ঢাকা, সোমবার, ২০ মে ২০১৯, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬ অাপডেট : ১ ঘন্টা আগে English

প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০১৯, ১১:৫৮

প্রিন্ট

ডিজিটাল কর: বাড়াতে হবে সক্ষমতা

ডিজিটাল কর: বাড়াতে হবে সক্ষমতা
সাজ্জাদ আলম খান

বাংলাদেশে ব্যবসা করে রাজস্ব এড়িয়ে যাওয়ার দিন শেষে হয়ে যাচ্ছে। এমন হুঁশিয়ারি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের। ডিজিটাল যুগের জন্য প্রস্তুতি চলছে। ফেসবুক, গুগল, অ্যামাজনকে বাংলাদেশে করের আওতায় আনা হবে। এক সময় বিজ্ঞাপনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম ছিলো সংবাদপত্র। ধীরে ধীরে তা পরিবর্তন আসছে। এখন বিজ্ঞাপনের বাজার দখলের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে সংবাদপত্র। শীর্ষস্থানে চলে এসেছে টেলিভিশন। এক দশক ধরে বিজ্ঞাপনের বাজারে টেলিভিশনের আধিপত্য রয়েছে। ইউটিউব এবং ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিজ্ঞাপনের নতুন বাজার দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন কোম্পানি এবং ব্র্যান্ড অনেক ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনের প্রচার এবং প্রসারের জন্য ডিজিটাল মাধ্যমকেই বেছে নিচ্ছে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্র পরিবর্তন হচ্ছে। বাংলাদেশেও এর টেউ লেগেছে। বিজ্ঞাপনের বাজার পরিধি নিয়ে এক ধরণের অস্পষ্টতা রয়েছে। সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া দুষ্কর। ধারণা করা হয়, এই বাজারের পরিধি প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। বিজ্ঞাপনী সংস্থা, দাতা প্রতিষ্ঠান সবাই এ ব্যাপারে তথ্য লুকাতে চায়। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য দিতে এক ধরনের গোপনীয়তার প্রবণতা দেখা যায়। অস্পষ্টতা আর অস্বচ্ছতার অন্তরালে সবসময়ই লুকানো হয়, এ খাত থেকে আয়ের প্রকৃত চিত্র। দিন শেষে প্রকৃত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয় সরকার।

সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে নানা ধরণের আলোচনা আছে। ইচ্ছে করলেই এই মিডিয়াকে আর এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়। দিন দিন সোশ্যাল মিডিয়ার দাপট বাড়ছেই। এরসাথে যুক্ত হচ্ছেন প্রতিদিনই নতুন নতুন মানুষ। এখন অনেক বিজ্ঞাপন প্রথমে সোশ্যাল মিডিয়ায় আসে; পরে টেলিভিশন প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফেসবুকে বিজ্ঞাপনের ফিডব্যাক দেখে সিদ্ধান্ত আসে বিজ্ঞাপনটি কতবার কোন মিডিয়াতে প্রচার হবে। বিভিন্ন কোম্পানি এরই মধ্যে বিজ্ঞাপনের জন্য ডিজিটাল বিভাগ খুলেছে। এ নিয়ে চলছে রীতিমত গবেষণা আর সৃষ্টিশীল কর্ম উদ্যোগ। যুক্ত হচ্ছেন সৃজনশীল প্রতিভা। এসব বিজ্ঞাপন নির্মাণের জন্যে বাড়ছে বিনিয়োগ; তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থান।

বিজ্ঞাপনের বাজারে দাপুটে অবস্থানে আছে টেলিকম খাত। বেশি বিজ্ঞাপন দেয়ার তালিকায় রয়েছে বিভিন্ন মোবাইল অপারেট ও মোবাইল প্রস্ততকারক প্রতিষ্ঠান। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, টেলিকম খাতে প্রতিবছর তাদের বিজ্ঞাপন বাজেটের ৭০ শতাংশ এখন ডিজিটাল খাতে ব্যয় হচ্ছে। ডিজিটাল খাতে অংশীদারীত্ব ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। পাঁচ বছর আগে এ ক্ষেত্রে ছিলো উল্টো চিত্র। ভোগ্যপণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানও ডিজিটাল খাতে বিজ্ঞাপনের জন্য খরচ বাড়াচ্ছে। সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন চলে যাচ্ছে ডিজিটাল মাধ্যমে। বিজ্ঞাপন বাজার নিয়ে যারা করেন, তাদের ধারণা ইতিমধ্যে টেলিভিশন বিজ্ঞাপনের পাঁচ শতাংশ ডিজিটাল খাতে যাচ্ছে। কয়েক বছরের মধ্যে বিজ্ঞাপন বাজারের এক চুতার্থাশ ডিজিটাল খাতে যাবে। যেসব প্রতিষ্ঠান অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন তাদের বেশিরভাগই যাচ্ছে গুগল এবং ফেসবুকে। ইউটিউবেও বিজ্ঞাপনের হার বাড়ছে। ইন্টারনেট-ভিত্তিক যেসব ব্যবসা রয়েছে সেগুলো বিজ্ঞাপনের জন্য ইন্টারনেট মাধ্যমকেই বেছে নিচ্ছে।

সংবাদপত্র ও টেলিভিশন শিল্পের মালিকরা দাবি তুলেছেন, বাংলাদেশ থেকে যারা ফেসবুক-ইউটিউব এবং গুগলে বিজ্ঞাপন দেয়, সেগুলো করের আওতায় আনতে হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সে বিষয়ে একমত হয়ে কর আরোপের ঘোষণাও দিয়েছে। কিন্তু পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়নি। সম্প্রতি অর্থনীতিবিদদের সাথে প্রাক বাজেট আলোচনার আয়োজন করেছিলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। সেখানে কর আরোপের পদ্ধতি নিয়ে পরামর্শ চেয়েছেন বোর্ডের চেয়ারম্যান। এর আগে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, ভিডিও আদান-প্রদানের ওয়েবসাইট ইউটিউব এবং সর্ববৃহৎ অনুসন্ধান ইঞ্জিন গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের আয়ের ৩৫ শতাংশ উৎসে কর দিতে হবে বলে জানিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। গেল ৭ জুন জাতীয় সংসদে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনকালে তিনি এ তথ্য জানান। বলেন ‘ভার্চুয়াল ও ডিজিটাল খাত যেমন- ফেইসবুক, গুগল, ইউটিউব ইত্যাদির বাংলাদেশে অর্জিত আয়ের উপর করারোপণের জন্য আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার আলোকে প্রয়োজনীয় আইনী বিধান সংযোজনের প্রস্তাব করা হলো।’ কিন্তু এখনও তা কার্যকর হয়নি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, ভিডিও আদান-প্রদানের ওয়েবসাইট ইউটিউব এবং সর্ববৃহৎ অনুসন্ধান ইঞ্জিন গুগলসহ বিভিন্ন অনলাইনের মধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রচুর অর্থ আয় করা হচ্ছে। কিন্তু সরকার এ থেকে কোনো রাজস্ব পাচ্ছে না। অথচ দেশীয় গণমাধ্যম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সংবাদপত্রের আয়ের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ অর্থ ইউটিউব-ফেসবুকে নিয়ে যাচ্ছে বলে ধারণা করেন, বড় বড় সংবাদপত্রের কর্ণধাররা। যার কোনো অংশ সরকার পাচ্ছে না। ইউরোপসহ উন্নত বিশ্ব এমনকি ভারতেও এদের ওপর কর আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এটা সম্ভব হয়নি। ডিজটাল কর আরোপের নীতি কাঠামো তৈরি এখনও হয়নি। এ ক্ষেত্রে ইউরোপ ও ভারতের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনার দাবি রাখে। কর তদারকির জন্যে মানবনম্পদের দক্ষতা ও সমক্ষমতা বাড়ানোর দরকার। রাজস্ব বোর্ড এসব বিষয় বিবেচনায় নিতে পারে।

সমাজে সোস্যাল মিডিয়ার ইতিবাচক-নেতিবাচক নানা দিক আলোচিত হচ্ছে। অসম্পাদিত মাধ্যম হিসাবে তথ্য চুরি, সমাজে বিশৃঙ্খলা উস্কে দেওয়া, সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে দিতে এর অপব্যবহার বেশ প্রকট আকার ধারণ করেছে। সরকার, প্রশাসন এবং ক্ষেত্র বিশেষে সাধারণের মাঝে নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা নিয়ে দেশে দেশে দাবি উঠেছে। মিসর সরকার সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়া সংবাদ ছড়ানো ঠেকাতে নতুন বিল অনুমোদন দিয়েছে। নতুন আইন অনুযায়ী, সোস্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টধারীর পাঁচ হাজারের বেশি অনুসারী থাকলে তাদের ওপর নজরদারি চালাবে দেশটির সুপ্রিম কাউন্সিল ফর মিডিয়া রেগুলেশনস। ওয়েবসাইট, ব্লগ ও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রেও এ আইন প্রযোজ্য হবে। ভুয়া সংবাদ ছড়ানো, আইন লঙ্ঘন কিংবা সহিংসতা উসকে দেয়, এমন কনটেন্ট ছড়ানো হলে, যেকোনো ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট স্থগিতকরণ কিংবা ব্লক করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে কাউন্সিলকে।

যেকোনো কিছু সার্চ বা অনুসন্ধান করতে মানুষ এখন গুগলে যায়। জনপ্রিয় এ সেবাটিকে অনৈতিক ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে গুগলের বিরুদ্ধে। ইন্টারনেট সার্চ ইঞ্জিন কোম্পানি গুগলকে বিভিন্ন সময় জরিমানা করা হয়। কিছুদিন আগেও ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার জরিমানা করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। বাংলাদেশি মুদ্রায় জরিমানার এই অর্থ প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা। অ্যান্ড্রয়েড সিস্টেম বা ব্যবস্থার মোবাইল ডিভাইসে বিভিন্ন অ্যাপ এবং সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে গুগল ব্যবহারে ব্যবহারকারীদের বাধ্য করার অভিযোগে গুগলকে এ জরিমানা করা হয়েছে। প্রতিযোগিতা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে এখন পর্যন্ত এটি গুগলের জন্য সবচেয়ে বড় অঙ্কের জরিমানা। গুগল তাদের অ্যান্ড্রয়েড ইকোসিস্টেমে শুধু গুগলের অ্যাপ ডিফল্ট হিসেবে রাখতে ফোনের প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে চাপ দিচ্ছিল। এগুলোর মধ্যে ছিল যেসব প্রতিষ্ঠান গুগলের ক্রোম বা ক্রোম অ্যাপ তাদের ফোনে আগে থেকে ইনস্টল করত না, তাদের ফোনে প্লে স্টোর রাখার সুযোগ রাখে না গুগল। সার্চ ইঞ্জিনের বাজারে আধিপত্য বজায় রাখতে অ্যান্ড্রয়েডে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে গুগল। এ প্রবণতা অন্য প্রতিযোগীদের ক্ষেত্রে নতুন উদ্ভাবন ও প্রতিযোগিতার পথকে রুদ্ধ করেছে।

গুগল, ফেসবুককে ইউরোপেই কর দিতে হবে। ইউরোপে ব্যবসা করে কর এড়িয়ে যাবার দিন শেষ হয়ে গেছে, এমন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ৷ ইইউ শীর্ষ নেতারা ডিজিটাল যুগের জন্য ইউরোপকে প্রস্তুত করে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন৷ ফেসবুক, গুগল, অ্যামাজন, অ্যাপেলকো ইউরোপে কর দিতে হবে। প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতির মাঝে প্রতিযোগিতার বাজারে ইউরোপের অবস্থান মজবুত করতে তাঁরা বদ্ধপরিকর৷ সরকারি, বেসরকারি ক্ষেত্র থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষও যাতে ডিজিটাল প্রযুক্তির পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে পারে, সেই লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেবার তোড়জোড় করছে৷ এ ক্ষেত্রে এস্টোনিয়া এর মধ্যেই বিপুল সাফল্য অর্জন করেছে৷

শরণার্থীর ঢল, আর্থিক ও অর্থনৈতিক সংকট, পপুলিস্টদের উত্থান, কাঠামোগত দুর্বলতাসহ একাধিক সমস্যায় জর্জরিত ইউরোপীয় ইউনিয়ন৷ তবে একাধিক সংস্কারের মাধ্যমে ব্রেক্সিট-পরবর্তী যুগে ইইউ-কে শক্তিশালী করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে আয়ারল্যান্ডের মতো ছোট দেশগুলি এই প্রস্তাব প্রতিরোধ করছে, কারণ করের নিম্ন হারের মাধ্যমে তারা এতকাল বড় ডিজিটাল কোম্পানিগুলিকে আকর্ষণ করতে পেরেছে৷

লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক

ই-মেইল: [email protected]

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • অালোচিত
close
close