প্রতিরোধ তৈরি করছে বাঙালি যোদ্ধারা একদিকে, অন্যদিকে স্বদেশ ছেড়ে শরণার্থী জীবনে চলে গেলেন অনেকে। শরণার্থী শিবিরগুলোতেও আসেনি পয়লা বৈশাখ। বলেনি কেউ শুভ নববর্ষ ১৩৭৮ সাল। আগরতলায় ভারতীয়রাও সেবার ঘটা করে আয়োজন করেনি বৈশাখের। কোন অনুষ্ঠানাদিও চোখে পড়েনি। ‘বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি, বুঝে নিক দুর্বৃত্ত’ চেতনায় উদ্দীপ্ত আমাদের কাছে বৈশাখ নয়, কালবৈশাখী নয়, বারুদের গন্ধ, রক্তের হোলি খেলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের দুর্জয় শপথে বলীয়ান সময় তখন।

যুদ্ধের আগে নববর্ষ ছিল প্রাণের স্পন্দন জাগানো এক সময়। চৈত্র সংক্রান্তি আর পয়লা বৈশাখের আমেজ পুরো গ্রীষ্মকাল জুড়ে ভিন্ন আবহ তৈরি করতো। পয়লা বৈশাখের সঙ্গে বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের গভীর সম্পর্ক তখনই তৈরি হয়ে যায়। বাঙ্গালির স্বাধিকার আন্দোলনকে গতিবেগ করতে পয়লা বৈশাখ আসতো মুক্তির মহান ব্রত নিয়ে। ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, এক হও’ যেন চিত্ত উদ্বেলিত করে তুলতো। রক্তে বারুদে মাখামাখি দিনে চৈত্র-সংক্রান্তি আর পয়লা বৈশাখ এসেছিল, তবে আসে নাই বাঙালির জীবনে। মুক্তিকামী মানুষ বর্ষবরণ করতে পারেনি। পারেনি বিদায় জানাতে পূর্ববর্তী বছরকে। স্বাধীন বাংলাদেশে নববর্ষ গ্রামীণ জীবনের পাশাপাশি নাগরিক জীবনে জড়িয়ে যাবার পর বৈশাখ আসে উৎসবের আমেজে। তাই বৈশাখ পরিণত হয়েছে গ্রামীণ উৎসব থেকে বাংলার সর্বজনীন উৎসবে।

বৈশাখের প্রথম দিন নববর্ষ কেবলি উৎসবে নয়। বাঙালির বিশ্বাস-সংস্কার আর লোকাচারের একটি বড় ভূমিকা ক্রিয়াশীল রয়েছে। মূলত জীবিকার উৎস ধরেই নানা আয়োজন হয়ে থাকে বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতায়। প্রচণ্ড দাবদাহ আর খরার দহনের ধারাবাহিকতায় নববর্ষ আসে রুদ্রবেশে। খরায় পুড়ে যায় মাঠ, ফসল, আকাশ, পৃথিবী। কৃষিজীবী বাংলার কৃষি সভ্যতায় লালিত মানুষের কাজকর্মের সিংহভাগ সম্পন্ন হয়েছে কৃষি কাজের নানা প্রকরণের সঙ্গে মিলেমিশে। ভূমিপুত্র কৃষিজীবী জানে কখন, কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় কর্ষিত হলে ভূমি হবে অধিক ফসল কিংবা কখন হবে ফসল হানি। জানে কীভাবে খরা, অতি বৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস, কালবৈশাখী, ঘূর্ণিবার্তা, শিলাবৃষ্টির প্রভাবে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। এ সবই জানা গ্রামীণ জনপদবাসীর। ফসল ঘরে তোলা আর ফলন ‘বাম্পার’ হলে গ্রামীণ জীবন ও জনপদে আনন্দ -তৃপ্তির আবহ মেলে। তাই আয়োজন হয় পালা পার্বণের। বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশে পার্বণ মানেই উৎসব, আনন্দ। চৈত্রের খরতাপ সয়ে বৈশাখের রুদ্র মাতম মেনে নিয়ে হাজার বছরের জনপদে বাঙ্গালি জীবন নববর্ষে প্রাণ পায়।

যদিও রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘মানুষের নববর্ষ আরামের নববর্ষ নয়; সে এমন শান্তির নববর্ষ নয়; পাখির গান তার গান নয়; অরুণের আলো তার আলো নয়। তার নববর্ষ সংগ্রাম করে আপন অধিকার লাভ করে; আভরণের আবরণকে ছিন্ন বিদীর্ণ করে তবে তার অভ্যুদয় ঘটে।’

ফিরে তাকালে দেখা যায়, পয়লা বৈশাখ মুক্তিযুদ্ধের আগে দরিদ্র, মজুর, কৃষক ও সচ্ছল ব্যবসায়ী বণিক বাঙ্গালির জীবনে উৎসব-আনন্দের স্পর্শ যোগান দিতো। ‘মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগকে অন্তঃকরণের যোগ করে’ তোলার প্রচেষ্টা ছিল। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে নববর্ষের প্রথম দিনটিকে নবজীবনের আশীর্বাদে আনন্দঘন করার আয়োজন থাকতো সাধ্যমত। যাতে সারাটি বছর কাটে অভাব, দুঃখ, দুর্দশাহীন, বিষাদহীন, দারিদ্র মোচনে- প্রত্যাশা থাকতো তারও বেশি। আর এই নববর্ষেই সে সংগ্রহ করে নিতো পুরো বছরের গৃহস্থালি প্রয়োজনের নানা তৈজসপত্র, উপকরণসহ অন্যান্য সামগ্রী। সে কারণেই প্রাচীন সময় থেকেই বৈশাখী মেলার আয়োজন। গ্রাম বাংলার এই মেলা সর্বজনীন উৎসবের অঙ্গ। গ্রামীণ মানুষের সারা বছরের সাংসারিক প্রয়োজনীয় উপকরণ, বিনোদন ও শখের সামগ্রী কেনা এবং বিক্রেতাদের পণ্য বিপণনের সম্মিলন ঘটতো এই মেলায়। বারোয়ারি সব পণ্যের ভীড়ের সঙ্গে থাকতো খেলাধুলা, বিনোদনের নানা আয়োজন। পুতুল নাচ, সার্কাস, যাত্রা, পালাগান, নাগরদোলা এসব চিত্তাকর্ষক পর্ব ছিল মানুষের মন ও প্রাণকে প্রাণবন্ত করে তোলার জন্য বর্ষারম্ভের আয়োজন যেন।

রবীন্দ্রনাথ ‘পুরাতনের ভেতর থেকে নূতনের মুক্তিলাভ’ চেয়েছেন পয়লা বৈশাখে। বলেছেন তিনি, ‘মানুষতো পুরাতন আবরণের মধ্যে থেকে এত সহজে এমন হাসিমুখে নূতনতার মধ্যে বেরিয়ে আসতে পারে না। বাধাকে ছিন্ন করতে হলে- বিপ্লবের ঝড় বয়ে যায়। তার অন্ধকার রাত্রি এমন সহজে প্রভাত হয়না; তার সেই অন্ধকার বজ্রাহত দৈত্যের মতো আর্তস্বরে ক্রন্দন করে ওঠে এবং তার সেই প্রভাতের আলোক দেবতার ক্ষুরধার খড়গের মতো দিকে দিগন্তে চমকিত হতে থাকে।’

বৈশাখী শক্তির কাছে বারবার মিনতি জানাতে হয়, যেন ফসলের মাঠ হয় খটখটে রোদ্দুরে ভরা, জল সেঁচে এসে যাবে জমিনের সুখ উর্বরা। ঢেঁকির পাড়ের সাথে বউ দোলে গ্রাম-বাংলায়। নাকছাবি খসে পড়ে আউশের বীজের গোলায়, আমের গুটির মতো বকুলের ফুলে গাছ ভরা, ফলের পসরা নিয়ে গঞ্জের হাট সারি করা। মাটির পুতুল-মেলা সানকিতে পান্তা লবণ। নাগরদোলার রথে শিশুদের মনের ভ্রমণ, বাঁশির সুরের সাথে ডুগডুগি বাজায় ওরা। রেশমিচুড়ির হাতে লালফিতে পুঁতির মালা। রবীন্দ্রনাথ আবার অন্যত্র মানুষের নববর্ষ সম্পর্কে বলেছেন, ‘তার নববর্ষ সংগ্রাম ক'রে আপন অধিকার লাভ করে; আভরণের আবরণকে ছিন্নবিদীর্ণ করে তবে তার অভ্যুদয় ঘটে......... তিনি তাকে সহজ জীবন দেননি। সেই জন্যেই সাধনা করে তবে মানুষকে মানুষ করতে হয়; তরুলতা, পশুপক্ষী সহজেই তরুলতা, পশুপক্ষী! কিন্তু মানুষ প্রাণপণ চেষ্টায় তবে মানুষ।’

পয়লা বৈশাখ কেবলই বাঙালির। কেবলই উৎসবের, আনন্দের, পরবের, জাগরণের, উত্থানের, নবজীবনের আহবান আনে। তবে তা নিছক উৎসব ছিল না। পয়লা বৈশাখের একটি রাজনৈতিক চরিত্রও ছিল ষাটের দশকে। বাঙ্গালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে নববর্ষের সাংস্কৃতিক রূপ অবিচ্ছেদ্য হয়ে পড়েছিল। শাসক গোষ্ঠীর শত ভ্রুকুটি নিপীড়ন উপেক্ষা করেও প্রতিষ্ঠিত করতে হয়েছে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারকে। বৈশাখ ডাক দিয়েছে ‘স্বার্থ হতে জাগো, দৈন্য হতে জাগো, সব জড়তা হতে জাগো, জাগোরে- সতেজ উন্নত শোভাতে।’

নববর্ষ বিষয়টি প্রাচীন মানুষের কাছে এসেছে ভিন্নভাবেই। যখন পঞ্জিকাবর্ষের কোনো ধারণাই ছিল না। সে যুগে মানুষ কাল বা সময় প্রবাহকে ভাগ করতো শস্যের বীজবপন ও শস্য কর্তনের সময়সীমা ধরে। বীজবপন থেকে শস্যকর্তনের সময়কে ধরা হতো একটি সময় চক্র। সময় পরিমাপ হতো সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত এবং শস্যরোপন-শস্যকর্তন ধরে। প্রাচীনকালে গৃহীত শস্যসম্পৃক্ত কালচক্র ছিল এ যুগের অনুরূপ। শস্যবীজ বপন-কর্তন কালচক্রের প্রারম্ভ দিবসটি ছিল পঞ্জিকা পূর্ব পৃথিবীর নববর্ষ দিবস। খ্রিস্টেরও জন্মের দুই হাজার বছরেরও বেশ আগে ব্যবিলনে পৃথিবীর প্রথম আনুষ্ঠানিক নববর্ষ পালনের তথ্য মিলেছে। এই উৎসব ছিল মহোৎসব। টানা ১১ দিন ধরে চলা এই উৎসব হতো বসন্তকালে। এই উৎসবে শপথ নেয়া হতো দু’টি বিষয়ে। পূর্ববর্তী বছরের ঋণ পরিশোধ এবং প্রতিবেশীর কাছ থেকে ধার করে আনা কৃষি উপকরণ ফেরত প্রদানের অঙ্গীকার করা হতো। বাঙ্গালির নববর্ষ আদিতে আঞ্চলিক বা নিজস্ব পরিমণ্ডলে গ্রামীণ জীবনে উদযাপন করা হতো। আদিতে বাঙ্গালি কৃষকের পারিবারিক উৎসবটিকে বলা হতো ‘আমানি’।

পান্তাভাতের পানি বা কাঞ্জিকে আমানি বলা হতো। চৈত্র সংক্রান্তির রাতে এক হাঁড়ি পানিতে অসিদ্ধ চাল রেখে তাতে একটি কচি আমের ডাল বসানো হতো। নববর্ষের বা পয়লা বৈশাখের ভোরে এই ভেজা চাল পরিবারের সদস্যরা পান করতো। আম ডাল ভেজানো পানি সবার গায়ে ছিটানো হতো। সারাবছর যাতে শান্তি, সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য বজায় থাকে। কৃষি ফসলের, গবাদি পশুর যেন কোন ক্ষয়ক্ষতি না হয়। গ্রামীণ কৃষি সমাজের মানুষ বাংলা সন তারিখের যেমন হিসাব কষে জীবন-জীবিকা চালাতো, তার সঙ্গে চাঁদের হিসাবটাও ছিল মুখ্য। অমাবস্যা, পূর্ণিমা, সংক্রান্তি এবং তিথি নক্ষত্রের ব্যাপারেও দারুণ অভিজ্ঞ। নববর্ষ বা বৈশাখ অবশ্য বাঙ্গালির জীবনে এক উলট পালট হবার সময়। সব কিছু ভেঙ্গে চুরে আবার সৃজনের সময়। খরা, তপ্ত প্রখর রৌদ্র গুমোট আবহাওয়ার মাঝে ‘বরিষ ধরার মাঝে শান্তির বাণী’ নিয়ে আসে বৈশাখ। কালকেতু-ফুল­রার জীবনে মধ্যযুগে বৈশাখ আসে নিদারুণ দুঃখ কষ্ট নিয়ে। যা বাঙালি জীবনের শাশ্বত রূপ যেন। ‘ভাঙ্গা কুড়্যা ঘরখানি পত্র ছাওনী/ভেরান্ডার থাম তার আছে মধ্য ঘরে/ প্রথম বৈশাখ মাসে নিত্য ভাঙ্গে ঝড়ে।’ কালবৈশাখী এসে লণ্ডভণ্ড করে দেয় সবকিছু। প্রবল বর্ষণে ভেসে যায় সহায়-সম্পদ। আবার খরায় তিষ্টানো দায়। বৈশাখের রণরঙ্গি চরিত্র যেন। ফুল­রা তার বারামাস্যা পাঁচালিতে খেদ প্রকাশ করে, “অনল সমান পোড়ে বৈশাখের খরা/ তরুতল নাহি মোর করিতে পসরা/ অগ্নিসম রবিতাপ না জায় শহন/ গায়ে দিতে নাহি আঁটে অঙ্গের বসন/ বৈশাখ হৈল আগো মোরে বড় বিষ/ মাংস নাহি খায় সব লোকে নিরামিষ।/’ প্রাচীন আদিবাস থেকে সমতলভূমির মানুষরা নববর্ষ পালন করত নিজস্ব লোকাচারে। মূলত বিশ্বের প্রায় সব মানুষই তাদের নিজস্ব হিসেব রীতিতে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতো। বাংলাদেশে বসবাসরত বিভিন্ন জাতিসত্তা নিজস্ব রীতি ও পদ্ধতিতে নববর্ষ বরণ করে। নিজস্ব লোক ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে তুলে আনে নিজস্ব ভাষা ও রীতিতে।

তবে এই সবই কৃষি কেন্দ্রিক। কৃষিজীবী এই বাংলাদেশ। একাত্তরের সেই দিনে অর্থাৎ ১৩৭৮ সালে পয়লা বৈশাখে হলকর্ষণ হয়নি। হালখাতা দূরঅস্ত। বাঙালির বৈশাখ এসেছিল শত্রু হননের মত্ততায় আর মাতৃভূমি ছেড়ে শরণার্থী হতে বাধ্য হবার এক উত্তরঙ্গ আবহে। যুদ্ধ দিনের বৈশাখে সূর্য লাল হয়েছিল সবুজের মাঠে মাঠে, বাঙালির পতাকায়।

লেখক: মুহম্মদ সবুর, কবি, কথাসাহিত্যিক।

বাংলাদেশ জার্নাল/এনএইচ

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত
close
close