ঢাকা, শুক্রবার, ০৫ মার্চ ২০২১, ২০ ফাল্গুন ১৪২৭ আপডেট : ৪০ মিনিট আগে English

প্রকাশ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৯:২৫

প্রিন্ট

ভাষা আন্দোলন

মুসলিম লীগের মিথ্যাচারের প্রতিবাদ করেন শেখ মুজিব

মুসলিম লীগের মিথ্যাচারের প্রতিবাদ করেন শেখ মুজিব

জার্নাল ডেস্ক

১৯৫১ সালের শেষের দিকে বন্দি শেখ মুজিবকে ফরিদপুর জেল থেকে ঢাকার জেলে নিয়ে আসা হলো। যদিও প্রচণ্ড অসুস্থ জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে জেলে না নিয়ে জেল হাসপাতালে রাখা হয়েছিলো এক মাস। কয়েকদিন পর চোখের চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এই সুযোগে ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীসহ প্রচুর মানুষ শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করতে আসে। ১৯৫১ সালের অক্টোবর মাসে মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিব জেলে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানকে ১৬ অক্টোবর গুলি করে হত্যা করে এক যুবক। লিয়াকত আলী খানের হত্যাকাণ্ডেও কষ্ট পেয়েছিলেন মুজিব। কারণ শেখ মুজিব ছিলেন সবধরনের ষড়যন্ত্রের রাজনীতির বিরুদ্ধে। তিনি লিখেছেন, যদিও তারই হুকুমে এবং নুরুল আমিন সাহেবের মেহেরবানিতে আমরা জেলে আছি, তবুও তার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলাম। কারণ ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে আমরা বিশ্বাস করি না।

লিয়াকত আলী খান মারা যাওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন খাজা নাজিমুদ্দীন। চৌধুরী মোহাম্মদ আলী নামের একজন আমলাকে করা হলো অর্থমন্ত্রী। চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে পাকিস্তানে আমলাতন্ত্রের আধিপত্য বাড়তে থাকে। খাজা নাজিমুদ্দীন দুর্বল প্রকৃতির লোক ছিলেন। তার মধ্যে কর্মক্ষমতা ও উদ্যোগের অভাবের সুযোগ আমলাতন্ত্র মাথাচাড়া দিয়ে উঠে বলে লিখেছেন শেখ মুজিব।

তিনি বলেছেন, বিশেষ করে যখন তাদেরই একজনকে অর্থমন্ত্রী করা হলো, অনেকের মনে গোপনে গোপনে উচ্চাশার সঞ্চার হলো। আমলাতন্ত্রের জোটের কাছে রাজনীতিবিদরা পরাজিত হতে শুরু করল। রাজনীতিকদের মধ্যে তখন এমন কোন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নেতা মুসলিম লীগে ছিলো না, যারা এই ষড়যন্ত্রকারী আমলাতন্ত্রকে দাবিয়ে রাখতে পারে।

রাজনীতিবিদগণ যখন আমলা ঘেরা বেষ্টিত থাকেন, যে কোন সিদ্ধান্তের জন্য আমলাদের উপর নির্ভর করেন। রাজনীতিবিদগণ তখন বড় বড় ভুল বা অন্যায় করেন। খাজ্জা নাজিমুদ্দীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন এবং প্রাদেশিক আইনসভায় প্রস্তাব পাস করেছিলেন যে, পূর্ব বাংলার অফিসিয়াল ভাষা হবে বাংলা। শুধু তাই নয়, বাংলা যেন পুরো পাকিস্তানেরই অন্যতম অফিসিয়াল ভাষা হয়, সেজন্য কেন্দ্র সরকারকে বোঝানোর দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়ে সব ভুলে গেলেন খাজা নাজিমুদ্দীন। উল্টো ঘোষণা করলেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।

এ নিয়ে মুজিব লিখেছেন, যে ঢাকায় বসে তিনি ওয়াদা করেছিলেন সেই ঢাকায় বসেই উল্টা বললেন। দেশের মধ্যে ভীষণ ক্ষোভের সৃষ্টি হলো। তখন একমাত্র রাজনৈতিক দল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। ছাত্র প্রতিষ্ঠান ছাত্রলীগ এবং যুবাদের প্রতিষ্ঠান যুবলীগ সকলেই এর তীব্র প্রতিবাদ করে।

অসুস্থ শেখ মুজিব ঢাকার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি। একদিন সন্ধ্যায় ছাত্র নেতা মোহাম্মদ তোয়াহা ও অলি আহাদ দেখা করতে আসলেন নেতা মুজিবের সঙ্গে। শেখ মুজিব তাদেরকে রাত একটার পর আসতে বললেন। আসার সময় খালেক নেওয়াজ, কাজী গোলাম মাহবুবসহ অন্য ছাত্রলীগ নেতাদের নিয়ে আসতে বললেন শেখ মুজিব। গভীর রাতে বারান্দায় বসে শেখ মুজিব ছাত্র নেতাদের সাথে আলাপ করলেন। শেখ মুজিবের নির্দেশে সিদ্ধান্ত হলো, ভাষার মর্যাদা দাবির সংগ্রামে সফল হতে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে।

মুজিব বললেন, আবার ষড়যন্ত্র চলছে বাংলা ভাষার দাবিকে নস্যাৎ করার। এখন প্রতিবাদ না করলে কেন্দ্রীয় আইনসভায় মুসলিম লীগ উর্দুর পক্ষে প্রস্তাব পাস করে নেবে। নাজিমুদ্দীন সাহেব উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথাই বলেন নাই, অনেক নতুন যুক্তিতর্ক দেখিয়েছেন। ...খবর পেয়েছি আমাকে শীঘ্রই আবার জেলে পাঠিয়ে দেবে, কারণ আমি নাকি হাসপাতালে বসে রাজনীতি করছি। তোমরা আগামীকাল রাতেও আবার এস।

পরের দিন রাতে ছাত্রলীগ নেতারা আবার আসলে শেখ মুজিবের নির্দেশনায় সিদ্ধান্ত হয় যে আগামী ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করা হবে এবং সভা করে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে হবে। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকেই পরিষদের কনভেনর করার সিদ্ধান্তও হয়। সংগ্রাম পরিষদ বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দাবিতে ফেব্রুয়ারি মাস থেকে শক্ত জনমত তৈরির উপর গুরুত্ব আরোপ করে। সেদিন মুজিব ছাত্রলীগ নেতাদের আরো জানিয়েছেন, আমিও আমার মুক্তির দাবি করে ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে অনশন ধর্মঘট শুরু করব। আমার ছাবিবশ মাস জেল হয়ে গেছে। শেখ মুজিবকে কেন্দ্র করে ঢাকায় তীব্র আন্দোলনের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে বুঝতে পেরে সরকার নতুন ষড়যন্ত্র করল। চিকিৎসা না করিয়েই শেখ মুজিবকে হাসপাতাল থেকে আবার জেলে পাঠিয়ে দেয়া হলো।

শেখ মুজিব ঘোষণা দিলেন, হয় তিনি, না হয় তার লাশ জেলখানার বাইরে যাবে। এদিকে পাকিস্তানের সরকার নতুন চাল চালল, শেখ মুজিবকে দমিয়ে রাখতে। শেখ মুজিবকে দুরে রাখলে ভাষা আন্দোলন হবে না, এমন একটা চিন্তা থেকে তাকে ঢাকার বাইরে দূরে কোথাও পাঠিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করল সরকার।

১৯৫২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে সকালে তাকে জেলখানার গেইটে নিয়ে যাওয়া হলো। প্রশাসন থেকে বলা হলো, অনশনের ব্যাপারে কথা বলা হবে। আসলে এটা ছিলো আমরণ অনশনে যেতে উদ্যত শেখ মুজিবকে জেলখানার বাইরে এনে আরেক জেলে পাঠানোর কৌশল। জেল গেটে পৌঁছে তিনি জানতে পারলেন তাকে অন্য জেলখানায় পাঠানো হচ্ছে। জিজ্ঞেস করে জানতে না পারলেও পুলিশের একজন মুজিবকে গোপনে বলে দিলেন, তাকে ফরিদপুর কারাগারে পাঠানো হচ্ছে।

সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখে বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও ছাত্র ধর্মঘটের ডাক দেয়। আন্দোলন ঠেকাতে তৎকালীন সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে। যেকোন ধরনের গণজমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়। সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দিক থেকে ছাত্রজনতা ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে তৎকালীন ইস্ট বেঙ্গল লেজিসলেটিভ এসেম্বলি ভবন ঘেরাও করতে গেলে পুলিশ ভাষা সংগ্রামীদের উপর গুলি চালায়, এতে আব্দুস সালাম, রফিক উদ্দিন আহমেদ, আবুল বারকাত এবং আব্দুল জব্বারসহ আরও অনেক হতাহত হয়। একদিকে ঢাকার এই পরিস্থিতি, অন্যদিকে শেখ মুজিব ফরিদপুরের হাসপাতালে ভয়ানক অসুস্থ হয়ে অনশন কর্মসূচি পালন করছেন।

আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, ২১ ফেব্রুয়ারি আমরা উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা নিয়ে দিন কাটালাম, রাতে সিপাহিরা ডিউটিতে এসে খবর দিলো, ঢাকায় ভীষণ গোলমাল হয়েছে। কয়েকজন লোক গুলি খেয়ে মারা গেছে। রেডিওর খবর। ফরিদপুরে হরতাল হয়েছে, ছাত্রছাত্রীরা শোভাযাত্রা করে জেলগেটে এসেছিলো। তারা বিভিন্ন শ্লোগান দিচ্ছিলো, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, বাঙালিদের শোষণ করা চলবে না, 'শেখ মুজিবের মুক্তি চাই, 'রাজবন্দিদের মুক্তি চাই, আরো অনেক স্লোগান।

ভাষা আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলালো রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়ে জেলখানায় বন্দি ছিলেন শেখ মুজিব। জনগণকে শেখ মুজিব থেকে দূরে রাখার প্রয়াসে প্রথমে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে এবং পরবর্তীতে ফরিদপুর কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। অলি আহাদ এবং মোহাম্মদ তোহার নেতৃত্বে ভাষা সংগ্রামীরা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বন্দি শেখ মুজিবের সঙ্গে গোপন পরামর্শ করে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেন। মৃতপ্রায় শেখ মুজিবকে ২৭ তারিখে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় সরকার।

২৮ ফেব্রুয়ারি মুজিবকে তার পিতা শেখ লুৎফর রহমান গোপালগঞ্জের বাড়িতে নিয়ে যান। এদিকে ঢাকায় সরকারি পীড়নে আওয়ামী লীগসহ সরকারবিরোধী প্রায় সমস্ত রাজনৈতিক শক্তির খুব প্রতিকূল পরিস্থিতি। বেশ কয়েকদিন গ্রামের বাড়ি বিশ্রাম নিয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ না হয়েই ইত্তেফাক পত্রিকার সম্পাদক মানিক মিয়ার চিঠি পেয়ে শেখ মুজিব ঢাকায় এলেন। ঢাকায় এসে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেই ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং ডেকে দল গোছানোর কাজ শুরু করেন তিনি। ওই কঠিন পরিস্থিতিতে দলের সভ্যদের সিদ্ধান্তে শেখ মুজিবুর রহমানকে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত জেনারেল সেক্রেটারির দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। দ্বিগুণ উৎসাহে মুজিব নির্ভীক চিত্তে দল গোছানো এবং জাতীয় রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির আন্দোলনের কাজে পুরো মনোনিবেশ করলেন। ঢাকায় এসে দল গোছানোর কাজ করার পাশাপাশি, ভাষা সংগ্রামীদের পরিবারগুলোর পাশেও তিনি দাঁড়িয়েছেন। এমনকি রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিতে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে করাচিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দীনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন শেখ মুজিব।

ঢাকায় আসার পর শেখ মুজিবুর রহমানের সাহসী উদ্যোগে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং ডাকা হলো। তাতে যে বার-তেরজন সদস্য উপস্থিত ছিলেন তারা শেখ মুজিবকে ভারপ্রাপ্ত জেনারেল সেক্রেটারির দায়িত্ব অর্পণ করলেন। সেই সভায় দলের অন্যতম সহ-সভাপতি হিসেবে আতাউর রহমান সাহেব সভাপতিত্ব করেছিলেন। এমনিতেই, নতুন দল, তার উপর নেতাকর্মীদের উপর সরকারের নির্যাতন, ভয়-ভীতির পরিবেশ-সব মিলে ভেঙে পড়ার উপক্রম।

এ অবস্থায় দলের জেনারেল সেক্রেটারির ভার পেলেন শেখ মুজিব। তিনি ভয় না পেয়ে দল গোছানোর এবং জাতীয় রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির আন্দোলনের কাজে পুরোপুরি মনোনিবেশ করলেন। ওই সময় সরকারি নির্যাতন-অপশাসনের পাশাপাশি কিছু সংবাদপত্র সরকারের পক্ষে প্রভাব সৃষ্টি করে যাচ্ছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত মুসলিম লীগের সংবাদপত্রগুলো ভাবাদর্শিক আধিপত্য বিস্তারের প্রয়াস চালাচ্ছে।

আত্মজীবনীতে এ বিষয়ে তিনি লিখেছেন, এদিকে মুসলিম লীগের কাগজগুলি শহীদ সাহেবের বিবৃতি এমনভাবে বিকৃত করে ছাপিয়েছে যে মনে হয় তিনিও উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হোক এটাই চান। আমি সাধারণ সম্পাদক হয়েই একটা প্রেস কনফারেন্স করলাম। তাতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে হবে, রাজবন্দিদের মুক্তি দিতে হবে এবং যারা ২১শে ফেব্রুয়ারি শহীদ হয়েছেন তাদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দান এবং যারা অন্যায়ভাবে জুলুম করেছে তাদের শাস্তির দাবি করলাম।

সরকার যে বলেছেন, বিদেশি কোন রাষ্ট্রের উসকানিতে এই আন্দোলন হয়েছে, তার প্রমাণ চাইলাম। হিন্দু ছাত্ররা কলকাতা থেকে এসে পায়জামা পরে আন্দোলন হয়েছে, এ কথা বলতেও কৃপণতা করে নাই মুসলিম লীগ নেতারা। তাদের কাছে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ছাত্রসহ পাঁচ-ছয় জন লোক মারা গেল গুলি খেয়ে, তারা সকলেই মুসলমান কি না? যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের মধ্যে শতকরা নিরানব্বইজন মুসলমান কি না? এত ছাত্র কলকাতা থেকে এল, একজনকেও ধরতে পারল না যে সরকার, সে সরকারের গদিতে থাকার অধিকার নাই।

সূত্রঃ বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শ ও গণমাধ্যম ভাবনা, শেখ আদনান ফাহাদ।

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত