ঢাকা, শুক্রবার, ০৫ মার্চ ২০২১, ২০ ফাল্গুন ১৪২৭ আপডেট : ৩৭ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৫:২৪

প্রিন্ট

প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি ছাড়ার হুঁশিয়ারি

প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি ছাড়ার হুঁশিয়ারি
প্রতীকী ছবি

জার্নাল ডেস্ক

প্রাচীনকাল থেকেই শিক্ষকতা সমাজের অন্যতম সম্মানিত একটি পেশা। একজন শিক্ষার্থীকে মানুষের মত মানুষ করার গুরু দায়িত্ব থাকে শিক্ষকের হাতেই। তবে সম্প্রতি শিক্ষকদের সম্মানহানিকর বিভিন্ন বিষয় গণমাধ্যমে উঠে আসছে।

দৈনিক বাংলাদেশ জার্নাল শুরু লগ্ন থেকেই শিক্ষকদের বিভিন্ন দাবি আদায়ে শিক্ষকদের সঙ্গে রয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় আজ এক প্রাথমিক শিক্ষকের সঙ্গে নির্বাচন অফিসের এক অফিস সহকারীর অসৌজন্যমূলক আচরণের খবর প্রকাশ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ জার্নাল পরিবার এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে এবং বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখবেন সে প্রত্যাশা করছে।

নাজমুস সৈকত নামে একজন প্রাথমিক শিক্ষকদের একটি ফেসবুক গ্রুপে পোস্টটি করেন। সেই পোস্টে চাকরি ছাড়ার (ইস্তফা) হুঁশিয়ারি দেন তিনি। অফিস সহকারী কর্তৃক প্রাথমিক শিক্ষকের লাঞ্ছিত হওয়ার সেই পোস্টটি বাংলাদেশ জার্নালের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

ছোট বেলা থেকে দেখে আসছি বাংলা সিনেমা তে নায়ক নায়িকার মধ্যে গড়ে ওঠা গভীর সম্পর্কের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়াতো নায়ক কিংবা নায়িকার বাবার পেশা এবং আর্থিক বৈষম্যতা।

বেশির ভাগ সিনেমা গুলোতে দেখা যায় নায়িকার পছন্দ করা ছেলে কে যখন ধনী বাবার সামনে হাজির করে তখন চেহারা সুরত দেখে বাবা প্রথম দর্শনেই পছন্দ হয়ে যায়। পরবর্তীতে যখন জানতে চাওয়া হয়, তা তোমার বাবা কি করেন?

উত্তর আসে আমার বাবা গ্রামের প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক। যাহ!!!গরম তৈলে পানির ছিটা। এত বড় সাহস, আমার মেয়ের জামাই হবে একজন প্রাইমারী স্কুলের মাষ্টারের ছেলে। কত টাকা বেতন পায় তোর বাপ??? নুন আনতে পান্তা ফুরায়। এই কে কোথায়,আছিস ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দে।

এরকম হাজারো সিনেমায় চৌধুরী সাহেব রা প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক কিংবা, শিক্ষকের সন্তান পরিচয় পাওয়া মাত্র চাকর বাকর দিয়ে অর্ধচন্দ্র দিয়ে বাড়ি থেকে বের করেছে।

এবার আসি আসল কথায়, যেকোন দেশের সিনেমা সেই দেশের জনগণের আর্থ সামাজিক, সাংস্কৃতিক জীবনাচরণ তুলে ধরে। আর আমরা দর্শক, তা নিজের জীবনে প্রয়োগের চেষ্টা করি।

জাতি গঠনের কারিগর দের এভাবে হেয় করে উপস্থাপন বলে দেয় আমরা প্রাইমারীর শিক্ষক সমাজের কোন অবস্থানে আছি।

এসব দেখতে দেখতে বড় হওয়া সেই ছোট্ট শিশু গুলি কখনই উদ্বুদ্ধ হয় না শিক্ষা জীবন শেষ করে পেশা হিসাবে প্রাইমারীর শিক্ষকতা কে পেশা হিসাবে বেছে নিতে। আজ পর্যন্ত কোন মা বাবা কে বলতে শুনলাম না বড় হয়ে আমার সন্তান কে প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক বানাবো।

আজ পর্যন্ত কোন শুভাকাঙ্ক্ষী কে দোয়া করার সময় বলতে যে বড় হয়ে তুমি প্রাইমারীর শিক্ষক হবে। সচরাচর যেটা শুনি সেটা হলো বড় হয়ে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হও।

আজ পর্যন্ত কোন বিবাহ উপযুক্ত মেয়ের বাবার মুখে শুনলাম না আমার সুন্দরী শিক্ষিত মেয়েটা কে একজন প্রাইমারী শিক্ষকের সাথে বিয়ে দেবো। আজ পর্যন্ত দেখলাম না সরকারী কোন অফিস আদালতে প্রাইমারী শিক্ষক পরিচয় দেয়া মাত্র সম্মান কিংবা আতিথেয়তার মাত্রাটা বাড়িয়ে দিতে। বরং পরিচয় জানা মাত্র আচরণটা তাৎক্ষনিক পালটিয়ে যায়।

এই তো সেদিন পৌর নির্বাচনের পোলিং অফিসার হিসাবে নিয়োগ প্রাপ্ত হয়ে নিয়োগ পত্রটা আনতে গেছিলাম নির্বাচন অফিসে। আমার বেশ ভূষা আর চালচলন দেখে অফিস সহকারী সমাদর করে বসতে দিলেন। চা পান করার আহ্বান ও জানালেন। এবার পোলিং অফিসারের নিয়োগ পত্র চাইলাম।

আমার কাছে জানতে চাওয়া হইল কোন ডিপার্টমেন্ট আর নিজের নাম কি?? প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক!!!!

আরে ধুর মিয়া ঝামেলা করেন না যান। এতক্ষণ নিজে সযত্নে নিয়োগ পত্র খুঁজতে থাকা মহাত্নন আমার মুখের উপর নিয়োগের পত্র গুলি ছুড়ে দিয়ে বলে ধুর মিয়া পরিচয় আগে দেয়া যায় না। পারলে এর মধ্যে থেকে খুঁজে নাও। আর পিয়ন কে বলে ঐ এদিক এসো চা বানানো বন্ধ রাখো, অফিসে অনেক কাজ পড়ে আছে, কাজ করো।

আমি দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হতে অর্থনীতিতে ১ম শ্রেণী প্রাপ্ত একজন ছাত্র একজন অফিস সহায়কের এমন আচরণে হতবাক হয়ে গেলাম। সে সময় মনে হচ্ছিল আমি আমার সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেলছি। আসলে আমি জানি আমার মত হাজারো সহকর্মী এভাবে প্রতিদিন সর্বক্ষেত্রে নিজের পেশাগত পরিচয় এর কারণে অসম্মানিত হচ্ছে।

নিজ অফিস থেকে শুরু করে সরকারী সব অফিসেই, প্রাইমারীর শিক্ষকদের সাথে আচরণ যেন সংরক্ষিত। কাগজ কলমে সীমাবদ্ধ একটি কথা আছে, আমরা নাকি মানুষ গড়ার কারিগর। জাতির মেরুদণ্ড, হ্যান ত্যান সাত সতেরো।

ছাত্র অবস্থায়, কিংবা চাকরী পূর্ব জীবনে যতটা সম্মান পেয়েছি, সত্যি বলতে এই মহান পেশাতে ঢুকে সেই সম্মান টুকুও আজ বিলুপ্তির পথে।

এই যদি হয় পরিস্থিতি তাহলে মেধাবীরা কিভাবে আসবে এই সেক্টরে? মেধাবীদের হাতে প্রাইমারী শিক্ষা না থাকলে এই দেশের শিক্ষা বসা ভেঙ্গে পড়বে। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ গুলোতে উচ্চ গ্রেড, উচ্চ বেতন দিয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। অথচ শিক্ষার মূল ভিত্তি যেখানে সুচিত হয়, সেখানে নিম্ন গ্রেড, নিম্ন বেতন, অবহেলিত সামাজিক মর্যাদা।

দুর্বল ভিত্তির উপর গড়ে ওঠা অবকাঠামো উপরে কংক্রিট দিয়ে মজবুতের চেষ্টা করা বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়। শিক্ষাব্যবস্থা কে যুগোপযোগী করতে হলে সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করে মেধাবীদের আকর্ষণ করতে হবে।

সেই দিনের স্বপ্ন দেখি,যেদিন সিনেমার চৌধুরী সাহেব রা সংঘাত ছাড়াই হাসি মুখে স্ব প্রণোদিত হয়ে নিজের মেয়েকে গ্রামের প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষকের ছেলের হাতে মেয়ে তুলে দিবে। ব্যক্তিগত ভাবে আমার একটা দাবী,বেতন বাড়াতে হবে না, সামাজিক মর্যাদা টা বাড়ানোর ব্যবস্থা করুন।

বাড়িতে চার-দেয়ালের মাঝে একবেলা না খেয়ে থাকলে ও কেউ দেখতে পারবে না। কিন্তু দেয়ালের বাহিরে আর নিম্ন মর্যাদার, নিম্ন গ্রেডের পেশাজীবী হয়ে অপমানিত হতে চাই না। আর তা না হলে আমি সবাই কে সাক্ষী রেখে বলছি, খুব শীঘ্রই চাকরীর ইস্তফা পত্র সহ সবার সামনে শেষ বারের মত হাজির হবো।

বাংলাদেশ জার্নাল/কেআই

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত