ঢাকা, শুক্রবার, ১৪ মে ২০২১, ৩১ বৈশাখ ১৪২৮ আপডেট : ৪ মিনিট আগে

প্রকাশ : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০৯:৪৬

প্রিন্ট

রিপোর্টার থেকে সম্পাদক (পর্ব -৩৫)

রিপোর্টার থেকে সম্পাদক (পর্ব -৩৫)

শাহজাহান সরদার

[দেশের জনপ্রিয় দুটি পত্রিকার (যুগান্তর, বাংলাদেশ প্রতিদিন) জন্মের পেছনের ইতিহাস, কর্তৃপক্ষের চাপিয়ে দেয়া বিব্রতকর বিভিন্ন আদেশ নির্দেশ, হস্তক্ষেপ, পত্রিকা প্রকাশের ওয়াদা দিয়ে অন্য একটি জনপ্রিয় পত্রিকা থেকে নিয়ে এসে পত্রিকা না বের করে হাতজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে বিদায় দেয়া, পত্রিকা প্রকাশের পর কোন কোন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক কিছু দিনের মধ্যেই ছাপা সংখ্যা কমিয়ে দিয়ে লাভ খোঁজা, ইচ্ছেমত সাংবাদিক-কর্মচারি ছাঁটাই করা সহ পত্রিকার অন্দর মহলের খবরা-খবর, রাজনৈতিক মোড় ঘুড়িয়ে দেয়া কিছু রিপোর্ট, সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটির কিছু ঘটনা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ নিয়ে আমার এ বই ‘রিপোর্টার থেকে সম্পাদক’। জানতে পারবেন সংবাদপত্র জগতের অনেক অজানা ঘটনা, নেপথ্যের খবর।]

(পর্ব -৩৫)

পরদিন বিকালে আমি ধূপখোলা মাঠে পৌঁছি বেগম জিয়া আসার অনেক আগে। ফুটপাতে বসে চা পান করছি। কয়েকজন সাংবাদিকও এসেছেন। মাঠে মানুষজন অনেক। আমার চিন্তা বেগম জিয়ার সাক্ষাতকার। না আসা পর্যন্ত রেজাবুদৌলা চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগের কোন সুযোগ নেই। ৪টার দিকে বেগম জিয়ার গাড়ির সঙ্গেই অন্য গাড়িতে এলেন তিনি। বেগম জিয়া সরাসরি মঞ্চে উঠে গেছেন। আমি মঞ্চের পাশে যাই। আমাকে দেখেই রেজাবুদৌলা বললেন, শাহজাহান ভাই, আপনি এসেছেন? কথা হয়েছে। ম্যাডাম রাজি হয়েছেন। তবে বিব্রতকর কোন প্রশ্ন নয়। আমি বললাম, শুধু বর্তমান অবস্থা নিয়েই কথা বলব। জনাব চৌধুরী আমাকে বেগম জিয়ার গাড়ির কাছে নিয়ে এলেন, ড্রাইভারকে বললেন বেগম সাহেব আসার আগেই যেন আমাকে গাড়িতে উঠিয়ে নেন। কথামত কাজ। আমি গাড়িতে উঠে বসি।

কিছুক্ষণ পর বেগম জিয়া উঠলেন। আমাকে দেখেই বললেন, আপনি এসেছেন? আমি সালাম দিয়ে বললাম, জ্বি। ততক্ষণে ড্রাইভার গাড়ি চালু করে দিয়েছে। কোথায় যাবেন তিনি, আমি কোথায় নামব এসব চিন্তা না করে কথা শুরু করলাম। প্রথমে ত্রাণ, তারপর জোট, পরে আওয়ামী লীগ এবং সবশেষে আমার প্রশ্ন বা জানার ছিল মূল প্রশ্নটি। আমি তাকে শেষ প্রশ্ন করি, এরশাদবিরোধী আন্দোলনের জন্য ঐক্যবদ্ধ বা যুগপৎ আন্দোলনের পক্ষে জনমত সোচ্চার থাকার পরও ঐক্য হচ্ছে না, কেন? যুগপৎ আন্দোলনের কি আপাতত কোন সম্ভাবনা আছে? এই প্রশ্নে তিনি কিছুটা উত্তেজিত হয়েই বললেন, ‘কিসের ঐক্য, কার সাথে ঐক্য, আওয়ামী লীগ বা হাসিনার সাথে আর কোন ঐক্য নয়। তারা আমাদের সাথে বেঈমানি করেছে। আমরা এককভাবেই আন্দোলন করব।’ আমার মূল প্রশ্নের উত্তর শেষ হতে না হতেই গাড়ি এসে থামল ইস্কাটনে বেগম খালেদা জিয়ার ভাই সাইদ ইস্কান্দারের (মরহুম) তৎকালীন বাসায়। আমি তাকে ধন্যবাদ ও সালাম জানিয়ে রিক্সাযোগে সোজা তেজগাঁ খবর অফিসে ফিরলাম। তখন রাজধানীতে এত জ্যাম ছিল না। কাজেই আমার যেতে বেশি সময় লাগেনি।

অফিসে গিয়ে এককাপ চা খেয়ে ঠাণ্ডা মাথায় প্রশ্নোত্তর আকারে সাক্ষাতকারটি লিখলাম। বার্তা সম্পাদককে আগেই জানিয়ে রেখেছিলাম। পরদিন দৈনিক খবরে ‘হাসিনার সাথে ঐক্য নয়, যুগপৎ আন্দোলনও নয়’ প্রধান শিরোনামে বেগম জিয়ার সাক্ষাতকারটি ছাপা হলে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সচেতন মহলে হৈ-চৈ পড়ে যায়। এরপর পক্ষ-বিপক্ষে অনেক বক্তৃতা-বিবৃতি আসে। কেউ সমালোচনা করলেন, কেউ নিন্দা করলেন। কেউ বললেন, খালেদা জিয়া ঠিকই বলেছেন। কেউ বলেছেন খালেদা জিয়া আসলে আন্দোলন চান না। তবে বেশিরভাগ বক্তৃতা-বিবৃতিতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিকে যুগপৎ বা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে আহ্বান জানানো হয়। আর জনমতও ছিল এরশাদের বিরুদ্ধে, প্রত্যাশা ছিল যুগপৎ আন্দোলন। এ লক্ষ্যেই জনমত বৃদ্ধি পেতে থাকে। খালেদা জিয়া সবদিক দিয়ে বেশ চাপে পড়েন।

বাস্তবতা ছিল এই সাক্ষাতকারের পর দুই জোটের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সাময়িক অবসান হয়। শুরু হয় আবার সমঝোতা বা ঐক্যের উদ্যোগ। রাজনৈতিক পরিস্থিতিও পাল্টে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৭ সালের ২৮ অক্টোবর শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মধ্যে প্রথম বারের মত একটি বৈঠক হয়। বৈঠকটি হয়েছিল শেখ হাসিনার স্বামী পরমাণু বিজ্ঞানী ডা. ওয়াজেদ মিয়ার (মরহুম) তৎকালীন মহাখালীর সরকারি বাসভবনসংলগ্ন কমিউনিটি সেন্টারে। এই বৈঠকে ১৫ দল ও ৭ দল নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলনের একটি ইশতেহার তৈরি হয়। এ প্রেক্ষিতে আবার আন্দোলন চাঙ্গা হয়ে ওঠে। জামায়াতে ইসলামী এবং বামপন্থীদের জোটও যুগপৎ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। শেখ হাসিনা তখনও সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী ছিলেন। এরই মধ্যে জাতীয় পার্টিতেও ভেতরে বিভক্তি বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দলের অনেক এমপি পদত্যাগ করে আওয়ামী জোটের সাথে যোগ দিতে পারে, এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ে। হাসিনা-খালেদার বৈঠক, যুগপৎ আন্দোলনের পুনঃঐক্য এবং নিজ দলীয় এমপিদের পদত্যাগের গুজবে এরশাদ জাতীয় সংসদ ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচন দেন ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ। সে নির্বাচনে ১৫ দল, ৭ দল, জামায়াতসহ বড় কোনো দলই অংশ নেয়নি। কেবল জাসদ রব, ফ্রিডম পার্টি অংশ নিয়েছিল। সেই নির্বাচনেও এরশাদের রক্ষা হয়নি বরং পতন আরো ত্বরান্বিত করে। বেশিদিন টেকেনি ১৯৮৮ সালের সংসদও। এরশাদবিরোধী আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। কারফিউ ভেঙে জনতা এরশাদের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আসে। তীব্র আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগে বাধ্য হন।

দুই.

আওয়ামী লীগ তখন বিরোধীদলে। ক্ষমতায় বিএনপি। এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে এই দু’দলের নেতৃত্বাধীন জোটের দীর্ঘ আন্দোলনের পর বিচারপতি শাহবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন অন্তবর্তীকালীন সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালের নিবার্চনে বিএনপি ক্ষমতাসীন হয়। এই সংসদ শুরু থেকে যেমন প্রাণবন্ত থাকে তেমন ছড়াতে থাকে উত্তাপ। সংসদের এমনি একদিন ছিল ১৯৯৫ সালের ১ মার্চ। প্রশ্নোত্তর পর্বে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সংসদ সদস্য আবুল হাসান চৌধুরী পয়েন্ট অব অর্ডারে হেবরনে মুসলমান হত্যার জন্য সংসদে নিন্দা ও শোক প্রস্তাব গ্রহণের জন্য স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সে সময় তথ্যমন্ত্রী ছিলেন ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা। তিনি এ ধরনের প্রস্তাবকে ‘আওয়ামী লীগের মায়াকান্না ও হঠাৎ মুসলমান হয়ে যাওয়া’ বলে মন্তব্য করেন। আর নাজমুল হুদার এ-বক্তব্য আওয়ামী লীগ দলের সদস্যরা তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে তাকে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানান। তারা ওয়াক আউট করেন। এই ওয়াক আউট থেকেই পরে শুরু হয় সরকারবিরোধী আন্দোলন।

১৯৯৪ সালের ২৪ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় মাগুরা আসনের উপ-নির্বাচন। আওয়ামী লীগ এমপি আসাদুজ্জামানের মৃত্যুতে শূন্য এ আসনে উপ-নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হয়। তখন প্রধান নির্বাচন কশিশনার ছিলেন বিচারপতি আব্দুর রউফ। বিএনপি সমর্থিত এক শিল্পপতি কাজী সলিমুল হক এই নির্বাচনে জয়ী হন। ওই উপ-নির্বাচনে কারচুপির ঘটনা থেকেই আসে তত্বাবধায়ক সরকারের দাবি। আর এ দাবি আদায়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে তৎকালীন প্রায় সব বিরোধীদল হরতাল, অবরোধ, অসহযোগসহ নানা আন্দোলনের কর্মসূচি দিতে থাকে।

আন্দোলনের একপর্যায়ে ১৯৯৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর মানিক মিয়া এভিন্যুতে এক সমাবেশ শেষে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিরোধীদলীয় সদস্যরা সংসদ সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেন। কিন্তু তাদের পদত্যাগপত্র তখন গ্রহণ করা হয়নি। তবে ৯০ দিন কার্যদিবস একাধিক্রমে অনুপস্থিত থাকার কারণে তাদের আসন শূন্য হয় ১৯৯৫ সালের ৩০ জুলাই। এ দীর্ঘ সময়ে সমঝোতার জন্য দেশি-বিদেশি অনেক উদ্যোগ নেয়া হয়।

কমনওয়েলথের তৎকালীন মহাসচিব অ্যামেকা অ্যানিকু ঢাকা আসেন। তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও একই সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সমঝোতার প্রয়াস নেন। পরপরই মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তার প্রতিনিধি হয়ে আসেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক গভর্নর স্যার নিনিয়ান স্টিফেন। ৩৯ দিন ঢাকায় অবস্থান করে তিনি দুই নেত্রী এবং তৎকালীন সরকারি দল ও বিরোধীদলের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন। কিন্তু তিনিও সফল হননি। বিএনপি তত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানতে রাজি হয়নি। আর আওয়ামী লীগসহ তৎকালীন বিরোধীরা তত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানা ছাড়া আন্দোলন থেকে ফিরে আসবে না বলে সাফ জানিয়ে দেয়।

স্বাধীনতার পর সম্ভবত সেই তত্বাবধায়ক সরকারের দাবির আন্দোলনই ছিল সবচেয়ে বড় আন্দোলন। সর্বাত্মক এই আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্যেই অবাধ ও সুষ্ঠু সংসদ নির্বাচনের জন্য তত্বাবধয়ক সরকারের বিভিন্ন ফর্মুলা নিয়ে আলোচনা হয়। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন কাঠামো তুলে ধরা হয়। এই ফর্মুলা ও কাঠামোগুলোর মধ্যে সবচাইতে চাঞ্চল্যকর ছিল খোদ সরকারি দল থেকে আসা তথ্যমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার একটি ফর্মুলা। আর সে-সময় প্রেসিডেন্ট আব্দুর রহমান বিশ্বাসের দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও সামনে আসে। তৎকালীন বিরোধী নেতারা তার সাথে সাক্ষাত করে সমঝোতার উদ্যোগ নিতে বলেন। কিন্তু তিনি কোনো উদ্যোগ নেননি বা নিতে পারেননি। তবে সে-সময়কার পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি আমাকে একটি সাক্ষাতকার দিয়েছিলেন। এখানে বলে রাখি, সে সময়কার আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমেই তত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় হয়েছিল।

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপি একতরফা একটি নির্বাচন করে। সে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদের একমাত্র অধিবেশনটি বসে ১৯ মার্চ। আর তত্বাবধায়ক সরকারের বিলটি পাস হয় ২৪ মার্চ বসা বৈঠকে। এই তত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনের একপর্যায়ে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা আমাকে একটি সাক্ষাৎকার দেন। সরকারি দলে থেকেই তিনি তত্বাবধায়ক সরকারের একটি রূপরেখা দেন। নিচে তার সাক্ষাৎকারটিসহ একে ঘিরে আমার অন্যরকম এক অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হলো।

মন্ত্রীর সাক্ষাৎকার এবং পদত্যাগ ২ নভেম্বর ’৯৪। বেলা ২টা। হঠাৎ দুপুরে বাসার টেলিফোন বেজে উঠলো। আমার স্ত্রী উঠে টেলিফোন ধরলেন। তিনি জানালেন, তথ্যমন্ত্রী কথা বলবেন। আমি টেলিফোন ধরলাম। সাথে সাথে মন্ত্রীর পিএ লাইন থ্রো করলো মন্ত্রীকে। আমি হ্যালো বলতেই তথ্যমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা বললেন, আপনার খবর-টবর কী, দেখি না মোটেই। আমি বললাম, রাজনৈতিক অবস্থার কারণে ব্যস্ত আছি। নিনিয়ান সাহেব তো বেশ আরামে আছেন, তার খাওয়া-দাওয়াও ভালই হচ্ছে, আমরা তো রাস্তায় দৌড়ে শেষ। তাই দেখা-সাক্ষাৎ তেমন কারো সাথেই হয় না।

জবাবে তিনি বললেন, এখনই চলে আসুন সচিবালয়ে, খবর আছে। আমি বললাম কী খবর? তিনি বললেন, আগে আসুন। ভাল খবর। আমি আবার বললাম কাল সকালে এলে হয় না। আমার হাতে আজ অনেক কাজ আর এই মাত্র বাইরে থেকে এসে খেতে বসেছি। সচিবালয়ে অফিসের সময়ও শেষ প্রায়। তিনি বললেন, আমি আছি আপনি আসেন। আমি আর না করতে পারলাম না। খাওয়া শেষ করে সচিবালয়ে গিয়ে হাজির হই। নাজমুল হুদা সাহেবের সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক খুব ভালই ছিল। তিনি যা বলেন সোজসুজি বলেন, ঘোরপ্যাঁচ করেন না। সচিবালয়ের সর্ব-উত্তরের ভবনের ৯ তলায় তার অফিস। লিফটে উঠে পূর্বপাশ ঘুরে তার রুমে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালাম। এসময় পিএ এসে বললেন স্যার আপনাকে অনেকক্ষণ ধরে খুঁজেছেন। আপনি একটু বসুন। আমি মন্ত্রীর রুমসংলগ্ন একটি সোফায় বসলাম। মন্ত্রী ভিতরে লালবাতি জ্বালিয়ে কথা বলছেন। পিয়নকে জিজ্ঞেস করলাম কে ভিতরে। সে জানালো স্যারের চাচা। আমি চানতে চাইলাম চাচার নাম। পিয়ন জানালো, সালমান এফ রহমান সাহেব। নাজমুল হুদা ও সালমান রহমানের বাড়ি ঢাকার দোহার থানায়। আত্মীয়তার সম্পর্কও আছে। তবে কী ধরনের চাচা-ভাতিজা তা জানি না। পরে এই চাচা-ভাতিজার মধ্যে বেশ বৈরিতা দেখতে পাই। দু’জন একই আসন থেকে নির্বাচনও করেন। সালমান রহমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নাজমুল হুদার কাছে হেরে যান। আমার সঙ্গে সোফায় তখন বসে আছেন লন্ডন থেকে প্রকাশিত ঠিকানা প্রত্রিকার সম্পাদক শাহীন সাহেব। তার বাড়ি বৃহত্তর সিলেটে। বিএনপি’র সমর্থক। কথায়-কথায় জানালেন তিনি আগামী নির্বাচনে বিএনপি’র প্রার্থী হতে আগ্রহী।

৫ মিনিটের মধ্যেই সালমান এফ রহমান চলে গেলেন। আমি সাথে সাথে মন্ত্রীর রুমে প্রবেশ করি। বেলা তখন সোয় ৩টা। রুমে আমরা দু’জন। মন্ত্রী নিষেধ করে দিয়েছেন, এখন কাউকে যেন আসতে দেয়া না হয়। বললাম, কেন খবর দিয়েছেন? বড় কিছু আছে নাকি? মন্ত্রী বললেন, আছে। জানতে চাইলাম কী? মন্ত্রী বললেন, আমি একটি সাক্ষাৎকার দিতে চাই। আমার প্রশ্ন, কী বিষয়ে। কেননা ইত্তেফাকে সাক্ষাৎকার ছাপা হয় নিতান্তই কম। কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকলে ছাপা হতে পারে।

মন্ত্রী জানালেন, আমি তত্বাবধায়ক সরকার সম্পর্কে বক্তব্য রাখতে চাই। এ কথা বলে একটি কাগজ এগিয়ে দিলেন। কাগজে তার মত করে তত্বাবধায়ক সরকারের একটি রূপরেখার বর্ণনা আছে। যাতে সরকার পদত্যাগ করলে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের প্রধান বিচারপতিসহ বিচারপতিগণ নির্বাচনকালীন তত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব পালন করবেন। তত্বাবধায়ক সরকারের ফর্মুলা সম্পর্কে মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা সাক্ষাৎকার দেবেন এটা শুনে এবং ফর্মুলা দেখে আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। কেননা প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও বিএনপি নেতৃবৃন্দ এ দাবি মানতেই চান না। স্বীকারই করেন না। আর নাজমুল হুদা সাহেবও তত্বাবধায়ক সরকারের একজন কট্টর সমালোচক। তাই মন্ত্রীর কাছে জানতে চাইলাম এ বক্তব্য আপনার ব্যক্তিগত না দলের পক্ষ থেকে দিচ্ছেন।

মন্ত্রী জানালেন, তার ব্যক্তিগত। আমি বললাম, যেখানে আপনার দল রাজি নয়, সেখানে আপনি ব্যক্তিগতভাবে এরকম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে মতামত দিলে আপনারই বিপদ হতে পারে। আর তথ্যমন্ত্রী হিসেবে আপনি সরকারের মুখপাত্রও বটে। অন্য কোন মন্ত্রী আর আপনার বক্তব্যের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান আছে। তিনি জানালেন, বুঝে-শুনেই দিচ্ছেন। কী এমন হয়েছে হঠাৎ এ বিষয়ে আজই বক্তব্য দিতে চান জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা গতকাল মানিক মিয়া এভিন্যুর জনসভায় সংসদ থেকে পদত্যাগের যে-কথা বলেছেন এতে আমি খবুই মর্মাহত হয়েছি। কাল থেকেই আমি মনে মনে স্থির করেছি এ বিষয়ে কীভাবে কী করা যায়। অনেক চিন্তা করে আমি স্থির করেছি, এভাবে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন সম্ভব। আমি আবার তাকে বললাম প্রধানমন্ত্রীর (বেগম খালেদা জিয়া) সঙ্গে কি আপনার এ ব্যাপারে কথা হয়েছে? জবাবে তিনি বললেন, না।

তবে তিনি জানালেন, প্রধানমন্ত্রীকে আমি চিনি, তাকে বুঝিয়ে বললে তিনি না করবেন না। প্রায় ১৫ মিনিট এভাবে কথাবার্তা চললো এবং রূপরেখাটি পড়ার পর আমি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করলাম। আমি নিশ্চিত ছিলাম বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, ছাপা হলে দেশ-বিদেশে সাড়া পড়বে। কিন্তু আমার কাছে ক্যাসেট রেকর্ডার ছিল না। এভাবে শুনে প্রতিবেদন লিখে যদি কোন শব্দের হেরফেরের কারণে বিপদে পড়ি। আমি তখন মন্ত্রীকে ঘটনা বললাম, আপনার জন্যও ভাল হবে, আমার জন্য ও ভাল হবে সাক্ষাৎকারটি লেখার পর আপনি যদি দেখে স্বাক্ষর করে দেন। আমি সাক্ষাৎকারটি সেখানেই লিখে ফেলি। পরে মন্ত্রী কম্পিউটারে কম্পোজ করার জন্য পাঠান। আমি বললাম কম্পিউটার কম্পোজে সময় লাগবে। আমি বরং ঘুরে আসি। যাওয়ার সময় মন্ত্রীর এপিএসকে বলে যাই একঘণ্টা পর গাড়ি দিয়ে যেন আমাকে প্রেস ক্লাব থেকে আনা হয়।

বিকাল তখন সাড়ে ৫টা। আমি প্রেসক্লাবের কেন্টিন থেকে বের হয়ে গেইট পর্যন্ত এসেছি। ততক্ষণে এপিএস সাহেব এসে আমার অপেক্ষায় বসে আছেন। প্রেসক্লাবে ঘণ্টাখানেক থাকার সময় অনেকের সঙ্গে দেখা হলেও এ ব্যাপারে আমি মুখ খুলিনি। যাহোক ৫ মিনিটের মধ্যেই সচিবালয়ে মন্ত্রীর রুমে পৌঁছলাম। ততক্ষণে কম্পোজ করা তিন পৃষ্ঠার সাক্ষাৎকার মন্ত্রীর টেবিলে এসে গেছে। মন্ত্রী পড়ে তিন পৃষ্ঠায়ই স্বাক্ষর করলেন। আমি তাকে সালাম জানিয়ে বের হয়ে সোজা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন মেঘনায় গেলাম। সেখানে নিনিয়ান ছিলেন। কোন খবর আছে কিনা এক চক্কর দিয়ে জেনে যাওয়া। অবশ্য আজকের দিনের সবচাইতে বড় খবর তো আমার পকেটেই আছে। প্রতিদিনের মত ১৫-২০ জন রিপোর্টার যথারীতি বসে আছেন মেঘনার সামনের ফুটপাতে।

ফুটপাতে বসা আর মেঘনার গেইটে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। আমি তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অফিসে রওনা হলাম। সবাই বললো, আজ এত তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছেন? আমি বললাম, আজ মনে হয় না তেমন কিছু আর পাওয়া যাবে। কেউ কিছু বুঝতেও পারলো না। আমি রিকশায় উঠতেই ইনকিলাবের সাইফুল আলম বললো (বর্তমানে যুগান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক) আমিও যাবো। সাইফুল তার অফিসে নেমে যান। পাশাপাশি অফিস। আমি ঠিক সোয়া ৭টায় অফিসে পৌঁছে টাইপ করা কাগজগুলো বের করে লেখা শুরু করলাম। ৪০ মিনিটে লেখা শেষ। বার্তা সম্পাদক বাতেন ভাই দায়িত্বে। লেখা শেষ করে আমি মোবাইলে ফোন করলাম সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মঞ্জু সাহেবকে (তিনি তখন ইত্তেফাকের সম্পাদক ও প্রকাশক)। তাকে বিশদভাবে সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং বক্তব্য সম্পর্কে জানালাম। তিনি তখন সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতার রুমে জোট নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠকে ছিলেন। আমিও জানতাম বিকেলে বৈঠক ছিল। কিন্তু ৮টা পর্যন্ত চলছে তা জানতাম না।

সংসদে আমারও যাওয়ার কথা ছিল। প্রতিদিনই যাই। কারণ তখন সম্মিলিত বিরোধীদলের খবর আমিই কভার করি। কিন্তু নাজমুল হুদার সাক্ষাৎকারের কারণে মেঘনা হয়েই অফিসে ফিরে আসি। সম্পাদক সাহেবের সঙ্গে নাজমুল হুদার সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে আমার আলাপ বৈঠকে উপস্থিত কেউ কেউ হয়তো আঁচ করে ফেলেন। কেননা বৈঠকের মাঝেই আমাদের কথোপকোথন হয়। সম্পাদক সাহেব আমাকে বললেন, ভলো ভাবেই ছাপা হবে, বাতেন সাহেবকে বলো (বাতেন সাহেব তখন যুগ্ম বার্তা সম্পাদক)।

চলবে...

বইটি পড়তে হলে সপ্তাহের রবি, মঙ্গল, বৃহস্পতিবার চোখ রাখুন ‘বাংলাদেশ জার্নাল’ অনলাইনে।

বইটি প্রকাশ করেছে উৎস প্রকাশন

আজিজ সুপার মার্কেট (তৃতীয় তলা), ঢাকা।

বইটি সংগ্রহ করতে চাইলে ক্লিক করুন

বাংলাদেশ জার্নাল/কেআই

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত