ঢাকা, রোববার, ২৫ জুলাই ২০২১, ১০ শ্রাবণ ১৪২৮ আপডেট : ৮ মিনিট আগে

প্রকাশ : ২৩ মে ২০২১, ২১:৫১

প্রিন্ট

'দূর হেমন্তের রাতে' কবিতার পরাবাস্তব জানালা

'দূর হেমন্তের রাতে' কবিতার পরাবাস্তব জানালা

আখতার জামান

'দূর হেমন্তের রাতে' কাব্যগ্রন্থটি সরাসরি কবির হাত থেকেই উপহার পেলাম। কবিতার বই উপহার হিশেবে পেতে ভালো লাগে না। উপহার পেলেও জোর করে আমি কবিকে এর যথোপযুক্ত মূল্য দিয়েই উপহার নিয়ে থাকি।

আমি জানি, একটি কবিতা-বইয়ের পেছনে একজন কবিকে কতোটা শ্রম, সাধনা ও অর্থ ব্যয় করতে হয়! কতো নির্ঘুম রাতের প্রেমের ফসল একটি কবিতাগ্রন্থ তা আমি জানি। সম্ভবত কবি বলেই হয়তো জানি। তবুও কোনো কোনো কবিকে উপহারের মূল্য দেয়ার সাহস দেখাই না। প্রথম সাক্ষাতেই বুঝে গিয়েছিলাম কবি জালাল উদ্দীন তাদের মধ্যে একজন।

সখ করে মেলা থেকে সুন্দর সুন্দর প্রচ্ছদ দেখে অনেক কবিতার বই কিনে আনি। দুয়েকটা কবিতা পড়ার পর আর পড়তে ইচ্ছে করে না। তখন কবি আবু হাসান শাহরিয়ারের কথা মনে পড়ে--

"যেদিকে তাকাই, দেখি, প্রচ্ছদের উপর চালাকি।"

'দূর হেমন্তের রাতে' বইটি হাতে পাওয়ার পর আমার এমনই মনে হয়েছিলো। মনকাড়া সুন্দর প্রচ্ছদ দেখে মনে মনে ভেবেছিলাম ভেতরে শরীর আছে তো! ঐ কবিতার মতো--

"ভেতরে শরীর নেই, কার জামা, কার জামা ঝুলছে বারান্দায়"

বইটি পড়ার পর আমার ধারণা সম্পূর্ণ পাল্টে গেলো। কেবল উপরের পোশাকই সুন্দর নয়, ভেতরে রয়েছে একটি সুন্দর হৃষ্টপুষ্ট শরীর। যার একেকটি কবিতা সমস্ত শরীরের একেকটি অঙ্গ। এরকম ৪২টি কবিতাঙ্গ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে 'দূর হেমন্তের রাতে' নামক একটি সমস্ত কবিতা-শরীর।

অনেক বিখ্যাত কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থে প্রভাব পরিলক্ষিত হলেও খ্যাতিমান প্রচ্ছদশিল্পী ধ্রুব এষের মনকাড়া প্রচ্ছদে কবি জালাল উদ্দীনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'দূর হেমন্তের রাতে' সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি কবিতার বই। 'Morning shows the day' কথাটি যে চিরন্তন তা এ বইয়ের প্রথম কবিতাটি পাঠ করলে সহজেই অনুমেয়। একের পর এক সাবলিল শব্দ বসিয়ে কবি তাঁর কবিতায় তৈরি করেছেন এক পরাবাস্তব ঘোর যা পাঠের পরও এর রেশ কাটতে চায় না কিছুতেই। কবিতার সৌন্দর্য পাঠককে ভ্রমণ করিয়ে আনে ভাবনার অলিগলি। যখন পাঠ করি--

"ঘামের উৎপাত ক্রমশ সিক্ত করে তোলে ভয়ংকর অন্ধকারের মতো প্রবল নিঃসঙ্গতা।" কিংবা

"নতুন পল্লবের আহ্বান, শুকনো পাতারা ঝরে গেলো পদপিষ্টের শঙ্কা উপেক্ষা করে।"

তখন ভাবনার সাগরে ডুব না দিয়ে উপায় থাকে না। সহজ-সুন্দর শব্দ বুননের মাধ্যমে কবিতার শরীরকে শক্তপোক্ত করতে কবিকে ডোবা-নর্দমায় স্নান করতে হয়নি, কিংবা আশ্রয় নিতে হয়নি কোনো উপরিচালাকির। কবিতায় তিনি কবিতার কথাই বলেছেন। প্রবল ঝড়-ঝাপ্টায়ও থেকেছেন শান্ত, বিস্তার করেছেন আনন্দ-বার্তা। নিচের চয়ন দুটি উপরোক্ত কথার সত্যতা প্রমাণ করে।

"মনের দেয়ালে, বাতাসের ভয়ানক তোড়ে আনন্দের স্বরূপ বিস্তার করে চলি দিনদিন।"

কবির কবিতায় জৈব-যন্ত্রণা নেই, বিকৃত যৌণাকাঙক্ষা কবির কাব্যে উপজীব্য নয়। একটি সুস্থ মানব-সম্বন্ধের উত্তাপ কবির কবিতায় সার্বজনীন। 'আত্মপ্রলাপ' কবিতাটি তারই সাক্ষ্য বহন করে। পুরো কবিতাটির পাঠোদ্ধার করা যাক:

"রাত্রি এখন অন্ধকার।

আলোটা নিভিয়ে দাও। হৃদয়ের গহীনে

কেউ হয়তো জেগে আছে; ঘুমকাতুরে,

আলোটা নিভিয়ে দাও।

এবার বিদীর্ণ ব্যথার বিপণিবিতান

খুলে দাও। কেউ এসে পান করে যাক

অঞ্জলি ভরে; সমুদ্রজল।"

শুধু প্রেম নয়, কবির মধ্যে রয়েছে অন্যান্য বৈশিষ্টও। প্রকৃতি থেকে কুড়িয়ে পাওয়া শব্দফুল দিয়ে কবি রচনা করেছেন রোমান্টিসিজম। আলোর সাথে অন্ধকারের সমন্বয় কবিতার এক নতুন চমক। নিচের কবিতাংশটি পড়লেই তা বোঝা যায়:

"আমনের গন্ধমাখা ঠোঁটে; এই পৃথিবীতে প্রথম

জেনেছি সত্য এক-- অন্ধকারের, আলোর

অধিক সৌন্দর্য নিয়ে আড়াল করে চরাচর।

মানুষের ইতিবৃত্ত, চাষবাস, দৈহিক অনুষঙ্গ।"

কিংবা,

"অন্ধকারে; আসিতেছে উড়ে সময়ের বাবুই, ঠোঁটে তার মহাকালের খড়।"

কবির কাছে প্রেমের আবেদন অন্যতম। স্বাভাবিক জীবনযাপনের সঙ্গে প্রেমও স্বাভাবিক। যৌবনের স্পর্ধায় কবির দর্পিত উচ্চারণ প্রেমিক মনের আকুতি ফোটে ওঠে:

"যদি আমার অনভিজ্ঞ প্রেমের স্পর্ধা

বনজ পুষ্পের মতো মেলে দিত ঘ্রাণ

তোমার উষ্ণ কামনার রঙিন প্রাণে"

কবি আবু হাসান শাহরিয়ার বলেন-- "প্রেমের কবিতাগুলো প্রতিপত্তিশালী।" তেমনই প্রতিপত্তি দেখা যায় কবি জালাল উদ্দীনের 'দূর হেমন্তের রাতে' কাব্যগ্রন্থটির প্রতি পরতে পরতে। 'সংশয়' কবিতাটি তেমনই একটি কবিতা। কিছু অংশ পাঠ করা যাক:

"যদি ফেরা যেত সেই পুরোনো বাগানে

আত্মার ভাষায় যাকে প্রেম বলে জানি

দুটো দূর বিন্দু একটি ঋজু রেখায়

সর এসে, তবে কেমন হতো-- জীবন?"

জীবনে চলার পথে বাস্তবিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করে কবি রচনা করেন তার কবিতা। চাওয়া-পাওয়ার মাঝে খুঁজে পান বিস্তর ফারাক। কবির ভাষায়--

"যা জেনেছি

আর যা পেয়েছি

ব্যবধান-- আকাশ কুসুম।"

তিনি মানুষকে পরিমাপ করেন প্রেম দিয়ে, ধনসম্পদ দিয়ে নয়। প্রেমকে তিনি অক্ষরে মলাটবন্দি দেখতে চান না। তাইতে ব্যকুল হয়ে বলেন:

"আসলে প্রেম কী? কালো কালো অক্ষরে মলাটবন্দি নিছক কোনো ধারনা?" কিংবা,

"কখনো মাঝ দুপুরে ক্লান্তির শেষে

দেখি মানুষের হৃদয়

আকাঙ্ক্ষার তীব্র বিষবাষ্পে ভরা।"

প্রেমকে কবি একটি প্রস্ফুটিত ফুল হিশেবে দেখতেই ভালোবাসেন। অপর একটি কবিতায় তিনি লিখেছেন:

"প্রেমকে বেঁধো না কোনো শব্দে

এতো নিছক দুটো অক্ষর নয়

প্রেম হলো ফুল, বীজে যার আবাস।"

নদী-তীরবর্তী মানুষের মন থাকে কোমল, সহজ, সরল। কবি যে মেঘনাপারের ছেলে তা কবির 'মেঘনা পারে' কবিতাটি পড়লেই বোঝা যায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ থেকে প্রায় ৩ কি.মি. দূরে মেঘনাপারে অবস্থিত দূর্গাপুর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব ও কৈশর কেটেছে নিজ গ্রামেই। দূরন্তপনা করেছেন, দাপিয়ে বেড়িয়েছেন গ্রামের মেঠোপথ, জমির আল ধরে হেঁটেছেন আর ক্লান্ত হয়ে মাথা রেখেছেন মেঘনার কোলে। 'মেঘনা পারে' কবিতাটি পড়লেই এ কথার সত্যতা পাওয়া যায়:

"এই রাতে_ অন্ধকার রাতে_ মৃতের শিথান নিয়ে শুয়ে আছি ক্লান্ত মেঘনার পারে। আধবোজা চোখ তার আজ খোঁজে না আমারে।"

কী সহজ-সরল-সাবলিল ভাষা, অথচ ভাবার্থ কতো গভীর! এমনই গভীর ভাবার্থের একটি সহজ কবিতা 'সম্পর্ক'। কবিতাটির কিয়দংশ তুলে ধরছি:

"আজকাল মনে হয়_ সম্পর্ক মানে

ধানক্ষেতে ইঁতুরের গর্ত।

কিংবা কোনো প্রচ্ছন্ন বাসনায় কাঁটাতারের বেড়া,

আপাত সন্ধি।"

কবিতার গুণের চেয়ে দোষের পরিমাণ খুঁজে বের করার মধ্যে গবেষকের জীবন সার্থক হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু তাতে কবিতার প্রকৃত রস-উদ্ধার হয় না। আমি কবি, কোনো গবেষক নই। তাই কবিতায় আমি কবিতাকেই খুঁজি। কবিতার উদ্দেশ্য আবিষ্কার করে পণ্ডিত হতে চাই না। বরং আমি খুঁজি প্রেমে বোনা কথা বা চমক। চমক সৃষ্টি করাই কবির কীর্তি। চমকের আরেক নাম কবিতা। 'দূর হেমন্তের রাতে' কাব্যগ্রন্থটির সেই চমক আছে। তেমনই একটি চমকপ্রদ কবিতা 'স্ফূর্তিহীনতা-২'। কবিতাটি নিম্নরূপ :

"নৈশ প্রহরীর মতো জেগে থাকে দুই জোড়া চোখ জীবন দিয়েছে তাদের দুটো মরুবিস্তীর্ণ বুক।"

জীবনে দুঃখ যেমন সত্য, আনন্দ-সুখও তো তাই। তবুও কবি আনন্দ-উৎসবে নিজেকে খুব বেশি মাতিয়ে রাখেন না। সমাজের দুঃখ-দুর্দশা, জরা-জীর্ণ, মরা-মারি কবিকে বিচলিত করে বেশি। শেলী বলেন--

"আমাদের মধুরতম সঙ্গীত সেইগুলো, যেখানে বর্ণিত হয়েছে দুঃখানুভূতি?"

'দূর হেমন্তের রাতে' কাব্যগ্রন্থের কবিকেও সমাজের অসংগতি নিয়ে বিহ্বল হতে দেখা যায়। কবি প্রত্যাশা করেন একটি অনাগত ভোরের, যে ভোর সমস্ত অন্ধকার দূর করে নিয়ে আসবে জাগতিক আলো। তেমনই একটি কবিতা 'ভোর আসবেই'। এ কবিতায় কবি কেবল দুঃখ-দুর্দশার চিত্রই তুলে ধরেননি, চিরকালের পাঠককে শুনিয়েছেন আশার বাণী। কিছু অংশ তুলে ধরছি:

"আহ! এই পাষাণ অন্ধকারের গ্রাসে নিস্তরঙ্গ নাট্যশালা, ঘুমন্ত মানুষের দেশ,

অবিরাম বাতাসময় দুর্গন্ধ- মরা, মারি জেগেছে কী ভীষণ!

ভোর আসবেই।"

শিল্পের কাছে, সুতরাং কবিতার কাছেও মনে হয়, মানুষের মৌলিক প্রত্যাশা জীবনযাপনেরই অনুপ্রেরণা। তাইতো কবি চিত্রকল্পের মাধ্যমে জাদুকরী শব্দের দ্বারা আমাদের চোখ রাখতে বলেন পালতোলা নৌকার পথে:

"খেয়াপারে ডাকছে দয়াপরবশ কোন সে মাঝি! এবার পালতোলা নৌকার পথে নিমিষে চোখ রাখো।"

নদীতীরবর্তী জনপদে সবুজের সমারোহে বেড়ে ওঠায় কবির কবিতায় নদী, সবুজ, পালতোলা নৌকা, খেয়াপার, পানকৌড়ি ইত্যাদি শব্দের উল্লেখযোগ্য ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। এইসব গ্রামিণ শব্দকে কবি তাঁর কবিতার অনুষঙ্গ হিশেবে বেছে নিয়ে বাংলা কবিতাকে দিয়েছেন এক উচ্চ মাত্রা। সেকারণেই কবির কবিতাপাঠের মাধ্যমে ঘরে বসেও ভ্রমণ করে আসা যায় গ্রামিণ কোনো জনপদে। দুয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি:

দেখো-- জীবনের পার ঘেঁষে বয়ে চলা নদীটিকে

পালতোলা নৌকার ভেতর কাঁদছে কোন শিশু

কোন সে কিশোরী আড়চোখে তাকিয়েছে পারে;" কিংবা'

"নিস্তব্দ নিঝুম প্রান্তর

সবুজের মাঝ দিয়ে মেঠোপথ

নদীর কূলে এসে থেমেছে

ইটভাটায় শ্রমিকের ব্যস্ততা

নদীতে শব্দিত ঢেউ নেই তেমন।"

আবার কবিকে সমাজ, সমাজের মানুষ, মানুষের মধ্যে থাকা মিথ্যাভাব, লোভ-লালসা ইত্যাদি চৈতন্যে চিন্তাশীল দেখা যায়। এটা বুঝতে নিচের পঙক্তি দুটোই যথেষ্ট:

"মিথ্যার জঠর, মানুষের হুদয়ে কীভাবে চরের মতো জেগে ওঠে লালসার আবাসভূমি!"

ইচ্ছে করছে সবগুলো কবিতা নিয়েই কথা বলি। এতে পাঠকের মূল বইটি পাঠের আগ্রহ হারাতে পারে। আজকাল পাঠকগণ এমনিতেই সমকালীন কবিদের বই খুব একটা পাঠ করতে চান না। তার উপরে একটি আলোচনায় সবগুলো কবিতার কথা থাকলে মূল বইটি পড়ার প্রয়োজন অনেকের হয় না। আবার কারো কারো আগ্রহ বেড়ে যায়, সেটা ব্যতীক্রম। অথচ সমকালীন কবিদের কবিতাই বেশি বেশি পাঠ করা উচিত। বাংলা আধুনিক কবিতার অন্যতম সমালোচক দীপ্তি ত্রিপাঠী বলেন:

"সমকালীন কবিদের সম্বন্ধে আমাদের অজ্ঞতা প্রায় লজ্জার বস্তু হয়ে পড়েছে।"

সেই লজ্জা মোচনের দায়ভার কিন্তু পাঠককেই নিতে হবে। 'দূর হেমন্তের রাতে' কাব্যগ্রন্থের কবি জালাল উদ্দীনকে সাধুবাদ জানাই এইজন্য যে, তিনি মস্তবড় ব্যাবসায়ী হয়েও কবিতার জন্য বাঁচেন। কবিতার জন্য ছুটে বেড়ান দিক্বিদিক। তাঁর এই কবিতাপ্রেমই তাঁকে বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র তৈরি করবে একদিন। কবি জালাল উদ্দীনের কবিতাপ্রেম সুনিল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার মতোই স্বচ্ছ।

"শুধু কবিতার জন্য এই জন্ম, শুধু কবিতার

জন্য কিছু খেলা, শুধু...

কবিতার জন্য এ রক্তপাত।" (শুধু কবিতার জন্য, সুনিল গঙ্গোপাধ্যায়।)

  • সর্বশেষ
  • পঠিত
  • আলোচিত