ঢাকা, সোমবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১১ ফাল্গুন ১৪২৬ আপডেট : ৯ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০২০, ১৮:৩৬

প্রিন্ট

অপ্রতিরোধ্য ধর্ষণ, উত্তরণের উপায় কী

অপ্রতিরোধ্য ধর্ষণ, উত্তরণের উপায় কী
হৃদয় আলম

আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে ধর্ষণের ভয়াবহতায় আতঙ্কিত অভিভাবকরা। সম্প্রতি ধর্ষণের মাত্রা বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি কুর্মিটোলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনাটি সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি করে।

গত পাঁচ বছরে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে পাঁচ হাজারের বেশি। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ধর্ষণের ঘটনা ৮৭৯টি, যা ২০১৯ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৬০৭টিতে। যা সংখ্যার হিসেবে প্রায় দ্বিগুণ।

২০১৯ সালে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭৭ জনকে। ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ২৫৪টি। এছাড়া ধর্ষণের শিকার হয়ে লোকলজ্জায় আত্মাহত্যা করেছেন ১৯ জন নারী।

সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে এক হাজারেরও বেশি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ হিসাবে প্রতি মাসে ধর্ষণের শিকার ৮৪ শিশু।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পৃথক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৯ সালে এক হাজার ৪১৩ নারী ধর্ষিত হয়েছেন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭৬ জনকে। আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন ১০ নারী। ২০১৮ সালে ধর্ষণের ঘটনা ছিল ৭৩২টি এবং ২০১৭ সালে ৮১৮টি।

পুলিশ সদরদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা হয়েছে এক হাজার ৯২৪টি। এর মধ্যে ৫১.৬২ শতাংশই ধর্ষণের অভিযোগে মামলা। এক্ষেত্রে সাজাপ্রাপ্তির হার মাত্র ১১.২৬ শতাংশ।

পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যাচ্ছে, দিন-দিন চিন্তার কারণ হয়ে উঠছে ধর্ষণের মতো জঘন্য একটি বিষয়।

কেন বাড়ছে এমন ঘটনা

মনোবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক সময়ই ঘটনার সুষ্ঠু কোনো বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। মূলত বিচারহীনতার সংস্কৃতিই এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্ম দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিন্দনীয় এ ঘটনার পেছনে দায়ী সমাজ ব্যবস্থা, নৈতিক শিক্ষার অভাব, যথাযথ শিক্ষার অভাবসহ মাদকের মতো বেশ কিছু বিষয়। তাদের মতে, এ ঘটনার বিস্তার রোধে এখনই ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। পাশাপাশি কঠিন শাস্তি নিশ্চিত করা দরকার কথিত এই ধর্ষকদের। এবং শাস্তির বিষয়গুলোও প্রচার করা দরকার গণমাধ্যমে যাতে কেউ এই ধরনের হীন কাজ করার সাহস না দেখায়। পাশাপাশি পরিবার-সমাজ, বিদ্যালয়ের মতো জায়গাগুলোতে নৈতিক শিক্ষার বিস্তার করা উচিত। এছাড়া লিফলেট, ব্যানার-পোস্টারের মাধ্যমেও সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চালানো উচিত।

নারী নেত্রীরা বলছেন, পুরোনো আইনে ধর্ষণ ও নির্যাতনের বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার জন্ম দিয়েছে। পাশাপাশি মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও সামাজিক অবক্ষয়ের মতো বিষয়ও এজন্য দায়ী। এছাড়া যৌনবিষয়ক শিক্ষা ও পারিবারিক শিক্ষার অভাব; আকাশ-সংস্কৃতির সর্বগ্রাসী বিস্তার, প্রযুক্তির অপব্যবহারে এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে। ঘটনায় সুষ্ঠু ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা উচিত।

ধর্ষণ সম্পর্কে কে কী ভাবছেন

দেশের ধর্ষণের ঘটনা সম্পর্কে সম্প্রতি শিক্ষাবিদ, নারীনেত্রী, সমাজসেবী মুক্তিযোদ্ধা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এবং একমাত্র নারী ভিপি মাহফুজা খানম বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হবে। সবাইকে সচেতন হতে হবে। সমাজের সবাইকে এক হয়ে এ ধরনের হীন কাজের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। সমাজের সবাই সচেতন হলেই এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে। পাশাপাশি দোষীরা যাতে শাস্তি পায় সে দিকটাও নিশ্চিত করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, ধর্ষণের ঘটনা উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ঘটছে। সম্প্রতি ঢাবির ছাত্রী ধর্ষণের যে ঘটনা ঘটেছে, তা আমাদের জন্য লজ্জার। সামনের দিনগুলোতে নারীর ওপর নির্যাতনের বিচার যদি না হয় তাহলে ভবিষ্যতে আমার ওপরে নির্যাতন হবে কিংবা আপনার পরিবারের কোনো নারীর ওপর নির্যাতন হবে কিন্তু বিচার হবে না। দেশের যে সামাজিক বলয় তাতে বিচারহীনতা ও নিরাপত্তাহীনতার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

মানবাধিকার কর্মী আয়েশা মজুমদার বলেন, আমরা দেখেছি বিগত বছরগুলোতেও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। তবে, বর্তমানে এ সংখ্যা দিনকে দিন বাড়ছে। আমাদের এ বিষয়ে এখনই সচেতন হওয়া দরকার। আমরা শিশুদের এ বিষয়ে সচেতন থাকার জন্য শিক্ষা দিতে পারি।

সব ধর্ষদের কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত বলে মনে করেন মজুমদার। তিনি বলেন, আমরা বিভিন্ন সময় দেখেছি, অনেক ধর্ষক আটক হন। কিন্তু তাদের তেমন কোনো বিচার হতে দেখা যায়। অনেক সময় আবার আইনের বিভিন্ন ফাঁক-ফোকরে বেরিয়ে যান অনেকে। এ ক্ষেত্রে দোষীরা অনেক সময়ই পার পেয়ে যান। আমার মতে, এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটলে দ্রুত এসবের বিচার হওয়া দরকার।

তরুণদের ভাবনা

ধর্ষণ নিয়ে তরুণ-তরুণীরাও উদ্বিগ্ন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকার বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তারা এ ধরনের নিন্দনীয় ঘটনার দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান। সেই সাথে তরুণদের এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে এগিয়ে আসা উচিত বলেও উল্লেখ করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নাফিসা বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, আমার মনে হয় কেউ এখন আর নিরাপদ নয়। বছরের শুরুতেই যে একটা ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটল এ ধরনের ঘটনা আমাদের কারোই কাম্য না। আমরা চাই অন্যায়কারী বিচার পাক। তাতে অন্তত কিছুটা হলেও স্বস্তি আসে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তাসনিম মৌলি বলেন, ধর্ষণের ঘটনাগুলোর মূল কারণ আমাদের সামাজিক প্রচলিত মানসিকতা। ধর্ষণকে ক্ষমতার প্রদর্শন বলে মনে করে থাকে আমাদের সমাজের পুরুষেরা। তাই এই ঘটনাগুলো যদি বন্ধ করতে হয় তাহলে আসলে প্রয়োজন মানসিকার পরিবর্তন ও নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন। ধর্মের অপব্যাখ্যা ও ধর্ষণের প্ররোচনামূলক কথাবার্তা এই ধর্ষণের ঘটনাগুলো বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে আমি মনে করি। ধর্মীয় নেতারা এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারেন। আর সেই সাথে অপরাধ দমনে আইনের কঠোর প্রয়োগ ও দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক বিচারের প্রয়োজন যা অপরাধটি যে, আসলে নিকৃষ্ট সেটি জানান দিবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতির ইতি টানতে হবে।

ঢাবির শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী সোহেল আলম বলেন, নৈতিক ও প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি ধর্ষণের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ভাবে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে পারলে এই অপরাধ কমানো সম্ভব।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আরিফ বলেন, বর্তমান সময়ে ধর্ষণ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। সমাজের সবার এ ধরনের ঘটনা রোধে ভূমিকা পালন করতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সাদিয়া আফরিন বলেন, নারীরা দুর্বল না। আমরা সবাই এক হলে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না। আমাদের উচিত বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজগুলো থেকে এ ধরনের জঘণ্য ঘটনা রোধে সচেতনতা তৈরি করা।

তিতুমীর কলেজের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ইসা ইসরাত বলেন, বর্তমানে আমাদের দেশ কিংবা সমাজ,অর্থাৎ পুরো জাতির জন্য যে বিষয়টি সবচেয়ে লজ্জাজনক তা হলো ‘ধর্ষণ’। এর হাজারো কারণ দেখানো গেলেও আমি বলব- গবেষণার চেয়ে এর নিরসনের উপায়ের দিকে আমাদের জোর বেশি দিতে হবে।

আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগের আহ্বান জানিয়ে ইসা বলেন, সরকারের উচিত আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করা। সাথে সাথে আমাদের তরুণ সমাজকেও বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হবে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, ধর্ষণ বিরোধী বিভিন্ন কাউন্সিলিংই পারে ধর্ষণ রোধ করে সোনার বাংলা গঠন করতে।

তিতুমীর কলেজের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নাজমুল হুদা বলেন, বর্তমানে আমাদের সমাজে ধর্ষণ মহামারি আকার ধারণ করেছে। আমি মনে করি ধর্ষণ একটা সামাজিক ব্যধি। মানুষের মাঝে নৈতিক মূল্যবোধের ঘাটতি থাকলে সমাজে এই ব্যধি বেড়ে যায়। কাজেই ধর্ষণ রোধের একমাত্র মূখ্য উপায় নৈতিক মূল্যবোধ বৃদ্ধি করা। সামাজিকভাবে সচেতনতামূলক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে এটি কমানো যায়। এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্মের নৈতিক শিক্ষা নিতে পারলেও সে ধর্ষণ করতে সাহস পাবে না।

একই কলেজের শিক্ষার্থী মহিউদ্দিন বলেন, আমাদের ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিক শিক্ষা দুই দরকার। যে যেই ধর্মেরই হোক না কেন, সে যদি তার ধর্ম মানে তাহলে এ ধরনের কাজ করতে পারে না।

ইডেন কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী লিমা বলেন, ধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনা যাতে বার বার না ঘটতে পারে তার জন্য দোষীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কঠোর শাস্তি হলে শাস্তির ভয়ে হলেও কেউ এ ধরনের কাজ করবে না।

ঢাকা কলেজের ছাত্র ইমরান মজুমদার বলেন, সত্যি কষ্ট লাগে। ২০২০ সালে এসে যখন দেশ এভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। নানান জায়গায় উন্নতি হচ্ছে, সেখানে ধর্ষণের মতো একটা বিষয় নিয়ে কথা বলা লাগছে। এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে তার জন্য দোষীদের যথাযথভাবে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা দরকার। আর শাস্তির বিষয়গুলো গণমাধ্যমে প্রচার হওয়া দরকার। যাতে ভয়ে হলেও অপরাধীরা এ ধরনের কাজ করার সাহস না পায়।

বোরহান উদ্দিন কলেজের শিক্ষার্থী আলম বলেন, আমাদের বর্তমান সমাজে মা-বোনেরাও নিরাপদ না। সত্যি দুঃখ লাগে। আসলে সমাজের সবার সচেতনতা ছাড়া এ ধরনের ঘটনা রোধ করা সম্ভব না। আমাদের সবাইকে এ ধরনের হীন ঘটনা রোধে এক হয়ে কাজ করতে হবে।

বাঙলা কলেজের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী নাজমুল বলেন, ধর্ষণ ব্যাপারটিই একটি জঘণ্য অপরাধ। নিচু মনের পরিচয় ছাড়া এটি কিছুই না। আর ছাত্র হিসেবে আমি বলবো, আমাদের আশপাশে যেসব মেয়ে আছে তারা আমাদের বোন। আমাদেরকে তারা আশ্রয় মনে করে। আর আমাদের দ্বারাই যদি এই কাজটি হয় সেটা নিন্দনীয় এবং ক্ষমার অযোগ্য। এদেশের আইনে ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। আর আমাদের সামাজিক সচেতনতা আরো বেশি করে বাড়াতে হবে।

একই কলেজের শিক্ষার্থী মমিনুল বলেন, সচেতনতার পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তুলতে হবে। তাহলেই ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটবে না।

বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ভাবনা

ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে সমাজের নানান স্তরের মানুষজন নানান দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেন। তাদের মতে, নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার ঘটালে এ ধরনের ঘটনা কমবে। পাশাপাশি দোষীদের কঠোর শাস্তিও দাবি তাদের।

রিকশাচালক জহির বলেন, আমরা রিকশা চালাই। এতোকিছু বুঝি না। তারপরেও মানুষের থেকে মাঝে মাঝে শুনি। এ ধরনের ঘটনা যারা ঘটায় তাদের শাস্তি হওয়া দরকার।

ফার্মগেটের সবজি ব্যবসায়ী রোজিনা বলেন, পোলাপাইনে কী না কী খায়, ওই কি সব ট্যাবলেট। ওইসব খাইয়াই তো এইসব কাম করে। ওরা যেন খারাপ জিনিস না খাইবার পারে হেইডা দেহা উচিত সরকারের।

বাস ড্রাইভার কাজল বলেন, সব চালক-হেল্পার খারাপ না। কিছু লোক খারাপ। যারা খারাপ কাজ করে তাদের শাস্তি হলে আর এমন ঘটনা ঘটবে না।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী আরিফুর বলেন, আমার দেখা মতে, বেশিরভাগ ঘটনারই বিচার হয়না। তাই অপরাধীরা এ ধরনের ঘটনা বার বার ঘটানোর সুযোগ পাচ্ছে।

গার্মেন্টসকর্মী রহিমা বলেন, আমরা কষ্ট করে জীবন চালাই। তারপরেও দিন শেষে ঘরে ফেরার সময় ভয়ে থাকতে হয়। নারীদের যেন কোনো নিরাপত্তা নেই! সরকারের প্রথমেই নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

ফার্নিচার দোকানের বৃদ্ধ আকিবুর রহমান বলেন, কী বলবো। কারা শুনবে আমাদের কথা! আমার মেয়ে আছে। তাদের নিয়ে চিন্তায় থাকতে হয়। কারো তো বিচার হয় না। বিচার দিয়ে লাভ কী!

কমিশন গঠনের নির্দেশ হাইকোর্টের

নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ ঠেকাতে একটি কমিশন গঠন করার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আগামী ৩০ দিনের মধ্যে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে এ কমিশন গঠনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কমিশনে মামলার সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের প্রতিনিধি, সুপরিচিত মানবাধিকার সংগঠনের কর্মী, বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের কর্মীদের একজন করে প্রতিনিধি, আইনজীবী, বিচারক, সচেতন নাগরিক, বিশিষ্টজন, ভিকটিমের স্বাস্থ্য পরীক্ষাকারী চিকিৎসক ও চাইলে বা রাজি থাকলে ভিকটিমদেরকেও কমিশনে নিযুক্ত করতে বলেছেন আদালত।

একইসঙ্গে কমিশনকে পরবর্তী ৬ মাসের মধ্যে ধর্ষণ প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে একটি সুপারিশমালা তৈরি করে আদালতে প্রতিবেদন আকারে জমা দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

জনস্বার্থে দায়ের করা এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে রোববার (১৯ জানুয়ারি) বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ রুল জারিসহ এসব আদেশ দেন।

আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার রাবেয়া ভূঁইয়া। সঙ্গে ছিলেন রিটকারী আইনজীবী ব্যারিস্টার এমএস কাউসার। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার এবিএম আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার।

অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের পাশাপাশি ১৬ বছরের নিচে কেউ ধর্ষণের শিকার হলে সেক্ষেত্রে ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কেন দেয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।

পাশাপাশি ধর্ষণের ঘটনায় কারো মৃত্যু ঘটলে সেক্ষেত্রে আইনে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি যাবজ্জীবন সাজার যে বিধান রয়েছে সেখান থেকে যাবজ্জীবন উঠিয়ে দিতে সরকারের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ হবে না, রুলে তাও জানতে চেয়েছেন আদালত।

এছাড়া ধর্ষণের শিকার ভিকটিমদের জন্য সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, ধর্ষকদের ডিএনএ সংরক্ষণের জন্য ডাটাবেজ তৈরি, প্রতিটি জেলায় ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের মাধ্যমে ভিকটিমদর সুরক্ষা দেয়া, ভিকটিমদের ছবি গণমাধ্যমে প্রচারের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন, সব ধরনের ধর্ষণের অপরাধের জন্য পৃথক একটি আদালত গঠন এবং সে আদালতে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করার ক্ষেত্রে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না- তাও জানতে চেয়ে রুল জারি করে এর জবাব দিতে বলেছেন আদালত।

এর আগে ধর্ষণের জন্য পৃথক পৃথক নির্দেশনা চেয়ে এ রিট দায়ের করা হয়। ব্যারিস্টার রাবেয়া ভূঁইয়া হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এ রিট দায়ের করেন।

ধর্ষকদের গুলি করে মারার দাবি সংসদে

কোনো রকম বিচার ছাড়াই চিহ্নিত ধর্ষকদের গুলি করে হত্যার দাবি উঠেছে দেশের আইনসভা জাতীয় সংসদে। প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির দুই সদস্যের এ দাবিতে সমর্থন জানিয়েছেন সরকারি দলের সিনিয়র সদস্য তোফায়েল আহমেদ। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের আরেক শরিক তরীকত ফেডারেশনের এমপি নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী বলেছেন, ধর্ষকদের ‘ক্রসফায়ারে’ দিলে বেহেশতে যাওয়া যাবে।

মঙ্গলবার (১৪ জানুয়ারি) সংসদের বৈঠকে মাগরিবের বিরতির পর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে এসব দাবি জানানো হয়। এর আগে বিকেল সোয়া ৪টায় স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়।

আলোচনায় জাতীয় পার্টির সদস্য মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, সারাদেশের মানুষ উদ্বিগ্ন। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গেল বছর ১৭ হাজার ৯০০ নারী নির্যাতনের মামলা হয়। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছে পাঁচ হাজার ৪০০ জন। এদের মধ্যে ১৮৫ শিশু। ২০১৮ সালে ধর্ষণের সংখ্যা ছিল ৭২৭ জন। গেল বছর ধর্ষণের পর ১২ শিশু ও ২৬ নারীর মৃত্যু হয়। এ বছর ধর্ষণের শিকার হয়ে মারা যায় ১৪টি শিশু। বিগত বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২০১৯ সালে ধর্ষণ হয়েছে।

মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, এই বিষয়কে গুরুত্ব না দিলে জাতির সামনে কোনো প্রশ্নের জবাব দেয়া যাবে না। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে ধর্ষণ করার ঘটনায় আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরপরও জনমনে গ্রেপ্তার নিয়ে প্রশ্ন আছে। এর পরপরই সাভারে আরেক ঘটনায় ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ধামরাইতে একই ঘটনা ঘটেছে।

তিনি বলেন, যে হারে ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে, তাতে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এটাকে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থা নিতে হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে মুজিবুল হক বলেন, মাদকের জন্য এত ক্রসফায়ার হচ্ছে, সমানে বন্দুকযুদ্ধে মারা যাচ্ছে; ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের জন্য কেন কেউ কোনো বন্দুকযুদ্ধে মারা যায়নি?

জাতীয় পার্টির আরেক সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ছাত্রী, শিশু, নারী শ্রমিক, এমনকি প্রতিবন্ধী নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ধন্যবাদ, কারণ তারা অনেক ক্লু-লেস ধর্ষককে অ্যারেস্ট করতে পেরেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ধর্ষককে গ্রেপ্তার করেছে। প্রত্যেক জায়গায় ধর্ষকদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তাহলে বিচার হচ্ছে না কেন? বিচার যখন হয়, তখন আর কেউ মনে রাখেন না। ১৫ বছর, ২০ বছর পর একটা বিচার হয়।

তিনি বলেন, বহুল আলোচিত শাজনীন হত্যার পর ১৬ বছর লেগেছে তার বিচার করতে। তার পিতা এ দেশের স্বনামধন্য একজন শিল্পপতি। তার মেয়ের এই ধর্ষণ হত্যার বিচার নিয়ে কোর্ট-কাচারি করতে করতে ১৬ বছর পার করেছেন। আট কোটি টাকা খরচ হয়েছে। একজনের মাত্র ফাঁসি হয়েছে।

তিনি বলেন, ধামরাইয়ে বাসে ধর্ষণ করে হত্যা করা হলো। বাসের চালককে গ্রেপ্তার করা হলো। কী বিচার হবে? কোনো সাক্ষী নেই। এখন পুলিশের কাছে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেবে। যখন মামলায় যাবে, সাক্ষী থাকবে না।

কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, এই ধর্ষকদের কী আইন আপনি করবেন? তাদের কোনো ফাঁসি হবে না, জেলও হবে না। একসময় একবছর পর বেরিয়ে যাবে, কেউ খবরও রাখবে না। যদি এই সমাজকে ধর্ষণমুক্ত করতে চান, তাহলে এনকাউন্টার নিশ্চিত করতে হবে। তাকে গুলি করে মারতে হবে।

এমপি কাজী ফিরোজ বলেন, আইন লাগে না। পুলিশের আইন আছে। মাদকের আসামি পরশু দিনও মারা হয়েছে, কোন আইনে মারা হয়েছে? এই যে বাসে ধর্ষণ করে যে মেয়েটিকে মেরে ফেলা হয়েছে, তার ধর্ষক ধরা পড়েছে। তাকে কী করব আমরা? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষককে বিচারের আওতায় আনেন, দেখা যাবে কোনো সাক্ষী নেই। এই মেয়েকে কাঠগড়ায় আনা হবে। সাক্ষী দিতে হবে কীভাবে ধর্ষণ করা হলো। কীভাবে ঘটনা ঘটেছে। এর চেয়ে লজ্জাজনক কিছু নেই। সারাজীবন তাকে এই জ্বালা সহ্য করতে হবে।

এমপি রশীদ বলেন, মানবাধিকার কর্মীদের বলব, যদি ধর্ষণের শিকার হতেন, আপনার স্ত্রী, আপনার মা, আপনার বোন, আপনার কেউ যদি ধর্ষণের শিকার হতো, কী হতো? আমরা কী চাই? এই সংসদে আমরা মনে করি যে, এদের ত্বরিত বিচার হওয়া দরকার। ত্বরিত বিচারে কোনো আইন হবে না। এক মাসের মধ্যে বিচার করা যাবে না। রূপাকে ধর্ষণ করে ঘাড় মটকে মেরে ফেলল। পুলিশ সবাইকে গ্রেপ্তার করল। সেদিন যদি এই পাঁচজনকে গুলি করে মধুপুরে নিয়ে মারা হতো তাহলে পরে বাসে টাঙ্গাইলের পথে কেউ ধর্ষিত হতো না।

তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে স্পষ্ট বলতে চাই, ধর্ষণ করা হলো। আসামি ধরা পড়েছে, মেয়ে বলছে যে সেই আসামি। জিজ্ঞাসাবাদের নামে ধর্ষককে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হোক, নিয়ে গুলি করে মারা হোক। সবাই দেখুক, তার লাশ পড়ে আছে।

কারো যদি ফাঁসি হয় কেউ খবর রাখে না। ১০টা ২০টা মারা হোক, ধর্ষণ বন্ধ হয়ে যাবে। স্পষ্ট বলতে চাই, একমাত্র ওষুধ পুলিশ ধরার পর ওখানে নিয়ে গুলি করে মেরে ফেলা।

আওয়ামী লীগের সিনিয়র সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, মুজিবুল হক চুন্নু সুন্দর প্রস্তাব এনেছেন। কাজী ফিরোজ তিনিও সুন্দরভাবে বলেছেন।

তোফায়েল আহমেদ বলেন, ভারতে একজন ডাক্তার মেয়ে বাস থেকে নামার পর চারজন তাকে নিয়ে গণধর্ষণ করে। দু-তিন দিন পর ক্রসফায়ার দিয়ে তাদের হত্যা করা হয়। এ ঘটনার পর ভারতে আর কোনো ঘটনা ঘটেনি। কাজী ফিরোজের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করে তোফায়েল আহমেদ বলেন, আইনকানুন আছে, তার মধ্যেও একটা চিহ্নিত লোক, ওয়ারীর একটা বাচ্চা মেয়ে, ছয় বছর বয়স, তাকে ধর্ষণ করে হত্যা করেছে। আমাদেরও ছোট নাতি-নাতনি আছে। এটা হতে পারে না। তিনি বলেন, এখানে দরকার কঠোর আইন করা। এই কাজ করেছে তার আর এই পৃথিবীতে থাকার কোনো অধিকার নেই।

নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী বলেন, চুন্নু এবং কাজী ফিরোজ যাদের কথা বলেছেন, আমি টুপি দাড়ি মাথায় নিয়ে আল্লাহকে হাজির নাজির জেনে বলছি, এদের ক্রসফায়ার করলে বেহেশতে যাওয়া যাবে, কোনো অসুবিধা নেই।

বাংলাদেশ জার্নাল/আরকে

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত