ঢাকা, সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৮ আশ্বিন ১৪২৬ আপডেট : ৩ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২২:২৬

প্রিন্ট

শাড়িকথনে নারীর প্রতি কামনার চোখ

শাড়িকথনে নারীর প্রতি কামনার চোখ
মেসবাহ য়াযাদ

সেই এক সময় ছিল। ২০০৪ থেকে ২০১৯। তখন গণমাধ্যমের পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়া বলতে ব্লগই ছিলো একমাত্র প্ল্যাটফর্ম। তখন ফেসবুক বা অন্য কোনো মিডিয়া এতটা জনপ্রিয়তা পায়নি আমাদের দেশে। ব্লগের সে স্বর্ণযুগে দেখেছি, ব্লগের হিট বাড়ানোর জন্য বিতর্কিত বিষয়ে লেখা পোস্ট বা কমেন্টসকে মাঝে মাঝে উস্কে দিতেন মডারেটররা।

আজকাল দৈনিক পত্রিকায়ও দেখি সে রকম ব্যাপার স্যাপার। বিতর্কিত লেখা ইচ্ছে করে ছাপানো হয়। তাতে সে লেখা নিয়ে পাঠক সমাজে আলোচনা, সমালোচনা চলতে থাকে। এতে লেখকের কী লাভ হয়, জানি না। তবে পত্রিকার প্রচার হয় যথেষ্ঠ রকম।

শাহবাগ যখন উত্তাল, তখন ছাত্র ইউনিয়ন নেত্রী লাকির ছায়া অবলম্বনে একজন নারী চরিত্রের বারোটা বাজিয়ে দেওয়া একটি গল্প ছাপা হয় একটি জাতীয় দৈনিকে। গল্পটি নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা ও বিতর্কও হয় ওই সময়।

লেখাবাহুল্য, ওই সময়ের গল্পটি আর সম্প্রতি নারীর পরিধেয় বস্ত্র শাড়ি বিষয়ক লেখা-দুটোই ছাপা হয়েছে একই দৈনিকে।

শাড়ি বিষয়ক লেখাটি পড়ার পর একই লেখকের নিকট অতীতের আরেকটি বক্তব্যের কথা মনে পড়লো। সেটি ছিল আমাদের প্রবাসীদের চাল-চলন, কথা-বার্তা, আচরণ আর শিক্ষা নিয়ে। সেই বক্তব্য নিয়েও কম-বেশি সমালোচনার ঝড় উঠেছিল সোশ্যাল মিডিয়াসহ গণমাধ্যমে।

সেই বক্তব্য শুনে আর শাড়ি বিষয়ক লেখাটি পড়ে মনে হয়েছে, দুটো ঘটনাই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। একটিতে প্রবাসীদের অত্যন্ত খাটো করে, অপমান করে তাদের আচরণগত ত্রুটিগুলো তুলে ধরা হয়েছে। আর শাড়ি বিষয়ক লেখায় লেখক যতটা না বাঙালি নারীর শাড়ি না পরার আক্ষেপ করেছেন, ইনিয়ে-বিনিয়ে শাড়িতে নারীকে সুন্দর লাগে বলেছেন, তারচেয়ে বেশি শাড়ি পরার পর একজন নারীর শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের চড়াই-উৎড়াই আদি রসাত্মকভাবে বর্ণনা করেছেন। নারীর শারীরিক উচ্চতা নিয়ে কথা বলেছেন।

প্রায় হারিয়ে যাওয়া নারীর পোশাক এই শাড়ি নিয়ে লিখতে গিয়ে লেখক কেন এমনভাবে নারী দেহের পোস্টমর্টেম করেছেন, সেটা তিনিই ভালো বলতে পারবেন। কিন্তু নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অনেক মনে করেন, তিনি বেশ ভালোভাবে বুঝে-শুনেই লিখেছেন। এ ব্যাপারে অনেকে তাদের ক্ষোভমিশ্রিত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিভিন্ন গণমাধ্যম আর সোশ্যাল মিডিয়ায়।

কেন শাড়ি বিষয়ক লেখাকে কেন্দ্র করে এত বিতর্ক? সে বিষয়ে জানার আগে আসুন জানার চেষ্টা করি ‘শাড়ি’ বিষয়ক লেখাটা আসলে কী ধরনের লেখা? প্রবন্ধ? নিবন্ধ? গদ্য? কলাম? ফিচার? ফেসবুক স্ট্যাটাস? ব্লগিং? চটি গল্প? না শাড়ি পরার পর বাঙালি নারীদের শরীরের চড়াই-উৎরাই বিষয়ক আদি রসাত্মক বিশ্লেষণ?

তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, লেখক মনে-প্রাণে চান, বাঙালি নারীরা নিয়মিত শাড়ি পরুক। শাড়ি ছেড়ে বাঙালি নারীরা এই যে সালোয়ার-কামিজ, জিন্স-ফতুয়া এসব পরছেন, অফিস আদালতে কাজ করছেন; তাতে দিন দিন শাড়িপরা নারী-সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এতে তিনি ভীষণ রকম উদগ্রীব। লেককের এই উদগ্রীব হওয়াকে সাধুবাদ জানাই। পাশাপাশি তার কাছে সবিনয়ে জানতে চাই, আমাদের দেশে এর চেয়েও অনেক বেশি উদগ্রীব হওয়ার মতো ঘটনা অতীতে ঘটেছে। যেমন, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ।

নয় মাসে লাখ লাখ মানুষ হত্যা। নারীদের ইজ্জত লুণ্ঠন। পঁচাত্তরে প্রায় পুরো পরিবারসহ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা। দীর্ঘদিন সামরিক শাসন। গণতন্ত্রের জন্য অসংখ্য ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ। নব্বইয়ের গণআন্দোলন। ওয়ান ইলেভেন। মাইনাস টু ফর্মুলা। পেট্রোল বোমায় মানুষ হত্যা। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার দাবি। শাহবাগ প্রজন্ম চত্বর। পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ। বাংলাদেশ ব্যাংকের কোটি কোটি টাকা লুট। শেয়ার মার্কেটের হাজার কোটি টাকা লোপাট। অসহনীয় যানজট। সড়ক দুর্ঘটনায় হাজারো মানুষের মৃত্য। তেল গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি। সমাজের নানা স্তরে দুর্নীতি। নষ্ট রাজনীতি। বন্যা-খরা-জলোচ্ছ্বাস। ধ্বংস হয়ে যাওয়া শিক্ষা ব্যবস্থা। কিশোর, তরুণদের নৈতিক অধঃপতন। রোহিঙ্গা সমস্যার মতো অসংখ্য প্রাকৃতিক, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সমস্যা বা অসঙ্গতি নিয়ে উদগ্রীব বা সোচ্চার হয়ে কলম তুলে নিতে দেখিনি তাকে।

তাহলে কেন এ শাড়িকাহিনী? এ লেখাটি অতি বর্ণবাদী আর লিঙ্গবৈষম্যমূলক দোষে দুষ্ট বলে মনে করেন অনেকে। আমিও তাদের সঙ্গে একমত। এটি একটি রক্ষণশীল ও কট্টরপন্থী লেখা। নারীর শরীরের লোভাতুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো অত্যন্ত ঘৃণিতভাবে লেখক একজন পুরুষের চোখে তুলে ধরেছেন। এ রকম লেখা কেবল একটি চটি বইতেই মানায়। তিনি রহিম-করিম বা ছলিমুদ্দিন নন। যারা কোথায়, কখন, কী লিখলো, তাতে তেমন প্রভাব পড়ে না পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্রে। অথচ এই লেখকের লেখায় সে প্রভাব পড়ে। আলোকিত মানুষ গড়ার নামে সারাদেশে তিনি যে বই পড়ার আন্দোলন করছেন, সে মানসিকতা-উদ্দেশ্য আর আদর্শের সঙ্গে তার এ লেখা যায় না। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের পাশাপাশি তার কট্টর অনুসারীদেরও বিষয়টা বুঝতে হবে, মানতে হবে। কোনো মানুষই ভুলের উর্ধ্বে নয়। তিনি যা করছেন, বলছেন, সবই ঠিক, এ মানসিকতা থেকে বেরুতে না পারলে দিন শেষে ফল কিন্তু শূন্য। মনে রাখা জরুরি, সম্মান অর্জন করতে বছরের পর বছর সময় লাগে। কিন্তু সম্মান যেতে লাগে মুহূর্ত মাত্র। এটি যত তাড়াতাড়ি এই লেখক ও তার অনুসারীরা বুঝতে পারবেন, ততই মঙ্গল সবার জন্য।

লেখক: অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট

ডিপি/

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত